শিরোনাম :

অকৃত্রিম


বৃহস্পতিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৭, ০২:৫৭ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

অকৃত্রিম


১. আমি আমার বুড়িমা (দাদীর মা)-কে খুব ভালোবাসি। কোথা থেকে এবং কিভাবে এত ভালোবাসার উৎপত্তি হল স্বজ্ঞানে আমি কখনও তা ভেবে দেখিনি। তবে এটা স্মরণ করতে পারি কৈশোরের কোন একটা সময় থেকে এটার শুরু হয়েছে। এখন আমি গ্রাজুয়েশনের শেষ বর্ষে আর আমার বুড়িমা একশ ছুঁয় ছুঁয় করছে। বয়সের ভারে লাঠি নিয়ে কুঁজো হয়ে হাঁটে ঠিকই কিন্তু বিস্ময়কর এটা যে তার মনের তারুণ্য কিছুমাত্র কমেনি! বুড়িমার ভাষায়, “দেহের চামড়া ঝুলে গিয়েছে তো কি হয়েছে ? মনটা এখনো টনটনাই আছে।” এই বলে বুড়িমা তার দন্তবিহীন মুখে একটা আত্মতুষ্টির হাসি দেয়। গ্রামের অন্যান্য মুরব্বিরা যারা বুড়িমার চেয়েও বছর দশ পনের ছোট, তারা তাদের সেই প্রাচীন ধ্যান-ধারণা নিয়ে চললেও আমার বুড়িমা ওগুলো থেকে মুক্ত এবং বলা চলে আধুনিকপ্রায়। তার কর্মকৌশল খুবই নিখুঁত এবং প্রশংসার দাবি রাখে। এসমস্ত কারণেই হয়তো তাকে বেশি ভালো লাগে। প্রতিবার যখন ছুটিতে বাড়িতে যায়, সবার আগে বুড়িমার সাথেই দেখা করি। আবার ছুটি শেষে ক্যাম্পাসে চলে আসার সময় সবশেষে তার কাছ থেকেই বিদায় নিই। বুড়িমা নিজে পড়ালেখা করতে পারেননি ঠিকই কিন্তু অন্যের লেখাপড়াতে অনুপ্রেরণা যোগাতে তিনি সিদ্ধহস্ত। বুড়িমা বলতেন, “পায়েস যেমন যত বেশি দুধ দিয়ে রান্না করা যায় ততই তার স্বাদ বেড়ে যায়, ঠিক তেমনি বই যত বেশি পড়া যায় তত বেশি শেখা যায়”। বুড়িমার এই কথাটাই আজ অবধি আমার জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘হাপরের ফুঁ’ হয়ে কাজ করছে। সদা হাস্যোজ্জ্বল, প্রেরণাদায়ী এহেন মহীয়সী নারীর জীবনেও অনেক গভীর ক্ষত থাকতে পারে বিশ্বস্ত উৎস থেকে না জানলে এযুগের কারও বিশ্বাস হবে না।

২. বছর চল্লিশেক আগের কথা। সময়টা ‘মধুমাস’ জ্যৈষ্ঠের। সে বছর জ্যোৎ¯œাদের নবীন লিচু গাছে প্রথম বারের মত মাত্র পাঁচটি লিচু ধরেছে। সাত বছরের জ্যোৎ¯œার মনে তাই অতিশয় আনন্দ; এই প্রথম বারের মত সে তাদের গাছের লিচু খাবে। যদিও আগে প্রতিবছরই বাবা গফুর মুন্সী পরিবারের প্রত্যেকের জন্য বাজার থেকে দুটো করে লিচু কিনে আনত কিন্তু এ বছর সে ঘোষণা দিয়েছে “এবার থেকে আর টাকা দিয়ে লিচু কিনবো না। এ পাঁচটা লিচুই আমরা পাঁচ জনে খাবো। প্রত্যেকের ভাগে একটা করে।” জ্যোৎ¯œার লিচু খুবই প্রিয়। পরিবারের সকলের চেয়ে ছোট হওয়ায় তার অন্য দুই বোন ও বাবা-মা সবার কাছ থেকেই সে লিচু ভাগে পায় বরাবরই। তার মায়েরও লিচু খুব প্রিয়। এই একমাত্র ফলই তিনি খান। অন্য কোন ফল তিনি স্পর্শই করেন না হোক না তা যতই মধুর। জ্যোৎ¯œা খুবই আগ্রহ নিয়ে আছে লিচু গুলোতে কবে পাক ধরবে, কবে সে লিচুর অমৃত স্বাদ উপভোগ করতে পারবে। মা বলেছিল লিচুগুলো দেখে রাখতে। একটু পাক ধরলেই পাখিতে খেয়ে ফেলবে। মায়ের কথাটা তার মনে ভীতির সঞ্চার করেছিল। তাই সে বান্ধবীদের নিয়ে লিচু গাছের নিচে খেলার আসর বসায়। বান্ধবীদের নিয়ে খেলায় ব্যস্ত থাকলেও মন কিন্তু ওই ঝুলে থাকা লিচুগুলোর দিকেই থাকে।

৩. আমার দাদীরা তিন বোন। রোকেয়া, নীহার, আর জ্যোৎ¯œা। আমার দাদী বড়। মা জরিমুন্নেসা আর বাবা গফুর মুন্সী। পাঁচ জনের অভাব-অনটনের সংসার। গফুর মুন্সী বর্গা কৃষক ছিলেন। ভাল কোরআন পড়তে পারতেন। তাই মাঝে মধ্যে তাকে মসজিদের ইমামতিও করতে হয়েছে। সে হিসেবে সমাজে তার একটা সম্মান ছিল। কিন্তু শুধু সম্মান দিয়ে তো আর পেট চলে না। টানাটানির সংসারে তিনিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। নিজের কোন জমি জমা নেই, বর্গাচাষে এক মৌসুমে যা পাওয়া যায় তা দিয়েই সারা বছর চলতে হয়। এমনি একটা পরিবারে একটা লিচু গাছের পাঁচটা লিচু তাই খোদাতা’লার পক্ষ থেকে আশীর্বাদ স্বরূপই বটে।

লিচু গুলো পেঁকেছে। জ্যোৎস্নার সকাল-সন্ধ্যা তদারকিতে কোন পাখি ওতে ভাগ বসাতে পারেনি। বাবা গফুর মুন্সী লিচু গুলো গাছ থেকে নামিয়ে মায়ের হাতে দিয়েছে। জ্যোৎস্নার সাথে সাথেই মায়ের হাত থেকে একটা নিয়ে খেয়ে ফেলেছে। আহ! কী চমৎকার স্বাদ।“মা, আমি আর একটা খাবো, দেও”। মা বলেছে, “না। এই চারটা লিচু আমরা চারজন খাবো।” জ্যোৎ¯œার মন খারাপ হল। মুখটা গোমড়া করেই খেলতে চলে গেল ও। ও চলে যাওয়ার পরে মায়েরও মনটা কিছুটা নিস্তেজ হয়ে গেল, “ইস! মেয়েটাকে তো আমার ভাগেরটা দিলেই পারতাম।” মায়েরও লিচু খুবই প্রিয় একমাত্র ফল কিন্তু সন্তানের আবদারের চেয়ে তো আর বেশি প্রিয় না। মায়ের মন খুঁতখুঁত করতে লাগলো। ভাবলো মেয়েটা খেলা থেকে বাড়িতে ফিরে এলে ওকে তার ভাগের লিচুটা দিয়ে দিবে। খুঁতখুঁতে মন নিয়েই মা বাড়ির বিভিন্ন কাজকর্ম করতে লাগলো। সন্তানদেরকে সে অনেক ভালোবাসে।

৪. গ্রীষ্মের দুপুর। গরমটা একটু না অনেকটা চড়া। লোকে বলে “কাঁঠাল পাঁকা” গরম। জ্যোৎস্না সেই যে মুখ গোমড়া করে বেরিয়েছে এখনও ফিরে আসেনি। মায়ের চিন্তা হচ্ছে। অন্যদিন তো ও এতটা দেরি করে না। খেলাধুলা করে বারোটার আগেই বাড়ি ফিরে আসে। মা পাশের রহিমাদের বাড়িতে খোঁজ নেয়। রহিমা আর জ্যোৎ¯œ সমবয়সী। একই সাথে খেলাধুলা করে। রহিমাকে জিজ্ঞাসা করলে বলে, ওরা নাকি লুকোচুরি খেলছিল কিন্তু একসময় জ্যোৎ¯œা কোথায় লুকিয়ে পড়ে। পরে আর কোন সাড়া পায়নি। মায়ের মন উদ্বেগ উৎকন্ঠায় ভরে ওঠে। দুঃচিন্তার পারদ আরও ঊর্ধ্বগামী হয়। চারিদিকে খোঁজা শুরু হয়। ইতিমধ্যে বাবা গফুর ও বোনেরা বাড়ি ফিরেছে। তাদেরকে সবকিছু বলার পরে তারাও জ্যোৎ¯œাকে খুঁজতে শুরু করে। কোথাও কোন সাড়া পাওয়া যায় না। একসময় রায়হানদের বাড়ি থেকে একটা উচ্চকন্ঠ ভেসে আসে মায়ের কানে। “আরে! এই তো জ্যোৎ¯œা। মাচানের নিচে।” লুকোচুরি খেলতে খেলতে কখন ও রায়হানদের মাচানের নিচে লুকিয়েছে, তারপর তো আর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। মা ছুটে যায় সেখানে। কেউ একজন মাচার নিচ থেকে জ্যোৎ¯œার নিথর দেহটা বের করে আনে। ওর ডান পায়ের এক জায়গা থেকে রক্ত গড়াচ্ছে। মাচানের নিচে অনেক গুলো গর্ত। বুঝতে বাকি থাকে না বিষধর সাপে কেটেছে। মা “ওরে আল্লারে” বলে একটা আর্তনাদ করে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।

৫. জ্যোৎ¯œাকে ওই লিচু গাছের একটু পাশে কবর দেওয়া হয়। মায়ের কাছে এখনও সেই বাকি চারটা লিচু। মায়ের চোখ দিয়ে বেদনার অশ্রুর নহর বইছে। মায়ের মনে হল এই লিচু না দেওয়াতেই তার সন্তান বাড়ি থেকে মুখ গোমড়া করে বেরিয়েছে আর ওর শেষ চাওয়াটাই ছিল লিচু। তাই ওর মৃত্যুর জন্য লিচুই দায়ী। মা সব দোষ লিচুর উপর চাপিয়ে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করলো জীবনে আর কখনও লিচু খাবে না, এমনকি ছুঁয়েও দেখবে না।
ঘটনাটা চার দশক আগের। আমার দাদীর মুখ থেকে শোনা। লিচু গাছটা এখনো আছে। প্রতিবছর প্রচুর লিচু ধরে। লিচু গাছ থেকে নামানোর পর বুড়িমা সবাইকে ভাগ করে দেন। কিন্তু নিজে একটা লিচুও খান না। অনেক চেষ্টা করেছি খাওয়াতে কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি। সেই একই কথা, “আমার জ্যোৎ¯œা লিচু না খেতে পেয়ে মারা গেছে। আমিও কখনও লিচু খাব না।” চল্লিশ বছর ধরে বুড়িমা তার প্রিয় ফলটা খান না সন্তানের শোকে। এটা সম্ভব হয়েছে সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসা থেকেই। এক অকৃত্রিম ভালোবাসা। এখনও রাতে যখন পৃথিবী জুড়ে জ্যোৎ¯œা নামে, বুড়িমা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বাইরের প্রকৃতির দিকে। ঝাপসা চাহনিতে জ্যোৎ¯œাবিলাস করেন। এই হয়তো তার জ্যোৎ¯œা প্রকৃতির জ্যোৎ¯œা হয়ে ঝরে পড়ছে পৃথিবীর বুকে।

শিমুল এফ রহমান

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন