শিরোনাম :

ঘূর্ণিঝড় ফণী: দেশজুড়ে যা ঘটলো


রবিবার, ৫ মে ২০১৯, ১০:১৭ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

ঘূর্ণিঝড় ফণী: দেশজুড়ে যা ঘটলো

ডেস্ক, ০৫ মে(বাংলাপ্রেস): শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ফণী দুর্বল হয়ে গতকাল শনিবার বাংলাদেশে আঘাত হানে। এর প্রভাবে দিনভর দেশজুড়ে ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে জনজীবন। গত ২৪ ঘন্টায় ঘরচাপা পড়ে, গাছ ভেঙে ও পানিতে ডুবে কমপক্ষে ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিহতদের অধিকাংশই শিশু ও নারী।

ফণীর প্রভাবে নদ-নদীর পানি বেড়ে পুরনো ও দুর্বল বাঁধের কোথাও কোথাও ভেঙে প্লাবিত হয় অর্ধশতাধিক গ্রাম। পানিবন্দি হয়ে পড়ে লাখো মানুষ। ভেসে যায় অনেক পুকুর ও ঘেরের মাছ। এসময় বিধ্বস্ত হয় কয়েক হাজার ঘরবাড়ি। উপড়ে পড়ে গাছপালা, বৈদ্যুতিক খুঁটি। বিদ্যুবিহীন হয়ে পড়ে অনেক এলাকা। বন্ধ হয়ে যায় নৌযান চলাচল। বিঘ্নিত হয় বিমান ও ট্রেনের শিডিউল।

ঘূর্ণিঝড়টি বাংলাদেশ অতিক্রম কালে বোরো, সয়াবিন, আম, কলাসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেক জায়গায় বাঁধে ধস শুরু হওয়ায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে লোকালয়ে। উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার মধ্যে দিন কাটান আশ্রয় কেন্দ্রে থাকা লোকজন। 

বরগুণা: ঝড়বৃষ্টি চলাকালে শুক্রবার রাত তিনটার দিকে বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার বলেশ্বর নদীর তীরে দক্ষিণচরদোয়ানী গ্রামে গাছ উপড়ে ঘরের উপর পড়ে একই পরিবারের দাদী ও নাতি নিহত এবং তিনজন আহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন: জেলে আব্দুল বারেক ওরফে বাদা বারেকের স্ত্রী নুরজাহান বেগম (৫৫) ও নাতি জাহিদুল (১৩)। ইব্রাহিমের ছেলে জাহিদুল স্থানীয় খলিফার হাট বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির ছাত্র।

সিরাজগঞ্জ: জেলার কাজিপুরে ঝড়ের সময় গাছের নিচে চাপা পড়ে দাদা ও নাতনির মৃত্যু হয়েছে। এসময় আহত হয়েছেন আরো ৮ জন। শনিবার বিকেল ৩টার দিকে উপজেলার ভানুডাঙ্গা হাটে এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন: স্থানীয় মুকুল হোসেনের পিতা ইসমাইল হোসেন (৫৫) ও মেয়ে বিথি খাতুন (৮)।

সাতক্ষীরা: জেলার উপকুলীয় অঞ্চলের প্রায় ৬শ কাঁচা ঘর-বাড়ি আংশিক বিধ্বস্ত হয়েছে। এছাড়া ২ হাজার হেক্টর ফসলি জমি এবং শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার প্রায় ৫ কিলোমিটার বেঁড়িবাধের আংশিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। ঝড় আতঙ্কে শ্যামগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের গাইনবাড়ি আশ্রয় কেন্দ্রে আয়না মতি বিবি (৯২) নামের এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। তিনি ওই গ্রামের মৃত কওছার আলীর স্ত্রী।

নোয়াখালী:শুক্রবার রাতে ঘর চাপা পড়ে সুবর্ণচর উপজেলার চর ওয়াপদা ইউনিয়নের চর আমিনুল হক গ্রামের আবদুর রহমানের ছেলে মো. ইসমাইল (২) মারা গেছে। ঝড়ের তান্ডবে জেলায় সাত শতাধিক কাঁচা বাড়িঘর বিধস্ত হয় এবং কয়েকশ গাছপালা ভেঙে ও উপড়ে পড়ে। হাতিয়া উপজেলার বিচ্ছিন্ন ইউনিয়ন নিঝুমদ্বীপের ব্যাপক এলাকা জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায়।

ভোলা: দ্বীপজেলায় দু’শতাধিক ঘরবাড়ি বিধস্ত হয়েছে। জোয়ারে জেলার নিম্নাঞ্চল ২/৩ ফুট পানিতে তলিয়ে গেছে। শনিবার সকালে ভোলা সদরের দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নে ঘরচাপা পড়ে রানী বেগম (৪৫) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। নিহত রানী ওই এলাকার সামসুল হকের স্ত্রী। সকালে লালমোহনের কচুয়াখালী চর থেকে নিকটবর্তী আশ য় কেন্দে যাওয়ার পথে একটি ট লার ডুবে গেছে। এতে পাঁচজন আহত হন।

লক্ষ্মীপুর:প্রচন্ড ঝড়ে রামগতি উপজেলায় ঘর চাপা পড়ে আনোয়ারা খাতুন (৭৫) নামে এক বৃদ্ধা নিহত হয়েছেন। শনিবার ভোরে চরআলগি ইউনিয়নের রব রোড এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এছাড়া আহত হয়েছেন আরো প্রায় ২০জন। ফণীর আঘাতে উপজেলার প্রায় পাঁচ শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে বহু গাছপালা ভেঙে পড়েছে, পাকা সয়াবিন ও ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কমলনগর উপজেলার মাতাব্বরহাট এলাকায় নদীর তীর রক্ষা বেড়িবাঁধের প্রায় ১শ মিটার নদীতে ধসে পড়েছে।

পটুয়াখালী:জেলার কলাপাড়ায় মনসাতলীতে শুক্রবার দুপুরে ঝড় চলাকালে গাছের ডাল ভেঙে পড়ে মোটরসাইকেল আরোহী হারুন মুসুল্লীর ছেলে হাবিব মুসুল্লী মারা গেছেন। জেলার ৮টি উপজেলায় ২ হাজার ৯২টি ঘরবাড়ির আংশিক ও ৬ হাজার ১৮ একর জমির মুগডাল, বাদাম ও ধান ফসলের ক্ষতি হয়েছে। বিধ্বস্ত হয়েছে উপকূলীয় এলাকার ১০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ।

কাউখালী (পিরোজপুর): শনিবার দুপুরে হঠাত্ জোয়ারের পানিতে বাড়ির পাশের ডোবা ভরে গেলে পানিতে ডুবে মোরসালিন খান (৪) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সে উপজেলার সয়না রঘুনাথপুর ইউনিয়নের বেতকা গ্রামের নুরুজ্জামান খানের ছেলে। এছাড়া জোয়ারের পানিতে উপজেলার ১৫টি গ্রামের নিন্মাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

রাজশাহী: ফণীর প্রভাবে রাজশাহীতে ভেঙে পড়েছে বিমানের শিডিউল। এ কারণে শনিবার যথাসময়ে হযরত শাহমখদুম (র) বিমানবন্দর থেকে বিমান উড়তে পারেনি। অন্যদিকে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশন থেকেও বিভিন্ন রুটের আন্তঃনগর ট্রেন ছেড়ে গেছে নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে। এতে যাত্রীরা পড়েন দুর্ভোগে।

বরিশাল:ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলায় প্রায় ১৫শ’ বাড়ি-ঘর ক্ষতিগ্রস্তসহ বিপুল পরিমাণ জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। জেলায় বোরো ধান, মুগডাল, মরিচ, তিল, সয়াবিন, শাকসবজিসহ প্রায় ৯ হাজার হেক্টর ফস?লি জ?মির ক্ষ?তি হয়েছে। জেলায় সকল প্রকার নৌ-যান চলাচল বন্ধ ছিল।

ঝালকাঠি: সুগন্ধা ও বিষখালী নদীতে স্বাভাবিকের চেয়ে তিন-চার ফুট পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। কাঁঠালিয়া ও রাজাপুরে বিষখালী নদীর বেড়িবাঁধের বিভিন্ন স্থান ভেঙে অন্তত ২০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

মনপুরা (ভোলা) :ফণীর তান্ডবে উপজেলার ৪ টি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক বাড়ি-ঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিধ্বস্ত হয়েছে। হাজিরহাট ইউনিয়নে নতুন বেড়িবাঁধ ভেঙে সোনারচর, দাসেরহাট ও মনপুরা ইউনিয়নের ঈশ্বরগঞ্জ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। চর নিজামে শতাধিক গবাদি পশুর মৃত্যু হয়েছে।

মোংলা (বাগেরহাট): পানির চাপে ভেঙে গেছে পশুর নদীর কানাইনগরের ছয় হাজার ফুট দীর্ঘ বেড়িবাঁধ। বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য ছোট বাড়িঘর বিধ্বস্ত হওয়াসহ বহু গাছপালা উপড়ে গেছে। বিপদ সংকেত নামিয়ে হুঁশিয়ারী সংকেত দেওয়া হলেও বন্দরে অবস্থানরত জাহাজে ও জেটিতে পণ্য বোঝাই খালাস কাজ গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত শুরু করা যায়নি। কয়েকটি ছোট ছোট নৌযান ডুবির খবর জানা গেছে।

শরণখোলা (বাগেরহাট): বলেশ্বর নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে দুই থেকে তিন ফুট বৃদ্ধি পেয়ে বগী ও দক্ষিণ সাউথখালী গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পাঁচ শতাধিক পরিবারের রান্নাবান্না বন্ধ হয়ে গেছে।

শ্যামনগর (সাতক্ষীরা):উপজেলার দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরা, পদ্মপুকুর ও মুন্সিগঞ্জে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধে ভয়াবহ ভাঙন ধরেছে। এতে এলাকার মানুষের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে বাঁধ সংস্কারের কাজ শুরু করেছেন স্থানীয়রা।

পিরোজপুর: নদ-নদীতে পানি বেড়ে যাওয়ায় জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলায় বলেশ্বর নদের তীরে দুটি জায়গায় ৫শ মিটার পুরানো বেড়িবাঁধ ভেঙে অনেক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া মঠবাড়িয়ার খেতাচিড়া গ্রামে শতাধিক কাঁচাঘর বিধ্বস্ত হয়েছে।

আমতলী (বরগুনা): উপজেলার ২শ ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। জোয়ারের পানিতে নিম্নাঞ্চল ও পায়রা নদী সংলগ্ন ১৩ টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে ।

দুমকি (পটুয়াখালী): উপজেলায় পায়রা নদীর স্রোতের তোড়ে পাউবোর ওয়াপদা বেড়িবাঁধ ভেঙে উত্তর পাঙ্গাশিয়া, মধ্য পাঙ্গাশিয়া ও দক্ষিণ পাঙ্গাশিয়া গ্রামের মাঠ, ঘাট ও ফসলী জমি প্লাবিত হয়েছে।

চাঁদপুর: কচুয়া, মতলব উত্তর উপজেলাসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে শতাধিক ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে উপড়ে গেছে এলাকার অসংখ্য গাছপালা।

ফেনী: প্রচন্ড ঝড়ো বাতাসে সোনাগাজী উপকূলীয় এলাকার ৭৪ টির বেশি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জোয়ারের পানিতে নিম্নাঞ্চল ৩/৪ ফুট পানিতে তলিয়ে গেছে।

রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী): জোয়ারের তোড়ে ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি ঢুকে উপজেলার চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নের মধ্য চালিতাবুনিয়া, বিবির হাওলা, গরুভাঙা ও চরমোন্তাজ ইউনিয়নের চরআন্ডা গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

হোমনা (কুমিল্লা): ঝড়-তুফানে উপজেলার বিভিন্ন জমির পাকা ইরি-বোরো ধান ও গাছের আমের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন নদীর পানি বেড়ে নদী তীরবর্তী ফসলি জমি তলিয়ে গেছে।

রাজবাড়ী:দৌলতদিয়া-মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া নৌ-রুটের ফেরিসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল গত শুক্রবার দুপুর ২ টা থেকে শনিবার বিকাল ৫টা পর্যন্ত প্রায় ২৮ ঘন্টা বন্ধ ছিল। এতে নদীর দু’পাড়ে আটকে পড়ে প্রায় সহস্রাধিক যানবাহন।

শরীয়তপুর :জেলায় সড়ক ও নৌ যোগাযোগ বন্ধ ছিল। এতে আলুর বাজার ফেরিঘাটে চার শতাধিক পণ্যবাহী ট্রাক আটকা পড়ে। শুক্রবার রাত ৯টা থেকে জেলার সকল এলাকার বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ ছিল।

নেত্রকোনা: জেলা ১০ ঘন্টা ছিল বিদ্যুিবহীন। এতে পানি সরবরাহ বন্ধ থাকে। জনগণ চরম দুর্ভোগে পড়েন।

গাজীপুর: জেলা পুলিশ লাইনের সামনে পল্লী বিদ্যুতের ১৫টি বৈদ্যুতিক খুঁটি সড়কে হেলে পড়েছে । এতে ঢাকা-গাজীপুর সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়।

ভান্ডারিয়া (পিরোজপুর):ঝড় থেকে রক্ষা পেতে উপজেলার কচাঁ নদী লাগোয়া ১৯নং চরখালী সরকারি প্রাথমিক প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন শেল্টারে আশ্রয় নিয়ে রাতযাপন করেছেন নবদম্পতি এবং তাদের সঙ্গে থাকা ৬০জন বরযাত্রীসহ স্থানীয় দুই থেকে আড়াইশ মানুষ। খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা চেয়ারম্যান মিরাজুল ইসলাম মিরাজ আশ্রিতদের মাঝে শুকনা খাবার ও পানি বিতরণ করেন। ঝড়ে উপজেলায় কলা বাগান, পেপে, পান বরজসহ মৌসুমী ফসলের অনেক ক্ষতি হয়েছে।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন