শিরোনাম :

নববর্ষ ১৪২৩: আত্মশুদ্ধির সময় এখনই


বৃহস্পতিবার, ১৪ এপ্রিল ২০১৬, ১১:৫৩ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

নববর্ষ ১৪২৩: আত্মশুদ্ধির সময় এখনই

বছর ঘুরে আরো একবছর যোগ হলো চিরতরুণ বাংলা নববর্ষের শরীরে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরো বেশি রঙিন-যৌবনাদ্দীপ্ত হয়ে উঠছে বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। বলাই বাহুল্য, শ্রেণি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য এটাই বাঙালি সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় উৎসব। কাজেই পহেলা বৈশাখকে নিয়ে আমাদের জাতীয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে একটা আলাদা উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকে। আমরা আমাদের সংস্কৃতির মহাত্বের কথা ভেবে যেমন গর্বিত হয়, তেমনি দৈন্যতার কথা ভেবে শঙ্কিত হয়। আমরা গর্বিত হই আমাদের চিরায়ত সংস্কৃতির কথা ভেবে, আমরা গর্বিত হই আমাদের ভাষা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এখনও লীন হয়নি ভেবে। আমরা গর্বিত আমাদের খেলাধুলা ও শিক্ষাদীক্ষা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রসারতার কারণে, আমরা গর্বিত এমন আরো অনেক কারণেই। আবার, আমরা শঙ্কিত আমাদের চেতনা প্রশ্নবিদ্ধ দেখে, আমরা শঙ্কিত আমাদের সংস্কৃতির রিমিক্স তৈরির মহড়া দেখে, আমরা শঙ্কিত আমাদের নৈতিক অবক্ষয় দেখে। আমরা শঙ্কিত এমন অনেক কারণেই। আমরা পুরো জাতিজুড়েই আজ আত্মগর্ব ও শঙ্কার মাঝে দোদুল্যমান। আমরা এই ভীষণ আনন্দিত হয়, আবার এই তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ি! আমরা এই অন্যায় দেখলে মাথা চাড়া দিই, আবার এই অন্যায়ে সামিল হই! সামগ্রিক ভাবে, পৃথিবীর চলমান ইতিহাসে আমরা এখন এক ‘কনফিউজড’ জাতি। 

আজ স্বাধীনতার এতটা বছর পর মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে কথা বলবার মানুষ থাকবার কথা ছিল না, কিন্তু আছে। দেশীয় সংস্কৃতিকে খাটো করে ভিনদেশী সংস্কৃতিতে মত্ত হওয়ার মতো বাঙালি থাকবার কথা ছিল না, কিন্তু তাও আছে। তার মানে গোলযোগ কোথাও একটা আছে এবং সেটা মিটিয়ে ফেলবার এখনই সময়। এখনই মানে বাঙালির সবচেয়ে প্রাণের অনুষ্ঠান, চেতনার মাস এই পহেলা বৈশাখ থেকেই সেটা শুরু করা যায়।
আত্মশুদ্ধির জন্য কোনো বিশেষ দিনক্ষণ লাগবার কথা নয়। সেটা আমিও মানি। কিন্তু অনুপ্রেরণা যে দরকার এ বিষয়ে কারোরই দ্বিমত থাকবার কথা নয়। সেই অনুপ্রেরণা হিসেবে বাঙালিদের আত্মশুদ্ধির জন্য একটি বিশেষ দিন বা সময় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এই পহেলা বৈশাখ। আমি অবশ্যই একুশে ফেব্রুয়ারির কথা বলতে পারতাম, ভাবতে পারতাম বিজয় দিবস কিংবা স্বাধীনতা দিবসের কথা। কিন্তু আমি আরো আগে ফিরে যেতে চাইছি। চেতনাটা একেবারে মূল থেকে উঠিয়ে আনতে চাইছি। এখনও যারা বিশ্বাস করেন, পহেলা বৈশাখ বা আমাদের নববর্ষ উদযাপন হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি, এটি বাঙালি মুসলমানদের অনুষ্ঠান নয়, তাদের সেই বিশ্বাস টিকিয়ে রেখে বাঙালিকে একাত্ম হওয়ার কথা বলা আর উলু বনে মুক্ত ছড়ানো একই কথা। কাজেই শুরুটা সেখান থেকেই করার প্রয়োজন।

সময়ের পরিক্রমায় হয়ত দিনটি উদযাপনের তরিকায় আমূল বদল এসেছে। কিন্তু বাঙালিকে ঐতিহ্যমুখী করবার জন্য দিনটির ভূমিকা আগের মতোই অক্ষত আছে। ৬০-এর দশকে ঢাকায় রমনা বটমূলে ছায়ানট দিনটিকে উদযাপনের ভেতর দিয়ে সামরিক পাক সরকারের বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদ জানায়। একমাত্র শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চার ভেতর দিয়েই একটা জাতি পরিশুদ্ধ হতে পারে, অস্থিরতা থেকে মুক্তি পেতে পারে, তার সাক্ষী বিশ্ব ইতিহাসে যেমন আছে তেমন বাংলাদেশের ইতিহাসেও আছে। আমরা যত বেশি সংস্কৃতিমনা হবো, ততবেশি আমাদের ভেতর সততা ও ঐক্যের জায়গা তৈরি হবে। আমরা পরস্পর পরস্পরের ওপর ততবেশি আস্থাশীল ও বিশ্বাসী হবো। আমরা মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে একটু একটু করে আমাদের সংস্কৃতি থেকে বিচ্যুত হতে থেকেছি বলেই মৌলবাদ আজ এত শক্ত অবস্থানে আসতে পেরেছে। যে মৌলবাদের বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ করেছি, একটু একটু বেখেয়ালি হয়ে সেই মৌলবাদকেই আবার উসকে দিয়েছি। এসব বিষয়ের কোনটিই আজ আর আমাদের কাছে অজানা নয়। এখন সময় শুধু ফিরে আসার: আপন সংস্কৃতি, আপন বিশ্বাস ও সর্বোপরি আপন ঠিকানায়।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন