শিরোনাম :

পরীক্ষার উদ্দেশ্যই হওয়া উচিত যোগ্যদের পাস করানো


শনিবার, ২৮ মে ২০১৬, ০৯:৫৬ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডিতে প্রকাশিত একটি খবরের কিছু অংশ তুলে দিলাম। পাবলিক পরীক্ষা থেকে বহুনির্বাচনী প্রশ্ন (এমসিকিউ) তুলে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা। এছাড়া এমসিকিউ পুরোপুরি তুলে দেওয়ার পাশাপাশি পাবলিক পরীক্ষার জন্য একটি সৃজনশীল প্রশ্ন ব্যাংক তৈরিরও সুপারিশ করেন তারা।

গত বৃহস্পতিবার ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে মাধ্যমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে করণীয় শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় তারা সরকারকে এসব পরামর্শ দেন। 'মাধ্যমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে করণীয়' শীর্ষক এ মতবিনিময় সভায় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সভাপতিত্ব করেন। সভা সঞ্চালনা করেন শিক্ষাসচিব মো. সোহরাব হোসাইন।

তারা বলেন, সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতির কারণে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায় তালগোলের সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষকরা নিজেরাই ঠিকমতো সৃজনশীল বোঝেন না। বেশিরভাগ শিক্ষকই এই পদ্ধতিতে প্রশ্ন করতে পারেন না। ফলে শিক্ষার্থীরাও সৃজনশীল পদ্ধতি আত্মস্থ করতে পারছেন না। তাই অতি দ্রুত কারিকুলামকে সহজীকরণ করুন। এতে শিক্ষার্থীদের নোট-গাইড ও কোচিং এর উপর নির্ভরতাও কমবে।

সভায় বক্তারা শিক্ষক প্রশিক্ষণ বাড়ানো, ক্লাসরুম শিক্ষাদান পদ্ধতি আকর্ষণীয় করা, শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীদের আকর্ষণ করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাদের মতামত তুলে ধরেন।

শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, 'শিক্ষকরাই সৃজনশীল প্রশ্ন করতে পারেন না। ফলে তারা গাইডের আশ্রয় নেন। যদি একটা প্রশ্ন ব্যাংক তৈরি করা যায় তাহলে আর গাইডের আশ্রয় নিতে হবে না। অভিভাবকরা শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট টিউটরের কাছে নিয়ে যান। আর শিক্ষকরা তার ছাত্রের ভালো ফলের জন্য প্রশ্ন বলে দেন। এটা মোটেই ঠিক নয়। এমসিকিউ কমিয়ে ১৫ নম্বরে নামিয়ে নিয়ে আসা উচিত। আর পরীক্ষার উদ্দেশ্যই হওয়া উচিত ফেল করানো। যে অযোগ্য তাকে ঠেকানোর জন্যই তো এই পরীক্ষা। এই যে এতো পাস করছে তাতে সমস্ত শিক্ষা ব্যবস্থাই সন্দেহের মধ্যে পড়ছে। মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে।'

অধ্যাপক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, 'শিক্ষক, পাঠ্য বই ও পরীক্ষা শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রথমত আমরা ঠিকমতো শিক্ষক পাচ্ছি না। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও না। এরপর পাঠ্যবই। আমি নিজে পড়েও বিজ্ঞানের বই বুঝতে পারি না। পাঠ্যবই এমনভাবে লেখা উচিত যাতে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়তে না হয়। একবার যদি ভালোভাবে পাঠ্যবই তৈরি করা যায় তাহলে পাঁচ-সাত বছর পড়ানো যাবে। আর আমি নিজে দেখেছি, প্রশ্নের মান ভালো নয়। এখন জিপিএ-৫ পাওয়ার জন্য ছেলেমেয়েদের চাপ দেওয়া হয়। গ্রেডিং পদ্ধতির বিন্যাসটাও জরুরি। এমসিকিউ পুরোপুরি তুলে দেওয়া উচিত। ব্যবহারিকেও কোনো পরীক্ষা হয় না। ২৫ নম্বর এমনিতেই দিয়ে দেওয়া হয়। এ বিষয়টাও ভাবা জরুরি।'

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, 'কারিকুলাম খুবই ভারী। এজন্য শিক্ষার্থীরা কোনোকিছুই ভালোভাবে শিখতে পারছে না। এমপিওভূক্ত শিক্ষকরা ১১০ শতাংশ বেতন পাচ্ছেন। আবার বিধিবর্হিভূতভাবে স্কুলের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। জনসাধারণের করের টাকায় এই ধরনের বিলাস কী ঠিক হচ্ছে? এমসিকিউ পর্যায়ক্রমে শূণ্যে নামিয়ে আনা উচিত। এটা কোনো পরীক্ষাই না। আর পিএসসি ও জেএসসি পরীক্ষার ফলে কোচিং বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনেও উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে গাইড বই প্রকাশের সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে ওই কর্তৃপক্ষের টুপাইস কামানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে। আগে সকালে-বিকেলে পাবলিক পরীক্ষা হয়েছে। কিন্তু এখন কেন হবে না? মাধ্যমিকের ভর্তিও অঞ্চলভিত্তিক হওয়া উচিত।'


শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, 'শিক্ষায় সংখ্যাগতভাবে আমাদের অনেক পরিবর্তন হয়েছে, এখন গুণগতমান বাড়াতে হবে। শিক্ষকদের উন্নয়নে আমরা অনেকগুলো প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি। নিয়মিত প্রশিক্ষণ চলছে। প্রশ্ন ব্যাংক করার চিন্তাও আমরা করেছিলাম। যেহেতু এ ব্যাপারে সবাই একমত তাই এটি করার পথ সহজ হলো। এমসিকিউতে ২০১৭ সাল থেকে আরো ১০ নম্বর কমানো হবে। আর শিক্ষাবিদরাই এই সৃজনশীল পদ্ধতি তৈরি করে দিয়েছিলেন। কিন্তু অভিভাবকরা এতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। কোচিং ও গাইড বইয়ের বিরুদ্ধে আমাদের শক্ত অবস্থান। কিন্তু কিছু শিক্ষক এখন ক্লাসে না পড়িয়ে বাড়িতে পড়ান। আর শিক্ষায় এখন সবচেয়ে বেশি দরকার বিনিয়োগ। তবে বাজেটে এই বিনিয়োগ কমছে। আশা করছি আগামী বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়বে।'

বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতি পাবলিক পরীক্ষায় দু’টি ভাগ রয়েছে। এরমধ্যে এমসিকিউতে ৪০ নম্বর ও সৃজনশীল রচনামূলকে ৬০ নম্বর। তবে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আগামী বছর থেকে এমসিকিউ ১০ নম্বর কমানো হবে।

২০০৯ সাল থেকে দেশে সৃজনশীল পদ্ধতিতে চালু হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদফতরের একাধিক জরিপেও অধিকাংশ শিক্ষকরাই এখনও সৃজনশীল বোঝে না বলে উঠে এসেছে। আর শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে আরো করুন চিত্র লক্ষ্য করা গেছে।

দেশের গুণিজনদের কথাগুলো ভাবতে কয়েকদিন সময় নিয়েলাম। সময় নেওয়ার জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি।

যাহোক কাজের কথা যায়, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছেন, পরীক্ষার উদ্দেশ্যই হওয়া উচিত ফেল করানো। এটার চেয়ে এমন হওয়া উচিত, যোগ্যরাই পাস করুক বা যোগ্যরা পাস করবে সেভাবে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা দরকার। ফেল করানো উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয়। এতেই কি অযোগ্যরা ঝরে পড়বে না? আমার মনে হয় অযোগ্যরা ঝরে পড়বে।

১৯৯৫ সালে এমসিকিউ প্রশ্ন মাধ্যমিকে সংযুক্ত করা হয়। সেইবার মাত্র ৫০০ প্রশ্ন পড়ে চোখ বন্ধ করেই বলা যায়, পাস করত অনেকেই। প্রশ্ন করা ধারণা ঠিক না থাকলে শিক্ষাব্যবস্থা ঠিক না থাকলে জাতির অবস্থান কোথায় যাবে একটু ভাবা দরকার।

একটি বই-এর ছয়টি তল যদি একজন শিক্ষক নিজের মধ্যে ধারণ করতে না পারেন, তাহলে তিনি কি করে ছাত্রের মধ্যে ধারণ করান? শিক্ষাব্যবস্থায় কোঠা তুলে দিলে কি কেউ কি না খেয়ে মরবেন? না কোনভাবেই না খেয়ে মরবেন না। বিশেষ করে শিক্ষাব্যবস্থায় মেধাবীদের আনার ব্যবস্থা করা দরকার। এতে শেষ নয়, তাদের কাজ করার পরিবেশ ঠিক রাখতে হবে।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন