শিরোনাম :

প্রকৃতির প্রতিকূলতা থেকেও শিখেছেন কাজী নজরুল


বুধবার, ২৯ আগস্ট ২০১৮, ১০:০৮ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

প্রকৃতির প্রতিকূলতা থেকেও শিখেছেন কাজী নজরুল

সুদীপ দে: আজ কাজী নজরুল ইসলামের ৪২তম প্রয়াণ দিবস। এইদিনে আজ তাঁরই পৌত্র (কনিষ্ঠ পুত্র প্রখ্যাত গিটারবাদক প্রয়াত কাজী অনিরুদ্ধর পুত্র) প্রখ্যাত গিটারবাদক কাজী অরিন্দম আমাদের জানাবেন বহুমুখি প্রতিভাধর এই ব্যক্তিত্বের সম্বন্ধে এমন কিছু কথা, যার বেশ কিছু হয়ত আমাদের অজানা। এই সব তথ্য হয়ত কোনও বইয়ের মুখবন্ধে নেই, গুগল করলেও যে সব তথ্য জানা সম্ভব নয়। একেবারেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং পারিবারিক স্মৃতির পাতা থেকে উঠে আসা এক আজানা দুখুমিয়াঁ-কে কাজী অরিন্দম আজ পরিচিত করালেন একান্ত সাক্ষাত্কারে। মুখোমুখি ।


প্রশ্ন: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং নজরুল, এদের মধ্যে তো যোগাযোগ ছিল, দুজনের সম্পর্ক কেমন ছিল?


কাজী অরিন্দম: ছোটবেলা থেকেই বা যবে থেকে সঙ্গীতবোধ তৈরী হয়েছে, রবীন্দ্রনাথের গানের পাশাপাশি দাদুরও গান শুনে বড় হয়েছি। এই দুজনের মধ্যে কোনও তুলনা চলে না। কারণ, এঁদের সম্পর্ক ছিল গুরু শিষ্যের মতো, যা হয়তো অনেকেই জানেন না। নিজের যৌবনে দাদু যখন নানা কাজে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতেন, শুনেছি তাঁর কাঁধে সবসময় একটা কাপড়ের ঝোলা থাকত। আর সেই ঝোলাতে থাকত গীতবিতান এবং দাদু কবিগুরুর গান গেয়েই বেড়াতেন। পরবর্তীকালে নিজে গান রচনা শুরু করলেন, কবিতা লেখা শুরু করলেন। এগুলোই পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে প্রকাশিত হতে শুরু করে। আর এই সময় থেকেই দাদুর বৈপ্লবিক কবিতাগুলোর মাধ্যমে মানুষ তাঁর সম্বন্ধে জানতে শুরু করল। দাদু জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করলেন। জনপ্রিয় হল তাঁর গানগুলোও। আর এই সময় থেকেই সমাজের বেশ কিছু মানুষ অহেতুক রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর তুলনা শুরু করলেন। এই তুলনা দাদু নিজেও পছন্দ করতেন না। কারণ, রবীন্দ্রনাথ দাদুর কাছে ছিলেন পিতৃতুল্য, তাঁর গুরু। আর কবিগুরুও তাঁকে সন্তানবত স্নেহ করতেন। না হলে রবীন্দ্রনাথের নাটকে গীতিকার, সুরকার নজরুল... এটা সম্ভব হত কি!

প্রশ্ন: রবীন্দ্রনাথের বসন্ত নাটকের কথা বলছেন কি!

কাজী অরিন্দম: হ্যাঁ, বসন্ত। শুধু বসন্ত কেন গোরা নাটকেও তো... গীতিকার রবীন্দ্রনাথ, সুরকার নজরুল ইসলাম। আসলে একজন গুণি মানুষ আরেকজন গুণিকে চিনেছিলেন। এখানে কোনও দ্বন্দ্ব নেই, এখানে কোনও তুলনা চলে না।

প্রশ্ন: তাঁর ব্যক্তিগত জীবন কেমন ছিল এবং সাহিত্যে তার কতটা প্রভাব ছিল?

কাজী অরিন্দম: দাদুর ছোটবেলা খুব দারিদ্রের মধ্যেই কেটেছে। কষ্ট তো ছিলই তার মধ্যেও অদ্ভুত বাউন্ডুলে বোহেমিয়ান জীবন যাপন করতেন তিনি। কখনও বাউলদের সঙ্গে, কখনও যাত্রা দলের সঙ্গে ভিঁড়ে গিয়ে দিনের পর দিন ঘর ছাড়া থাকতেন। মাঠে ঘাটে অচেনা পথে ঘুরে ঘুরে, অসংখ্য নতুন মানুষের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হত। আর এর মাঝে মাঝেই চলত তাঁর সাহিত্য ও সঙ্গীত রচনার প্রয়াস। দাদু প্রকৃতির থেকেও শিখেছেন, প্রতিকূলতার থেকেও শিখেছেন। তাঁর বৈচিত্রময় জীবন যাপনই বদলে দিয়েছে তাঁর সঙ্গীত ও সাহিত্য দর্শণকে। যার সঙ্গে কারও তুলনা চলে না।

১৯৩৪-এ মুক্তি পাওয়া ছবি ‘ধ্রুব’-এ নারদের ভূমিকায় কাজী নজরুল ইসলাম।

প্রশ্ন: নজরুলগীতি গাইবার জন্য উপযুক্ত সঙ্গীত শিক্ষা থাকার প্রয়োজন, বিশেষত শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিক্ষার। কিন্তু তাঁর সঙ্গীত শিক্ষা কোথা থেকে হয়েছিল?

কাজী অরিন্দম: দাদুর কিছু কিছু গানে মধ্য প্রাচ্যের সঙ্গীত ধারার একটা ছোঁয়া মেলে। কিন্তু তিনি কখনও মধ্য প্রাচ্যে গিয়েছিলেন বলে আমার জানা নেই। তাঁর গানে কখনও কালী, কখনও কৃষ্ণ, কখনও ইসলাম, এসবই বোধহয় তাঁর জীবনের শিক্ষার প্রভাব। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কাজ করেছেন অথচ ইংরেজ শাসণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে মুখর হয়ে জেলও খেটেছেন তিনি এবং বাঙালি জনসাধারণের কাছে হয়ে উঠেছিলেন বিদ্রোহী কবি। তাঁর এই জীবন যাত্রার মধ্যেই তিনি কোথায় সুর খুঁজে পেয়েছেন এবং কোথায় তাঁর সঙ্গীত শিক্ষা তা সঠিক জানা নেই। তবে তাঁর সঙ্গীত এবং সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষমতা হয়তো ঈশ্বর প্রদত্ত্ব।

প্রশ্ন: দাদুকে (নজরুল ইসলাম) নিয়ে আপনার ছোটবেলার কোনও স্মৃতি...

কাজী অরিন্দম: যখন থেকে আমি বুঝতে শিখেছি, দাদু তখন অসুস্থ। আমরা দেখতাম, তাঁকে স্নান করিয়ে, সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরিয়ে বসার ঘরে আনা হত। তিনি আমাদের সঙ্গে একেবারে শিশুর মতোই খেলতেন, হাসতেন, কথা বলতেন। তবে ছাতা বা রঙিন চশমা দেখতেই চঞ্চল হয়ে উঠতেন। এমনটা কেন হতো, আমার জানা নেই।


প্রশ্ন: তাঁর এই অসুস্থতা কবে থেকে?

কাজী অরিন্দম: দাদুর কর্মজীবন মাত্র ২২ বছরের। ১৯৩৯ সালে ৪০০ টাকা মাইনেতে একটি গ্রামাফোন কোম্পানিতে চাকরি করেছেন। ১৯৪০-এ নবযুব নামের একটি সংবাদপত্রে প্রধান সম্পাদকের দায়িত্বও সামলেছেন। দাদু যখন আকাশবাণীতে শিশুদের নিয়ে একটি অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন, সেই সময় প্রথম তাঁর সমস্যা বাড়াবাড়ির দিকে মোড় নেয়। শুনেছি, একদিন এমনই একটি অনুষ্ঠানের রেকর্ডিং শুরুর সময় যেই স্টুডিওর লাল আলো জ্বলে উঠতেই দাদু চঞ্চল হয়ে ওঠেন। উদ্ভ্রান্তের মতো স্টুডিও বেরিয়ে আসেন। একবার, দু’বার, তিন বার...সেই শুরু।

প্রশ্ন: তাঁর এমনটা হওয়ার কারণ?

কাজী অরিন্দম: আসলে ছোটবেলা থেকে দারিদ্র, অনটন, সন্তানের মৃত্যু, স্ত্রীর অসুস্থতা, স্ত্রীর মৃত্যু... সব মিলিয়ে মারাত্মক মানসিক টানাপড়েনের মধ্যে দিয়ে বছরের পর বছর কাটিয়েছেন তিনি। এ সবেরই জন্যই হয়তো শেষটায়...

প্রশ্ন: এই প্রজন্মের কাছে কাজী নজরুল ইসলাম কতটা প্রাসঙ্গিক?

কাজী অরিন্দম: খুবই প্রাসঙ্গিক। তাঁর জাতীয়তাবোধ, ধর্ম, বর্ণ, জাতীবিদ্বেশের উর্দ্ধে উঠে মনুষ্যত্বকে প্রাধান্য দেওয়ার উদার জীবনদর্শন, এই প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত জরুরি একটি পাঠ। সামাজিক এবং ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে সুস্থ পরিবেশ, দৃঢ় মানসিক গঠনের জন্য এগুলো বোঝা দরকার। আমার মনে হয়, স্কুল পাঠ্যের মাধ্যমেও আরও বেশি করে নজরুল ইসলামকে জানানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

প্রশ্ন: তেমন কোনও উদ্যোগ কি নেওয়া হয়েছে?

কাজী অরিন্দম: পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সরকার এ বিষয়ে যথেষ্ট উদ্যোগী। নজরুলতীর্থ তার অন্যতম উদাহরণ। এ ছাড়াও নজরুল সাহিত্য ও সঙ্গীত সংরক্ষণ ও প্রচারে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শুধু রবীন্দ্রনাথ বা নজরুল ইসলাম নয়, বাংলার একাধিক মনীষী, ব্যক্তিত্বকে এই প্রজন্মের কাছে নানা ভাবে তুলে ধরা হচ্ছে, চেনানো হচ্ছে, মনে করানো হচ্ছে। রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগ অবশ্যই প্রসংশার দাবি রাখে। রবীন্দ্রনাথ বা নজরুল ইসলামের মতো মনীষীদের ভুলে গেলে বাঙালির অস্তিত্ব আরও সংকটময় হয়ে যাবে। আর তা কি হতে দেওয়া যায়?

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন