শিরোনাম :

নড়াইলের দেশী মাছের শুঁটকির বিশাল সম্ভাবনা যাচ্ছে দেশের বাইরে


বুধবার, ৩ জানুয়ারি ২০১৮, ০৬:১৮ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

নড়াইলের দেশী মাছের শুঁটকির বিশাল সম্ভাবনা যাচ্ছে দেশের বাইরে

ডেস্ক প্রতিবেদন: জেলায় দেশী মাছের শুঁটকির বিশাল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, তাই এক যুগ পূর্ব থেকেই স্থানীয় জেলেরা স্বল্প পরিসরে এখানে শুঁটকির উৎপাদন শুরু করেন। লাভ ভালো হওয়ায় দিন দিন শুঁটকির উৎপাদন বাড়ছে।

স্থানীয় এসব শুঁটকি দেশের বিভিন্ন জেলার পাশাপাশি রপ্তানি হচ্ছে ভারতে। ইতো মধ্যে নড়াইলের এ শুটকির সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বাইরের বিভিন্ন দেশে। এতে লাভবান হচ্ছেন নড়াইলের শুটকি ব্যাবসায়ীরা। এবছর সাড়ে তিন হাজার মণ শুঁটকি উৎপাদন হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে মৌশুম শুরু হওয়ায় ২ মাস আগে থেকে কর্মব্যাস্ততা বেড়ে গেছে শুটকি ব্যাবসায়ের সাথে জড়িত শতাধিক নারী পুরুষের।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নড়াইল সদর উপজেলার সোলুয়ার বিলে খাল পাড়ে গড়ে উঠেছে দেশী পুঁটি মাছের শুঁটকি পল্লী। প্রতিদিন বিভিন্ন বিল-খাল থেকে দেশী পুঁটি এনে রোদে মাচা বা চাতালে শুকানো হচ্ছে। এখানে কাজ করছে এলাকার নারী পুরুষ মিলে। ভালো মূল্যে এসব মাছ জেলার বাইরে এবং ভারতে রপ্তানি হচ্ছে। শুঁটকির খরচ কম হওয়ায় এবং লাভ বেশি হওয়ায় প্রতি বছর এ ব্যবসার পরিধি বাড়ছে বলে জানালেন এখানকার ব্যাবসায়ীরা।

জানা গেছে, সদর উপজেলার কল্যানখালি গ্রামে গড়ে উঠে এ শুটকি পল্লী। ১৩ বছর আগে কল্যানখালি গ্রামের অলোক মালো স্থানীয় সোলুয়া, আড়ংগাছাসহ কয়েকটি বিলে প্রাকৃতিকভাবে দেশী পুঁটি মাছের ব্যাপক উৎপাদনের শুবাদে সখের বশে পুঁটি শুঁটকি তৈরি করে ব্যবসা শুরু করেন। সেই থেকে এখানে শুঁটকি মাছের ব্যবসা শুরু। এখন নড়াইল ছাড়াও মাদারীপুর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ ও মাগুরা জেলা থেকে বিভিন্ন ব্যবসায়ী এসে এ মাছের ব্যবসা করছেন।

জেলেরা জানান, প্রথমে হাট-বাজার থেকে মাছ কিনে এনে খালের পানিতে ধুয়ে বাঁশের মাচা করা চাতালে এক সপ্তাহ থেকে পনের দিন শুকাতে হয়। তারপর বস্তাবন্দি করে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হয়। বাংলা কার্তিক মাস থেকে শুরু করে সাড়ে চার মাস এ ব্যবসা চলে।

স্থানীয় কল্যানখালি গ্রামের মাছ ব্যবসায়ী অলোক মালো জানান, গত বছর তিনি নিজে ২শ ৫০ মণ দেশী পুঁটি মাছ শুকিয়েছেন। এবছরও তিনি ২ মাস আগে থেকে এ মাছ শুখাচ্ছেন। খুলনা, গোপালগঞ্জ, মাদারিপুরসহ বিভিন্ন জেলার ব্যাপারিরা এসে এ মাছ কিনে নিয়ে যান। আর বিভিন্ন জেলার এ ব্যাবসায়ীরা বাছাই করে বড় ভালো মানের বড় মাছ ভারতে রপ্তানী করে। ভারতে এ মাছের চাহিদা অনেক বেশি। তিনি আরও জানান, কাঁচা মাছ প্রতি মণ ৫শ থেকে শুরু করে ৫ হাজার টাকা ক্রয় করেন এবং শুকিয়ে সাড়ে ৬ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা মণ বিক্রি করে থাকেন।

মাদারীপুরের মাছ ব্যবসায়ী ফারুক বলেন, আমি প্রতি বছর এখানে ব্যাবসা করতে চলে আসি। এবছরও প্রায় আড়াই মাস আগে কর্মিসহ ৬ জন এসেছি। এখানের পরিবেশ খুবই ভালো। কোন সমস্যা নেই। ব্যবসা মাঘ মাস পর্যন্ত চলবে। আমরা এসব মাছ নড়াইল থেকে আগে ব্রাম্মনবাড়িয়া নিয়ে যায়। তার পর সেখান থেকে ভারতে পাঠাই। ভারতের কয়েকটি বাজারে আমাদের এ শুটকির বেশ চাহিদা রয়েছে। খরচ-খরচা বাদে লাভ ভাল থাকে বলে জানান তিনি।

গোপালগঞ্জ জেলার মোকছেদপুর এলাকার ব্যবসায়ী শহিদুল বিশ্বাস বলেন, মাছ শুকানোর পর মাছের সাধারনত ছোট-বড় দুটি গ্রেড করা হয়। বড় গ্রেডের মাছের দাম বেশী। ছোট গ্রেডের মাছের দাম কিছুটা কম। বড় গ্রেডের বেশির ভাগ মাছ বিদেশে রপ্তানি করা হয়। ভারতে এ মাছের চাহিদা অনেক বেশি।

তিনি বলেন, এবছর বিলে মাছের আনাগোনা কম। তায় হাটে-বাজারেও মাছের পরিমান কম। তিনি আশা করেন আর সপ্তাহ থানেক পরে বিভিন্ন বিল থেকে অনেক বেশি মাছ জেলেরা ধরতে পারবে। তখন বাজারেও অনেক মাছ আসবে। আর তখন তারা বাজার থেকে অনেক বেশি মাছ ক্রয় করে শুটকি তৈরি করতে পারবে।

মাগুরার ব্যবসায়ী মিরাজুল বিশ্বাস জানান, আমি অনেক দিন যাবৎ এ ব্যাবসার সাথে জড়িত। এখানে আমার কোন জমি নেয়। কৃষকের কাছ থেকে ৬ মাসের জন্য জমি লিজ নিয়ে ১০টি মাচাইল পেতে (তৈরি) মাছ শুকিয়ে সেই মাছ বিক্রি করি। এ ব্যবসায় প্রতি বছর কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। আমরা এ ব্যাবসা করে খুবই খুশি। তিনি আরও জানান, এ শুটকি মাছের চাহিদা আমাদের দেশের থেকে ভারতে অনেক বেশি। ভারতে চাহিদা বেশি থাকায় তাদের লাভ বেশি হয় বলে জানান তিনি।

ফরিদপুরের মুসা ব্যাপারি বলেন, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক নিয়মে এ শুটকি করা হয়। কোনো প্রকার মেডিসিন ব্যবহার করা হয় না। তাই এ মাছের চাহিদা অনেক বেশি। প্রতি বছর এখানে আনুমানিক ৫ কোটি টাকার লেনদেন হয়। ভারতে এ মাছের চাহিদা দিন দিন বেড়ে যাওয়ায় তিনি অনেক খুশি।

মাছ কিনতে আসা মাদারীপুরের আরিফুল শেখ বলেন, তার বাপ দাদারা এ ব্যাবসা করতেন। তিনিও ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে এ ব্যবসার সাথে জড়িত। এখানে দেশিয় পদ্ধিতে মাছ শুকানো হয়। তাই এ মাছের চাহিদা খুব বেশি।

তিনি জানান, আমরা এখান থেকে বেশি দামে মাছ কিনলেও চাহিদা থাকার কারণে আমরাও ভালো লাভে বিক্রি করতে পারি। আমি সাধারণত নড়াইলের শুটকি মাছ কিনে দেশের কয়েকটি জায়গাসহ ভারতে বিক্রি করি। প্রধানত এ মাছের বাজার ভারতে। ভারতে এ মাছের চাহিদা অনেক বেশি।

সিনিয়র সহকারী মৎস্য কর্মকর্তা এস এম এনামুল হক জানান, প্রতিবছর নড়াইলের বিল, খাল, ও বিভিন্ন নদী থেকে অনেক দেশীয় প্রচুর (অনেক) মাছ ধরা পড়ে। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন জায়গায় এসকল মাছ শুকানো হচ্ছে। আর এ মাছের চাহিদা দেশের বাজারে অনেক বেশি, এখানের মাছ ভারতেও রপ্তানী করা হচ্ছে। ইতি মধ্যে ভারতেও আমাদের এখানের শুটকির সুনাম অর্জিত হয়েছে। আমরা মৎস্য অফিসের পক্ষ থেকে শুটকি পল্লির জেলেদের বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে থাকি।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন