শিরোনাম :

সংস্কৃতির চর্চাই কি তবে অপরাধ?


রবিবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৬, ০২:৩৮ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

গতকাল সকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে তার বাড়ির সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সন্ধ্যায় নিজেদের ওয়েবসাইটে হত্যার দায় স্বীকার করেছে আইএস। এর আগে ২০১৪ সালের ১৫ নভেম্বর ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. একেএম শফিউল ইসলামকে। রাবিতে গত এক যুগে খুন হয়েছেন ৪ জন শিক্ষক। ২০০৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. ইউনুসকে হত্যা করা হয়। ২০০৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি নিখোঁজ হন ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এস তাহের আহমেদ। নিখোঁজের দুইদিন পর ৩ ফেব্রুয়ারি বাসার পেছনের সেফটিক ট্যাংক থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। ২০১৪ সালের ১৫ নবেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন চৌদ্দপাই এলাকায় নিজ বাসাভবনের সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম শফিউল ইসলামকে।

এই হত্যাকাণ্ডগুলো আমাদের সামনে নতুন বাস্তবতার সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে হত্যা করার বিশেষ কোনো কারণ উদ্ধার করতে পারছেন না তার সহকর্মী, ছাত্রছাত্রী তথা নগরবাসীরা। তিনি ধর্মীয় গোঁড়ামির বিপক্ষে কথা বলতেন। কিন্তু নাস্তিক ছিলেন কিনা সেটি তার আচরণে কখনোই পরিষ্কার হয় নি। অর্থাৎ তিনি ধর্ম নিয়ে বিদ্বেষমূলক কথাবার্তা বলতেন না। বলতেন সামাজিক অনাচার অসঙ্গতি নিয়ে। তাহলে কি তার অপরাধ? মোটা দাগে একটা ‘অপরাধ’ তার বের হয়েছে। তিনি সাংস্কৃতিমনা মানুষ ছিলেন। রাবির ইংরেজি বিভাগের সাংস্কৃতিক ও খেলাধুলায় বিষয়টি তিনি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে দেখতেন। এর বাইরে তিনি কোমলগান্ধার বলে একটা সাহিত্যপত্রিকা বের করতেন। নিজে খরচ করে পত্রিকাটি বের করতেন ইংরেজি বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের লেখা প্রকাশ করবেন বলে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বাঙালির উৎসব পার্বণে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে গানবাজনা করতেন। নিজের গ্রামে তিনি বাচ্চাদের জন্য গান শেখানোর স্কুলও দিয়েছিলেন পকেটের টাকায়।

এই শিক্ষকের সখও ছিল সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গে। তিনি ভালো সেতার বাজাতে পারতেন। তার একটি দামি সেতার ছিল। আর বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ভিডিও করবেন বলে সখের ক্যামেরাম্যান ছিলেন। ছাত্রদের ছবি দেখাতে প্রজেক্টর কিনেছিলেন। এইরকম নানা সাংস্কৃতিক সখের কথা জানা যাচ্ছে।

এর বাইরে এই শিক্ষকের কোনো রাজনৈতিক যোগাযোগ ছিল না। একা একা থাকতে পছন্দ করতে। অর্থের পেছনে ছুটতেন না। ঠোঁটকাটা সত্যবাদী ছিলেন বলে অনেকে তাকে এড়িয়ে চলতেন। তাহলে এই মানুষটাকে মধ্যযুগীয় স্টাইলে খুন করা হল কেন? এর কারণ আপাতত আমরা দেখতে পাচ্ছি উনি দেশে সংস্কৃতি চর্চা প্রসারে কাজ করছেন, সেটা মৌলবাদী জঙ্গী গোষ্ঠীরা চাচ্ছে না। যে কারণে তাকে খুন করা হয়েছে। এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে কি বাংলাদেশে এখন সংস্কৃতি চর্চা অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে! আমরা কি দেশ থেকে সাংস্কৃতিক সকল কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করে দেবো? যে দিকে এখন দেশের গতিপথ তাতে মনে হচ্ছে এখনই সময় দেশের সাধারণ জনতাকে একত্রিত করে বুদ্ধিজীবী শ্রেণির কিছু একটা কার্যত পদক্ষেপ নেয়া। নইলে কালে কালে বেলা একেবারে চলে যাবে, তখন আর কিছুই করার থাকবে না।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন