শিরোনাম :

সাঁতারে ৩৬ ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার পাড়ি


বুধবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৯:৩৭ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

সাঁতারে ৩৬ ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার পাড়ি

নেত্রকোনা: মানুষটি সাঁতার শুরু করলেন। তাঁর মাথার ওপর জ্বলছে গনগনে সূর্য; কখনোবা ভাদ্রের বৃষ্টি। পার হচ্ছেন গ্রামের পর গ্রাম। ঘাটের পর ঘাট। তাঁর সঙ্গে চলছে ইঞ্জিনচালিত বড় দুটি নৌকা ও দুটি ডিঙি। তাতে দুই শতাধিক উৎসুক জনতা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখছেন তাঁকে।

নৌকায় গান বাজছে, সঙ্গে বাদ্যের তাল। তিনি সাঁতার কাটছেন আর কাটছেন। তাঁর ক্লান্তি এড়াতেই এই গান-বাজনার আয়োজন। আর যাতে তিনি দুর্বল না হন, সে জন্য তরল খাবার দেওয়া হচ্ছে। এভাবে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত নদীপথে ৩৬ ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার পাড়ি দিলেন। প্রতি ঘণ্টায় তিন কিলোমিটারের বেশি পথ সাঁতরাচ্ছেন। ওই সময় তিনি সদর উপজেলার বড়ওয়ারি বাজারসংলগ্ন সেতুঘাট পার হচ্ছিলেন।

গত সোমবার সকাল পৌনে সাতটার দিকে শেরপুরের নালিতাবাড়ী ভোগাই নদের সেতুসংলগ্ন এলাকা থেকে ১৮৫ কিলোমিটার পাড়ি দেওয়ার লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করেন তিনি। মদন উপজেলা নাগরিক কমিটি ও নালিতাবাড়ী পৌরসভা যৌথভাবে দূরপাল্লার এই সাঁতারের আয়োজন করে। নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই একক সাঁতারের উদ্বোধন করেন। নদীপথে ওই পথ আসতে তাঁকে নালিতাবাড়ী ছাড়াও ময়মনসিংহের তারাকান্দা, ফুলপুর, ধোবাউড়া, নেত্রকোনার পূর্বধলা, দুর্গাপুর, সদরসহ ছয়টি উপজেলা পার হতে হয়েছে। গন্তব্যে আসতে বাকি আছে আটপাড়া ও মদন উপজেলা।

বুধবার দুপুরের দিকে গন্তব্যস্থল মদনের দেওয়ান বাজার ঘাট এলাকায় পৌঁছার কথা রয়েছে। নালিতাবাড়ী থেকে মদন নদীপথে বুগাই, ইছামতী, কংস ও মগড়া নদী রয়েছে। আসার পথে স্থানে স্থানে নদীর দুই তীরে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার নারী-পুরুষ বিরামহীন সাঁতারের ওই দৃশ্য দেখছেন। এ সময় হাত নেড়ে উৎসুক জনতার সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন সাঁতারু।

সাঁতারুর নাম ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য। বয়স ৬৭। পরোয়া নেই তাতে। নিজস্ব রেকর্ড তৈরির লক্ষ্যে তাঁর এই সাঁতার।

সাঁতারে নামার আগে ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য বলেছিলেন, ‘আমি একটি রেকর্ড করতে চাই। আর এটা প্রমাণ করতে চাই, বয়স কোনো বিষয় না। চেষ্টা থাকলে সবই সম্ভব। আমার শরীরে এখনো যথেষ্ট স্ট্যামিনা আছে। আমি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদকে বিভিন্ন সময় অনুরোধ করেছিলাম। পরিষদ আমার আবেদন গ্রহণ করেনি। তাই আমি নিজ উদ্যোগেই সাঁতরাব।’

গত বছরের ৪ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে ৬ আগস্ট দুপুর পর্যন্ত ১৪৬ কিলোমিটার নদীপথে সাঁতার কেটেছিলেন ক্ষিতীন্দ্র। এবার আরও ৩৯ কিলোমিটার পথ বাড়িয়ে ১৮৫ কিলোমিটার নদীপথে সাঁতার কাটছেন এই মুক্তিযোদ্ধা।

অদম্য এই মানুষের বাড়ি নেত্রকোনার মদন উপজেলার জাহাঙ্গীরপুর গ্রামে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন কর্তৃপক্ষের এএনএস কনসালট্যান্ট হিসেবে অবসর গ্রহণ করেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় এমএসসি পাস করেন। সাঁতার কেটে এ পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়ে চারটি পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি জানান, ১৯৭০ সালে সিলেটের ধুপাদিঘি পুকুরে অরুণ কুমার নন্দীর বিরামহীন ৩০ ঘণ্টার সাঁতার প্রদর্শনী দেখে ক্ষিতীন্দ্র উদ্বুদ্ধ হন। পরে একই বছর মদনের জাহাঙ্গীরপুর উন্নয়ন কেন্দ্রের পুকুরে তিনি ১৫ ঘণ্টার সাঁতার প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করে আলোচিত হন। ওটিই তাঁর প্রথম সাঁতার প্রদর্শনী। পরে ১৯৭২ সালে সিলেটের রামকৃষ্ণ মিশন পুকুরে ৩৪ ঘণ্টা, সুনামগঞ্জের সরকারি হাইস্কুলের পুকুরে ৪৩ ঘণ্টা, ১৯৭৩ সালে ছাতক হাইস্কুলের পুকুরে ৬০ ঘণ্টা, সিলেটের এমসি কলেজের পুকুরে ৮২ ঘণ্টা এবং ১৯৭৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের পুকুরে ৯৩ ঘণ্টা ১১ মিনিট বিরামহীন সাঁতার প্রদর্শন করে জাতীয় রেকর্ড সৃষ্টি করেন। জাতীয় রেকর্ড সৃষ্টি করায় ওই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস বন্ধ ঘোষণা করা হয় এবং ডাকসুর উদ্যোগে ক্যাম্পাসে বিজয় মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৭৬ সালে তিনি জগন্নাথ হলের পুকুরে ১০৮ ঘণ্টা ৫ মিনিট সাঁতার প্রদর্শন করে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেন। এর স্বীকৃতি হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জগন্নাথ হলের পুকুরের পাড়ে একটি স্মারক ফলক নির্মাণ করে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে ঢাকা স্টেডিয়ামের সুইমিং পুল, মদন উপজেলা পরিষদের পুকুর এবং নেত্রকোনা পৌরসভার পুকুরে তাঁর একাধিক সাঁতার প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।

ভারতেও দূরপাল্লার সাঁতার প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন ক্ষিতীন্দ্র। ১৯৮০ সালে মাত্র ১২ ঘণ্টা ২৮ মিনিটে মুর্শিদাবাদের ভাগীরথী নদীর জঙ্গীপুর ঘাট থেকে গোদাবরী ঘাট পর্যন্ত ৭৪ কিলোমিটার নদীপথ পাড়ি দেন। সাঁতার প্রদর্শনী ও রেকর্ড সৃষ্টির স্বীকৃতি হিসেবে অনেক পুরস্কার-সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গণভবনে তাঁকে রুপার নৌকা উপহার দেন। একই বছর ডাকসু তাঁকে বিশেষ সম্মানসূচক স্বর্ণপদক দেয়।

ক্ষিতীন্দ্র বৈশ্যের সঙ্গে থাকা তাঁর মামাতো ভাই বিমান বৈশ্য বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, গত বছরের মতো দাদা এবারও সফল হবেন। তাঁর শরীর এখন পর্যন্ত ঠিক আছে। তিনি কথা বলছেন। হাসছেন, গানের তালে তালে সাঁতার কাটছেন। তবে তাঁর চোখ কিছুটা লালচে বর্ণ হয়েছে। সঙ্গে ডাক্তার রয়েছেন। সমস্যা নেই।’ তিনি জানান, সোমবার রাতে হালকা ও মাঝারি ধরনের বৃষ্টি হওয়ায় কিছুটা সমস্যা দেখা দিয়েছিল।

মদন উপজেলার নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক দেওয়ান মোদাচ্ছের হোসেন বলেন, ‘গুগল ম্যাপ ডেটায় দূরত্ব নির্ণয় করা হয়েছে। ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্রের বয়স ও দৈর্ঘ্যের বিবেচনা করলে এই সাঁতার বিশ্ব রেকর্ড হিসেবে গণ্য হবে। গিনেস বুকে রেকর্ড করতে সার্বক্ষণিক সাঁতারের ভিডিও ধারণ করা হচ্ছে। তিনি সুস্থ আছেন। সব ঠিকঠাক থাকলে তিন দিনের মধ্যে তাঁকে নাগরিক কমিটির মাধ্যমে সংবর্ধনা দেওয়া হবে।’

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন