শিরোনাম :
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

বিরোধী উস্কানী দিতে বাংলাদেশে অবস্থান নেয় আকতার আলম


বুধবার, ১৮ এপ্রিল ২০১৮, ১২:৫৯ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

বিরোধী উস্কানী দিতে বাংলাদেশে অবস্থান নেয় আকতার আলম

কক্সবাজার প্রতিনিধি: সরকারের সিদ্ধান্ত ভন্ডুল করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিরোধী উস্কানী দিতে সপরিবারে বাংলাদেশে অবস্থান নেয়া আকতার আলম-এমনটি মনে করছে বিভিন্নমহল। গত শনিবার (১৪ এপ্রিল) গভীর রাতে নো-ম্যান্সল্যান্ড থেকে ৫ সদস্যকে নিয়ে মিয়ানমার ফিরে যাওয়ার পর সন্দেহের দানা বড় হতে থাকে।সাড়ে ১১ লাখের বেশী রোহিঙ্গা বাংলাদেশে থাকতে কেনইবা মাত্র একটি পরিবারের ৫ জনকে ফিরিয়ে নেয়া হলো? বিষয়টি বিভিন্ন মহলকে ভাবিয়ে তুলেছে।

অভিযোগ উঠেছে, একটি পরিবারকে ফুঁসলিয়ে বিভিন্ন প্রলোভন দিয়ে ডেকে নিয়ে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু হয়েছে বলে মিথ্যা প্রচারনা চালাচ্ছে (নাটক মঞ্চস্থ করেছে) মিয়ানমার সেনা কর্তৃপক্ষ।

রাতের অন্ধকারে শুন্যরেখা থেকে রোহিঙ্গা একটি পরিবার মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার পর বিষয়টি বিতর্ক চলছে উখিয়ার-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে।এরই মধ্যে তুমব্রু নো-ম্যানস ল্যান্ডে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে মিয়ানমারে ফেরত যাওয়া পরিবারটি গুপ্তচর ছিল।

তুমব্রু নো-ম্যানস ল্যান্ডে বসবাসরত রোহিঙ্গা আব্দুল করিম জানান, আকতার আলম ছিলেন রাখাইনের মংডু শহরের বলিবাজার এলাকার ‘তুমব্রু রাইট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। সে সময়ে রাখাইনে একক আধিপত্য বিস্তার করত এই রোহিঙ্গা নেতা।তার সাথে রাখাইনের সেনাশাসিত বাহিনীর সদস্যদের সাথে ছিল দহরম মহরম সম্পর্ক।

গত বছরের ২৪ আগস্ট এর ঘটনার পর তার উপর কোন নির্যাতন না হলে ও এ দেশে থেকে খবর সংগ্রহের জন্য মিয়ানমারের সেনাদের নির্দেশে রোহিঙ্গা ঢলের সাথে তিনিও পালিয়ে বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের তমব্রু কোনারপাড়ার নো-ম্যানস ল্যান্ডে আশ্রয় নিলেও তিনি ভাড়া থাকতেন স্থানীয় নারী ইউপি মেম্বার ফাতেমা বেগমের বাড়িতে।নির্যাতনের কারণে বাংলাদেশে আশ্রয় নিলেও আকতারের অবস্থান ছিল মিয়ানমারের পক্ষে।এ কারণেই ধরা পড়ার আগে তিনি সপরিবারে ফেরত গেছেন বলে মনে করছেন রোহিঙ্গারা।

সাথে তার স্ত্রী সাজেদা বেগম (৪৫), মেয়ে শাহেনা বেগম (১২), ছেলে তারেক আজিজ (৭), মেয়ে তাহেরা বেগম (১০) এবং গৃহকর্মী শওকত আরা বেগম (২৩) সহ পরিবারের ৭ সদস্য।কিন্তু, রোববার সকালে জানতে পারি যে সে আমাদের সাথে প্রতারণা করে মিয়ানমারে ফেরত গেছে এবং ন্যাশনাল ভেরিফেকেশন কার্ড (এনভিসি) নিয়েছে’।

বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সংকটের সরকারি-বেসরকারি খবর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর কাছে পাচার করতেন।গতিবিধি সন্দেহজনক হলেও তিনি কী করতেন তা ধরতে পারেনি রোহিঙ্গা ও স্থানীয় প্রশাসন।রোহিঙ্গা নেতা অজুহাত দেখিয়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে প্রতিদিনই আকতার আলম যোগাযোগ করতেন বলে জানিয়েছেন তমব্রুতে বসবাসরত রোহিঙ্গা ও স্থানীয়রা।

আরেক রোহিঙ্গা নেতা খালেদ হোসেন বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই আকতার চেয়ারম্যানকে সন্দেহ করে আসছিলাম।তার চলাফেরা ও গতিবিধি ছিল অন্যরকম।মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিল।মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ায় তার অবস্থান পরিষ্কার হয়ে গেল।বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার নজরে আসার আগেই তিনি মিয়ানমারে চলে গেছেন।’

ঘুমধুম ইউনিয়নের ১, ২ ও ৩নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য ফাতেমা বেগম বলেন, ‘প্রথমে মানবিক কারণে আমার বাড়িতে আকতার চেয়ারম্যানকে আশ্রয় দিয়েছিলাম। তার গতিবিধি সন্দেহজনক হওয়ায় সাড়ে ৩ মাস থাকার পর আমার বাড়ি থেকে চলে যেতে বলি। পরে তমব্রু নো-ম্যানস ল্যান্ডে ঝুপড়িঘর বানিয়ে থাকতো। রবিবার সকালে শুনেছি তিনি মিয়ানমারে চলে গেছেন।’এ ঘটনাটি বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন মিডিয়াতে আসার পর রোহিঙ্গাদের মাঝে এটি ছিল প্রধান আলোচনার বিষয়।

উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্পের কাশেম মাঝি বলেন, এখন কাকে বিশ্বাস করবো? নিজের জাতির সাথে যে বেঈমানি করতে পারে সে কি মানুষ? এমন প্রশ্ন ছিল তার।

এইদিকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য রাখাইনের মানবাধিকার পরিস্থিতি এখনো উন্নত হয়নি। জাতিসংঘের এমন অভিযোগকে মিথ্যা প্রমাণ করতে এবং রাখাইনে পরিস্থিতি রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ বুঝাতে এমন ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়েছে মিয়ানমার।মিয়ানমারের অভ্যান্তরের নো-ম্যান্স ল্যান্ডসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন, যে পরিবারটিকে প্রত্যাবাসনের কথা মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ বলছে তা বানোয়াট। পরিবারের ওই পাঁচ সদস্য বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়নি। নো-ম্যান্স ল্যান্ডের মিয়ানমারের অংশে ছিল। পরিবারটির অন্য ২ জন সদস্য এখন নো-ম্যান্স ল্যান্ডে রয়েছে।গত বছরের ২৫ আগস্টের পর সংঘটিত সেনা তান্ডবকালীন আলীথাইঞ্জ গ্রামের আক্তার কামাল গ্রাম ছেড়ে কিছু দিনের জন্য স্থানীয় পাহাড়ে আত্মগোপন করলেও, পরে গ্রামে ফিরে যায়। সেখান থেকে আবারও নো-ম্যান্স ল্যান্ডে আশ্রয় নেয়।

অন্যদিকে বাংলাদেশের শরণার্থী ও পূনর্বাসন কর্তৃপক্ষের কাছেও এ পরিবারটির সম্পর্কে কোন তথ্য জানা নেই। তারা জানেনা, কখন কিভাবে পরিবারটির ৫ সদস্য মিয়ানমারে ফিরে গেল।
সূত্র জানিয়েছে, উত্তর রাখাইনের আলীথাইঞ্জ গ্রামের এক রোহিঙ্গা পরিবারকে জিম্মি করে শরণার্থী সাজিয়েছে কর্তৃপক্ষ। জিম্মি পরিবারটির ৫ সদস্যকে সেনা ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে এনভিসি দেয়া হয়েছে।এসময় সেনা কর্তৃপক্ষের মিডিয়া উইংয়ের সদস্যরা স্থীর ও ভিডিও চিত্র ধারণ করে। এসব ছবি মিয়ানমার গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোষ্ট করে প্রচার করা হচ্ছে যে, “জাতিসংঘের সতর্কতার মধ্যেও রাখাইনে ফিরে এসেছে একটি বাঙ্গালী শরণার্থী পরিবার। তারা স্বেচ্ছায় এনভিসি (অভিবাসী কার্ড) নিয়েছে। রাখাইনে এখন অভিবাসীর বাঙ্গালীর জন্য নিরাপদ।

কক্সবাজার শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) ও অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, ১২টি ক্যাম্পে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা আছে। সেখান থেকে একটি পরিবারকে তুলে নিয়ে মিয়ানমার কী বোঝাতে চায় তা বোধগম্য নয়। এটা প্রত্যাবাসনের আওতায় পড়ে না। তমব্রু সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডে ৬ হাজার রোহিঙ্গা রয়েছে। ওই রোহিঙ্গা পরিবারগুলো প্রত্যাবাসনের আওতায় পড়ে না। এজন্য মিয়ানমার সরকারকে আগে থেকেই বলা হচ্ছে ওই পরিবারগুলাকে ফেরত নেওয়ার জন্য। কিন্তু তারা সবাইকে ফেরত না নিয়ে শুধু একটি পরিবারকে নিয়ে গেছে।শনিবার (১৪ এপ্রিল) গভীর রাতে পরিবারের ৫ সদস্যকে নিয়ে মিয়ানমারে ফেরত গেছেন আকতার আলম। গভীর রাতে সবার অজান্তে মিয়ানমার সীমান্তের ঢেকিবুনিয়া সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমারের ফেরত যান মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সহযোগিতায়।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশের এক কর্মকর্তা জানান, মিয়ানমারের সাথে চুক্তি হলেও এখনো কোন রোহিঙ্গাকে আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন করেনি বাংলাদেশ।

প্রসঙ্গত, গত বছরের ২৪ আগস্ট রাতে মিয়ানমারের রাখাইনে সহিংসতার পর বাংলাদেশে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে এসেছে। এসব রোহিঙ্গা উখিয়া ও টেকনাফের শিবিরগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চুক্তি করেছে।চুক্তি অনুযায়ী, রাখাইনে অস্থায়ী আশ্রয় শিবির তৈরির কথাও জানিয়েছে দেশটি। ইতোমধ্যে এসব রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত দিতে ইউএনএইচসিআর-এর সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি হয়েছে।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন