শিরোনাম :

সীমান্তের জিরো পয়েন্টে যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে গুলিবিদ্ধ রোহিঙ্গারা


রবিবার, ২৭ আগস্ট ২০১৭, ০৩:১২ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

সীমান্তের জিরো পয়েন্টে যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে গুলিবিদ্ধ রোহিঙ্গারা

ইমাম খাইর, সীমান্ত থেকে: মিয়ানমারের আরকান প্রদেশে সহিংসতার মাত্রা ক্রমশ বেড়েই চলেছে।

নির্বিচারে চলছে নিরস্ত্র রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ। এই পর্যন্ত শতাধিক রোহিঙ্গা নারী,শিশু ও পুরুষ গুলি করে হত্যা করেছে দেশটির সামরিক বাহিনী। 
রোহিঙ্গা বসতিতে ঢুকে বেপরোয়া গুলিবর্ষণ অব্যাহত রেখেছে। গুলিবিদ্ধ রাহিঙ্গারা বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের জিরো পয়েন্টে বিজিবির প্রতিরোধের মুখে মরণ যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে।

বালুখালী, রহমতেরবিল, ধামনখালী, ঘুমধুম, তমব্রু, হোয়াইক্যংসহ বিভিন্ন সীমান্তে জিরো পয়েন্টে অবস্থান নিতে দেখা গেছে হাজার হাজার মানুষকে। ওপার থেকে ছোঁড়া গুলি এপারের জনপদে এসেও পড়ছে। শনিবার সন্ধ্যা নাগাদ মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ছোঁড়া গুলির আওয়াজে আতংকিত হয়ে পড়েছে উখিয়ার বালুখালী ও রহমতের বিলসহ আশপাশের এলাকাগুলো। অনেকেই বাড়িঘর ছেড়ে পাহাড়ের ঢালে আশ্রয় নেয় বলে জানান বালুখালী গ্রামের ইসলাম আহমদ ও রহমতের বিল এলাকার এডভোকেট আবদুল মন্নান।

তিনি জানান- বিকাল চারটার দিকে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মিয়ানমারে সেদেশের সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার উড়ে যেতে দেখা যায়। এরপরই কানে তুলো দেওয়ার মতো উপর্যপুরি গুলীবর্ষণের শব্দ শোনা যায়। সীমান্ত পেরিয়ে সেই গুলি প্রায় এক মিটার বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পড়ে। এরপরই আতংকিত গ্রামবাসী পাহাড়ের ঢালে আশ্রয় নেয়। গত শুক্রবার থেকে উখিয়ার বালুখালী ও রহমতেরবিল সীমান্তে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু নাফনদীর জিরো পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছে। সেখানে চিংড়ি ঘেরের বেড়ীবাঁধে তাদেরকে আটকে দিয়েছে বিজিবি সদস্যরা। শনিবার রাতেও বিজিবি সদস্যরা রোহিঙ্গাদের স্রোত ঠেকাতে হিমসিম খাচ্ছিল। পালিয়ে আসাদের মধ্যে ছিল বেশিরভাগ নারী-শিশু ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। এরই মাঝে আসছিল গুলিবিদ্ধরাও।

শনিবার রাত পৌনে ৮টায় বালুখালী সীমান্ত দিয়ে জব্বার ওরফে জাবু নামের গুলিবিদ্ধ এক যুবককে বিজিবির প্রতিরোধের মুখে নাফনদীর বেড়ীবাধে গুলির আঘাতে কাতরাচ্ছে।

তার সাথে আসা ব্যক্তিরা জানিয়েছে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সদস্যরা শনিবার বিকালে তাদের গ্রামে ঢুকে রোহিঙ্গাদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি বর্ষণ করছে। এতে মাত্র একটি গ্রামেই শতাধিক মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ইতোমধ্যে মারা গেছেন। ওই গ্রামের মৌলভী ফজল, নুর বশরসহ চার ভাইকেও ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। বৃহস্পতিবারের সহিংস ঘটনার পর তারা বাংলাদেশে পালিয়ে না এসে ঘরেই অবস্থান করছিল।

এর আগে রাতের আধাঁরে পানি ভেঙ্গে পালিয়ে আসা একই এলাকার সত্তরোর্ধ বৃদ্ধ সোলতান আহমদের সাথে দেখা হলে তিনি জানান- তার মেয়েকেও মিলিটারিরা নির্যাতন করে হত্যা করেছে। মেয়ে জামাই নিখোঁজ রয়েছে। সেনা সদস্যরা অভিযানকালে তাকেও রাইফেলের বাট দিয়ে বেদম মারধর করে তাড়িয়ে দিয়েছে বলে জানান তিনি। আসার পথে তিনি বিল ও জঙ্গলের পাশে অনেকের মৃতদেহ দেখেছেন বলে জানান।
ডান হাতে গুলীবিদ্ধ অবস্থায় এমএসএফ-হল্যান্ড হাসপাতালে ভর্তি করা হয় কামাল হোসেন নামের একজনকে।

মংডুর ধুমবারিজা এলাকার আবু আহমদের ছেলে কামাল সেনাবাহিনীর গুলীতে গুরুতর আহত হওয়ার পর পালিয়ে এসেছেন। সেনাবাহিনী মংডুর রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামগুলো ঘিরে রেখে সেখানে সামনে যাকে পাচ্ছে গুলী করছে বলে জানান তিনি।

এদিকে শনিবার বিকাল থেকেই নাইক্ষ্যংছড়ি, উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্টে শত শত রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। রবিবার সকাল পর্যন্ত টেকনাফের শাহপরীরদ্বীপ ও দমদমিয়া এবং উখিয়া পয়েন্ট দিয়ে বিজিবি ৮৬ জন মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমকে ফেরত পাঠিয়েছে।


সীমান্ত লাগোয়া গ্রামগুলোতে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী রোহিঙ্গাদের লক্ষ্য করে বেপরোয়া গুলি বর্ষণ শুরু করলে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশ সীমান্তের জিরো পয়েন্টে এসে জড়ো হয়। অনেকেই নৌকা দিয়ে নাফনদী পার হওয়ার চেষ্টা করে। এইসময় বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি সর্তক অবস্থান নেয়।

নাইক্যংছড়ি তুমব্রু, ঘুমধুম, উখিয়ার বালূখালী, থাইংখালী, রহমতের বিল, পালংখালী সীমান্ত দিয়ে গভীররাত অবদি শত শত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালায়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা জানিয়েছে মিয়ানমারের এখণ সেনাবাহিনীর অভিযানের নামে নারকিয় তান্ডব। এতে অনেকেই হতাহত হচ্ছে। অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে সীমান্তের জিরো পয়েন্টে বিজিবির প্রতিরোধর মুখে পড়ে যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে। তারা নিতে পাচ্ছেনা কোন চিকিৎসা।

বিজিবি ৩৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে: কর্নেল মনজুরুল হাসান জানিয়েছেন সীমান্তের শুণ্য রেখা বরাবর অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রেবেশের চেষ্টা চালালেও তাদেরকে সীমান্ত অতিক্রম দেয়নি তারা। 
সুত্র জানায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্তের মধ্যে বর্ডার গার্ড পুলিশের ১২৪টি সীমান্ত চৌকি রয়েছে। গত বছরের অক্টোবরে ৩টি সীমান্ত চৌকিতে হামলার পর নতুন করে ৩০টি চৌকি বাড়ানো হয়েছে। এরআগে ৯৪টি চৌকি ছিল। এরমধ্যে বেশ কয়েকটি সীমান্ত চৌকি রয়েছে বাংলাদেশ সীমানার একেবারে কাছে জিরো পয়েন্টের মধ্যে। এছাড়া আরো রয়েছে ৩০/৪০ ফুট উঁচু পর্যবেক্ষণ টাওয়ারও।

এদিকে মিয়ানমারে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় বিজিপির চৌকি বাড়ানো ও সীমান্তের একেবারে কাছাকাছি সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হলেও সেখানকার পরিস্থিতি আরো অস্থিতিশীল হয়ে ওঠেছে। ওপারের গ্রামগুলো প্রায় মানুষশূণ্য হয়ে পড়েছে। এপারের বেড়ীবাঁধের পাশপাশি বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে হাজার হাজার নারী-পুরুষ। সেনা অভিযান অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে রোহিঙ্গা ঢল আরো বাড়তে পারে বলে আশংকা সংশ্লিষ্টদের।

সংশ্লিষ্টদের মতে, চলতি মাসে রাখাইন প্রদেশে সেনা মোতায়েন করার পর থেকেই ওই এলাকা থেকে পালাচ্ছে রোহিঙ্গা মুসলিমরা। তবে বৃহস্পতিবার রাতের সহিংসতার পর শুক্রবার থেকে সীমান্তের গ্রামগুলোতে রোহিঙ্গাদের ঢল নামে।

আইকে

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন