শিরোনাম :

সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থের পরিমাণ কমেছে


শুক্রবার, ২৯ জুন ২০১৮, ১০:৪১ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থের পরিমাণ কমেছে

ডেস্ক: সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমানো অর্থের পরিমাণ গত তিন বছরের তুলনায় কমলেও সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক প্রকাশিত ২০১৭ সালের সামগ্রিক আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দেশটির ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থের পরিমাণ ৪৮ কোটি ১৩ লাখ সুইস ফ্রা, টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ চার হাজার ৬৩ কোটি টাকারও বেশি। ২০১৬ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থের পরিমাণ ছিল পাঁচ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা।

বৃহস্পতিবার তাদের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের তিন বছরের চেয়ে গত বছর সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমানো অর্থের পরিমাণ কমেছে। তবে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থ কমার মূল কারণ দেশ থেকে অর্থপাচার কমে যাওয়া, নাকি আগের মতো নিরাপদ মনে না করে পাচারকারীরা সুইস ব্যাংক থেকে অর্থ সরিয়ে অন্য কোনো দেশের ব্যাংকে রাখছে, তা স্পষ্ট নয়। কারণ সুইস ব্যাংকে টাকা রাখতে বিভিন্ন দেশের পাচারকারীরা আগে যতটা নিরাপদ বোধ করত, এখন আর ততটা করছে না। কারণ বিশ্বচাপে সুইস ব্যাংকগুলো গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষার নিরাপত্তাচাদর কিছুটা সরাতে বাধ্য হচ্ছে।

প্রচলিত ধারণা হলো, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসে বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচার তত বাড়ে। তবে ২০১৭ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থের তথ্য এর সঙ্গে মিলছে না। কারণ ২০১৭ সালে বাংলাদেশিদের যে পরিমাণ অর্থ সেখানে রয়েছে, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে এর চেয়ে বেশি অর্থ ছিল। ২০১৫ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থের পরিমাণ ছিল চার হাজার ৬২৭ কোটি টাকা, ২০১৪ সালে এটি ছিল চার হাজার ২৫১ কোটি টাকা।

২০১৭ সালে বাংলাদেশিদের সুইস ব্যাংকে যে অর্থ রয়েছে তার মধ্যে ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা অর্থের পরিমাণ ৪৪ কোটি ৭০ লাখ ফ্রা, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় তিন হাজার ৮০০ কোটি টাকা। আর ব্যাংকগুলোতে গ্রাহকের আমানতের পরিমাণ তিন কোটি ৪০ লাখ ফ্রা বা ২৮৭ কোটি টাকা।

সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের এই অর্থ দেশ থেকে পাচার করা, নাকি প্রবাসে থাকা বাংলাদেশিরা নিজেদের সঞ্চয় সুইস ব্যাংকে রাখছেন, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের কিছু ব্যাংকও আমদানি বিল পরিশোধে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকের নস্ট্রো অ্যাকাউন্টে অর্থ জমা রাখে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, সুইস ব্যাংকে রাখা অর্থের বড় অংশই দেশ থেকে পাচার হওয়া। বড় ব্যবসায়ীরা আমদানি-রপ্তানির আড়ালে এই অর্থ পাচার করছেন। তবে গত বছর অর্থ মন্ত্রণালয়কে দেওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এর বেশির ভাগ অর্থই বাংলাদেশি বিভিন্ন ব্যাংক ও প্রবাসীদের। সুইজারল্যান্ডেও অনেক বাংলাদেশি ব্যবসা ও চাকরি করেন। তাঁদের জমানো অর্থও ওই দেশের ব্যাংকগুলোতে রয়েছে। তবে দেশ থেকেও কিছু অর্থ পাচার হয়ে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে রাখতে পারে পাচারকারীরা।

‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড, ২০১৭’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে কোন দেশের নাগরিকরা সুইস ব্যাংকে কত অর্থ রেখেছে তার তথ্য রয়েছে। তবে নগদ অর্থের বাইরে সোনাসহ বিভিন্ন মূল্যবান ধাতুও সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকের ভল্টগুলোতে জমা রাখে বাংলাদেশিরা। ওই সব সম্পদের হিসাব এ প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

টাকার অঙ্কে আগের তিন বছরের তুলনায় বাংলাদেশিদের অর্থের পরিমাণ কমলেও জনসংখ্যা ও বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বিবেচনায় এটি এখনো অনেক বেশি। ১২০ কোটি মানুষের দেশ ভারতের সুইস ব্যাংকে রয়েছে ১০০ কোটি ফ্রা। এটি ১৬ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশের থাকা অর্থের মাত্র দ্বিগুণ। ২০১৬ সালে ভারতের অর্থ ছিল বাংলাদেশের প্রায় সমান, ৬৬ কোটি সুইস ফ্রা। ২০১৬ সালের তুলনায় পাকিস্তানি নাগরিকদের সুইস ব্যাংকে অর্থের পরিমাণ কমলেও এখনো দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে দেশটির নাগরিকরাই সবচেয়ে বেশি অর্থ রাখছে সেখানে। ২০১৭ সালে পাকিস্তানিদের অর্থের পরিমাণ ১১০ কোটি ফ্রা, আগের বছর এর পরিমাণ ছিল ১৩৯ কোটি ফ্রা।

প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাংলাদেশে যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ে তখন বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচারও বেড়ে যায়। ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথম বছর, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালে বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচার অনেক বেড়ে গেছে।

সুইস ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে সুইস ব্যাংকে পাচার হয়েছে চার হাজার ২৫১ কোটি টাকা, আগের বছর এর পরিমাণ ছিল তিন হাজার ১২৩ কোটি টাকা। এ ছাড়া ২০১২ সালে এক হাজার ৯২২ কোটি, ২০১১ সালে এক হাজার ২৭৯ কোটি, ২০১০ সালে এক হাজার ৯৭৯ কোটি, ২০০৯ সালে এক হাজার ২৫২ কোটি, ২০০৮ সালে ৮৯৮ কোটি এবং ২০০৭ সালে দুই হাজার ৪১ কোটি টাকা পাচার হয়েছে।

২০১৬ সালে বাংলাদেশ থেকে যখন অর্থপাচার বাড়ছিল, তখন প্রতিবেশী ভারত থেকে সুইস ব্যাংকে অর্থপাচার এক বছরেই অর্ধেকে নেমে এসেছে। ২০১৫ সালে ভারতীয়দের সুইস ব্যাংকে থাকা অর্থের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে তা নেমে এসেছে পাঁচ হাজার ৫৮৪ কোটিতে। ভারত সরকার সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে গত বছর চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার আওতায় ভারতীয় নাগরিকদের কেউ সুইস ব্যাংকে অর্থ রাখলে তার তথ্য পাবে ভারত। তবে ওই অর্থের মালিকের বিরুদ্ধে ভারত সরকারের কর ফাঁকি বা অন্য কোনো আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ থাকতে হবে। ভারত সরকার সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে এই চুক্তি করার পর ভারতের নাগরিকরা নিজ দেশের সরকারের কাছে পাচারকারী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ভয়ে পাচার কমিয়ে দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সারা বিশ্বের সব দেশ থেকে কর ফাঁকি দেওয়া অপ্রদর্শিত অর্থের নিশ্চিন্ত আশ্রয় হিসেবে সুইজারল্যান্ড এখন আর আগের মতো নিরাপদ নয়। বৈশ্বিক চাপে দেশটির ব্যাংকগুলো গোপনীয়তার চাদর সরাতে বাধ্য হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত. অস্ট্রেলিয়াসহ প্রায় ৪০টি দেশের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় তথ্য বিনিময় চুক্তি রয়েছে সুইজারল্যান্ডের। এর ফলে দেশগুলো তাদের নাগরিকদের সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা হিসাবের তথ্য পাবে। প্রতিটি দেশের সঙ্গে আলাদা করে এ চুক্তি সুইস পার্লামেন্টে পাস হতে হয়। চুক্তি অনুসারে ভারত তার দেশের নাগরিকদের ব্যাংক হিসাবের তথ্য আগামী বছর থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাবে। ভারতের কর কর্তৃপক্ষ সুইস ব্যাংকে রাখা ভারতীয় নাগরিকদের হিসাব নম্বর, নাম, ঠিকানা, জন্মতারিখ, টিআইএন, সুদ ও ডিভিডেন্ড বাবদ আয়সহ অপ্রদর্শিত অর্থের সব তথ্য পাবে।

সুইস ব্যাংকে পাকিস্তানিদের ২০০ বিলিয়ন ডলার গচ্ছিত আছে—এমন তথ্য প্রকাশের পর কর ফাঁকি দিয়ে বিদেশে অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণে পাকিস্তান সরকারও উদ্যোগ নেয়। দেশটির অর্থমন্ত্রী গত বছর সংসদে সুইজারল্যান্ড সরকারের সঙ্গে তথ্য বিনিময় চুক্তি সম্পাদনের ঘোষণা দেন। ওইসিডির সদস্য হিসেবে এমনিতেই পাকিস্তান ১০৪টি সদস্য দেশ থেকে বিদেশি অ্যাকাউন্টে লেনদেনের হিসাব পেয়ে থাকে। কর ফাঁকি দিয়ে অর্থপাচারের অন্যতম নিরাপদ দেশ সিঙ্গাপুরের সঙ্গেও এ রকম চুক্তি স্বাক্ষর করেছে ভারত। যার ফলে ২০০৮ সাল থেকে সিঙ্গাপুরে গচ্ছিত সব অর্থের তথ্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষের গোচরে চলে আসবে। তবে বাংলাদেশ এখনো সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় তথ্য বিনিময় চুক্তি স্বাক্ষর করতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, বাংলাদেশে বসে সুইজারল্যান্ডের কোনো ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ নেই। তবে যে কেউ চাকরির জন্য সেখানে গেলে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারে। দেশে ফেরার পরও ওই সব অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে হয় না। তবে বাংলাদেশ থেকে যারা সুইস ব্যাংকে টাকা পাচার করছে, তারা সুইজারল্যান্ডে গিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলে এসে অর্থপাচার করছে। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী এভাবে বিদেশে অ্যাকাউন্ট খোলাও অবৈধ।

ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর করে বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে শুধু আইন করে অর্থপাচার প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশ সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি করে নিজ দেশের আমানতকারীদের তথ্য চাওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার ফলে ওই সব দেশ থেকে পাচার কমেছে। বাংলাদেশও একই উদ্যোগ নিতে পারে। এ ছাড়া শুধু কঠোর আইন করে অর্থপাচার প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, একটি শ্রেণি অবৈধ অর্থ লুকানোর জন্য বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকে টাকা জমা করছে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে কম অথবা অতিমূল্য ঘোষণার মাধ্যমে টাকা পাচার করা হয়। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) এগুলো খতিয়ে দেখা উচিত। তবে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে আমানতকারীদের গোপনীয়তা রক্ষা করার বিষয়ে আইন অনেক কড়া। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে তারা এই আইন শিথিল করে। বিএফআইইউ, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ, আইন মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় সবাই সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করতে হবে।

দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ অবকাঠামো উন্নয়ন হলে অর্থপাচার আরো কমে যাবে। তখন আর কেউ বিদেশে অর্থ রাখতে আগ্রহী হবে না। কারণ বিদেশে টাকা রাখা নিরাপদ নয়। অনেকেই বিদেশের ব্যাংকে টাকা রাখার পর আর তার হদিস পায় না।

শফিউল ইসলাম আরো বলেন, সরকার এখন ব্যবসায়ীদের বৈধভাবে বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ দিচ্ছে। এর ফলে অর্থপাচার কমে যাবে। শুধু আইন করে অর্থপাচার প্রতিরোধ সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এই টাকার পুরোটাই কিন্তু পাচার হওয়া টাকা নয়। সাধারণের মধ্যে এই নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি আছে। সুইজারল্যান্ডসহ অন্যান্য অনেক দেশে প্রচুর বাংলাদেশি আছে, যারা বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এরা অনেকেই বৈধভাবে উপার্জিত অর্থ সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে রাখে। এদের সবার তথ্য আমাদের পক্ষে কেন, কোনো দেশের পক্ষেই বের করা সম্ভব নয়। কেননা আমানতকারীদের তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করার বিষয়ে তাদের আইন অনেক কড়া। আমরা কেবল যাদের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগ বা সন্দেহ করা হচ্ছে তাদের তথ্য চাইতে পারি। এরই মধ্যে অনেকের তথ্য আনাও হয়েছে। এ রকম কিছু মামলার বিষয়ে আমরা তথ্য এনেছি।’

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন