শিরোনাম :

লগি


রবিবার, ২৯ জুলাই ২০১৮, ০১:৩৮ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

লগি

লোকমান তাজ
ভরা বর্ষা। কালো মেঘে ঢেকে গেছে আকাশ। উত্তর পাড়ায় এক পশলা বৃষ্টিও ঝরে যেতে দেখে সরফত মাঝি। আগের সেই সুঠাম দেহ নেই। বয়স হয়েছে, দেহের চামড়ায় ভাজ পড়ে গেছে। আকাশে মেঘ আর বজ্রের শব্দ কানে আসলেই ভয় ধরে বুড়োর। শক্ত করে লগি ধরে দাঁড়িয়ে থাকে মাঝি। শুধু নৌকা ঠেলার কাজে নয়, মনে শক্তি যোগায় হাজার স্মৃতিবিজড়িত এই লগি। উনপঞ্চাশ বছর আগের কথা, বট তলার হাট থেকে চারানায় কেনা লগি। কালো হয়ে গেলেও ঘুণ ধরেনি এখনো। লগি নিয়ে যৌবনের সেই দুরন্তপনা চোখে ভাসে। উত্তাল পদ্মার বুকে ঢিঙি নৌকার হাল ধরা। ¯্রােতের টানে ভিটে হারা অসহায় মানুষদের পারাপার এখন সব স্মৃতি।

পদ্মার সেই ¯্রােতের গতি নেই। ভরা বর্ষায়ও নদীর সেই যৌবন খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে এখনো পদ্মার পাড়ে ভাসে ভিটে হারা মানুষের কান্না। এই কান্না যেন তাদের সৃষ্টিলগ্নের। অনন্তকাল ধরে চলে আসা একটি প্রথা। চর প্রসব করে পদ্মা শান্ত হলেও একদল হায়েনারা সেই চরকে খাবলে খায়। নিজেদের পেটে ভরে কারি কারি টাকা। হিং¯্র পদ্মাকে জাগিয়ে তোলে হায়েনার দল। সেই হিং¯্র থাবায় পায়ের তলার মাটি হারিয়ে উদ্বাস্তু হয় খেটে খাওয়া মানুষ। কিছু সময়ের জন্য ঠাই হয় সরফত মাঝির নৌকায়। মাটি কেড়ে নেয়া পদ্মার বুকে ভেসে চোখের জল মুছে। পা ভিজায় পদ্মার জলে। দুই হাত এক করে জল তুলে এক ঢোক গিলে নেয়। তৃষ্ণার জল মধুর থেকে মধুর মনে হয়। আরো মধুর হতো যদি সব জল চুষে নেওয়া যেত। শোধ নেওয়া যেত ভিটে হারানোর জ্বালা। মাঝি এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। বুক হুহু করে কেঁদে উঠলেও মুখে প্রকাশ করতে পারে না। মুখ বুঝে দেখতে দেখতে সব সয়ে গেছে। এখন তো শেষ বেলা। যৌবন থেকে দেখে আসছে মাঝি। পেট চালাতে যার দিন যায় তার আর প্রতিবাদের ভাষা থাকে কোথায়। গোপনে চোখের জল পদ্মায় ফেলে বুকের ব্যথা দূর করে মাঝি।

শীতের সময় কৃষকদের চরে যাওয়ার তাড়া বেড়ে যায়। কৃষকের হাত ধরে চর হয়ে উঠে সবুজের বাগিচা। পারাপার করতে করতে হাঁপিয়ে উঠে সরফত মাঝি। কিন্তু বর্ষায় সেই জনজোয়ার দেখা যায় না। কৃষকরা বিশেষ কোনো কারণ ছাড়া চরে যায় না। চরে যেই কয় ঘর বসতি রয়েছে তাদের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হয়। তাদের পারাপারে যে কয় টাকা পাওয়া যায় তা দিয়েই সংসার চলে মাঝির। কিছু লোক যায় মাছ ধরার পেশায়। সারা রাত মাছ ধরে সূর্যের আলো উঠার আগেই পার হয় অভাবের টানে জেলে হওয়া লোকগুলো। পার হয়ে মহাজনের হাতে মাছ দিয়ে নিজেকে ভিন্নভাবে প্রকাশ করে লাল সূর্যের আলোয়। ঘরে চাল না থাকলেও দাদার বড়লোকি ভাবটা প্রকাশ না করতে পারলে যে জাত থাকে না। এই জাতের জাতা জাতিতে কত স্বপ্ন ভেঙ্গে যায় অঙ্কুরে।
সরফত মাঝি এসব দেখে আসছে সেই তের বছর বসয় থেকে। বাপটা অকালে ওপারের ডাকে সাড়া দেয়। সংসারের হাল ধরতে স্কুলের বই রেখে নৌকার হাল ধরে সরফত মাঝি।
পদ্মার চরের সব ঘটনার সাক্ষী আজকের এই বুড়ো মাঝি। উত্তাল একাত্তরের পরের ঘটনা এখনো চোখে ভাসে তার। চারদিকে তখন ভাতের অভাবে দিশেহারা অসহায় মানুষ। বাতাসে তখনো লাশের গন্ধে ভারি হয়ে ছিল আকাশ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঘর গোছানোর চাইতে ভাগাভাগি নিয়ে মেতে উঠে দুই দল। একে অপরের উপর ঝাঁপিয়ে পরে অস্ত্র হাতে। দিনে যারা ভদ্রবেশী, রাত নামলেই ভয়ংকর হয়ে উঠে তাদের কার্যক্রম। সরফত মাঝির সব চোখে ভাসে এখনো। রাত নামলেই এ পাড়া ও পাড়া থেকে যুবকদের ধরে চরে নিয়ে যাওয়া হতো। বাঁচার জন্য পা ধরা থেকে কি না করেছে তারা। মাঝি তখন ফেল ফেল করে তাকিয়ে দেখেছে। টু শব্দটিও করার সাহস ছিল না সেই সময়। চোখ বাঁধা যুবকদের দেখে অশ্রু ধরে রাখতে পারতো না। চোখের জল পদ্মার জলে ভাসিয়ে কষ্ট দূর করতো সরফত মাঝি।

চোখ বাঁধা যুবকদের চরে নিয়ে কি করা হতো সব ঘটনা জানা হয়ে যেতো মাঝির। একদিন তো চার বার নৌকায় পার করে মাঝি। চরে নিয়ে যুবকদের সারিবদ্ধ করে দাড় করানো হয়। কিছু যুবকদের দিয়ে বড় গর্ত খোঁড়ান হয়। তখনো তাদের মনে জাগেনি সেই গর্ত দিয়ে কি করা হবে। খোঁড়া শেষ হলে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকদের গর্তে ফেলে জ্যান্ত কবর দেওয়া হয়। এর পর ছোট আরো একটি গর্ত খোঁড়ানো হয়। যারা গর্ত খুঁড়েছে এবার তাদের ফেলে মাটি চাপা দিয়ে ফিরে আসতো সেই দলটি। মানুষ মেরেও যে কত উল্লাস করা যায়, তা দেখার অভিজ্ঞতাও হয়েছে সরফত মাঝির; কিন্তু যারা মানুষকে জ্যান্ত পুতে চরকে কবরস্থান করেছে তাদের পরিণতিও ভালো হয়নি। মৃত্যু দূত ভয়ংকর হয়ে দেখা দিয়েছে তাদের সাথেও।

পদ্মা বার বার চর প্রসব করেছে ভূমিপুত্রদের কর্মের যোগান দিতে। বুক চিরে জন্ম নিয়েছে সবুজের মাঠ। বসতি গড়ে তুলেছে জেলে চাষারা; কিন্তু সেই প্রসব করা চরে যখন নরপশুরা উল্লাস করে। অসহায়ের চোখের জলে মাটি ভিজে যায়। কান্নায় ভারি হয় আকাশ। তখন পদ্মা তার হিং¯্র রূপ প্রকাশ করে। হ্রাস করে বাড়ি ঘর ফসলের মাঠ। সেই হিং¯্র থাবায় গুড়িয়ে দেয় সব অপকর্মের চিহ্ন।

অনেক ভাঙা গড়া দেখেছে সরফত মাঝি। বেদে নারীর সংগ্রাম দেখে চোখ ছলছল করে উঠত তার। দুধের শিশুকে নিয়ে পদ্মার বুকে ভেসে চলত বেদে জুটি। তাবিজ কবজ বেচতে স্বামী যখন পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াতো দুধের শিশুকে কোলে নিয়ে বড়শিতে টোপ গেঁথে যেত সে। সেই সাথে মনের কোনে উকি দেয়া স্বপ্নগুলো একে একে নিংড়ে দিতো বড়শির সুচে। গভীর রাত অবধি বড়শি নদীতে ফেলে তীর্থের কাকের মতো বসে থাকতো মাছের আশায়। যেই মাছ ধরা হতো সূর্যের আলো ফোটার আগেই গঞ্জে গিয়ে বেচে আসতো বেদে নারীর স্বামী।
যেই নদী গ্রাস করে পথ প্রান্তর সেই নদীকেই জীবন জীবিকা করে সুখের নীড় খোঁজে বেদে দম্পতি। কখনো নদীর বুকে যৌবনের খেলা খেলে যেত উদ্দাম দেহে। হারিকেনের আলোয় নিজেকে খুঁজে পেতো স্বপ্নের পরী রূপে। পদ্মার জলে স্নান করে অমৃত সুখ গ্রহণ করে বেদে নারী।
এক বিকেলে সরফত মাঝির বুকটা চিনচিন করে উঠে এই বুঝি বেদে শিশু নদীতে পড়ে যায়। নৌকায় হামাগুড়ি দিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা চলতে থাকে বারবার। প্রাণের ভয় নেই ছোট্ট শিশুটির। সে জানে না নদী তাকে অতল তলে নিয়ে যেতে পারে। ইতি টানতে পারে ছোট্ট এই জীবনের। সে বোঝে জয় করা। হামাগুড়ি দিয়ে একটু একটু করে এগিয়ে যাওয়া যেন বিজয়ের আনন্দ গ্রহণ করে এই মানব শিশু। সরফত মাঝিও দেখে দেখে আনন্দ পায়। ফোকলা দাঁতের হাসি তাকে কাছে টানে। মন জয় করে নেয় অল্প সময়। মাঝি আবেগ তাড়িত হয়। মন জুড়ায় শিশুর ছলাকলায়।

শীতের এক ভোর রাতের কথা হৃদয়ে দাগ কেটে যায় মাঝির। মাঘ মাসের শীত। ভোরে ঘাটে এসে কাঁপতে ছিল মাঝি। কুয়াশার মধ্যেও একটি মেয়ের অবয়ব দেখতে পায় মাঝি। কোমরে কলস নিয়ে নদীর পারে আসে। মাঝিকে দেখে একটু দূর দিয়ে নদীতে নেমে চলে। মাঝি প্রথমে ভেবে ছিলেন জল নিতে নামছে হয়তো। একটু পরে হাঁটু জল পেরিয়ে গলা অবধি জলে নেমে গেলো। তার পর জলের পানিতে হারিয়ে গেলো। মাঝি ঠিক তখনো বিষয়টি বুঝে উঠতে পারেনি। ধরে নিয়েছিল কুয়াশার মধ্যে চলে গেছে হয়তো। সূর্যের আলো যখন চারদিকে ফুটে উঠে মনহর হাঁপাতে হাঁপাতে মাঝির নৌকার সামনে আসে। বউটা সকাল থেকে ঘরে নেই, কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না মনহর। ভোরের কুয়াশায় চেহারা চিনতে পারেনি মাঝি কিন্তু এখন সব স্পষ্ট। মাঝির কথা শুনেই নদীতে ঝাঁপিয়ে পরে মনহর। ঠা-া জলে ডুব দিয়ে বউয়ের নিথর দেহ টেনে তোলে। গলা থেকে কলশির বাঁধন খুলে নাকের সামনে কান পাতে। কোনো শ্বাসপ্রশ্বাস নেই। প্রাণপাখিটা জলেই চলে গেছে। অভাবের সংসার দ্বন্দ্ব একটু হতেই পারে। তাই বলে অভিমান করে চলে যাওয়া মেনে নিতে পারে না মনহর। হাউমাউ করে কান্না শুরু করে। আকাশ ভারি হয়ে উঠে সেই কান্নায়। সরফত মাঝির সেই কান্না এখনো কানে বাজে। মনে হলেই এক ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।

মাঝি লগি ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। কালো মেঘ এক সময় বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। ভিজিয়ে দেয় নৌকা আর মাঝির গা। মাঝি তবুও পথের দিকে তাকিয়ে থাকে রুটি রুজির আশায়।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন