শিরোনাম :

কাঁচা আম- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


সোমবার, ২৮ মে ২০১৮, ১১:৩৯ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

কাঁচা আম- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তিনটে কাঁচা আম পড়ে ছিল গাছতলায়

চৈত্রমাসের সকালে মৃদু রোদ্‌দুরে ।

যখন-দেখলুম অস্থির ব্যগ্রতায়

হাত গেল না কুড়িয়ে নিতে ।

তখন চা খেতে খেতে মনে ভাবলুম ,

বদল হয়েছে পালের হাওয়া

পুব দিকের খেয়ার ঘাট ঝাপসা হয়ে এলে ।

সেদিন গেছে যেদিন দৈবে-পাওয়া দুটি-একটি কাঁচা আম

ছিল আমার সোনার চাবি ,

খুলে দিত সমস্ত দিনের খুশির গোপন কুঠুরি ;

আজ সে তালা নেই , চাবিও লাগে না ।

 

গোড়াকার কথাটা বলি ।

আমার বয়সে এ বাড়িতে যেদিন প্রথম আসছে বউ

পরের ঘর থেকে ,

সেদিন যে-মনটা ছিল নোঙর-ফেলা নৌকো

বান ডেকে তাকে দিলে তোলপাড় করে ।

জীবনের বাঁধা বরাদ্দ ছাপিয়ে দিয়ে

এল অদৃষ্টের বদান্যতা ।

পুরোনো ছেঁড়া আটপৌরে দিনরাত্রিগুলো

খসে পড়ল সমস্ত বাড়িটা থেকে ।

কদিন তিনবেলা রোশনচৌকিতে

চার দিকের প্রাত্যহিক ভাষা দিল বদলিয়ে ;

ঘরে ঘরে চলল আলোর গোলমাল

ঝাড়ে লণ্ঠনে ।

অত্যন্ত পরিচিতের মাঝখানে

ফুটে উঠল অত্যন্ত আশ্চর্য ।

কে এল রঙিন সাজে সজ্জায় ,

আলতা-পরা পায়ে পায়ে —

ইঙ্গিত করল যে , সে এই সংসারের পরিমিত দামের মানুষ নয় —

সেদিন সে ছিল একলা অতুলনীয় ।

বালকের দৃষ্টিতে এই প্রথম প্রকাশ পেল —

জগতে এমন কিছু যাকে দেখা যায় কিন্তু জানা যায় না ।

বাঁশি থামল , বাণী থামল না —

আমাদের বধূ রইল

বিস্ময়ের অদৃশ্য রশ্মি দিয়ে ঘেরা ।

 

তার ভাব , তার আড়ি , তার খেলাধুলো ননদের সঙ্গে ।

অনেক সংকোচে অল্প একটু কাছে যেতে চাই ,

তার ডুরে শাড়িটি মনে ঘুরিয়ে দেয় আবর্ত ;

কিন্তু , ভ্রূকুটিতে বুঝতে দেরি হয় না , আমি ছেলেমানুষ ,

আমি মেয়ে নই , আমি অন্য জাতের ।

তার বয়স আমার চেয়ে দুই-এক মাসের

বড়োই হবে বা ছোটোই হবে ।

তা হোক , কিন্তু এ কথা মানি ,

আমরা ভিন্ন মসলায় তৈরি ।

মন একান্তই চাইত , ওকে কিছু একটা দিয়ে

সাঁকো বানিয়ে নিতে ।

একদিন এই হতভাগা কোথা থেকে পেল

কতকগুলো রঙিন পুথি ;

ভাবলে , চমক লাগিয়ে দেবে ।

হেসে উঠল সে ; বলল ,

“ এগুলো নিয়ে করব কী । ”

ইতিহাসের উপেক্ষিত এই-সব ট্র্যাজেডি

কোথাও দরদ পায় না ,

লজ্জার ভারে বালকের সমস্ত দিনরাত্রির

দেয় মাথা হেঁট করে ।

কোন্‌ বিচারক বিচার করবে যে , মূল্য আছে

সেই পুঁথিগুলোর ।

 

তবু এরই মধ্যে দেখা গেল , শস্তা খাজনা চলে

এমন দাবিও আছে ওই উচ্চাসনার —

সেখানে ওর পিড়ে পাতা মাটির কাছে ।

ও ভালোবাসে কাঁচা আম খেতে

শুল্পো শাক আর লঙ্কা দিয়ে মিশিয়ে ।

প্রসাদলাভের একটি ছোট্ট দরজা খোলা আছে

আমার মতো ছেলে আর ছেলেমানুষের জন্যেও ।

 

গাছে চড়তে ছিল কড়া নিষেধ ।

হাওয়া দিলেই ছুটে যেতুম বাগানে ,

দৈবে যদি পাওয়া যেত একটিমাত্র ফল

একটুখানি দুর্লভতার আড়াল থেকে ,

দেখতুম , সে কী শ্যামল , কী নিটোল , কী সুন্দর ,

প্রকৃতির সে কী আশ্চর্য দান ।

যে লোভী চিরে চিরে ওকে খায়

সে দেখতে পায় নি ওর অপরূপ রূপ ।

 

একদিন শিলবৃষ্টির মধ্যে আম কুড়িয়ে এনেছিলুম ;

ও বলল , “ কে বলেছে তোমাকে আনতে । ”

আমি বললুম , “ কেউ না । ”

ঝুড়িসুদ্ধ মাটিতে ফেলে চলে গেলুম ।

আর-একদিন মৌমাছিতে আমাকে দিলে কামড়ে ;

সে বললে , “ এমন করে ফল আনতে হবে না । ”

চুপ করে রইলুম ।

 

বয়স বেড়ে গেল ।

একদিন সোনার আংটি পেয়েছিলুম ওর কাছ থেকে ;

তাতে স্মরণীয় কিছু লেখাও ছিল ।

স্নান করতে সেটা পড়ে গেল গঙ্গার জলে —

খুঁজে পাই নি ।

এখনো কাঁচা আম পড়ছে খসে খসে

গাছের তলায় , বছরের পর বছর ।

ওকে আর খুঁজে পাবার পথ নেই ।

 

 

 

 

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন