শিরোনাম :
ইউপি নির্বাচন

সারাদেশে সহিংসতায় নিহত ১০


শনিবার, ২৮ মে ২০১৬, ০৪:৩৮ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

সারাদেশে সহিংসতায় নিহত ১০

ডেস্ক প্রতিবেদন: পঞ্চম ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে সহিংসতায় জামালপুর, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীতে দশজন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে জামালপুরে দুই শিশুসহ চারজন এবং নোয়াখালীতে দুইজন, চট্টগ্রামে তিনজন এবং কুমিল্লায় একজন নিহত হয়েছেন।

শনিবার দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনী সহিংসতায় এ হতাহতের ঘটনা ঘটে।

জামালপুর: জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরাবাদ ইউনিয়নের কুঠারচর ইবতেদায়ি মাদ্রাসা ভোটকেন্দ্রে আজ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মো. শাকিরুজ্জামান রাখাল ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মো. শাহজাহান মিয়ার সমর্থকদের মধ্যে জাল ভোট দেওয়া নিয়ে সংঘর্ষ হয়। এ সময় চারজন নিহত হন।

নিহতরা হলেন, জিয়াউর রহমান, নূর আলম (৬৫), মাজেদ (৮), নবীরুল (১০)। এদের মধ্যে নিহত জিয়াউর রহমান ও মাজেদের বাড়ি একই ইউনিয়নের শেখের পাড়া গ্রামে এবং নূর আলম ও নবীরুলের বাড়ি ওই ইউনিয়নের কুতুবের চরে বলে জানা গেছে।

জামালপুরের পুলিশ সুপার মো. নিজামউদ্দিন চারজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন।

তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ চলছিল। এ সময় বিদ্রোহী প্রার্থী মো. শাহজাহান মিয়ার সমর্থকেরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ভোটকেন্দ্রে হামলা চালায়। এ ঘটনায় পাঁচ পুলিশ সদস্য, তিন আনসার সদস্যসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আটজন আহত হন। তাঁদের মধ্যে দুজনকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে ১০০টি ফাঁকা গুলি ছোঁড়া হয়। ওই কেন্দ্রে ভোট গ্রহণও স্থগিত করা হয়।

নিহত কিশোর মাজেদের চাচা কালাম মিয়া বলেন, মাজেদ ভোট দেখার জন্য ওই কেন্দ্রে যায়। সংঘর্ষ বাঁধলে গুলিবিদ্ধ হয়ে সে মারা যায়। তারপর সেখান থেকে লাশ বাড়িতে নিয়ে আসা হয়।

নোয়াখালী: প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা বলেন, বেলা ১১টার দিকে বেগমগঞ্জ উপজেলার রাজগঞ্জ সিনিয়র মাদ্রাসা কেন্দ্র দখল নিয়ে নৌকা ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে মারামারি শুরু হয়। এ সময় কেন্দ্রের পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দুই পক্ষকে ধাওয়া করে। এ সময় কেন্দ্রে ভোট দিতে যাওয়া পার্শ্ববর্তী ছোট হোসেনপুর গ্রামের সৈয়দ আহম্মদ নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটতে গিয়ে পাশের দেয়ালের সঙ্গে ধাক্কা লেগে পাকা রাস্তায় পড়েন। এতে তিনি মাথায় আঘাত পান। তাৎক্ষণিক আশপাশের লোকজন উদ্ধার করে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত সৈয়দ আহম্মদের ছেলে সুজায়েত উল্লাহ বলেন, তাঁর বাবা শারীরিকভাবে কিছুটা অসুস্থ ছিলেন। এরপরও ভোট দিতে কেন্দ্রে গিয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ ও র‌্যাবের ধাওয়া খেয়ে কেন্দ্রের পার্শ্ববর্তী একটি দেয়ালের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে রাস্তার ওপর পড়েন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান।

অন্যদিকে, জিরতলী ইউনিয়নের কে বি ইউনিয়ন উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে একদল দুর্বৃত্ত এসে ব্যালট পেপার ছিনিয়ে সিল মারার চেষ্টা করেন এবং কিছু ব্যালট ছিঁড়ে ফেলেন। এ ঘটনায় কিছু সময় কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ বন্ধ রাখা হয় বলে জানিয়েছেন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মানিক রতন সরকার।

এরপর রিটার্নিং কর্মকর্তা মুহা. আবুল খায়ের এসে পুনরায় ভোট গ্রহণ শুরু করার নির্দেশ দিয়ে যান। মানিক রতন বলেন, রিটার্নিং কর্মকর্তার যাওয়ার পর বেলা একটার দিকে কেন্দ্রের চারদিক থেকে বহিরাগত লোকজন ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ককটেল হামলা চালাতে থাকে। এ সময় পুলিশকে নির্দেশ দিলে তারা বন্দুকের গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনায় হামলাকারীদের কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে শুনেছেন।

স্থানীয় লোকজন বলেন, পুলিশের গুলির এ ঘটনায় সদস্য প্রার্থী গোলাম মোস্তফার ভাতিজা মো. শাকিল (১৭) এবং জসিম উদ্দিন (২৮) ও মো. রাব্বি (২২) নামের তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। এ ছাড়া পিটুনিতে ও ধাওয়া খেয়ে আহত হয়েছেন আরও কমপক্ষে ১০ জন। পরে শাকিল ও রাব্বিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে নেওয়ার পথে কুমিল্লায় শাকিলের মৃত্যু হয়।

নিহত শাকিলের মা বকুল বেগম বলেন, তাঁর ছেলে ফল দোকানে চাকরি করতেন। দুপুরে ভোটকেন্দ্রে ভোট দেখতে গিয়েছিলেন। ওই সময় কেন্দ্রে মারামারি লাগলে পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি করে। এতে শাকিল মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।

তবে বেগমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান ভোটকেন্দ্র দখলমুক্ত ও সড়কের ব্যারিকেড সরাতে পুলিশ ফাঁকা গুলি করেছে দাবি করে বলেন, ওই ঘটনার কেউ আহত হয়নি। শাকিল ওই পথ দিয়ে যাওয়ার পথে ভয়ে পালানোর সময় সড়কে পড়ে মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হন। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান। তবে ঘটনার বিষয়ে পরিবারের কোনো অভিযোগ নেই।

চট্টগ্রাম: দুপুর ১২টার দিকে পটিয়া আশিয়া ইউনিয়নের আছদ আলী ফকির মাজার–সংলগ্ন শাহআমানত হেফজখানা ও এতিমখানা কেন্দ্রের বাইরে দুই ইউপি সদস্যের সমর্থকদের সংঘর্ষের সময় বাবুল শীল (৫০) নামে এক ব্যক্তি নিহত হন।

তাঁর ছেলে জিতেন্দ্র শীল বলেন, আমার বাবা ইউপি সদস্য সৈয়দ নুরুল করিমের পক্ষের কাজ করেছে বলে তাকে মারধর করা হয়।

পটিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্তব্যরত চিকিৎসক দেব আরতি চৌধুরী বলেন, তাঁর শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাইনি। আমরা মৃত অবস্থায় পেয়েছি।

এ ছাড়া বড়উঠান ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সদস্য প্রার্থী মো. ইয়াছিনকে (৪৫) কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। শাহ মিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের বাইরে সাড়ে ১২টার দিকে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী দিদারুল আলম এবং বিদ্রোহী প্রার্থী আবদুল মান্নান খানের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের সময় তাকে কোপানো হয় বলে আবদুল মান্নান অভিযোগ করেন। মো. ইয়াছিনকে বেলা দেড়টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে আনা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এ দিকে একই ঘটনায় গুরুতর আহত মোহাম্মদ হোসেন (৬০) চিকিৎসাধীন অবস্থায় সন্ধ্যা সাতটার দিকে চমেক হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি বিভাগে মারা যান। চমেক হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির তত্ত্বাবধায়ক জহিরুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

ইয়াছিনের প্রতিবেশী মোহাম্মদ আলী বলেন, দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষের সময় তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে শরীরের পেট, বুক ও মাথায় কোপানো হয়েছে। মোহাম্মদ আলীই ইয়াছিনকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন।

জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন বিকেলের দিকে পটিয়ায় নির্বাচনী সহিংসতায় দুজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এ ছাড়া বেশ কিছু কেন্দ্রে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে চারটি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত করার কথা জানান।

কুমিল্লা: জেলার তিতাস উপজেলার বলরামপুর ইউনিয়নে বিএনপির বিদ্রোহী চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ও বর্তমান চেয়ারম্যান মো. কামাল উদ্দিনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। বেলা তিনটার দিকে নাগেরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের বাইরে এ ঘটনা ঘটে।

নিহত কামাল উদ্দিনের সমর্থকেরা দাবি করেন, আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী মো. নূর নবীর সমর্থকেরা এ হত্যাকাণ্ড ঘটান।

জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা রাশেদুল ইসলাম বলেন, একজন চেয়ারম্যান প্রার্থীর মৃত্যুর খবর পেয়েছি। বিস্তারিত জেনে পরে বলব।

এছাড়া জামালপুর, কুমিল্লা, নোয়াখালী ও লক্ষীপুরে নির্বাচনী সহিংসতায় আহত হয়েছেন ৯৮ জন।

ভোট বর্জন: মুন্সিগঞ্জে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী চেয়ারম্যান প্রার্থী মুক্তার হোসেন ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। এছাড়াও নাটোর, নারায়নগঞ্জ, বরিশাল, কুমিল্লা, পাবনা ও গাইবান্ধায় ১৯ বিএনপি প্রার্থী ও একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী ভোট বর্জন করেছেন।

ভোট স্থগিত: জামালপুর, কুমিল্লা, নোয়াখালী ও লক্ষীপুর, নাটোর, নারায়নগঞ্জ, বরিশাল, কুমিল্লা, পাবনা ও গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ ও চাঁদপুরে ৭০ টি কেন্দ্রের ভোটগ্রহন স্থগিত করা হয়।

উল্লেখ্য, পঞ্চম ধাপের এ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ সকাল ৮টায় শুরু হয়ে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলে। এ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ৭২৯ ইউপিতে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন ৩ হাজার ২৫৪ জন। এর মধ্যে ১৫টি দলের প্রার্থী ১ হাজার ৭২৭ জন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ১ হাজার ৫২৭ জন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী রয়েছে ৭২৬ ইউপিতে, ৬২৯ ইউপিতে রয়েছে বিএনপির প্রার্থী। এ ধাপে নৌকা প্রতীকের ৪২ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া জাতীয় পার্টি ১৭৭টি, জাসদ ২১টি, বিকল্পধারা ২টি, ওয়ার্কার্স পার্টি ১৩টি, ইসলামী আন্দোলন ১২২টি, জেপি ২টি, ইসলামী ফ্রন্ট ১১টি, এলডিপি ৬টি, সিপিবি ৫টি, জেএসডি ১টি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ৬টি, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট ৭টি এবং অপর একটি দল ১ ইউপিতে প্রার্থী দিয়েছে। আগামী ৪ জুন ষষ্ঠ ধাপের নির্বাচনের মাধ্যমে ইউপি নির্বাচন শেষ হবে।

এসএ

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন