শিরোনাম :

১৩ শ্রমিকের মৃত্যুতে অপরিচিতদের চোখেও জল


শুক্রবার, ২৫ জানুয়ারি ২০১৯, ০৭:০৭ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

১৩ শ্রমিকের মৃত্যুতে অপরিচিতদের চোখেও জল

নীলফামারী: নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলায় শোকের মাতম শুরু হয়েছে। শুক্রবার ভোরে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে সড়ক দুর্ঘটনায় এই উপজেলার দুইটি ইউনিয়নের ১৩ জন শ্রমিকের মৃত্যুতে শুধু পরিবারের সদস্যরাই নয়, অপরিচিতরাও চোখের জল ঝড়াচ্ছেন।

নিহতদের মধ্যে নয়জনের বাড়ি উপজেলার মীরগঞ্জ ইউনিয়নে। বাকিরা পার্শ্ববর্তী শিমুলবাড়ী ইউনিয়নের।

দুর্ঘটনার পর সকালে ওই নিহতদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় কান্না-আর্তনাদ। নিহতের স্বজনদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারি হয়ে উঠেছে। একসঙ্গে এতজনকে হারিয়ে এলাকাজুড়েই শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

মীরগঞ্জ ইউনিয়নের নিজপাড়া কুড়ারপার গ্রামের নিহত শংকরের মা জনতা বালা ও নিহত প্রশান্ত রায় দিপুর মা গীতা রানী সন্তান হারিয়ে কাঁদছেন আর বিলাপ করে বলছেন, বুকের মানিকেরা কবে বাড়ি আসবে। ওরা যে যাবার সময় বলেছিল টাকা রোজগার করে সংসারের অভাব দূর করবে।

সেখানেই কথা হয় কুমিল্লা থেকে আসা নিহতদের সহকর্মী অনুকুল চন্দ্র রায়ের সঙ্গে। সে জানায়, আমরা একসঙ্গে কাজ করতাম। গত পরশু আমি বাড়িতে আসি। আসার সময় তারা বলেছিল, ‘আমরাও কয়েকদিন পর বাড়ি যাব।’ কিন্তু তাদের আর বাড়িতে আসা হলো না।

একই গ্রামের নিহত অমিত চন্দ্র রায়ের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, অমিতের মা সাবিত্রী সন্তান হারিয়ে বাকরুদ্ধ। বাবা কামিক্ষ্যা চন্দ্র বুকের ধনকে হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন।

ভাই নারায়ণ চন্দ্র বলেন, দুইমাস আগে সহপাঠিদের সঙ্গে রোজগারের আশায় বাড়ি ছেড়েছিল অমিত। কিন্তু আজ এটা কি হল! ৎ

একই গ্রামের নিহত রঞ্জিতের বাড়ির চিত্রও একই। রঞ্জিতের স্ত্রী সচি রানী তার একমাত্র ১০ বছরের প্রতিবন্ধী কন্যা সন্তান সাথী রানীকে নিয়ে বিলাপ করে কাঁদছেন আর বলছেন, এখন আমার সন্তানের কি হবে?

নিহতদের সহকর্মী সুজন চন্দ্র মুঠোফোনে বলেন, ভগবানের কৃপায় অল্পের জন্য মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছি।

সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ভোরে ট্রাকটি ভাটায় ঢোকার সময় একটি ইট আমার গায়ে পড়লে ঘুম ভেঙে যায়। এ সময় দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ট্রাকটি উল্টে ঘরের ওপর পরে। ট্রাকের চাপে আমার শরীর অর্ধেকও দেবে যায়। তখন অন্য সহকর্মীরা আমাকে উদ্ধার করেন।

মীরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির খান হুকুম আলী বলেন, ঘটনাটি জেনে সঙ্গে সঙ্গেই সমবেদনা জানাতে নিহতের বাড়িতে যাই। আমি প্রতিটি পরিবারের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপুরণ দাবি করছি।

জলঢাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সুজাউদৌলা বলেন, এরই মধ্যে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক ও চৌদ্দগ্রাম ইউএনওর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে লাশ জলঢাকা আসলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তা প্রদান করা হবে।

নিহত পরিবারের সদস্যদের প্রতি শোকপ্রকাশ করে স্থানীয় সংসদ সদস্য মেজর (অব.) রানা মোহাম্মদ সোহেল বলেন, নিহতদের পরিবারের জন্য আমার ও সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা প্রদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এর আগে ভোরে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে একটি কয়লাবাহী ট্রাক উল্টে ইটভাটার শ্রমিকদের থাকার ঘরের ওপর পড়ে ঘুমন্ত ১৩ জনের মৃত্যু হয়।

দুর্ঘটনায় আহত দু’জনকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

নিহতরা হলেন- মো. সেলিম (২৮), কনক চন্দ্র রায় (৩৫), মোরসালিন (১৮), রনজিত চন্দ্র রায় (৩০), বিকাশ চন্দ্র রায় (২৮), মৃনাল চন্দ্র রায় (২১), অমৃত চন্দ্র রায় (২০), দীপ চন্দ্র রায় (১৯), শঙ্কর চন্দ্র রায় (২২), মনোরঞ্জন চন্দ্র রায় (১৯), বিপ্লব (১৯), অরুন চন্দ্র রায় (২৫) ও মাসুম (১৮)।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাকটি উল্টে ইটভাটার শ্রমিকদের থাকার ঘরের ওপর পড়ে। এতে ঘুমন্ত অবস্থায় থাকা ১২ জন শ্রমিক ঘটনাস্থলেই মারা যান। হাসপাতালে নেওয়ার পথে আরেক শ্রমিকের মৃত্যু হয়।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন