শিরোনাম :

মশা মারার ৫০ কোটি টাকাই লোকসান


বৃহস্পতিবার, ১ আগস্ট ২০১৯, ০৮:০১ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

মশা মারার ৫০ কোটি টাকাই লোকসান

ঢাকা: মশার ওষুধ অকার্যকর জেনেও রাজধানীর মশা নিধনের জন্য ৫০ কোটি টাকা খরচ করেছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। এর মধ্যে দক্ষিণ সিটিতে খরচ হয়েছে সাড়ে ২৮ কোটি টাকা ও উত্তর সিটি করপোরেশন খরচ করেছে ২৩ কোটি টাকা। মশার ওষুধ কেনা-কাটা, মশা নিধনের যন্ত্রপাতি ফগার/হুইল/স্প্রে মেশিন ক্রয়, মেশিন পরিবহন এবং কচুরিপানা-আগাছা পরিষ্কারের নামে এসব টাকা খরচ করা হয়েছে।

মশা মারার এসব আয়োজন সবই গেছে জলে। গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর ডেঙ্গু ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশার ওষুধ ওকার্যকর এটা জেনেশুনে এ খাতে খরচ করা মানে জনগণের ট্যাক্সের টাকা জলে ফেলা। এ খাতে দুর্নীতি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়ার মতো না।

দুই সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মশা নিধন খাতে ২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করে। অন্যদিকে উত্তর সিটি করেছে ২১ কোটি টাকা। দক্ষিণ সিটি ২৬ কোটি টাকার মধ্যে ২৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল ওষুধ কেনার জন্য। এছাড়া মশা মারার যন্ত্র ও পরিবহনে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ কোটি টাকা। কচুরিপানা-আগাছা পরিষ্কারে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩০ লাখ টাকা। এছাড়া সিটি করপোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে আড়াই কোটি টাকার মশা নিধনের যন্ত্রপাতি কিনেছে সংস্থাটি। অন্যদিকে উত্তর সিটির ২১ কোটি টাকার মধ্যে ওষুধ কেনার জন্য বরাদ্দ ছিল ১৮ কোটি টাকা। মশা নিধনের যন্ত্রপাতি ক্রয় করা হয়েছে ২ কোটি টাকার। মেশিন পরিবহনে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ কোটি টাকা এবং কচুরিপানা-আগাছা পরিষ্কারে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে দক্ষিণ সিটি ২৮ কোটি টাকা এবং উত্তর সিটিতেও এ খাতে গত বছরের চেয়ে কয়েক কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা করেছিল।

আন্তর্জাতিক উদারাময় গবেষণা কেন্দ্র আইসিডিডিআরবি’র এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচলিত কীটনাশক দিয়ে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির এডিস মশা মরছে না। বিজ্ঞানী ও গবেষকরা ওই গবেষণার ফলাফল ১৪ মাস আগে জানালেও আমলে নেয়নি সিটি করপোরেশন। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৮ সালের মে পর্যন্ত রাজধানীর আটটি এলাকায় অ্যাডিস মশা নিয়ে গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, ঢাকা শহরের অ্যাডিস মশা ওষুধ প্রতিরোধী। বর্তমান ওষুধে মশা মরে না।

শুরু থেকেই দুই সিটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গবেষণার বিষয়ে অবহিত করা হয়েছিল এবং গবেষণার ফলাফল সম্পর্কেও দুই সিটি করপোরেশন অবহিত। তবে সব জেনেও কর্তৃপক্ষ মশা মারার ওষুধ পরিবর্তনে পদক্ষেপ নেয়নি। চলতি বছরের শুরুতেই অ্যাডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির শঙ্কা প্রকাশ করেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখা। গত মার্চ মাসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার আওতায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার ৯৭টি ওয়ার্ডের ১০০টি স্থানের ৯৯৮টি বাড়ি পরিদর্শন করে নমুনা সংগ্রহ করে এবং ১০ দিনব্যাপী জরিপ চালানো হয়। ওই জরিপে ডিএসসিসির ৮০ নম্বর ওয়ার্ডে অ্যাডিস মশার লার্ভার ঘনত্বের সূচক বা বিআই সবচেয়ে বেশি—৮০ শতাংশ পাওয়া গিয়েছিল। হাতিরঝিল এলাকার দুই পাশে দুই সিটি করপোরেশনেরই কয়েকটি ওয়ার্ডে অ্যাডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব বেশি পাওয়ার কথা জানিয়েছিল রোগনিয়ন্ত্রণ শাখা। বর্ষায় অ্যাডিস মশার উপদ্রব বাড়তে পারে বলেও তখন সতর্ক করেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সেই শঙ্কার বাস্তব রূপ নিয়েছে জুনের শুরুতেই। চলতি বছরের এপ্রিলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন সভাকক্ষে দুটি গবেষণা ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। আইসিডিডিআরবি, সিডিসির বিজ্ঞানী ও গবেষক ছাড়াও সভায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র সাঈদ খোকন বরাবরই মশার ওষুধ অকার্যকরের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ওষুধের কার্যকারিতা শতভাগ না হলেও ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ কার্যকারিতা আছে। স্থান, কাল, পাত্রের ওপর এর কার্যকারিতা নির্ভর করে। পুরান ঢাকায় ওষুধ যেভাবে কাজ করবে, নতুন ঢাকায় সেভাবে কাজ না-ও করতে পারে।

সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে মশার নতুন ওষুধ কেনার নির্দেশনা দেওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে দুই সিটি করপোরেশন। নতুন ওষুধ কেনার প্রক্রিয়া চলছে। যত দ্রুত সম্ভব নতুন ওষুধ আমদানি করা হবে বলে জানিয়েছেন সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, সরকারি সংস্থার গবেষণায় সিটি করপোরেশনের মশা নিধনের ওষুধ যে অকার্যকর তা প্রমাণিত। তারপরও এই অকার্যকর ওষুধ কিনে আসলে জনগণের ট্যাক্সের টাকা জলে ফেলা হয়েছে।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন