শিরোনাম :

রামপাল বিদ্যুৎপ্রকল্প : আরো একবার ভাবা যায় কী?


সোমবার, ১৮ জুলাই ২০১৬, ০৯:১৪ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার ভারতের সঙ্গে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর সম্পন্ন করেছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার প্রয়োজন ও বিদ্যুতের ঘাটতি মেটানোর জন্য দেশে প্রচুর বিদ্যুৎ দরকার। ক্রমেই ফুরিয়ে আসছে গ্যাসের মজুত, যা দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অনেকাংশে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া নদীর গতিপথ, আবহাওয়া ও জলবায়ুর চক্রের উলটপালটের কারণে যথেষ্ট বৃষ্টি ও বর্ষা না হওয়া এবং ভারত-কর্তৃক বাঁধ দিয়ে দেশে নদীগুলোতে পানি প্রবাহের তারতম্যের কারণে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনও যথেষ্ট নয়। অর্থাৎ বিদ্যুৎ ক্রয় না করলে অথবা নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন না করলে দেশ জ্বালানি-বিপর্যয়ে পড়বে। একদিকে বিদ্যুৎ ক্রয় দীর্ঘমেয়াদিভাবে লাভজনক নয়, তাই স্বাভাবিকভাবেই মনোযোগ দিতে হবে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে। বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার তাই নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দিকে ঝুঁকছে, এটি নিশ্চয় প্রশংসনীয় উদ্যোগ। জনগণ সেটা বোঝে এবং তার জন্য সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে প্রস্তুতও।

অথচ এই প্রশংসনীয় উদ্যোগের কারণে আজ সরকারের সমালোচনা হচ্ছে। এর একমাত্র কারণ হল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য ভুল জায়গা নির্বাচন। রামপাল প্রকল্পের জন্য বাগেরহাটে ১৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করে বালু ভরাটের মাধ্যমে দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য চুক্তি হয় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে। এই প্রকল্প হবে বাংলাদেশের পৃথিবী বিখ্যাত ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের মাত্র বাফারজোনের ১৪ কিলোমিটারের মধ্যে। যা সুন্দরবনের বনাঞ্চল, পরিবেশ ও জীবসম্পদের জন্য হুমকিস্বরূপ। এই প্রকল্প হবে কয়লাভিত্তিক, যেটি পরিবেশবান্ধব নয় বিবেচনায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এখন নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের এই বিতর্কিত কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লা আমদানি হবে বিভিন্ন দেশ থেকে, যেহেতু সুন্দরবন-সংলগ্ন নদীপথ জাহাজ চলাচলের জন্য উপযুক্ত নয় এই কয়লা ছোট ছোট নৌকা ও লঞ্চের মাধ্যমে বহন করে নিয়ে যেতে হবে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে, এই মালামাল ওঠানামা ও চলাচলে রয়েছে কয়লা পানি ও পরিবেশে নিঃসৃত হওয়ার ঝুঁকি। ফলে আবর্জনা, তেল, জাহাজ-লঞ্চ-নৌকা চলাচলে জলদূষণ ইত্যাদিতে সুন্দরবন ও সংলগ্ন পরিবেশের জল ও বায়ু দূষণ। শুধু সুন্দরবন নয়, বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশের মানুষ ও জনপদের জন্য ব্যাপারটি ক্ষতিকর হবে। এই প্রকল্পের ফলে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে সত্যি, কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, যে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের পাশে বসবাসকারী মানুষজন দীর্ঘমেয়াদে ৩-৬ গুণ বেশি আক্রান্ত হন ক্যানসার, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও নিউরোডিজেনারিটিভ স্নায়ুরোগে, যেহেতু কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ফলে সৃষ্ট বায়ু ও জল দূষণ মানুষকে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।

ফলে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন না করে সরকার নজর দিতে পারতো নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে। ভৌগলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ সৌরশক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য উত্তম জায়গা। এখানে বছরের পাঁচ থেকে সাত মাস মাঝারি থেকে প্রখর রোদ থাকে, ফলে বছর দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাঁধা নেই। সৌরশক্তি ও নবায়নযোগ্য অন্যান্য শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে একটি বড় অসুবিধা হচ্ছে এর সঞ্চয় ও পরিবহনে। পর্তুগাল সৌর ও বায়ুশক্তি ব্যবহার করে সম্পূর্ণ নবানয়নশক্তি ব্যবহার করে ৪ দিন ধরে সারাদেশের জ্বালানি সরবরাহ মিটিয়েছে সম্প্রতি, এবং এখনও ৮৫-৯০% জ্বালানি (বিদ্যুৎ) হচ্ছে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে। নেদারল্যান্ডস অনেকদিন ধরে সমুদ্রে টার্বাইন স্থাপন করে সমুদ্রের ঢেউ ব্যবহার করে বিদ্যুৎস্থাপন করছে অন্যান্য নবায়নযোগ্য শক্তির পাশাপাশি, পারমাণবিক-নির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র বিপর্যয়ের পরে জাপান-ও মনোযোগ দিচ্ছে এই প্রযুক্তিতে এবং তারা তাদের সমুদ্রপৃষ্ঠ কয়েক কিলোমিটার জায়গা জুড়ে সৌর প্যানেল স্থাপন করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। এছাড়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও স্থাপন করতে পারে বাংলাদেশ। রাশিয়া এই ব্যাপারে সহযোগিতার ও সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছে। যদিও ভূমিকম্প-প্রবণ এলাকা হিসেবে এই ব্যাপারে বাংলাদেশকে সর্তক হতে হবে তারপরও সাম্প্রতিককালে রাশিয়া ও জাপান পোর্টেবল পারমাণবিক চুল্লি বিষয়ক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছে অনেক, এইসব চুল্লি সহজে বহনযোগ্য, সহজে শাট-ডাউন করে দেওয়া যায় বিপর্যয়ের সময়ে এবং তেজস্ক্রিয়-বর্জ্যের পরিমাণ কম।

বাংলাদেশ সরকারের চিন্তা নিশ্চয় মহত। সরকার জনস্বার্থেই এবং আগামী দিনের বাংলাদেশের উন্নতির কথা ভেবেই এই বিদ্যুৎপ্রকল্প নির্মাণ করতে চলেছে। কিন্তু উন্নয়নের কথা ভেবে বড় কোনো ক্ষতি ডেকে আনা হচ্ছে কিনা সেটিও সরকারকে বিবেচনায় আনতে হবে। বাধা উপেক্ষা করে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যে কতটুকু কৃতিত্ব আছে সেটিও ভেবে দেখবে আমাদের সরকার, এটিই প্রত্যাশা এখন।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন