শিরোনাম :

ঈদে খাবার খাবেন বুঝেশুনে


শনিবার, ৯ জুন ২০১৮, ০৯:২৮ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

দেশের বিভিন্ন জেলায় পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত

অধ্যাপক ডা. শুভাগত চৌধুরী:

সামনেই উৎসব। আসছে ঈদ। সেই সঙ্গে আনন্দ। বাংলাদেশের মানুষ আনন্দে মেতে উঠবে উৎসবেই। বাঙালি অনেক দুঃখ-কষ্ট ঘাত-প্রতিঘাত সয়ে, এসব অতিক্রম করে উৎসবের আনন্দকে জীবনের সঙ্গে উপভোগ করে।

তখন ভালো-মন্দ সবাই আহার করে। চিরাচরিত প্রথা এ রকমই। আর উৎসবের আহার মানে চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয়, যার যতটুকু সঙ্গতি। তেল, ঘি, চর্বি, মসলা, মিষ্টি- এসব খাবারের আতিশয্য তখন দেখা যায়।

বিরিয়ানি, রেজালা, কাচ্চি বিরিয়ানি, মোরগ পোলাও, চিকেন রোস্ট, খাসি-গরুর বাহারি রান্না, মিষ্টান্ন তো আছেই। মাছ হয় কম, তবে পূজায় মাছের রান্না হবেই। মাছ মানে রুই, কাতলা, পাবদা, কই, যে যা পাচ্ছে।

কথা হল, উৎসবে আমরা প্রশ্রয় দেই ঠিক, এক-আধটু দিতেও হয়, না দিলে হয় না। অনুরোধ-উপরোধে মানুষ ঢেঁকি গেলে, আর এত সুস্বাদু খাবার, তেল-চর্বিতে চপচপে হলোই বা। তবে সবকিছু প্রশ্রয়ই মাত্রার মধ্যে হলে ভালো হয়।

যাদের ডায়াবেটিস আছে, তারা যদি এখন মিষ্টি বেশি খান, তেল, চর্বি, মসলা দিয়ে রান্না করা গোশত অন্যদের মতোই উপভোগ করেন, তাহলে সমস্যা হতে পারে।

ডায়াবেটিস আছে বেশকিছু দিন, এবার কিডনিতে একটু ধরেছে। ক্রিয়েটিনিন-এর মান বাড়তি। ডাক্তার বলেছেন ৪০ গ্রামের বেশি প্রোটিন নয়, মাছ বা মাংস দিনে মাত্র দুই টুকরো। তিনি যদি খাসির গোশতের বাটি নিয়ে বসেন এবং দুই বেলাই চার-ছয় টুকরো গলধঃকরণ করেন দিন কয়েক, তাহলে সমস্যা তো হতেই পারে। তখন উৎসবের পুরো আনন্দ মাটি হয়ে যাবে। নিজের তো বটেই, স্বজনদেরও। উচ্চ রক্তচাপের রোগী, রক্তেও কোলেস্টেরল বেশি। ওষুধ খাচ্ছেন রক্তচাপ কমানোর জন্য, সেইসঙ্গে রক্তে চর্বি কমানোর। তাকে যদি দু-তিন বেলা বিরিয়ানি, রেজালা, গরুর গোশত ভুনা খেতে দেয়া হয়, সেইসঙ্গে আচার, তাহলে বিপদ তো হতেই পারে। আচার যে খুব লোনা এবং রক্তচাপ বেশি হলে খাওয়া বেশ বারণ, তখন তা আর মনে থাকে না। এর সঙ্গে নুন মেশানো ইলিশের শুঁটকি, তাহলে সাঁই সাঁ করে উঠবে রক্তচাপ! বলছিলাম, সবচেয়ে কঠিন হল ‘না’ বলতে পারা।

উৎবের আনন্দে তারা খাবেন বটে, তবে রয়েসয়ে। টেবিল-চামচের এক চামচ বিরিয়ানি চলবে। এক-আধটা মোরগ বা খাসির টুকরো চলতে পারে। পায়েস চেখে দেখলে চলে। উৎসবের স্বাদ তো নেয়া হল, তবে অতিরিক্ত নেয়া হল না।



কেউ যদি বলেন, নিন না আরও, তখন বিনয়ের সঙ্গে ‘না’ বলতে পারা বড় গুণ। সবাই তো পারে না। একে বলে সংযম, আর জীবনের সব ক্ষেত্রে এর চর্চা করতে পারলে কী যে লাভ হয়, তা যারা এর চর্চা এক-আধটু করেন, তারা জানেন। এতে কেবল স্রষ্টার সন্তুষ্টিই করা হয় না, নিজেরও তৃপ্তি হয়।

পরিমিত ভোজন কেবল ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের রোগীর জন্য কেন, সবার জন্য ভালো।

জীবনের সর্বত্র মাত্রা ছাড়লেই বিপদ হয়। তাই আনন্দ তো করবই, খাব, ফুর্তি করব। তবে মাত্রা ছাড়িয়ে নয়, পরিমিত। যাদের ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ আছে, তাদের জন্য পরিমিত আহার বড়ই প্রয়োজন। আর প্রয়োজন, বেশি খেতে দিলে ‘না’ বলতে পারাটা।

নতুন জামাই শ্বশুরবাড়িতে গেছে। নতুন জামাই বলে কথা। প্লেট, থালা, বাটি সাজিয়ে দেয়া হয়েছে। জামাই বাবাজি খাবেন। জামাই খাবেন অল্প। পাতে তুলে দিতে চাইলে খুব জোরে ‘না না’ বলবেন। তা না হলে লোকে বলবে ‘হাভাতে’। তাই বেশি পাতে দিলে নতুন জামাইয়ের মতো ‘না না’ বলতে হবে।

ছোটবেলায় দেখেছি, গ্রামে মানুষ পঙিক্ততে খেতে বসত। এক সারিতে অনেকে। একবার দেয়া গেছে। এবার সুস্বাদু মিষ্টি নিয়ে এসেছেন পরিবেশনকারী, বড় কুটুমকে দেবেন বলে। বড় কুটুম মৃদুস্বরে ‘না’ বলে বললেন, আরে (পাশে বসা) তর্কালংকার মশাইকে দিন (অর্থ হল : আমাকে দিন)। আর ওপাশে ভদ্রলোককে মিষ্টি দিতে গেলে তিনি বলেন খুব জোরে, ‘না না না’, ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো ব্যাপার। একে বলে ব্যাঘ্রঝম্ফ।



যাদের ডায়াবেটিস বা রক্তচাপ, বয়সও বেশি, তারা উৎসবে আত্মীয়বাড়ি, মিষ্টি সম্পর্ক যাদের সঙ্গে এমন স্বজনের বাড়িতেও যাবেন, সেখানে চর্ব্য, চষ্য, লেহ্য, পেয় হবে, অনুরোধ-উপবোধ হবে বেশি বেশি খাওয়ার জন্য, তখন সবিনয়ে ‘না’ বললে যদি না শোনে, তাহলে ব্যাঘ্রঝম্ফ দিয়ে না করা যেতে পারে- স্বাস্থ্যের জন্য।

ঈদে রোগীদের খাদ্য নির্বাচন

আসছে ঈদে আনন্দ ও উৎসবের মধ্যে অনেকের অতিভোজন হয়ে যায়। মিষ্টি-মণ্ডা ও চর্বি থেকে এসবের বাহুল্য ঘটে দিন-রাতের খাওয়ায়। এতে শরীরের ওজন বাড়ে। সামনে ঈদ, মাংস কম-বেশি খাওয়া তো হবেই। তবে উৎসবে রয়েসয়ে খেলে বাঁচে শরীর।

ঈদে গরু, খাসি ও অন্যান্য পশুর মাংস খাওয়া হয়ে থাকে। সমস্যা হল তাদের, যাদের পেটের সমস্যা, উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগ আছে কিংবা যারা এসব রোগের প্রাক-পর্যায়ে রয়েছে।

পরিমিতি বোধ যেখানে রসনা সংবরণ করতে পারে, সেখানে আর ভয়ের কিছু নেই। মাংসে তেল বা ঘিয়ের পরিমাণ কমিয়ে দিলে, ভুনা গোশতের বদলে শুকনো কাবাব করে খেলে, কোমলপানীয় ও মিষ্টি একেবারে কমিয়ে খেলে ভালোই থাকা যায়। সেইসঙ্গে হালকা ব্যায়াম বা বেশ কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে শরীর থেকে অতিরিক্ত ক্যালরি কমিয়ে নিতে পারলে আরও ভালো। এছাড়া তরকারির ঝোল থেকে গোশত কিংবা সবজি আলাদা করে নিয়ে তা ডালে মেখে খেলেও চর্বির পরিমাণ কিছুটা কমে।’

করোনারি হৃদরোগ, বিশেষ করে প্রবীণ ব্যক্তি, যাদের ইসকেমিক হৃদরোগ আছে এবং রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি, তাদের তৈলাক্ত মাংস কমিয়ে খেতে হবে। সারা বছর তারা যে ধরনের নিয়মকানুন পালন করা হয় খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে, কোরবানির সময়ও এর ব্যতিক্রম করা ঠিক হবে না। ঈদে মাংস দু-এক দিন খেলে যে শরীরের খুব ক্ষতি হয়ে যাবে তা নয়। তবে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে যারা রয়েছে, বিশেষ করে করোনারি হৃদরোগী, ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (আইবিএস) রোগী, ডিসপেপসিয়ায় আক্রান্ত রোগী, তাদের অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে ঈদের সময় খাওয়া-দাওয়ার পরিকল্পনা করতে হবে। স্থূলকায় শরীর যাদের, তাদের অবশ্যই ঈদের সময় খাওয়ার ব্যাপারে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। নিয়মিত ওজন পরীক্ষা করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, শরীরের উচ্চতা অনুপাতে স্বাভাবিক ওজন বেড়ে যাচ্ছে কিনা।

উৎসবের দিনগুলোতে প্রতিদিন সন্ধ্যায় ব্যায়াম কিন্তু চালিয়ে যেতেই হবে। এতে বাড়তি ক্যালোরি কিছু হলেও ঝরে পড়ার সুযোগ পাবে।

ভোজে যাওয়ার আগে ফলাহার করে, এক মুঠ বাদাম খেয়ে বেরোলে তেমন অতিভোজন করতেই পারবেন না ভোজের টেবিলে। ব্যায়ামের কর্মসূচিতে বিরতি টানা একেবারেই অনুচিত হবে। নিয়মিত ব্যায়াম, এমনকি ভ্রমণের সময়ও শরীরচর্চা চলবে। প্রচুর পানি পান করতে হবে। ভোজের সময় হাতের কাছে পানির বোতল থাকতেই হবে। শরবত, কোমলপানীয়, ড্রিংকস বর্জন করলে ভালো। এতে শরীরে অনাবশ্যক ক্যালোরি যোগ হবে।

মিষ্টি আর চকলেটের প্যাকেট প্রিয়জনকে উপহার না দিয়ে ফল ও বাদামের প্যাকেট উপহার দিলে বেশ স্বাস্থ্যকর হয়। এমন চর্চা শুরু করতে পারেন না কেউ?

উৎসব সবার আনন্দে কাটুক, নিরাপদে কাটুক- এই কামনা।

লেখক : পরিচালক, ল্যাবরেটরি সার্ভিসেস, বারডেম হাসপাতাল

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন