শিরোনাম :

শীতে কাঁপছে রাজধানীসহ গোটা দেশ


শনিবার, ৬ জানুয়ারি ২০১৮, ১২:১২ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

শীতে কাঁপছে রাজধানীসহ গোটা দেশ

ডেস্ক প্রতিবেদন: পৌষেই বাঘ কাঁপনো ঠাণ্ডা নেমেছে। রাজধানীসহ গোটা দেশ কাঁপছে শীতে। প্রতিদিন নামছে তাপমাত্রা। ঘন কুয়াশা বাড়িয়ে দিচ্ছে শীতের মাত্রা। উত্তর দিক থেকে আসা হুল ফুটানো শীতল বাতাস আর কনকনে ঠাণ্ডা দেশের উত্তরাঞ্চলে আগেভাগে শুরু হওয়ার পর এখন ধেয়ে আসছে রাজধানী ঢাকাসহ মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলের দিকে। দেশের প্রায় সব জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ।
 
শুক্রবার শীতলতম দিন ছিলো যশোরে। সেখানে তাপমাত্রা ছিলো ৭ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এদিকে হঠাৎ জোরে-শোরে শীতল বাতাস বইতে শুরু করায় ঠাণ্ডাজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকেই। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের অবস্থা বড় করুণ। কুড়িগ্রামের রাজারহাটে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে দেড় বছরের এক শিশু। ঠাণ্ডার কামড় সহ্য করতে না পেরে খড়-কাঠে আগুন জ্বালিয়ে শরীর গরমের চেষ্টা করছেন দরিদ্ররা। বিশেষ করে ঘন কুয়াশা আর হিমেল হাওয়ায় কাহিল অবস্থা উত্তরের জেলাগুলোর ছিন্নমূল মানুষের। সেখানে বর্তমানে দিনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ২০ ঘণ্টাই আকাশ থাকে মেঘ ও কুয়াশাচ্ছন্ন। বিকাল থেকে পরদিন আধাবেলা পর্যন্ত থাকছে দাপুটে শীত।
 
তীব্র ঠাণ্ডায় আর ঘনকুয়াশায় কনকনে শীতে কাহিল সারাদেশ।  সূর্য মামার দেখা নাই, তাই ঘন কুয়াশা চারপাশ জুড়ে উড়ছে ধোয়া হয়ে।  যানবাহনগুলো  হেড লাইট জ্বালিয়ে চলাচল করছে।  শীতের তীব্রতা যেন কুয়াশার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছে।  কুয়াশা ও শীতকে হার মানাতে বইছে শীতল বাতাস।  সব মিলিয়ে ঘন কুয়াশা তীব্র শীতের পাশাপাশি শীতল বাতাসে কাহিল হয়ে পড়েছে সারাদেশ।

গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছাড়া কেউ বের হচ্ছেনা ঘর থেকে।  আর এই তীব্র শীতে খেটে খাওয়া দিনমজুর ও ছিন্নমূল মানুষেরা পড়েছে বিপাকে।  শীতের মাঝেও শত কষ্টে কাটাতে হচ্ছে দিন।  শীত নিবারণে সম্বল হিসেবে খড়-কাঠে আগুন জ্বালিয়ে শরীর গরমের চেষ্টা করছেন।

পৌষের দ্বিতীয়ার্ধে এসে দেশের ছয় বিভাগের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্য প্রবাহ।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, উপমহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয় পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ায় শীত বেড়েছে বাংলাদেশে।  এই শৈত্য প্রবাহ চলতে পারে আরও দুই এক দিন।

শুক্রবার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল যশোরে ৭ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।  আগের দিন সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল চুয়াডাঙ্গায় ৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ছিল চলতি শীত মৌসুমে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা।

শুক্রবার ঢাকায় থার্মোমিটারের পারদ ১১ দশমিক ৫, রংপুরে ১০, দিনাজপুরে ৮ দশমিক ৪, শ্রীমঙ্গলে ৯ দশমিক ৪, টাঙ্গাইলে ৯ দশমিক ৮, গোপালগঞ্জে ৯ দশমিক ৭,  ময়মনসিংহে ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমেছে।  দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে কক্সবাজারে, ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

এদিকে তীব্র ঠাণ্ডায় কোথাও কোথাও কোল্ড ডায়রিয়া দেখা দিয়েছে।  বৃহস্পতিবার কুড়িগ্রামে দেড় বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে ডায়রিয়ায়।  শীতে সবচেয়ে বেশি ভুগতে হচ্ছে নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষকে।

আবহাওয়া অফিস বলছে, শ্রীমঙ্গল এলাকাসহ রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও খুলনা বিভাগের উপর দিয়ে বয়ে চলা শৈত্য প্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে এবং আশপাশের এলাকায় বিস্তৃত হতে পারে।   

শনিবার দিন ও রাতের তাপমাত্রায় তেমন কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা আবহাওয়া অফিস দেখছে না।  শীত মৌসুমে প্রতিদিনই মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত কুয়াশার দাপট থাকে।  শনিবারের আবহাওয়ার বুলেটিনেও একই আভাস দেওয়া হয়েছে।     

আবহাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, জানুয়ারিতে একটি মাঝারি (৬-৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) বা তীব্র (৪-৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস) এবং ২-৩টি মৃদু (৮-১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) বা মাঝারি  শৈত্য প্রবাহ বয়ে যেতে পারে।
 
সরেজমিন দেখা যায়, গত কয়েকদিন ধরে উত্তরের জেলা দিনাজপুরে শীতের তীব্রতা দিন দিন বাড়ছে।  শীতের পাশাপাশি ঘন কুয়াশা ও শীতল বাতাস নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করছে।  তীব্র শীতে উচ্চ ও মধ্যবিত্তদের তেমন অসুবিধা না হলেও বিপাকে পড়তে হয়েছে নিম্ন আয়ের ও ছিন্নমূল মানুষদের।  শীতের মধ্যে শত কষ্ট হলেও পেটের দায়ে ঘর থেকে বের হচ্ছেন কাজের সন্ধানে।  এই তীব্র শীতে কষ্ট পেতে হচ্ছে শিশু-বৃদ্ধসহ সব বয়সের মানুষদের।

দিনাজপুর শহরের দপ্তরিপাড়া এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম একজন দিনমজুর।  তার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘দিন আনি দিন খাই।  একদিন কাজ না করলে ৫ সদস্যের পরিবারের সবাই নাখেয়ে থাকবে।  যতই শীত হোক তাদের মুখে এক মুঠো খাবার তুলে দিতে কাজে যেতেই হবে।  পরিবারের সদস্যের মধ্যে দুই ছেলে, স্ত্রী ও বিধবা মা রয়েছেন।  বড় ছেলে মো. সবুজ (১৫) দিনাজপুর বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ক্যাম্প স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র।  অপর ছেলেক এবার নিকটবর্তী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করেছি।  দিনমজুরের কাজ করে আয় হয় তিন থেকে চার’শ টাকা।  যা দিয়ে সংসার ও ছেলেদের পড়াশোনায় খরচ চালাতে হয়। ’
    
তিনি বলেন, শনিবার সকাল সাড়ে ৭টায় শহরের শষ্টিতলা মোড়ে এসেছেন দিন হিসেবে কাজের সন্ধানে।  সাধারণত ইট, বালু, খোয়া, বাঁশের কাজ, কাঠের কাজ ইত্যাদি করে থাকেন তিন।  এই কাজগুলো এই রকম শীতে করা খুবই কষ্টকর।  কিন্তু বাঁচার তাগিদে কষ্ট করতেই হবে।  এ শীতে গরম কাপড় কেনার কথাতো আমাদের স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই না।  বিত্তবানদের ফেলে দেওয়া ছেড়া কাপড়ই আমাদের শেষ ভরসা।  তবে তীব্র এই শীতে সরকারি সহায়তার আহ্বান জানান তিনি।

দিনাজপুর আবহাওয়া অধিদফতরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. তোফাজ্জুর রহমান বাংলানিউজকে বলেন, শীত বাড়ছে।  শনিবার সকালে দিনাজপুরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে।  বাতাসের আদ্রতা ছিলো ৯৭ শতাংশ আর গতি বেগ ছিলো ঘণ্টায় ৮ কিলোমিটার।

তিনি বলেন, আবহাওয়ার পূর্ব আভাস অনুযায়ী আগামী আরও দুই থেকে তিনদিন দিনাজপুরে শীতের তীব্রতা থাকবে।  পাশাপাশি ঘন কুয়াশা ও শীতল বাতাস বয়ে যাবে।
 
সন্ধ্যার পর থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত ঘন কুয়াশা ঝরছে টিপ টিপ করে। কুয়াশার কারণে সড়ক-মহাসড়কে যানবাহনগুলো দিনের বেলায়ও হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করছে। পাশাপাশি ট্রেনগুলো অত্যন্ত ধীরগতিতে চলাচল করছে। সন্ধ্যার পর সাধারণ মানুষ নেহায়েত গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছাড়া ঘর থেকে বেরুচ্ছেন না। দিনের বেলায় সূর্য কিছু সময়ের জন্য দেখা গেলেও তা যেন মোটেও উত্তাপ ছড়াতে পারছে না। তীব্র শীতের কারণে দরিদ্র মানুষ কাজে যেতে না পেরে অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছে। নিম্ন ও মধ্য আয়ের লোকজন দারুণ অসহায় হয়ে পড়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বোরো ধানের বীজতলা, আলুসহ বিভিন্ন ফসলের। ছত্রাক জাতীয় রোগ দেখা দিয়েছে। প্রচণ্ড শীতের কারণে দেখা দিয়েছে বিভিন্ন শীতজনিত রোগ বালাই। হাসপাতালে বেড়েছে নিউমোনিয়া, ডায়েরিয়া, আমাশয়. হাঁপানি পেটের পীড়াসহ বিভিন্ন রোগীর সংখ্যা।
 
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী মঙ্গলবার অবধি শীতের তীব্রতা কমবে না। তাপমাত্রা ক্রমশ হ্রাস পাবে। এ সময় রাতের তাপমাত্রা ১ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলিসিয়াস নেমে যাবে। এ মাসেই তিনটি শৈত্যপ্রবাহের আশঙ্কা আছে। জানুয়ারিতে দেশের উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলে একটি মাঝারি (৬ ডিগ্রি-৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস), একটি তীব্র (৪ ডিগ্রি-৬ ডিগ্রি সে.) ধরনের শৈত্য প্রবাহ, অন্যত্র দুই থেকে তিনটি মৃদু (৮ ডিগ্রি ১০ ডিগ্রি সে.) বা মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে।
 
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক ও বিশেষজ্ঞ কমিটির চেয়ারম্যান সামছুদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, উপমহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়ের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ এবং তৎসংলগ্ন এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে। ফলে অস্থায়ীভাবে আকাশ মেঘলা থাকছে। উঁকি দিতে পারছে না সূর্য। ঘন কুয়াশায় দৃশ্যমানতা নেমে এসেছে ৫০ মিটারে। বিমান, নৌ পরিষেবা ব্যাহত হচ্ছে। শক্তিশালী ঝঞ্চার হাত ধরে এক দফা বৃষ্টি হয়ে গেলে কুয়াশা এত ঘন হতে পারত না।
 
আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ বজলুর রশিদ বলেন, যশোরে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রীর নিচে নামলে শৈত্যপ্রবাহ বলে গণ্যকরা হয়। আর সে হিসেবে মাঝারী থেকে তীব্র শৈত্য প্রবাহ চলছে বিভিন্ন জেলায়। শুক্রবার দেশের অন্তত ২০টি জেলায় তাপমাত্রা ছিলো ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নীচে।
 
আবহাওয়া বিজ্ঞানী রাশেদ চৌধুরী বলেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রার বৃদ্ধির দীর্ঘ মেয়াদী গড় থেকে বর্তমান সময়ের শীত হ্রাস পাচ্ছে এটা ঠিক। তবে শীতকালীন ‘লা নিনার’ কারণে এবার বাংলাদেশের কোথাও কোথাও কিছুদিন কিছুটা বেশি মাত্রায় ঠাণ্ডাও পড়তে পারে। এবারকার ঠাণ্ডাটা অন্যান্য বছরের চেয়ে একটু বেশি ব্যতিক্রম। আমাদের দেশে মুলত: ডিসেম্বর থেকে ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা পড়তে শুরু করে। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে মৃদু থেকে মাঝারী শৈত্যপ্রবাহ শুরু করে আবার কিছুদিন পর তা হ্রাস পেয়ে গেছে এমন উদাহরণ রয়েছে। কিন্তু এবার পুরো ডিসেম্বরের মাসে ঠাণ্ডা ছিল খুবই সহনীয় মাত্রায়। ডিসেম্বর মাস পেরিয়ে গেলেও ঠাণ্ডা না পড়ায় অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন যে শীত পড়বে না, সহনীয় মাত্রার ঠাণ্ডায় কেটে যাবে এবারের শীতকালটা। হঠাৎ অতিমাত্রায় শীত পড়ায় অনেকেই বিস্মিতও হয়েছেন।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন