শিরোনাম :

মাইগ্রেনের সমস্যা দূর করতে সমুদ্র


সোমবার, ৩০ জুলাই ২০১৮, ০৮:৫১ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

মাইগ্রেনের সমস্যা দূর করতে সমুদ্র

 

স্বাস্থ্য ডেস্ক: দিনের পর দিন মাথায় তীব্র যন্ত্রণার কারণ জানতে ডাক্তারি পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ২৬ বছর বয়সী তরুণী বেথ ফ্রান্সিস জানতে পারেন যে তিনি ক্রনিক মাইগ্রেনের সমস্যা ভুগছেন।

মাইগ্রেনের কারণে প্রায়ই বিছানায় পড়ে যেতেন তিনি। এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে তিনি বিকল্প সমাধানের পথ খুঁজছিলেন।

মিস ফ্রান্সিস থাকেন যুক্তরাজ্যের ওয়েলস রাজ্যের অ্যাঙলেসে শহরে।

মাইগ্রেনের সমস্যা কাটিয়ে উঠতে তিনি প্রতিদিন নর্থ ওয়েলস সমুদ্রে টানা ১০০ দিন সাতার কাটার চ্যালেঞ্জ হাতে নেন। সেটাও আবার শীতকালের কনকনে ঠাণ্ডার মধ্যে।

মাত্র নয় বছর বয়স থেকেই এই যন্ত্রণায় ভুগছেন মিস ফ্রান্সিস। তবে তখন ব্যথাটা ছিল বিক্ষিপ্ত।

কিন্তু দিন দিন এর মাত্রা বাড়তেই থাকে। গত বছরেও সপ্তাহে দুই তিনবার তার এই ব্যথা উঠতো। আর একবার মাথাব্যথা শুরু হলে প্রায় সারাদিন সেই ভয়াবহ কষ্ট সহ্য করতে হতো।

মিস ফ্রান্সিস ব্যাঙ্গর বিশ্ববিদ্যালয়ে সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানের ওপর পিএইচডি করছেন। তবে এই মাইগ্রেনের কারণে কোন কাজই করতে পারতেন না। আর গ্রীষ্ম এলেই এই যন্ত্রণা যেন মাত্রা ছাড়িয়ে যেত।

মাসের প্রায় প্রতিটা দিনই কষ্টে কাতরাতেন। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়। কাজ থেকে কয়েক মাসের ছুটি নিয়েও তার কোন লাভ হয়নি।

মিস ফ্রান্সিস বলেন, "আমি সবসময় খুব কর্মপটু আর বহির্মুখী। আমার মতো মানুষ যদি বিছানায় পড়ে যায় তাহলে খুব হতাশ লাগে। মনে হয় যেন আমি ফুরিয়ে যাচ্ছি। ধীরে ধীরে জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছি।"

এরপর তিনি প্রতিদিন সৈকতে যাওয়া শুরু করেন। তীরে বসে একনাগাড়ে তাকিয়ে থাকেন জলধির দিকে।
সমুদ্র সবসময়ই বেথ ফ্রান্সিসের জীবনে বড় ধরণের ভূমিকা রেখেছে। এই সমুদ্রের সঙ্গেই মিশে আছে তার শৈশব কৈশোর।

তিনি বলেন, "আমি জানি এই সমুদ্রের কাছাকাছি থাকলেই আমি ভাল থাকবো। আমি বইয়ে পড়েছি যে প্রকৃতির মধ্যে শরীরচর্চা করলে অনেক ধরণের অসুস্থতা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।"

কি বলছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-ডব্লিউএইচও, ক্রনিক মাইগ্রেনকে স্মৃতিভ্রষ্ট রোগ বা ডিমেনশিয়া কিংবা অ্যাকটিভ সাইকোসিসের মতো বড় ধরণের অসুস্থতার সঙ্গে তুলনা করেছে। যা মানুষের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

একবার মাইগ্রেন অ্যাটাক হলে নিত্যদিনের স্বাভাবিক কাজগুলো করাও বেশিরভাগ আক্রান্তের ক্ষেত্রে অসম্ভব হয়ে পড়ে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং স্নায়ুবিজ্ঞানীরা এক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দিলেও বাস্তবে এই সমস্যার স্থায়ী কোন প্রতিকার নেই। শুধু চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়।

এক্সেটার মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও স্বাস্থ্য বিষয়ক অধ্যাপক মাইকেল ডেপলেজ এবং ড. উইলিয়াম বার্ড ২০০৯ সালে ব্লু জিম নামে একটি ধারণার কথা তুলে ধরেন।

এর ব্যাখ্যা থেকে জানা যায়, "ঘরের বাইরে শরীরচর্চা করার স্পৃহা যোগাতে সমুদ্র অনেক বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। যা স্বাস্থ্যের সার্বিক কল্যাণে ভূমিকা রাখে।"

তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন প্রাকৃতিক পরিবেশের সংস্পর্শে থাকলে তিন ধরণের স্বাস্থ্য উপকারিতা পাওয়া যায়।

প্রথমত এটি মানসিক চাপ কমিয়ে দেয়।

দ্বিতীয়ত কর্মক্ষমতা বাড়ায়।

তৃতীয়ত কমিউনিটির মধ্যে বন্ধন দৃঢ় করে।

গবেষকদের মতে, যারা সৈকতের এক কিলোমিটার এলাকার মধ্যে থাকেন তারা শারীরিকভাবে অন্য এলাকার মানুষদের চাইতে বেশি সুস্থ থাকেন।

১০০ দিনের চ্যালেঞ্জ:
এ ধরণের গবেষণা থেকে উৎসাহ পেয়েই প্রকৃতির স্রোতে গা ভাসান মিস ফ্রান্সিস। এই আশা নিয়ে যে এই প্রকৃতিই হয়তো তাকে তার অসহনীয় যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে পারবে।

প্রবল বৃষ্টি এমনকি তুষারপাতের মধ্যেও ওই হিম শীতল পানিতে নামতে কার্পণ্য করতেন না মিস ফ্রান্সিস।

কখনও কখনও পানির তাপমাত্রা ছয় ডিগ্রি সেলসিয়াসেও নেমে আসতো। তারপরও নিজের সেই চ্যালেঞ্জ থেকে একচুলও নড়েননি তিনি।

শুধুমাত্র সমুদ্রের বিপদজনক স্রোত বা ঢেউ এড়িয়ে যেতেন।

তীব্র শীতের মধ্যে বেথ ফ্রান্সিসের এমন পাগলামি দেখে বিস্মিত হয়ে যেত সৈকতে আসা মানুষ। কেননা সার্ফার আর কুকুর নিয়ে বেড়াতে আসা লোকজন ছাড়া এই ভীষণ শীতে সৈকতে কোন মানুষকেই চলাফেরা করতে দেখা যায়না। সেখানে পানিতে নামা তো আরো দূরের কথা।

মিস ফ্রান্সিস জানান সমুদ্রে নামার আগে তিনি বড় করে নিশ্বাস নিয়ে নেন। শরীর ও মনকে এই ঠাণ্ডার সাথে মানিয়ে নেয়াটাই তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

কারণ তিনি জানতেন এই শীতল পানির সংস্পর্শে কিছুক্ষণের মধ্যেই তার পুরো শরীর অবশ হয়ে রক্তবর্ণ ধারণ করবে।

সাতার কাটার প্রতি তীব্র ভালবাসা কোন ক্ষেত্রেই তাকে পিছু হটাতে পারেনি। বরং এটাই তার জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ অনুভূতি।


তবে ফ্রান্সিসের এমন কাণ্ড দেখে অনেকেই মনে করেন, তিনি হয়তো কোন কারণে নিজেকে নিজে কষ্ট দিচ্ছেন। আবার অনেকে বলেই বসেন তিনি কোন বাজি হেরে এমনটা করছেন কিনা।

"আমার উদ্দেশ্য একটাই সেটা হল আমার শারীরিক যন্ত্রণা থেকে বেরিয়ে আসা।" এমনটিই জানান মিস ফ্রান্সিস। তিনি বলেন, "আমাকে দেখতে হয়তো সুঠাম আর স্বাস্থ্যবান মনে হয়। তবে ক্রনিক মাইগ্রেন সনাক্ত হওয়ার পর আমার পুরো জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।"

তিনি বলেন, "হয়তো এ কারণেই আমি এই হিমশীতল পানিকে নামার সাহস করতে পেরেছি। যেখানে এই পানিই আমার বেদনানাশক হিসেবে কাজ করেছে। আমি জানতাম এই কাজটা অনেক কঠিন হবে। তাও আমি নিজের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেই। শীতকালে ১০০ দিন সমুদ্রে সাতার দেয়ার চ্যালেঞ্জ। এই দু:সাহসিক কাজে আমার সঙ্গী ২৮ বছর বয়সী এন্ড্রু ক্লার্কও যোগ দেয়। আমরা একজন আরেকজনের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম, যে আবহাওয়া যেমনই হোক না কেন, এটা যতক্ষণ না বিপদজনক বা অন্ধকার হয়ে আসছে, তার আগ পর্যন্ত আমরা আমাদের এই অভিযান চালিয়ে যাব।"

প্রথম যেদিন তারা পানিতে নামের সেদিন সমুদ্রের তাপমাত্রা ছিল ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সে অবস্থায় তারা ঘণ্টাখানেক পানিতে থাকতে পেরেছেন।

পরবর্তী দিনগুলোতে পানির তাপমাত্রা ক্রমেই কমতে কমতে ৬ ডিগ্রিতে নেমে যায়। সে সময় পানিতে থাকার সময়সীমা তিনি কমিয়ে দেন।

তবে এতো ঠাণ্ডার মধ্যেও এই সমুদ্রে সময় কাটানোটাই দিনের সবচেয়ে দারুণ মুহূর্ত হয়ে ওঠে তাদের কাছে।

নাটকীয় পরিবর্তন:
মাইগ্রেনের সমস্যার এমন সমাধানের কথা শুনে অনেকেই হয়তো সন্দেহ প্রকাশ করতে পারেন। তবে যেই পরিবর্তন মিস ফ্রান্সিস উপলব্ধি করেছেন সেটা এক কথায় বিস্ময়কর।

আগে যেখানে মাসের প্রতিদিনই তার মাইগ্রেন অ্যাটাক হতো। এখন সেটা কমে মাসে ১৬ বারে এসে দাঁড়িয়েছে।

যন্ত্রণার স্থায়িত্বও কমে গেছে কয়েকঘণ্টা পর্যন্ত। সেই যন্ত্রণা তাকে আর আগের মতো কাবু করতে পারে না।

এছাড়া এই যন্ত্রণার তীব্রতা দিনে দিনে নাটকীয় হারে কমে যায়। তার স্বাস্থ্যের সার্বিক উন্নতি হয়েছে বলেও জানান মিস ফ্রান্সিস।

আর এই পরিবর্তনের পেছনে তিনি প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন VITAMIN -SEA বা ভিটামিন সমুদ্রকে।

মিস ফ্রান্সিস বলেন, "আমি ওই চ্যালেঞ্জ না নিলে নিজের এই উন্নতি দেখতে পারতাম না। এটা আমাকে সকাল সকাল জেগে উঠে বাইরে বের হওয়ার এবং আগের আমিতে ফিরে আসার একটা লক্ষ্য দিয়েছে। আমি আমার নিজের ভালোর জন্য ইতিবাচক কিছু করছি, আমি আমার অসুস্থতা আর নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিতে শিখেছি। এখন আর আমাকে বিছানায় যন্ত্রণায় কাতরানো জীবনের সঙ্গে আপোষ করতে হয় না।"

মিস ফ্রান্সিস এখন তার প্রতিদিনের এই জলকেলির প্রেমে পড়ে গেছেন। এটি ছাড়া জীবন যেন তিনি কল্পনাই করতে পারেন না।

মাইগ্রেন কি?
মাইগ্রেন অ্যাকশনের প্রধান নির্বাহী সায়মন ইভানসের মতে যারা মাসের অর্ধেক বা তার বেশি দিন মাথাব্যথায় ভোগেন, তাদের মাইগ্রেনে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। মাসে ১৫ বার মাথাব্যথা হলে এরমধ্যে অন্তত ৮টি মাইগ্রেন অ্যাটাক বলে জানান তিনি।

এই যন্ত্রণার কারণে মানুষের দৃষ্টিতে সমস্যা হওয়ার পাশাপাশি, বমি বমি ভাব, পেটব্যথা, শব্দ ও আলোয় সংবেদনশীলতা এমনকি স্ট্রোকের উপসর্গগুলো দেখা দিতে পারে।

তবে সমুদ্রের শীতল পানিতে সাতার কাটলেই যে মাইগ্রেন সেরে যায়, এমন দাবির কোন সরাসরি প্রমাণ নেই।

তবে ভিক্টোরিয়ান যুগে এমন যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে বরফ ব্যবহার হতো বলে জানা যায়।

জার্নাল অফ হেডেক এন্ড পেইনের ২০১৫ সালের একটি প্রতিবেদনেও মাথাব্যথা দূর করতে ঠাণ্ডা থেরাপির সুফলের ব্যাপারটি উঠে এসেছে।

ঠাণ্ডা পানিতে সাঁতার দেয়ার ব্যাপারে সতর্কতা:

সমুদ্রের ঠাণ্ডা পানিতে সাতার কাটলে শরীরের তাপমাত্রা কমে যায়। যার কারণে হাত ও পা দুর্বল হতে থাকে। এ কারণে অনেকের পক্ষেই পানি থেকে বের হয়ে আসা কঠিন হয়ে যায়। সাতার কাটার উপযুক্ত পোশাক পরে পানিতে নামতে হলে। ভারী কাপড় বিপদের কারণ হতে পারে।ঠাণ্ডা পানিতে সরাসরি লাফ দেয়া বিপদজনক হতে পারে, এ কারণে ধীরে ধীরে পানিতে ডুব দিতে হবে। তীর ঘেঁষে সাতার কাটা নিরাপদ। সাতার শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উষ্ণ কাপড়ে নিজেকে জড়িয়ে নিতে হবে। যদি ঠাণ্ডায় দাঁতের পাটি কাপতে থাকে তাহলে বুঝতে হবে আপনি হাইপোথার্মিয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে আছেন। সেক্ষেত্রে সঙ্গে সঙ্গে পানি থেকে বেরিয়ে শরীরকে উষ্ণ করে নিতে হবে।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন