শিরোনাম :

ফ্রিজ থেকে ৪০টি বাঘের মৃত বাচ্চা উদ্ধার


বৃহস্পতিবার, ২ জুন ২০১৬, ১২:২৪ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

ফ্রিজ থেকে ৪০টি বাঘের মৃত বাচ্চা উদ্ধার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: থাইল্যান্ডের 'টাইগার টেম্পল' থেকে উদ্ধার করা হয়েছে অন্তত ৪০টি বাঘের বাচ্চার মৃতদেহ৷

দেশটির পুলিশ জানিয়েছে, মন্দিরে একটি ফ্রিজের ভিতরে তাদের দেহ রাখা ছিল৷ সঙ্গে মিলেছে ভালুকসহ আরও কিছু প্রাণীর দেহ এবং দেহাংশ৷

পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে, বিশ্বখ্যাত ওই মন্দিরটিও যে কোনো সময়ে বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে৷

বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ নিয়ে যখন গোটা বিশ্বে হইচই, তখনই 'বাঘ মন্দির ' থেকে ৪০টি মৃত বাঘের বাচ্চা উদ্ধারে প্রবল ক্ষুব্ধ পশুপ্রেমী সংগঠনের প্রতিনিধিরা৷ থাইল্যান্ড বরাবরই চোরাশিকার ও অবৈধ পাচারের আখড়া বলে কুখ্যাত৷ চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, বাঘের দেহাংশ পাচারের অভিযোগও দীর্ঘদিনের৷ এবার প্রশ্ন উঠছে, তা হলে কি মন্দির থেকে বাঘের দেহাংশ পাচার করেই মহার্ঘ্য সব 'ওষুধ ' তৈরি হচ্ছিল৷ ব্যাঙ্ককের মন্দিরে এত সংখ্যায় মৃত বাঘের বাচ্চা সেই অভিযোগকে মান্যতা দিল৷ তবে নৃশংসতা যে এই মাপের, ধারণা করতে পারেননি কেউই৷ পর্যটকদের কাছে 'টুরিস্ট ডেস্টিনেশন ' থাইল্যান্ডের , অন্যতম সেরা 'স্পট ' এই বাঘ মন্দির৷ দেশ -বিদেশের পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে৷

না থাকার কোনও কারণও নেই৷ বাঘ মামাকে পাশে বসিয়ে সেলফি, আর কোন মুলুকে তোলা যাবে? গল্পের মতো শোনালেও সত্যি৷ এমন অহিংস বাঘ এই গ্রহে কোথাও নেই৷ ব্যাপারটা অনেকটা দুধ -কলা দিয়ে সাপ পোষার মতো৷ প্রান্তবয়স্ক বাঘদের ডায়েটে থাকত 'সিদ্ধ চিকেন '৷ আর খুদে বাঘদের বরাদ্দ ছিল শুধুই দুধ৷ ফলে গলা জড়িয়ে ছবি তুলতে আর বাধা কোথায়? বাঘের মতো ভয়ঙ্কর পশুকে, এমন 'গৃহপালিত ' বানিয়ে ফেলায় দীর্ঘদিন ধরেই সরব ছিল বন্যপ্রাণী বাঁচাও সংগঠনগুলো৷ কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি৷ সমস্ত সমালোচনাকে ফুত্কারে উড়িয়ে দেয় মন্দির কর্তৃপক্ষ৷

পূজারিদের কথায়, 'আধ্যাত্মিক বাঘের সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান একমাত্র পবিত্র স্থানেই সম্ভব৷ 'বছর দশেক আগে, একবার পুলিশ মন্দিরে ঢোকার চেষ্টাও করেছিল৷ কিন্তু কর্তৃপক্ষের বাধায় ধর্মীয় স্থানে ঢুকতে পারেনি৷ বাঘ দেখিয়ে হাজার হাজার বিদেশি ডলার আয়ের পথ ছাড়তে রাজি হননি পূজারিরাও৷ এবার তাই আটঘাঁট বেঁধেই নেমেছিল ব্যাঙ্কক পুলিশ ও থাইল্যান্ডের বন্যপ্রাণী বিভাগ৷ রীতিমতো কোর্টের ওয়ারেন্ট সঙ্গে নিয়ে, কাঞ্চনাবুরির বৌদ্ধ মন্দিরে হানা দেয় পুলিশ৷ মন্দিরে যে অবৈধ ভাবে বাঘ পোষা হচ্ছে সেটা নতুন খবর নয়৷ পুলিশের শুধু হিসেবে ছিল না, ঠিক কতগুলো বাঘকে আটকে রাখা হয়েছে৷ আদালতের চিঠি হাতে নিয়ে মন্দির চত্বরে ঢুকে ১৩৭টি বাঘের সন্ধান পায় পুলিশ ও বন্যপ্রাণী বিভাগ৷ দু'দিন ধরে ঘুমপাড়ানি গুলোতে ঘুম পাড়িয়ে, একে একে বাঘগুলোকে বের করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে৷ এখনও পর্যন্ত ৫২টি বাঘকে সরানো সম্ভব হয়েছে৷ সেইসঙ্গে মন্দিরের আনাচে কানাচে চলছিল তল্লাশি৷ মন্দিরের পিছন দিকে বড়মাপের কয়েকটি ফ্রিজ চোখে পড়ে পুলিশের৷ এত বড় বড় ফ্রিজের মন্দিরে কী প্রয়োজন? সন্দেহ হতেই ফ্রিজ খোলার নির্দেশ দেন পুলিশ কর্তারা৷ তারপর যে দৃশ্য চোখে পড়ল, তার জন্য না প্রস্তুত ছিলেন দুঁদে পুলিশ কর্তারা, না বন্যপ্রাণী বিভাগের অফিসাররা৷

ফ্রিজের ভেতর সারি সারি মৃত বাঘের বাচ্চা৷ একেবারে সদ্যোজাত৷ বয়স বড়জোর এক বা দু'দিন৷ ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া শরীরগুলো গুনে দেখা গেল মোট ৪০টি মৃত শিশু বাঘকে জমিয়ে রেখেছিলেন মন্দিরের পূজারিরা৷ শুধু ৪০টি বাঘ নয়, ১টি ভালুক ও আরও কয়েকটি বন্যপ্রাণীর মৃতদেহও চোখে পড়ে পুলিশের৷ জন্মের পরেই বাঘগুলোকে মেরে, ফ্রিজে রেখে দেওয়া হয়েছে বলে অনুমান বনবিভাগের কর্তাদের৷ মরা হাতি লাখ টাকার মতো , চোরাবাজারে মরা বাঘও বহুমূল্য৷ বাঘের হাড় ও দেহাংশের বিরাট বাজার রয়েছে চীনে৷ সেখানে ওষুধ তৈরিতে বাঘের হাড় ও দেহাংশের চাহিদা মারাত্মক৷

পুলিশের অভিযোগ, চোরাপথে এই মরা বাঘ পৌঁছে যেত চীনে৷ ইতোমধ্যেই মন্দিরের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে পুলিশ৷ মন্দির কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়েরও করা হচ্ছে৷ বন্যপ্রাণী হত্যা, অবৈধভাবে আটকে রাখা ও অবৈধভাবে বাঘ প্রজননের অভিযোগ আনছে পুলিশ৷ গোটা ঘটনায় মুখে কুলুপ এঁটেছেন পূজারিরা৷ তবে ফেসবুকে মন্দির কর্তৃপক্ষ, 'বাঘ জমানো 'র সাফাই দিয়েছেন৷ 'এই মন্দিরে বাঘের মৃত্যুর হার তুলনামূলক অনেক কম৷ যথেষ্ট যত্নে এখানে বাঘেদের রাখা হয়৷ কিন্তু বারবার অভিযোগ ওঠে আমরা নাকি বাঘ পাচার করি৷ তাই এখানে যে সমস্ত বাচ্চা বাঘ মারা গিয়েছে, সেগুলোকে মাটিতে না পুঁতে আমরা রেখে দিয়েছিলাম৷ কেউ যাতে বলতে না পারে, বাঘগুলো কোথায় গেল ?' তবে পূজারিদের এই ফেসবুক বিবৃতিতে খুব একটা যুক্তি খুঁজে পাচ্ছেন না বনবিভাগের কর্তারা৷

এদিকে মন্দিরে বেড়ে ওঠা বাঘেদের নিয়ে চিন্তায় পড়েছে থাইল্যান্ড সরকার৷ মন্দির থেকে বের তো করা হচ্ছে, কিন্তু কোনও জঙ্গলে ওই বাঘগুলোকে পাঠানো সম্ভব নয়৷ কার্যত 'নিরামিষ ' হয়ে যাওয়া বাঘগুলো জঙ্গলে গেলেই মারা পড়বে৷ তাই সরকারি তত্ত্বাবধানে কোনও ঘেরা জায়গায় রাখতে হবে বাঘগুলোকে৷ ততদিন, যতদিন না ১৩৭টি বাঘের স্বাভাবিক মৃত্যু হচ্ছে৷

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন