শিরোনাম :

সামিটের আজিজ খানের 'শত কোটিপতি' হয়ে উঠার গল্প


বুধবার, ২৯ আগস্ট ২০১৮, ১২:৩৩ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

সামিটের আজিজ খানের 'শত কোটিপতি' হয়ে উঠার গল্প

মিজানুর রহমান: সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ব্যবসা সাময়িকী 'ফোর্বস' এর সিঙ্গাপুরের শীর্ষ ধনীদের তালিকায় সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আজিজ খানের নাম সিঙ্গাপুরের শীর্ষ ৫০ ধনীর তালিকায় ৩৪তম অবস্থানে উঠে এসেছে। আর এর মাধ্যমে ডলারের হিসেবে তিনিই দেশের প্রথম 'শত কোটিপতি'।

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহসেনা হাসান ই-মেইলে জানান, তালিকায় আজিজ খানের শুধুমাত্র ‘পাওয়ার এসেট’ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে যার মূল্য ৯১০ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশে তার পারিবারিক সম্পদের পরিমাণ ১.৫ বিলিয়ন ডলারের সমান।

৬৩ বছর বয়সী আজিজ খান বাংলাদেশে ৩৬ বছরের বেশি সময় ধরে বিদ্যুৎ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। বিদ্যুৎ, বন্দর, ফাইবার অপটিকস, রিয়াল এস্টেট, এলএনজিসহ বিভিন্ন সেক্টরে সামিট গ্রুপের ২০টিরও বেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ কর্মরত।

স্বাধীনতা পরবর্তী অস্থির এক সময়ে চারিদিকে নানা বিশৃঙ্খলা চলছিল সেসময় খুব কম মানুষের মধ্যেই ব্যবসা-বাণিজ্যের ঝোঁক ছিল। মুহাম্মদ আজিজ খান তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সেই ছাত্র অবস্থাতেই আরও কিছু বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে ঝুঁকে পড়লেন ব্যবসার দিকে।

মুহাম্মদ আজিজ খান বলেন, 'আমি ব্যবসা শুরু করি ১৯৭৩ সালে পুরান ঢাকায়। বাবার কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা নিয়ে শুরু করেছিলাম। মাত্র এক বছরের মধ্যেই ব্যবসা করে সেই টাকা বাবাকে ফেরত দেই। তাই আমি অনেক সময় মজা করে বলি যে আমি ক্যাপিটাল বা পুঁজি ছাড়াই ব্যবসা করে আজকের পর্যায়ে এসেছি।'

পুরান ঢাকায় আজিজ খানের প্রথম ব্যবসা ছিল পিভিসি সামগ্রীর।

আজিজ খান বলেন, 'আমার ব্যবসায়িক পার্টনার আগে থেকেই ব্যবসায় ছিলেন। পুরান ঢাকার চকবাজারে গিয়ে ব্যবসা শুরু করি। সেখানে পিভিসি বা পলি ভিনাইল ক্লোরাইডের ব্যবসায় নামি। এরপর একসময় চিটাগুড়ের ব্যবসাও করেছি। বাংলাদেশ থেকে আমিই প্রথম চিটাগুড় রফতানি করি।'

তখন আজিজ খান দিনে ব্যবসা করেন, আর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা প্রশাসন ইনষ্টিটিউটে এমবিএর কোর্স করেন।

তিনি বলেন, 'পুরান ঢাকায় যাদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করতাম, তাদের কাছ থেকে অনেক সাহায্য পেয়েছি। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোও আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করেছে। প্রথম শুরু করেছিলাম ট্রেডিং দিয়ে। তারপর ইনফ্রাস্ট্রাকচারে যাই। সেখান থেকেই ব্যবসা করতে করতে আজকের অবস্থানে পৌঁছেছি।'

ফোর্বস তার সম্পদের যে হিসেবে দিয়েছে সেটা কি সঠিক? হিসেবটা কমবেশি ঠিকই আছে বলে মনে করেন তিনি।

আজিজ খান বলেন, 'ফোর্বস ম্যাগাজিন যেভাবে আমাদের মূল্যায়ন করেছেন, সেটা তাদের সিস্টেমে তারা করেছেন। আমরা এখনো সিঙ্গাপুরের বাজারে তালিকাভুক্ত নই। যদি হতাম, তাহলে আমাদের ইকুইটির বাজার মূল্য হতে এক দশমিক দুই বিলিয়ন ডলার। সেটাকেই তারা হয়তো নয়শো দশ মিলিয়ন ডলার হিসাব করেছে।'

'আমরা মনে করি এই মূল্যায়ন ঠিকই আছে। এটা কিন্তু আমার মূল্যায়ন নয়। এটা আমাদের পরিবারের মূল্যায়ন। পরিবারে আমার ভাই-বোনরা আছেন, মেয়েরা আছেন। ভাইদের মধ্যে অবশ্য ফারুক খান, ফিরোজ খান এবং ইমরান খান আমাদের ব্যবসায় নেই।'

সামিট গ্রুপের এই যে বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য, কী কী আছে তাতে? কোন কোন খাতে তারা ব্যবসা করছেন? এই প্রশ্নের উত্তরে আজিজ খান বলেন, 'মূলত বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও বন্দর খাতে এবং ইন্টারনেট যোগাযোগের মূল কাঠামো ফাইবার অপটিক খাতেই আমাদের বিনিয়োগ। এছাড়া বাংলাদেশে হোটেল খাতে এবং শপিং মলেও আমরা বিনিয়োগ করছি।'

তিনি আরও বলেন, 'বাংলাদেশে আমাদের এক দশমিক পাঁচ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ বারো হাজার হতে তের হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আছে।আগামী তিন চার বছরে আরও ২৫ হাজার কোটি টাকা আমরা বিনিয়োগ করতে পারবো।'

বাংলাদেশে এখন যত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়, তার প্রায় পনের শতাংশ আসে সামিট গ্রুপের বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে। সামিট বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী।

এ বিষয়ে আজিজ খান বলেন, 'এই মূহুর্তে আমাদের মোট উৎপাদন ক্ষমতায় এক হাজার নয়শো পঞ্চাশ মেগাওয়াট। আরও ৫৮০ মেগাওয়াটের কাজ চলছে। ২০২০ বা ২০২১ সাল নাগাদ শেষ হবে। পাইপলাইনে আছে আরও ২৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প। এর পাশাপাশি কাজ চলছে একটি এলএনজি টার্মিনালের।'

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে সামিট গ্রুপ যে এত বেশি ব্যবসা বাণিজ্য করছে সেটা সরকারের সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার কারণেই সম্ভব বলে অনেকে মনে করেন। মুহাম্মদ আজিজ খানের একজন ভাই অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল ফারুক খান আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা এবং সরকারের একজন সাবেক মন্ত্রী।

আজিজ খান দৃঢ়তার সাথে বলেন, সরকারের কাছ থেকে অন্যায্য কোন সুবিধা নেয়া হয়নি।

তিনি বলেন, 'বাংলাদেশের সব সরকারের সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্ক ছিল। বর্তমানেও খুব ভালো সম্পর্ক। আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করছি ১৯৯৮ সাল হতে। তখন থেকে যত সরকার এসেছে, সবার সঙ্গেই আমাদের ভালো সম্পর্ক। কোন সরকারের সময় কমবেশি বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে। কোন সরকারের সময় বেড়েছে, কোন সরকারের সময় কমেছে। কিন্তু আনুপাতিক হারে আমরা সবসময় ১৫-২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত ছিলাম।'

তার মতে, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তারা বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে বিশেষ মনোযোগ দেয়। সেটারই সুফল পেয়েছেন তারা।

সামিট গ্রুপের অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সিঙ্গাপুরের শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। আজিজ খান নিজেও স্থায়ীভাবে সিঙ্গাপুরেই থাকেন।

কেন তিনি সিঙ্গাপুরকে তার ব্যবসা-বাণিজ্যের বিষয়ে আজিজ খান বলেন, 'দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ফাইন্যান্সিয়াল ক্যাপিটাল কিন্তু সিঙ্গাপুর। তাদের ক্রেডিট রেটিং খুব ভালো। সেখানে কোম্পানি খুললে আমার ব্যবসার জন্য অর্থ সংগ্রহ করা সহজ। বাংলাদেশের তুলনায় সিঙ্গাপুরে ব্যাংক ঋণের সুদ অনেক কম। বাংলাদেশে যদি সুদের হার হয় ছয় শতাংশ, সিঙ্গাপুরে সেটা চার শতাংশ। আমাদের ব্যবসাটা ক্যাপিটাল ইনটেনসিভ। যেখানে বিলিয়ন ডলার ইনভেস্টমেন্ট, সেখানে কিন্তু এই দুই শতাংশ বিরাট ব্যাপার। এই দুই শতাংশ কম হারে যে আমরা ঋণ পাই, সেটার কারণেই আমরা সর্বনিম্ন দরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারি।'

প্রাথমিক জীবন
খান একজন সেনা কর্মকর্তার ছেলে। একজন ব্যবসায়ী হিসেবে তাঁর প্রথম পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছিল, তার বন্ধুর সঙ্গে, যিনি তার বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের আমদানি ব‍্যাবসার সঙ্গে নিযুক্ত হতে বাধ্য হন। তখন ১৮ বছর বয়সী খান ১৯৭৩ সালে পিতার কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা ধার করে বিনিয়োগ করেছিলেন।

১৯৮০ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব‍্যাবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট (আই.বি.এ) থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।

পেশা
খানের নেতৃত্বে, সামিট গ্রুপ ১৯৯৮ সালে দেশের প্রথম বেসরকারি বিদ্যুৎ প্লান্ট স্থাপন করে, যা খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড নামে পরিচিত।

ওশেন কনটেইনার্স লিমিটেড, সামিট গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারী অফ-ডক সুবিধা প্রতিষ্ঠা করেছিল, যা এখন সামিট অ্যালায়েন্স পোর্টস লিমিটেড নামে পরিচিত। বর্তমানে দেশের ৩০% রপ্তানি এবং দেশের আমদানি খাতের ১০% এই প্রতিষ্ঠান করে থাকে।

সামিট কমিউনিকেশনস লিমিটেড প্রথমবারের মতো দেশীয় টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক স্থাপন করে যা ফাইবার অপ্টিক্সকে বাংলাদেশের ৭০% কভার করে এবং বাংলাদেশকে , ভারত ও মায়ানমারের সাথে স্থায়ী ফাইবার অপটিক্সের মাধ্যমে সংযুক্ত করে।

আই.পি.সি.ও লিমিটেড , সামিট গ্রুপের একটি আতিথেয়তা এবং রিয়েল এস্টেট কোম্পানি। তারা একটি পাঁচ তারকা, একটি তিন তারকা হোটেল, একটি কনভেনশন হল এবং ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে ১০০০ টি দোকান নির্মাণ করছে।

২০১১ সালে, খান বাংলাদেশে ৩২৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণের জন্য জিইই এর সাথে একটি যৌথ উদ্যোগে নেন। সেখানে তিনি সামিট গ্রুপের নেতৃত্ব দেন। এই যৌথ উদ্যোগে বিশ্বব্যাংকের $ ১১২ এবং nbsp; মিলিয়ন ডলার সহ $ ৩২৭ মিলিয়ন ডলারের অর্থ তহবিল গঠন করা হয়।

সমালোচনা
২০১৬ সালের এপ্রিলে, পানামা প্যাপার্স -এ মুহাম্মদ আজিজ খান, উনার স্ত্রী আঞ্জুম আজিজ খান, কন্যা আয়েশা আজিজ খান, ভাই জাফর উমায়েদ খান এবং ভাতিজা ফয়সাল করিম খান এর নাম পাওয়া যায়। এতে দেখা যায় যে তাদের নামে সিঙ্গাপুরের ঠিকানা ব্যবহার করে ছয়টি অফশোর কোম্পানি পরিচালনা করা হচ্ছিল যার অধিকাংশ ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত।

বাংলাদেশ রাজস্ব বোর্ড (NBR) অর্থ পাচার ও কর প্রতারণার জন্য মুহাম্মদ আজিজ খান সহ বাংলাদেশের ২৫ জন রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের উপর অনুসন্ধান শুরু করেছে। তাছাড়া বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্তের জন্য তিন সদস্যের কমিটি তৈরি করেছে।

ব্যক্তিগত জীবন
মুহাম্মদ আজিজ খান সিঙ্গাপুরের একজন স্থায়ী বাসিন্দা। তিনি আঞ্জুমান আজিজ খান এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ। তাদের তিনজন কন্যাসন্তান রয়েছেন যাদের নাম আয়েশা, আদিবা ও আজিজা। আয়েশা খান হচ্ছেন সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনালের সিইও।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন