শিরোনাম :

স্যালাইন উৎপাদন বন্ধ


শনিবার, ৩০ জুন ২০১৮, ১০:২১ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

স্যালাইন উৎপাদন বন্ধ

ঢাকা: সরকারি পর্যায়ে দেশের একমাত্র স্যালাইন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটে (আইপিএইচ) জীবন রক্ষাকারী বিভিন্ন স্যালাইন উৎপাদন ছয় মাস ধরে বন্ধ রয়েছে।

এটি উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার উদাসীনতায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কাঁচামালের অভাবে স্যালাইন উৎপাদন বন্ধ থাকায় হাসপাতালগুলোতে রোগীরা দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।

বাইরে থেকে উচ্চমূল্যে তাদের স্যালাইন কিনতে হচ্ছে। শুধু স্যালাইনই নয়, সারা দেশের হাসপাতালগুলোতে ব্লাড ট্রান্সফিউশন সেটও সরবরাহ করে প্রতিষ্ঠানটি। এ ক্ষেত্রেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। এতে করে হাতেগোনা চার-পাঁচটি ওষুধ কোম্পানি এসব উৎপাদন করে বিপুল মুনাফা করছে।

আইপিএইচে উৎপাদিত স্যালাইন দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু উৎপাদন বন্ধ থাকায় স্যালাইন সররবাহ করতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। ফলে হাসপাতালগুলোতে স্যালাইনের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। উল্লেখ্য, এসব হাসপাতালে রোগীদের বিনামূল্যে স্যালাইন দেয়া হয়।

জানা গেছে, স্যালাইন তৈরির অন্যতম উপাদান গ্লুকোজ এনহাইড্রোস, গ্লুকোজ মনোহাইড্রোস এবং স্টপার টিটি, পিভিসি শিট ইত্যাদি না থাকায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। প্রায় ছয় মাস ধরে দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে বিভিন্ন ধরনের স্যালাইনের চাহিদাপত্র জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটে পাঠানো হয়। কিন্তু ইন্সটিটিউট থেকে চাহিদা অনুযায়ী স্যালাইন সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি।

১০ জুন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ১০০০ ব্যাগ ৫ শতাংশ গু­কোজ স্যালাইন (১০০০ এমএল), ১৫০০ ব্যাগ ৫ শতাংশ গ্লুকোজ স্যালাইন (৫০০ এমএল), ১০০০ ব্যাগ নরমাল স্যালাইন (১০০০ এমএল), ১৫০০ ব্যাগ কলেরা স্যালাইন (৫০০ এমএল) ও ৫০০ ব্যাগ হার্টম্যান সলিউশন (১০০০ এমএল) চাহিদা দেয়া হয়। চাহিদার বিপরীতে কোনো স্যালাইন সরবরাহ করতে পারেনি আইপিএইচ। এছাড়া ১০০০ হাজার ব্যাগ অ্যাকোয়া স্যালাইনের (১০০০ এমএল) বিপরীতে ১০০ ব্যাগ, ১৫০০ ব্যাগ অ্যাকোয়ার (৫০০ এমএল) বিপরীতে ২০০ ব্যাগ, ১৫০০ ব্যাগ নরমাল স্যালাইনের (৫০০ এমএল) বিপরীতে ২০০ ব্যাগ, ৫০০ ব্যাগ বেবি স্যালাইনের (৫০০ এমএল) বিপরীতে ১০০ ব্যাগ সরবরাহ করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০০ ব্যাগ ৩ শতাংশ সোডিয়াম ক্লোরাইড স্যালাইনের চাহিদার বিপরীতে ১০০ ব্যাগ সরবরাহ করা হয়।

১৯ জুন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে বিভিন্ন ধরনের স্যালাইনের চাহিদাপত্র দেয়া হলেও শুধু ৫০০ এমএল হার্টম্যান সলিউশন স্যালাইন ২০০ ব্যাগ এবং দুই ধরনের নরমাল স্যালাইন ১০০ ব্যাগ করে সরবরাহ করা হয়। একই অবস্থা দেখা গেছে রাজশাহী ও রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চাহিদার বিপরীতে। মার্চে দিনাজপুরের এম আবদুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে বিভিন্ন ধরনের স্যালাইনের চাহিদাপত্র দেয়া হলেও সেগুলো সরবরাহ করতে পারেনি আইপিএইচ।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফার্মেসি ও স্টোরের কর্মকর্তারা বলেন, ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে স্যালাইন, ব্লাড ব্যাগ ও ট্রান্সফিউশন সরবরাহ করছে না আইপিএইচ। তারা জানান, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতি মাসে ২০ হাজার ব্যাগের বেশি নরমাল স্যালাইন, ১২ হাজার ব্যাগের বেশি হার্টম্যান সলিউশন প্রয়োজন হয়। কিন্তু আইপিএইচের সরবরাহ বন্ধ থাকায় বাইরে থেকে বেশি দামে এগুলো কিনতে হচ্ছে।

পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক আইপিএইচের এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১২ রকমের স্যালাইন, ব্লাড ব্যাগ, ট্রান্সফিশন সেট উৎপাদন করা হয়। কিন্তু কাঁচামাল না থাকায় প্রায় ৬ মাস ধরে স্যালাইন ও ব্লাড ব্যাগ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদের পক্ষ থেকে সেগুলো আনার কোনো উদ্যোগ না নেয়ায় এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী স্যালাইন সরবরাহ করতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। তিনি আরও জানান, স্যালাইন ও ব্যাগ তৈরির কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।

এতে প্রায় তিন থেকে ছয় মাস সময় লেগে যায়। দীর্ঘদিন কাঁচামাল আমদানি না করায় অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে এবং এটি আরও দীর্ঘ হবে। এতে গরিব রোগীদের ভোগান্তি আরও বাড়বে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইপিএইচ’র আইভ ফ্লুইড শাখার কয়েকজন কর্মচারী বলেন, বর্তমানে প্রতিদিন অসংখ্য সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। এছাড়া বর্ষা মৌসুমে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক মানুষ ডায়রিয়া ও কলেরায় আক্রান্ত হচ্ছে। এসব রোগীর চিকিৎসায় স্যালাইন অপরিহার্য। তারা জানান, স্যালাইন উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার উদাসীনতায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ছয় মাসে স্যালাইন, ব্লাড ব্যাগ, ট্রান্সফিউশন সেট উৎপাদন বন্ধ থাকলেও আইপিএইচে কোটেশন বাণিজ্য থেমে নেই। নিয়মবর্হিভূতভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থের ‘ক্যাশ পার্চেজ’ করা হয়েছে।

এছাড়া বছরে বিল ভাউচারের মাধ্যমে ২০ লাখ টাকার বেশি কেনাকাটা করার বিধান না থাকলেও অর্থবছরের শেষ সময়ে ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের এসব অনিয়মের সঙ্গে দুর্নীতিবাজ কয়েকজন কর্মচারী জড়িত।

এর আগে তাদের বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলেও অদৃশ্য কারণে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও স্বাস্থ্য অধিদফতর। বরং ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ বৈধ করতে একই ব্যক্তিকে বিক্রয়, সংগ্রহ কর্মকর্তা ও স্টোর অফিসারের পদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইপিএইচের পরিচালক ডা. আবুল কালাম মো. আজাদ যুগান্তরকে বলেন, আইপিএইচে তিনি দুই মাস আগে যোগ দিয়েছেন। তবে আইভি ফু¬ইড শাখায় উৎপাদন বন্ধ প্রায় ছয় মাস ধরে। তিনি বলেন, তার আগে যারা পরিচালক ছিল তারা যথাসময়ে কাঁচামাল না কেনায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি জানান, চলতি মাসে কাঁচামাল কেনার জন্য কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। কাঁচামাল আমদানি করে উৎপাদনে যেতে আরও কয়েক মাস সময় লেগে যেতে পারে। তিনি বলেন, এবার টেন্ডার প্রক্রিয়া ছাড়াই কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। তবে এরপর থেকে ইজিপির (ই-গর্ভমেন্ট প্রকিউরমেন্ট) মাধ্যমে কাঁচামাল আমদানি করা হবে।

দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আইপিএইচে দুর্নীতি জেঁকে বসেছে। প্রতিষ্ঠানটিকে স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনতে তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
জানা গেছে, সরকারি হাসপাতালগুলোতে চাহিদামতো স্যালাইন সরবরাহ করতে জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের অনুকূলে সরকার বার্ষিক ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন