শিরোনাম :

বই পড়া ও লেখালেখির উৎসব


শনিবার, ২১ অক্টোবর ২০১৭, ১১:৩৬ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

বই পড়া ও লেখালেখির উৎসব

ইকরাম কবীর: বেশ কমাস ধরে মনে হচ্ছে, আমাদের জাতীয় পর্যায়ে বই পড়ার জন্য একটি মাস উদ্‌যাপন করলে কেমন হয়। যখনই এমন একটি মাসের কথা মনে হয়, তখনই লেখালেখি করার জন্য একটি সপ্তাহ বা মাসের কথা মনে আসে। অথবা একটি দিন। অনেক দেশে পত্র লেখার জন্যেও একটি দিন নির্ধারণ করা আছে। সেদিন সবাই একসঙ্গে চিঠি লেখে। কী সুন্দর একটি ব্যপার!

আমাদের কি এমন একটি মাস বা সপ্তাহ বা দিন আছে, যখন মানুষ সারা মাস ধরে বই পড়ে বা কিছু লেখে?
হয়তো আছে।

আমরা যদি ফেব্রুয়ারি মাসকে আমাদের বই পড়ার মাস হিসেবে ধরে নেই, তাহলে হয়তো আছে। তবে আমার মনে হয়, এ মাস আমাদের বইয়ের মেলার মাস, বই কেনার মাস। অনেকেই হয়তো বই কেনার পর একটু-আধটু পড়েন, তবে সবাই পড়েন না। আর লেখা? লেখার কাজটি লেখকরা ছাড়া আর কেউ এ মাসে তেমন মনোযোগ দিয়ে করেন না। আমরা ফেব্রুয়ারি এলেই বই নিয়ে খুব উত্তেজনা দেখাই, ঘটা করে মেলায় যাই, কিন্তু সারা মাস ধরে বই পড়ব, তা বোধ হয় করি না। এমন চেতনা কেউ আমাদের মধ্যে বুনে দেয়নি। আমরা বই পড়ার জন্য একটি মাস উদ্‌যাপন করব, তা নিয়ে খুব ভাবি না।

অনেকে বলবেন, ৩৬৫ দিনের মধ্যে অন্তত ৫০০ দিন আছে, যা সারা বছর উদ্‌যাপন করা হয়; আর দিন বা মাসের সংখ্যা বাড়িও না, বাপু! কী হবে ওসব দিবস দিয়ে? কোনও কাজে আসবে না। এমনিতেই দিন উদযাপনের জ্যাম লেগে আছে। এমন দিবস বা মাস আমাদের জীবনে কোনও কাজে আসবে না।

হ্যাঁ, এমন প্রশ্ন অবশ্যই করা যায়। যথার্থ প্রশ্ন। আসলেই তো দিন উদযাপনের সংখ্যা সন্দেহাতীতভাবে বেশি। জাতীয়ভাবে আমরা এত ‘দিবস’ উদ্‌যাপন করি, যা মনে রাখতে গেলেও খেই হারিয়ে ফেলি। কিছু-কিছু দিবস আছে, যার কোনও প্রতিফলন হয়তো আমাদের জনজীবনে পড়ে না।

এরপরও আমার মনে হয়, সবার জন্য একটি বই পড়ার মাস উদ্‌যাপন করলে লাভ ছাড়া ক্ষতি হবে না। বইপড়া মাসে সব শিশুর বাবা-মা আরও বেশি যত্ন নিয়ে তাদের সন্তানদের পড়াবেন, পড়তে সাহায্য করবেন। একটি বইবান্ধব সমাজের বিকাশ একটু হলেও হবে। বাবা-মা আরও বেশি সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পাবেন। সন্তানেরা তাদের আরও কাছে পাবে। আমাদের বিখ্যাত লেখকরা গণমাধ্যমে তাদের লেখা পড়বেন ও তা নিয়ে আলোচনা করবেন। গণমাধ্যমও বইপড়াকে উৎসাহ দিয়ে খবর ও অভিমত প্রকাশ করবেন। চারদিকে বইপড়া নিয়ে একটি সাজ সাজ রব উঠবে। সবাই পড়া ও লেখার জন্য উৎসাহিত হবেন।

বইপড়া নিয়ে আমরা যদি শিশু-কিশোরদের মধ্যে একটি সমীক্ষা চালাই, আমার মনে হয় আঁতকে ওঠার মতো কিছু তথ্য পাওয়া যেতে পারে। বইপড়া মাসের লক্ষ্য হবে, নতুন নতুন বইয়ের সঙ্গে সবার পরিচয় করিয়ে দেওয়া। আশা করা যেতে পারে যে, নতুন বইয়ের সংস্পর্শে এলে তারা পড়তে উৎসাহ পাবে। ধরুন, আমরা সবাই এ মাসে প্রতিদিন মাত্র ১৫ মিনিট সময় দেব বইপড়ার জন্য। একবার হলেও আমাদের সন্তানদের লাইব্রেরিতে নিয়ে যাব। স্কুল-কলেজে শিক্ষকরা তাদের ছাত্র-ছাত্রীদের আরও বেশি করে বই পড়াবেন। এ মাসে আমাদের সন্তানদের আমরা শেখাব কেমন করে গবেষণা করতে হয়, কেমন করে লিখতে হয়। দেশের সব পাবলিক লাইব্রেরি বইপড়া সভার আয়োজন করবে।

চিন্তা করুন! সারা দেশ একটি বিশাল  শিক্ষাগার হয়ে উঠবে এ মাসে! আমাদের পাশের দেশে ভারতেই একটি বইপড়া মাস উদ্‌যাপন করা হয়, যা এ বছর স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ মোদি উদ্বোধন করেন। সেখানে ‘পাবলিক লাইব্রেরি আন্দোলন নামেও একটি আন্দোলন জনমনে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এমনকি পাকিস্তানেও রিডিং প্রজেক্ট নামে একটি ঘটনা ঘটে, যা সে দেশের শিক্ষাদান পদ্ধতির উন্নতি করার জন্য প্রচলন করা হয়েছে।
আমাদের দেশে অনেক লেখকের জন্ম হয়; প্রতিনিয়তই হচ্ছে। সারা দেশেই কেউ কিছু না কিছু লিখছেন। আমরা গল্প লিখছি, কবিতা লিখছি, নানা ঘরানার গদ্য লিখছি। কিন্তু আমরা কজন বিজ্ঞান ও বিজ্ঞান-সম্পর্কিত লেখা লিখছি? সারা বছর আমরা যে পরিমাণ গল্প-কবিতার জন্ম দেই, সে পরিমাণ পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, জীববিদ্যা বা অন্য কোনও বিজ্ঞানের বিষয় নিয়ে লেখা হয়? এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রকাশকরা নেতৃত্ব দিতে পারেন।

বিশ্বে হাজার হাজার বিশ্ববিদ্যালয় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, যারা তাদের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য লেখালেখির সপ্তাহ উদ্‌যাপন করে। তা শুধু ভাষা বা সাহিত্যের শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, সবার জন্য। কল্পনা করুন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়ও সেই একই কাজ হচ্ছে। আমাদের সব শিক্ষার্থী সাতদিন ধরে লেখালেখি করছেন। কিছু না কিছু লিখছেন। এটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখ উজ্জ্বল করবে না, শিক্ষার্থীদের মধ্যেও লিখতে শেখার অনুপ্রেরণা জাগাবে। লেখা মানেই যোগাযোগ, লেখা মানেই নিজের চিন্তাধারা প্রকাশ করা। নিজেকে প্রকাশ করতে পারলে প্রতিটি মানুষ খুশি হয়।    

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অনেক তত্ত্ব পড়ানো হয়, কিন্তু লেখা শেখানো হয় না; এমনকি ভাষা-সাহিত্য বিভাগগুলোয়ও লেখা শেখানো হয় না। আমি নিজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা করেছি; অনেক শেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু কোনোদিন লেখা নিয়ে কোনও ক্লাস হয়নি। ইদানিং কয়েকটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখার ওপর একটি কোর্স চালু হয়েছে, যা শেখার জন্য অপ্রতুল মনে হয়।

দেশের নামকরা প্রকাশকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে শিক্ষার্থীর জন্য সেমিনার-ওয়ার্কশপ আয়োজন করার কথা ভেবে দেখতে পারে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। আমি নিশ্চিত, আমাদের প্রকাশকরা তা খুশি হয়ে করবেন। এতে বরং তাদের ব্যবসার প্রসার হবে, আরও বেশি বই বিক্রি হবে।

অনেক দেশে লেখকরা নিজেরাই লেখক সপ্তাহ-এর আয়োজন করেন। তারা একসঙ্গে জমায়েত হয়ে তাদের নিজেদের লেখা নিয়ে কথা বলেন, লেখার ওপর ওয়ার্কশপের আয়োজন করেন। নতুন লেখকরা এই ওয়ার্কশপগুলোয় যোগ দেন।

আমি নিশ্চিত দেশের আনাচে-কানাচে অনেক সাহিত্য সভা, সেমিনার ও প্রকাশনা উৎসবের আয়োজন করা হচ্ছে। ঢাকার বাইরেও হচ্ছে। মাঝে-মাঝে এসব খবর গণমাধ্যমে আসে। তবে এই খবরগুলো যতটা প্রাধান্য পেতে পারতো, ততটা পায় না; কোনও বার্তা সম্পাদকও যত্ন নিয়ে নিজ উদ্যোগে এ খবরগুলো ছাপেন না; শুধু অনুরোধ করলে, তা প্রকাশ করেন। যারা আয়োজন করেন, তারাও সারা দেশে আয়োজনের খবর ছড়িয়ে দিতে চান না।

এ দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েও এমন সভা-সেমিনার আয়োজিত হয়, কিন্তু আয়োজকরা গণমাধ্যমে এ আয়োজনগুলো তুলে ধরেন না। গণমাধ্যমও বিষয়টি তেমন গুরুত্ব দেয় না।

আমি নিজেই দেখেছি, কত মানুষ খবরের কাগজে লেখার স্বপ্ন দেখেন। কেমন করে সংবাদপত্রের জন্য উপযুক্ত লেখা লিখতে হবে, কেমন করে তা কাগজে পাঠাতে হবে, তা নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। কেউ কাগজের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিলে তারা লেখার উৎসাহ পান। এ ধরনের লেখকদের মধ্যে খবরের কাগজ নিয়ে এক ধরনের ভীতি কাজ করে লেখা পাঠালে কেউ ছাপবে না! এই ভয়েই কেউ লেখেনও না, লিখলেও তা কারও কাছে পাঠান না। খবরের কাগজগুলো এ বিষয়টি ভেবে দেখতে পারে, এ নিয়ে কাজ করতে পারে। কাগজগুলোতে চিঠি-পত্র বিভাগও দিন-দিন সংকুচিত হয়ে এসেছে।

সামাজিক গণমাধ্যমগুলোর দিকে খেয়াল করলে দেখা যায়, মানুষ লিখছে, তারা লিখতে চায়, নিজেকে প্রকাশ করতে চায়। প্রকাশকদের পৃষ্ঠপোষকতা না পেয়ে উন্মুক্ত মাধ্যমেই তারা তাদের লেখালেখির চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন; অনেকে হাজার-হাজার পাঠকও পেয়ে যাচ্ছেন।

বিলেতি রচনা লেখক ফ্র্যান্সিস বেকন কয়েক শত বছর আগে লিখেছিলেন রিডিং মেকেথ্ এ বেটার ম্যান অ্যান্ড রাইটিং মেকেথ্ এ পারফেক্ট ম্যান। কথাটি তখনও যেমন সত্য ছিল, এখনও তাই আছে। সমাজে বসবাসকারী জীবদের আচরণ এমনি এমনি বদলায় না; অভ্যাস বদলাতে হলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কিছু উদ্যোগের প্রয়োজন হয়। আর এসব উদ্যোগ নেওয়ার আগে, কিছু ভবিষ্যৎমুখী ভাবনাবিদের কর্মতৎপরতা প্রয়োজন হয়।

লেখক: গল্পকার ও গবেষক।  


 

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন