শিরোনাম :

বিএনপির কমিটি: পরিবারতন্ত্র ও স্বজনপ্রীতি


রবিবার, ৭ আগস্ট ২০১৬, ১২:৪৯ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

বিএনপির কমিটি: পরিবারতন্ত্র ও স্বজনপ্রীতি

বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন দলের পর যে দলটির কথা জণগন অকপটে ভাবতে পারে সেটি সম্ভবত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি। দলটির ক্ষমতায় আসার যোগ্যতা ও জনসমর্থনও রয়েছে, বলা যায় জনপ্রিয় দল। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালুর পর থেকে এই দলটিই কখনো সরকারি দলে আবার কখনো বিরোধীদলে ছিল। কিন্তু বর্তমানে দলটি এমন বেহাল দশায় নিমজ্জমান, যেখান থেকে পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাওয়া আপাত দৃষ্টিতে অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে।

বিরোধীদলহীন গণতন্ত্র অসম্ভব। প্রকারান্তরে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে গণতন্ত্রই। আর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে বিরোধীদলসহ সকল গণতান্ত্রিক দলকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হয়, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হয়। বিএনপি গত নির্বাচনে অংশ না নিয়ে যে ভুল করেছে তার খেসারত গুনছে এখন। এখন তাকিয়ে থাকতে হবে অদূর ভবিষ্যতের নির্বাচনের দিকে। সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্য নিয়েই দলটিকে এখন থেকেই মাঠে নামতে হবে, দলের কর্মীদের সক্রিয় করে তুলতে হবে, ত্যাগী এবং নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের মূল্যায়ন করতে হবে।

বিগত আন্দোলনের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বিএনপিকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় নেয়া দরকার। দীর্ঘদিন পর হলেও বিএনপি নতুন পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিয়ে সামনে এগুতে চাইছে বলে মনে হয়। নিজের ঘর গুছাতে কিছুটা ব্যস্ত বটে।

অবস্থাদৃষ্ট মনে হয় বিএনপি’র নিজের ঘরের অবস্থা ভালো নয়। প্রবীণ নেতারা অধিকাংশই নিষ্ক্রিয়, তরুণ কর্মী ও নেতাদের মধ্যেও দারুণ ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজমান। এর আগে দলনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যেসব কমিটি গঠনের ঘোষণা দেন, তার বিরুদ্ধে সাধারণ কর্মী ও নেতারা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। গত মার্চ মাসে দলটির জাতীয় কাউন্সিল হয়েছে। এতে চেয়ারপারসন পদে খালেদা জিয়ার সঙ্গে জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান পদে তারেক রহমান নির্বাচিত হন। তারপর বিভিন্ন সময়ে মহাসচিব, যুগ্ম মহাসচিব এবং সাংগঠনিক সম্পাদকদের নাম ঘোষণা করলেও দীর্ঘ পাঁচমাস পর পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিয়েছে দলটি। শনিবার স্থায়ী কমিটি, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদ, ভাইস চেয়ারম্যান, সম্পাদক মণ্ডলী ও কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্যসহ ৫০২ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির নাম ঘোষণা করেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার সাড়ে চার ঘণ্টার মাথায় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান পদ থেকে শারিরীক ও ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগ করেছেন মোসাদ্দেক আলী ফালু। তারপর সহ দপ্তর সম্পাদক পদে সাত বছর দায়িত্ব পালন করেও নবগঠিত কমিটিতে সহ প্রচার সম্পাদকের পাঁচ নম্বর জায়গায় নিজেকে দেখে সন্তুষ্ট থাকতে পারেননি শামীমুর রহমান শামীম। কমিটি থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার চাইছেন তিনি। সহ প্রচার সম্পাদকের এক নম্বরে আছেন তারই কনিষ্ঠ একজন। এগুলো বিএনপির জন্য অশনিসংকেত বলে মনে হয়।

কমিটিতে দেখা যায়, দলের পদে থাকা নেতাদের পরিবারের অনেক সদস্য পদ পেয়েছেন। বিএনপি নেতাদের উত্তরসূরী তৈরি এবং আত্মীয়-স্বজনদের একটি মহড়া দেখা যায় এই কমিটিতে। সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে যাদের নাম ঘোষণা হয়, তাদের মধ্যে ছিলেন দলের সাবেক মহাসচিব কে এম ওবায়দুর রহমানের মেয়ে শামা ওবায়েদ। ফখরুলের ছোট ভাই মির্জা ফয়সল আমিন নতুন কমিটিতে সদস্য  হয়েছেন। তিনি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে সম্প্রতি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন।

স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ছোট ছেলে সুপ্রিম কোর্টের নবীন আইনজীবী খন্দকার মারুফ হোসেন এবং আগের স্থায়ী কমিটির সদস্য যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী কার্যনির্বাহী সদস্য হয়েছেন। সালাউদ্দিন কাদেরের ভাই গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী কমিটিতে ভাইস চেয়ারম্যা নের পদ পেয়েছেন। 

স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য মুহাম্মদ জমিরউদ্দিন সরকারের ছেলে ব্যারিস্টার নওশাদ জমিরকে করা হয়েছে আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক। তিনি তারেক রহমানের আইনজীবী হিসেবে কাজ করছেন।

স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাসকে সহ-মহিলা বিষয়ক সম্পাদক করেছেন খালেদা জিয়া। গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ঢাকা উত্তরে মেয়র প্রার্থী স্বামীর প্রচারে নেমে সাড়া ফেলেছিলেন তিনি। মির্জা আব্বাসের ছোট ভাই ঢাকার সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার মির্জা খোকন কার্যনির্বাহী সদস্য পদ পেয়েছেন। ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে তাবিথ আউয়াল কার্যনির্বাহী সদস্য হয়েছেন। গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির সমর্থনে ঢাকা উত্তরে মেয়র প্রার্থী হয়েছিলেন বাফুফের সহসভাপতি তাবিথ। স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের মেয়ে অপর্ণা রায়কে প্রান্তিক ও জনশক্তি উন্নয়ন বিষয়ক সহ-সম্পাদক করেছেন খালেদা জিয়া। 

গয়েশ্বরের পুত্রবধূ নিপুন রায় চৌধুরীও পদ পেয়েছেন, তিনি কার্যনির্বাহী সদস্য হয়েছেন। নিপুন ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরীর মেয়ে।

বন্দি অবস্থায় মারা যাওয়া নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর স্ত্রী নাসিমা আখতার কল্পনাকে কার্যনির্বাহী সদস্য করেছেন খালেদা জিয়া। ভারতে বিচারের মুখোমুখি থাকার মধ্যেও স্থায়ী কমিটিতে আসা সালাহ উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী সাবেক সংসদ সদস্য‌ হাসিনা আহমেদকেও রাখা হয়েছে নির্বাহী সদস্য হিসেবে। সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক নিখোঁজ এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনাকে নিজের উপদেষ্টা পরিষদে আরও ৭২ জনের সঙ্গে রেখেছেন খালেদা জিয়া। স্থায়ী কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম মিয়ার স্ত্রী সাহিদা রফিক উপদেষ্টা পরিষদে স্থান পেয়েছেন। সাবেক মন্ত্রী হারুনার রশিদ খান মুন্নুর সঙ্গে তার মেয়ে আফরোজা খান রীতাও উপদেষ্টা পরিষদে রয়েছেন। আন্তর্জাতিক সম্পাদক নাসির উদ্দিন অসীম উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সাবেক প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নানের মেয়ের জামাই। প্রয়াত হুইপ জাহেদ আলী চৌধুরীর ছেলে ফাহিম চৌধুরীকে নির্বাহী কমিটির সদস্য করা হয়েছে।

প্রয়াত মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের ছেলে খোন্দকার আবদুল হামিদ ডাবলুকে এবারও নির্বাহী সদস্য পদে রয়েছেন। সাবেক শিল্পমন্ত্রী এম শামসুল ইসলাম খান অসুস্থতার কারণে স্থায়ী কমিটি থেকে বাদ পড়লেও তার ছেলে মইনুল ইসলাম শান্ত চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হয়েছেন। সাবেক পরিবেশমন্ত্রী শাজাহান সিরাজের স্ত্রী রাবেয়া সিরাজ সহ-তাঁতি বিষয়ক সম্পাদক পদ পেয়েছেন। সাবেক গৃহায়ন প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবিরের ভাই আনোয়ার হোসেন বুলু নির্বাহী সদস্য হয়েছেন। ২০ দলীয় জোটের শরিক ডেমোক্রেটিক লীগ (ডিএল) এর প্রয়াত সভাপতি অলি আহাদের মেয়ে ব্যারিস্টার রুমিন ফারাহানাকে সহ আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক করেছেন খালেদা।

রবীন্দ্রনাথের একটি গানের চরণ হচ্ছে 'আমি কান পেতে রই।' বেগম জিয়াও লন্ডনের দিকে কান পেতে রেখেছেন বলে কথিত আছে। পুত্র তারেক রহমান মাকে যা নির্দেশ দেন তিনি সেই নির্দেশ মেনে দল চালান। অথচ দল পরিচালনার ক্ষেত্রে দলীয় নেতৃত্বের উপর আস্থা রাখা জরুরী। দলীয় সিদ্ধান্ত একমুখী না হয়ে অংশগ্রহণমূলক হলে তৃণমূলের আকাঙ্খার বাস্তব প্রতিফলন সম্ভব। আর যদি বেগম জিয়ার ডাকে কেউ সাড়া না দেয় তাহলে হয়তো রবী ঠাকুরের গানের আরেকটি পংক্তি " যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে" নীতি অবলম্বন করা যেতে পারে।

প্রতিযোগিতার এই যুগে রাজনীতিতেও সৎ, যোগ্য, মেধাবী ও বিচক্ষণদের অগ্রাধিকার পাওয়া উচিৎ। যারা কমিটিতে পদ পেয়েছেন তাদেরকে অবমূল্যায়িত করছিনা, বরং নির্বাচন প্রক্রিয়া আরো গতিশীল এবং অংশগ্রহণমূলক প্রত্যাশা করছি। রাজনৈতিক দলের পদ পাওয়ার মানদণ্ড যদি পারিবারিক প্রভাব-প্রতিপত্তি ও আত্মীয়তার সম্পর্ক হয়, তাহলে অযোগ্য নেতৃত্ব জাতির উপর আরোপীত এক ধ্বংসাত্মক উপহারই বটে! রাজনীতিতে আসার আগ্রহ হারাবে মেধাবী তরুণ-তরুণরা, উৎসাহ হারাবে নতুন নেতৃত্ব। এতে মেধাশূন্য হবে সমাজ, জাতি, দেশ ও আমাদের রাজনীতি...

লেখক: মো. সারোয়ার আহমাদ

         সাংবাদিক

sarwar.ahmad74@gmail.com

( বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি অনলাইন এবং বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

 

 

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন