শিরোনাম :

২৬২-তে ১৬ কোটির ভয় কেন এত?


শুক্রবার, ২২ জুলাই ২০১৬, ১২:৩৪ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

২৬২-তে ১৬ কোটির ভয় কেন এত?

গুলশান ও শোলাকিয়ায় হামলায় ঘরছাড়া তরুণদের জড়িত থাকার বিষয়টি প্রকাশের পর নিখোঁজদের অনুসন্ধানে যায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। তারই একটি প্রাথমিক ফলাফল জানা গেল। র‌্যাবের অনলাইন মিডিয়া সেলের ফেইসবুক পাতায় মঙ্গলবার রাত সোয়া ১১টার দিকে নিখোঁজ ২৬২জনের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এই সংখ্যা যে আরো বাড়বে এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। যতই বাড়ুক সেটা ১৬ কোটি বাঙালির কাছে একেবারেই নগণ্য। অথচ এই ক্ষুদ্র সংখ্যা নিয়ে পুরো জাতি আজ শঙ্কিত, উদ্বিগ্ন, আতঙ্কগ্রস্ত। এর কারণ জাতীয় ঐক্য বলে এখনো কিছু আমাদের মাঝে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ১৬ কোটি কেন এক কোটি মানুষও যদি জঙ্গিবাদ প্রতিহত করার জন্য সংকল্পবদ্ধ হয় তাহলেই আর জাতির ভয় পাওয়ার কিছু থাকে না। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল আমরা এখনো সন্ত্রাসবাদ প্রশ্নে সেইভাবে জাতীয় ঐক্যে পৌঁছাতে পারিনি। ইসলামী সন্ত্রাসবাদ আর দেশীয় বা অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয় নই। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক চক্র জড়িত। সেই চক্রের সঙ্গে গোপনে হাত মিলিয়েছে এদেশের কিছু সুবিধাবাদী বা বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষ। কাজেই ঘরে-বাইরের এই সংঘবদ্ধ চক্রকে মোকাবেলা করার জন্যে, তাদের সব প্রাণঘাতী পরিকল্পনা নস্যাৎ করা জন্য আমাদের জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। একাত্তরে যে ভাবে বাঙালি জাতি ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সেইভাবে আরো একবার সম্মিলিতভাবে এই অপশক্তির মোকাবেলা করতে হবে। এখনো জঙ্গিবাদ-বিরোধী যুদ্ধটা ততটা জটিল আকার ধারণ করেনি। কিন্তু সময় মতো এটা রুখে দিতে না পারলে এই যুদ্ধ মোকাবেলা করা মুশকিল হয়ে পড়বে। এই মুহূর্তে এই জঙ্গিবাদ জামায়াত-বিএনপির সৃষ্টি কিনা, ক্ষমতাসীন দলের গোপন ইন্ধন আছে কিনা, বাংলাদেশ দখল করার জন্যে আমেরিকার চাল কিনা, মাদ্রাসা না প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়--এসব নিয়ে তর্ক করে বৃথা সময় নষ্ট করার দিন গত হয়েছে। মনে রাখতে হবে : রিকশাচালক থেকে প্রশিক্ষিত পাইলট, দোকানী, রাজমিস্ত্রি, গার্মেন্টস কর্মী, প্রকৌশলী এবং চিকিৎসকের নামও ‍উঠতে বাকি নেই জঙ্গিখাতায়। কাজেই প্রতিকারের চিন্তার চেয়ে প্রতিরোধের প্রয়োজন এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জঙ্গিবাদ যাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় বা ইন্ধনে হোক না কেন, মনে রাখতে হবে, এর সঙ্গে আমাদের ঘরের সন্তানরাই জড়িত, জড়িত আমাদের ভাই বা চাচা, মামা বা খালু। আবার এর নির্মম-নৃশংসতা শিকার হচ্ছি আমরাই। যেভাবে মগজধোলাই করা হচ্ছে তাতে করে একজন কিশোর তার নিজের পরিবার বোমা মেরে উড়িয়ে দিতে দ্বিধাবোধ করবে না। আপন পিতার গলাই চাপাতি চালানো এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। কাজেই নিজেদের ভেতর আর বিভেদ সৃষ্টি না করে প্রশ্রয়কারী-আশ্রয়কারী যেই হোক, আসুন আমরা তাদের চিহ্নিত করে প্রতিহত করি।

আমরা যদি এখন সর্বস্তর থেকে ইসলামী সন্ত্রাসবিরোধী জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে পারি, তাহলে কোনো অবস্থাতেই আমাদের ভয় পাওয়ার কিছু থাকবে না। আতঙ্কে থাকবে ঐ গুটিকতক জঙ্গি। যে দেশে গণপিটুনিতে প্রায়ই পকেটমার নিহত হয়, সে দেশে এখন পর্যন্ত কোনো ইসলামী জঙ্গি গণপিটুনির শিকার হল না কেন ভাববার বিষয় বটে। আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার কথা বলছি না, বলছি নিষ্ক্রিয়তার কথা। প্রশাসন থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছে, “যে সমস্ত জঙ্গি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসে সঠিক তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করবে তাদের ১০ লাখ টাকা পুরস্কারসহ তাদের পরিবারকে নিরাপত্তা দেওয়া হবে। এছাড়া যে সমস্ত মানুষ জঙ্গি তৎপরতার খবর দেবে তাদের পরিচয় গোপন রেখে ৫ লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে।” নিশ্চয় রাষ্ট্রের যথার্থ উদ্যোগ এটি। কিন্তু এই ঘোষণার আজ কেন প্রয়োজন হচ্ছে? এই তো সেদিন, ৭ মার্চের ভাষণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন বললেন, ‘...প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে...।’ তখন দেশমাতৃকার স্বার্থে, মানুষের কথা ভেবে বিনা প্রশ্নে কোনো প্রতিদানের প্রত্যাশা না করে এই জাতিই তৈরি হয়েছে যুদ্ধের জন্য। তুড়ি দিয়ে জীবন বিসর্জন দিয়েছে এই বাংলার সাধারণ শান্তিপ্রিয় জনগণই। অথচ আজ ১০ লক্ষ টাকার ঘোষণা দিয়েও সাড়া মিলছে না! আমাদের সেই ঐক্য, দেশাত্মবোধ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দুর্বিনীত চেতনা আজ কোথায় গেল? নিশ্চয় আছে কোথাও। হয়ত আমাদের বুকের খুব কাজেই। একেবারে মাঝখানে। আসুন সময়ের প্রয়োজনে তাকে জাগিয়ে তুলি। আরো একবার জেগে উঠি আমরা জাতীয় স্বার্থে, সত্য ও মানবিকতার প্রয়োজনে।

মোজাফফর হোসেন
লেখক।

 

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন