শিরোনাম :

মেট্রোরেলে ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ


বৃহস্পতিবার, ৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ১১:২১ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

মেট্রোরেলে ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ

ঢাকা: নতুন এই প্রকল্পের ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ ধরা হয়েছে। চলতি বছরে মেট্রোরেলের নতুন দুটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।

চলমান মেট্রোরেল লাইন-৬ এ ২০.১০ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ২২ হাজার কোটি টাকা। সেখানে মেট্রো-১ ও ৫ লাইনে মোট ৬৮.৬৪১ কিলোমিটারের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকা। এই প্রকল্প এরই মধ্যে অনুমোদন হয়েছে একনেকে। মেট্রোরেল লাইন-৬ প্রকল্প থেকে প্রতি কিলোমিটারে দ্বিগুণ খরচ হবে লাইন-৫ প্রকল্প বাস্তবায়নে। আর লাইন-১ বাস্তবায়নে কিলোমিটারে খরচ হচ্ছে ১ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। প্রকল্প ব্যয় নিয়ে ইতোমধ্যে দেখা দিয়েছে বিতর্ক।

প্রকল্প দুটির আওতায় বিমানবন্দর-কমলাপুর স্টেশন ও নতুনবাজার-পূর্বাচল ডিপো এবং হেমায়েতপুর-ভাটারা পথে দুটি ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন স্থাপন করা হবে। দেশের ইতিহাসে অন্যতম ব্যয়বহুল এ প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রকল্পে যে ব্যয় ধরা হয়েছে তা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। ভারত ও ইন্দোনেশিয়াতে এ ধরনের প্রকল্পে খরচ আরও অনেক কম। এ নিয়ে দরকষাকষির পরামর্শ দিয়েছেন তারা। নির্মাণকাজ এগিয়ে চলা মেট্রোরেলের প্রকল্প ব্যয় নিয়েও এর আগেও প্রশ্ন ওঠেছিল। এক স্টাডিতে দেখা যায়, ভারতের প্রায় দ্বিগুণ ব্যয়ে মেট্রোরেল নির্মাণ হচ্ছে।

এমআরটি-১ এর প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। এর আওতায় বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর স্টেশন এবং নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল ডিপো পর্যন্ত ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার এমআরটি লাইন নির্মাণ করা হবে। আরেকটি মেট্রোরেল হবে সাভারের হেমায়েতপুর থেকে আমিনবাজার, গাবতলী, মিরপুর-১, কচুক্ষেত, বনানী, গুলশান-২, নতুনবাজার হয়ে ভাটারা পর্যন্ত। এর দৈর্ঘ্য ২০ কিলোমিটার। এই রুটটি এমআরটি-৫ নামে পরিচিত হবে। এর প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা। এমআরটি-১ এর ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকার মধ্যে জাপান দেবে ৩৯ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। বাকি টাকা সরকার দেবে। এমআরটি-৫ প্রকল্পের ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকার মধ্যে ২৯ হাজার ১১৭ কোটি টাকা দেবে জাপান। বাকিটা সরকার দেবে।

এদিকে এমআরটি লাইন-১ ও ৫ এ যে ব্যয় ধরা হয়েছে তা নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, আমাদের প্রকল্প খরচ প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। এটা বেশি হওয়ার কারণ হচ্ছে জি টু জি (সরকার টু সরকার) ফ্রেমওয়ার্ক। বিভিন্ন ঋণদাতা কোম্পানির কঠিন শর্ত এজন্য দায়ী। যেখানে এমন শর্ত থাকে সেখানে খুব সীমিত সংখ্যক বিডার (নিলাম কোম্পানি) প্রতিযোগিতা করতে পারে। এসব শর্তের ফলে যে সকল কোম্পানি কাজ পায় তারা মাত্রাতিরিক্ত মূল্য চায়। ফলে ন্যায্যমূল্যের থেকে বেশি টাকায় তারা কাজ পেয়ে যাচ্ছে। কারণ তারা ভালো করেই জানে এটা তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

তখন দেখা যায় ভালো প্রতিযোগিতা হয় না। আন্তর্জাতিক দরপত্র বিহীন এই জি টু জি প্রকল্প মূল্যায়ণ প্রক্রিয়া অনেকটা অস্বচ্ছ। সর্বোচ্চ কম্পিটিশন হওয়া মানে কম দামে অবকাঠামোর উন্নয়ন করতে পারা। এতে চেক এন্ড ব্যালেন্স তৈরি হবে। এখন যেহেতু ইন্টারনেটের যুগ কাজেই আমাদের সরকার চাইলেই মুহূর্তে জানতে পারে ভারতে প্রতি কিলোমিটার পাতালরেল নির্মাণে কত খরচ হচ্ছে। আমাদের এখানে ঋণ নেয়ার সময় সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সঙ্গে দরকষাকষি খুব একটা হয় না। ফলে ইন্টারন্যাশনাল টেন্ডারে ওপেন কম্পিটিশনে নিলাম কোম্পানি থাকে না। এখানে ছোট্ট একটি গ্রুপের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়। পাতালরেল কিন্তু রাস্তার তলা দিয়েই যায়। এক্ষেত্রে সরকারের উচিত বৈশ্বিক বাজারের প্রকল্প ব্যয় প্রক্রিয়া জেনে নেয়া। একই ঋণদাতার ফান্ডে এক দেশে কম খরচ আরেক দেশে বেশি কেন? তাহলে এর তফাৎটি আসলে কোথায়? এ বিষয়ে সরকারের ভাববার সময় এসেছে। আমাদের অক্ষমতার কারণে আমরা ঋণ নিয়ে দর কষাকষির সময় এই বিষয়গুলো দেখিনা।

কলকাতা যদি ৬৫ মিলিয়ন ডলারে পাতালরেল করতে পারে তাহলে আমাদের কেন দেড়’শ মিলিয়ন ডলার খরচ হবে? এর বাইরে আমাদের দেশে প্রকল্প খরচ এবং সময় বাড়ানোটা একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। আমরা সময়মত কাজ করতে না পারায় প্রতি কিলোমিটারে খরচ বেড়ে যায়। যেটা সরকারও দিতে বাধ্য হচ্ছে। এটা বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্বল দিক। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ভারত একটির পর একটি অবকাঠামো প্রকল্প কম খরচে করে যাচ্ছে সেখানে আমরা পারছি না। ফলে আন্তর্জাতিকভাবে একটি বিরাট ভুল ম্যাসেজ পৌঁছায় ‘টাইম ওভার রান, কস্ট ওভার রান’। অর্থাৎ বাংলাদেশে সময়মত কাজ হয় না। প্রকল্প খরচ বেড়ে যায়।

সাবেক বিদ্যুৎ-সচিব ড. মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, আমাদের দেশে মেট্রোরেল বা পাতাল রেলে খরচ বেশি হওয়ার কারণ কিন্তু ভিন্ন। এখানে যে কোনো প্রকল্প অনুমোদনের সময় প্রথমে কম মূল্য দেখানো হয়। এরপর প্রকল্প খরচ দফায় দফায় বাড়ানো হয়। এরফলে যারা প্রথম শ্রেণির বা বিশ্বখ্যাত কোম্পানি রয়েছে তারা কিন্তু আসে না। কারণ তারা এ বিষয়ে জানেন না। এবং তারা না আসাতে বিভিন্ন দেশের সেকেন্ড গ্রেড, থার্ড গ্রেড কোম্পানিগুলো এ প্রকল্পের কাজে আসে। এই কোম্পানিগুলো প্রকল্পের বিষয়ে খুব ভালো জানে না। এবং তাদের কনফিডেন্ট নেই। খরচ বাড়ার এটা একটি কারণ। এছাড়া আমাদের দেশে কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থাকে যারা এটা নিয়ন্ত্রণ করে। এসকল কারণেই ব্যয় বেশি হয়।

এটা যে শুধুমাত্র রেলের ক্ষেত্রে তা নয়। সব ধরনের নির্মাণ প্রকল্পের ক্ষেত্রে এটা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে প্রকল্পে প্রতিযোগিতার অভাব আছে। প্রকল্প নিয়ে যদি ওপেন কম্পিটিশন করা হয় এবং প্রসেস সম্পর্কে আস্থা বা কনফিডেন্ট থাকে তাহলে দেখা যাবে বাইরের দেশে উন্নত বা প্রথম শ্রেণির কোম্পানি নির্ধারিত দামে এবং নির্দিষ্ট সময়ে কাজটি করে দিবে। কিন্তু যখন এই প্রসেস সম্পর্কে সন্দেহ থাকে তখনই মূলত আমরা দ্বিতীয় এবং তৃত্বীয় শ্রেণির কোম্পানিকে কাজ দিয়ে থাকি। যারা সঠিক সময়ে কাজ বুঝিয়ে দিতে পারবে না। এবং তারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে খরচ বেশি দেখাবে। আমাদের দেশে প্রকল্প খরচ বেশি হওয়ার মূল কারণ প্রকল্প প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানা শোনা এবং আস্থা কম। এক্ষেত্রে দেখা যায় খুব নিম্নমানের কোম্পানিগুলো কাজ করে। চীনে এবং ভারতে বিশ্বখ্যাত প্রথম শ্রেণির কোম্পানি আছে। অথচ তারা কিন্তু এখানে আসে না। মেঘনা ঘাট এবং হরিপুরে দুটি পাওয়ার প্ল্যান্ট হয়েছে তখন আমরা ওয়ার্ল্ড ক্লাস কোম্পানি পেয়েছিলাম। তখন অনেক কম্পিটিশনের মধ্যে দিয়ে প্রথম শ্রেণির কোম্পানি কাজটি পেয়েছে। এবং নির্দিষ্ট সময় ও খরচে প্রকল্পটি শেষ করেছে। তারা কিন্তু প্রায় ৯০ ভাগ দক্ষ কোম্পানি। এসময় দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শ্রেণির কোম্পানিগুলো সুযোগ পায়নি। মোটা দাগে বলা যায় প্রকল্প সম্পর্কে আমাদের আস্থার অভাব আছে। কাজ শুরু হওয়ার একটি সঠিক খরচ তালিকা দেয়া হলে আমরা বিশ্বের শীর্ষ কোম্পানিগুলোকে পেতাম। প্রথমত, আমরা শুরুতেই একদম কম খরচ ধরি। ফলে ভালো কোম্পানি আসে না। দ্বিতীয়ত, দেরিতে কাজ সম্পন্ন হয়। ফলে দফায় দফায় সময় বাড়ানো হয়। আর দেরিতে কাজ হওয়া মানেই খরচ বেড়ে যাওয়া। এসময় কোম্পানি নতুন করে খরচের তালিকা দেয়।

স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, আমাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। আমাদের দেশে প্রকল্পের ফিনান্সিয়াল ভিজিবিলিটি করা আমাদের বড় প্রকল্পের জন্য আইন করে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। এগুলো না করে প্রকল্প করার কারণেই মূলত সংশয়গুলো তৈরি হয়। অর্থাৎ এখানে যদি ফিনান্সিয়াল ভিজিবিলিটি থাকতো তাহলে কোন খরচগুলো কিভাবে সেটা তুলনা করে সাশ্রয়ীমূল্যে প্রকল্প নিশ্চিত করা যেত। এক্ষেত্রে এনভায়রনমেন্ট, ইকুয়িটি, ইকোনমি তিনটি বিষয় মিলে সাশ্রয়ী মূল্যে করতে হবে। এখানে অপশনগুলো কি এবং তার মধ্যে এটা কেন গ্রহণযোগ্য এই গবেষণাগুলো থাকতে হবে।

প্রকল্পের ব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) খান মো. মিজানুল ইসলাম বলেন, এমআরটি লাইন-১ ও ৫ পাতাল রেল অর্থাৎ আন্ডারগ্রাউন্ডে তাই খরচটা একটু বেশি হবে। জাইকা বলেছে, আন্ডারগ্রাউন্ডে তিনগুন খরচ বেশি হবে। সেখান থেকে আমরা অনেক মিটিং, দরকষাকষি করে খরচ দ্বিগুণের কাছাকাছি নিয়ে এসেছি। এটা হচ্ছে সম্ভাব্য বরাদ্ধ। যখন আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হবে তখন জানা যাবে প্রকৃত খরচ কত। আমরা আশা করছি দর কষাকষির মাধ্যমে খরচ আরো কমবে।

প্রশ্ন ওঠেছিল আগেই: উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০.১ কিলোমিটার দীর্ঘ বাংলাদেশের প্রথম মেট্রো রেল প্রকল্পের কাজ চলছে। এটি প্রতি ঘন্টায় ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহনে সক্ষম হবে। এ প্রকল্পের ব্যয় নিয়েই আগেই প্রশ্ন ওঠেছিল। ঢাকা ট্রিবিউনের এক রিপোর্টে বলা হয়, ঢাকার এই মেট্রো রেলের যে নির্মাণ ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে তা প্রতিবেশি দেশ ভারতের দিল্লি কিংবা মুম্বাইয়ের মেট্রো রেলের তুলনায় দুইগুনেরও বেশি। সরকার পরিচালিত প্রতিষ্ঠান ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট কোমপানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) সমপ্রতি দুই দেশের মেট্রো রেলের ব্যয়ের একটি তুলনামূলক গবেষণা করেছে। ওই গবেষণাতেই উঠে আসে যে, বাংলাদেশে মেট্রো রেল নির্মানের ব্যয় ভারতের থেকে বেশি। গড়ে প্রতি কিলোমিটার মেট্রো রেল নির্মাণে ভারতে ব্যয় হয় ৫০ থেকে ৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সেখানে বাংলাদেশের প্রথম মেট্রো রেল নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে এই ব্যয় হচ্ছে ১৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ ২০.১ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রো রেল নির্মাণ করছে। ডিএমটিসিএলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এতে ব্যয় হবে ২.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ২২ হাজার কোটি টাকা। ভারতের শহর ব্যাঙ্গালোরে ২০১৪ সালে ৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রো রেলের নির্মাণ শুরু হয়। এই প্রকল্পে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৪.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থাৎ কিলোমিটার প্রতি ব্যয় ৬৫.৩ মার্কিন ডলার। এই প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ১৩.৭৯ কিলোমিটারের আন্ডারগ্রাউন্ড রাস্তা। মোট ৬১ স্টেশনের মধ্যে এক ডজন ষ্টেশন নির্মাণ করতে হবে মাটির নিচে।

আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেলের নির্মান ব্যয় সাধারণত রাস্তার ওপর দিয়ে বানানো মেট্রোর থেকে তিনগুন বেশি হয়। এ বছরের মধ্যেই প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। আরেক ভারতীয় শহর জয়পুরে ২০১৪ সালেই ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রো রেল নির্মিত হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছিলো ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থাৎ কিলোমিটার প্রতি ব্যয় ছিল মাত্র ৪১.৭ মিলিয়ন ডলার। এটিরও ২.৭৮ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি অংশ মাটির নিচ দিয়ে গিয়েছে। এছাড়া ১১ স্টেশনের তিনটিই ছিল মাটির নিচে।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন