শিরোনাম :

মানবঢলের আশঙ্কায় মিয়ানমার সীমান্ত বন্ধ


বৃহস্পতিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৯:০৪ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

মানবঢলের আশঙ্কায় মিয়ানমার সীমান্ত বন্ধ

ঢাকা: রাখাইন থেকে ফের মানবঢলের আশঙ্কায় মিয়ানমার সীমান্ত বন্ধ (সিলগালা) করে দিয়েছে বাংলাদেশ। বুধবার জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর বিশেষ দূত অ্যাঞ্জেলিনা জোলি ও জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমার বিষয়ক দূত ক্রিস্টিন এস বার্গনারের সঙ্গে পৃথক বৈঠক শেষে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে ওই সিদ্ধান্তের কথা জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। একাধিক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা অনেক দিন সীমান্ত খোলা রেখেছি। মানবিক কারণে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছি। এখন আমরা মিয়ানমারকে বলেছি নতুন করে আর কাউকে গ্রহণ করবো না। সীমান্ত সিল করা হয়েছে কি-না? জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, হ্যাঁ, আমরা সীমান্ত মোটামুটি সিল করে রেখেছি।

জোলির মতো কোনো আন্তর্জাতিক সেলিব্রেটি বা বিশ্ব সম্প্রদায় যদি ফের সীমান্ত খোলার অনুরোধ করে তখন বাংলাদেশ কি করবে? এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শুনেন, আমরা যথেষ্ট লোকের জন্য বর্ডার খুলেছি। এবার অন্যদের বর্ডার খুললে ভালো।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, খবর পাওয়া যাচ্ছে মিয়ানমারে নতুন করে সহিংসতা শুরু হয়েছে। সেখান থেকে রোহিঙ্গা মুসলিম ছাড়াও বৌদ্ধ, হিন্দুসহ বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী ও ধর্ম-বিশ্বাসীরা নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। মিয়ানমার আমাদের বলেছে রাখাইন (আরাকান) আর্মি এবং মিয়ানমার আর্মির মধ্যে সংঘাত চলছে। বিভিন্ন সমপ্রদায়ের লোকজন প্রাণভয়ে পালাচ্ছেন। এরা বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছে। আমরা বলেছি কাউকে নেবো না।

ঢাকার আশঙ্কা, রাষ্ট্রদূতকে তলব, প্রতিবাদ: এদিকে রাখাইনে সামপ্রতিক সংঘর্ষে শতাধিক রাখাইন ও খুমিন সম্প্রদায়ের লোকজন প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বান্দরবানের দুর্গম সীমান্তবর্তী চাইক্ষ্যং পাড়াতে আশ্রয় নিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, বৌদ্ধ ও উপজাতিদের তাড়িয়ে দিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করাসহ গোটা ইস্যুকে ভিন্নখাতে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পিত যড়যন্ত্রে মেতেছে মিয়ানমার। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী জাতি-গোষ্ঠীর লোকজনের ওপর পরিকল্পিতভাবে নির্যাতন করছে। নির্যাতিতরা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করছে।

সংখ্যায় অল্প হলেও অনেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। কয়েকটি দলের অনুপ্রবেশ ঠেকানো গেছে। তবে প্রত্যাখ্যাতরা সীমান্তে কাছাকাছি অবস্থান করছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার ঢাকার মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত উ লুইন ও কে জরুরি তলব করা হয় এবং ঢাকার পক্ষ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং অনুপ্রবেশ চেষ্টার কড়া প্রতিবাদ জানানো হয়। মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অনু বিভাগের মহাপরিচালক মো. দেলোয়ার হোসেন মিয়ানমার দূতের সঙ্গে কথা বলেন এবং এ নিয়ে ঢাকার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবং ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে এমন ঘটনা ঠেকাতে এখনই পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান। সীমান্ত পরিস্থিতির বিস্তারিত তুলে ধরে রাষ্ট্রদূতের হাতে একটি প্রটেস্ট নোট বা প্রতিবাদপত্রও ধরিয়ে দেয়া হয়। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, আমাদের আশঙ্কার বিষয়টি তাদের জানিয়েছি। রাষ্ট্রদূতকে ডাকা হয়েছিল। তাকে বলা হয়েছে- আমাদের কাছে তথ্য আছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বৌদ্ধ, খুমিন ও অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীর লোকজন বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। আরো কিছু লোক সীমান্তে অবস্থান করছে প্রবেশের জন্য। যারা সীমান্ত পাড়ি দিয়েছে তারা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে না গিয়ে বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নিচ্ছে।

রাখাইনে গত জানুয়ারিতে বৌদ্ধ বিদ্রোহীদের হামলা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ৭ জন নিহত হয় বলে রিপোর্ট করে বিবিসি। সেই সময়ে সামরিক বাহিনী ও সশস্ত্র বিদ্রোহীদের বক্তব্য নিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এবং এএফপিও প্রতিবেদন প্রকাশ করে। উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে এমন একটি ঘটনার প্রেক্ষিতেই রাখাইনে সিদ্ধান্ত নিয়ে সাঁড়াশি সেনা অভিযান শুরু করেছিল সুচি সরকার। তাদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে (নিরাপত্তার অজুহাতে) রোহিঙ্গারা দলে দলে বাংলাদেশে ঢুকেছিল। দেড় বছরে একজন মিয়ানমার নাগরিককেও ফিরিয়ে নেয়নি সুচি সরকার। এ অবস্থায় বাংলাদেশ এখন ১০ লাখ রোহিঙ্গার বোঝা টানছে।

চীন-আসিয়ানের তত্ত্বাবধানের রাখাইনে সেফ জোনের প্রস্তাব ঢাকার: রাখাইনে রোহিঙ্গাদের সেফ জোন করার যে প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী ২০১৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দিয়েছিলেন সেটি নিয়েও জাতিসংঘ দূতদ্বয়ের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমি বলেছি ওই প্রস্তাবটি এখনো কার্যকর করার সুযোগ আছে। মিয়ানমার চাইলে রাখাইনের অভ্যন্তরে (প্রস্তাবিত) সেফ জোনটি আসিয়ানের তত্ত্বাবধানে হতে পারে। সেখানে চীনও যুক্ত থাকতে পারে। চীন মিয়ানমারের বন্ধু। সুতরাং এটার একটা সম্ভাবনা আছে।

আমি তাদের বলেছি আপনারা এ নিয়ে কাজ করতে পারেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমি অ্যাঞ্জেলিনা জোলিকে বলেছি, যে বাংলাদেশ চায়, সব রোহিঙ্গা নিরাপদে তাদের আসল জায়গা রাখাইন রাজ্যে ফিরে যাক। যত দ্রুত সম্ভব এটি হবে ততই মঙ্গল। তা না হলে এখানে অনিশ্চয়তা বাড়বে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমি বলেছি রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়েরও দায়িত্ব রয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট জিইয়ে থাকলে বিশ্বের স্বার্থ বিঘ্নিত হবে, সবার জন্য অমঙ্গল হবে। সকলের স্থিতিশীলতার জন্য রোহিঙ্গা সংকট একটি হুমকি বলেও উল্লেখ করেন মন্ত্রী। তার মতে, অ্যাঞ্জেলিনা জোলি বিশ্বের ‘অন্যতম কণ্ঠস্বর’। তাকে (জোলি) বলা হয়েছে, বাংলাদেশ শান্তি চায়, রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়। মিয়ানমার বাংলাদেশের বন্ধুরাষ্ট্র।

বিশ্বের বিভিন্ন ফোরামে বাংলাদেশ মিয়ানমারকে সাপোর্ট করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কান্ট্রি স্প্যাসিফিক দেশটি যখন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছিল তখনো বাংলাদেশ তাদের সাপোর্ট করেছে। কিন্তু মিয়ানমার সেটার প্রতিদান বা বিনিময় তো দেয়নি বরং রোহিঙ্গা সংকট সৃষ্টি করে বাংলাদেশকে কষ্টের মধ্যে রেখেছে। মন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারের আচরণে অনেকে হতাশ। বাংলাদেশেও এ হতাশা আছে। তবে আমি আশাবাদী মিয়ানমারের শুভবৃদ্ধির উদয় হবে এবং রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে দেশটি এগিয়ে আসবে। মন্ত্রী বলেন, জোলি বা জাতিসংঘের অন্য বন্ধুরা রোহিঙ্গাদের জন্য তহবিল সংগ্রহে এবং সংকটের সমাধানে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করতে পারেন। সোমবার বাংলাদেশ সফরে আসা অ্যাঞ্জেলিনা জোলি দুদিন রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকা কক্সবাজারে কাটিয়ে বুধবার ঢাকায় ফিরেন। পৌনে ১টার দিকে তিনি সেগুনবাগিচায় পৌঁছান। প্রথমে পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হকসহ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এ সময় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমও উপস্থিত ছিলেন।

ক্যাম্প থেকে ২ লাখ রোহিঙ্গার নিখোঁজের তথ্য নেই: পররাষ্ট্রমন্ত্রী: ওদিকে সমপ্রতি ক্যাম্প থেকে ২ লাখ রোহিঙ্গা নিখোঁজ মর্মে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে যে রিপোর্ট হয়েছে সে বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, না, এমন তথ্য তার কাছে নেই। এত বড় ঘটনা ঘটলো আমরা জানলাম না!

মিয়ানমারের ১৬০ শরণার্থী এখন বান্দরবানে
রুমা উপজেলার রেমাক্রি প্রাংনসা সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমারের ৩৫টি পরিবারের ১৬০ শরণার্থী বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছেন। তারা সহায়তার জন্য বার্মিজ ভাষায় আহ্বান জানাচ্ছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কমিউনিটি লিডাররা এ তথ্য জানিয়েছেন। সূত্র জানায়, মিয়ানমারের চিন রাজ্যের এসব শরণার্থী শনিবার রেমাক্রি প্রাংনসা ইউনিয়নের চাইক্ষাং সীমান্তের শূন্য রেখায় অবস্থান নেয়ার পর মঙ্গলবার বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। অনুপ্রবেশকারীরা চাইক্ষাং পাড়ার আশপাশে খোলা জায়গায় ত্রিপল টানিয়ে বাস করছেন। তীব্র শীতের মধ্যে শিশু ও বৃদ্ধরা দুর্ভোগে রয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দরা তাদের খাবার দিয়ে সহায়তা করছে বলেও খবর বেরিয়েছে। গোটা পরিস্থিতি বাংলাদেশের সামরিক বেসামরিক কর্মকর্তারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। এ ছাড়া সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে বলেও বিজিবি সূত্রে খবর বেরিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, শরণার্থীরা বার্মিজ ভাষায় তাদের মানবিক সহায়তা দেয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছেন। তারা বেগুন, পাহাড়ি লতাপাতা, কলার মোচা ইত্যাদি খেয়ে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করছেন বলে জানান। আরো বেশকিছু শরণার্থী সীমান্ত পথে রয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

রুমা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামসুল আলম বলেন, শরণার্থীদের বান্দরবানে প্রবেশের খবর তিনি জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে জেনেছেন। বিষয়টি নিশ্চিত এবং প্রয়োজনীয় তদন্ত করতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। গত মাস থেকে মিয়ানমারের রাখাইন ও চিন রাজ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আরাকান আর্মির সঙ্গে সেনাবাহিনীর ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয়। এ ঘটনায় খুমি, খেয়াং, বম ও রাখাইন বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের অনেক মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করে বান্দরবান দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে মর্মে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন