শিরোনাম :

জঙ্গি সংগঠনে নারী : ফিরে দেখা, আশঙ্কা


শনিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ০২:০৬ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

জঙ্গি সংগঠনে নারী : ফিরে দেখা, আশঙ্কা

 দেবজ্যোতি রুদ্র :

বাংলার নারী -- কমনীয়, রমনীয়।
বাংলার নারী -- কথাটা শুনলেই যে চেহারাটা ফুটে ওঠে মায়ের প্রতিচ্ছবি; মমতাময়ী, সর্বংসহা। সে সন্তানের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে পারে, স্বামীর সেবায় দিতে পারে শখ-আহ্লাদ বিসর্জন। শুধু নিজের পরিবার না, সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের প্রতিও তার টান চিরন্তন, নিজে না খেয়েও সে অভুক্ত প্রতিবেশী কিংবা পথিককে খাওয়াতে ভালোবাসে।
অবশ্য দিন বদলেছে। পুঁজিবাদ আমাদেরকে নতুন অনেক শব্দ উপহার দিয়েছে, যার অন্যতম কর্পোরেটিজম এবং সেল্ফ-সেন্টারিজম। এই দুইয়ে মিলে আমাদেরকে শেখাচ্ছে-- 'আমি-তুমি' নিয়েই শুধু 'আমরা', 'আমি' আর 'তুমি' নিয়েই শুধু জগৎসংসার। ফলে ভাঙছে পরিবার ও সমাজে একান্নবর্তিতার ধারণা, মরচে ধরছে মানবিক মূল্যবোধে। ফলতঃ, বাড়ছে দ্বন্দ্ব, বাড়ছে হতাশা; আর পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিধ্বংসী চিন্তাভাবনা।

অবাক হচ্ছেন? আমি জানি, হচ্ছেন না; অন্ততঃ মানবিক মূল্যবোধ হারানোর কথায় অবাক হচ্ছেন না। কারণ প্রতিদিনই সংবাদমাধ্যম আপনাকে জানাচ্ছে, দেশের কোথাও না কোথাও সন্তানকে খুন করছে মা, সন্তানের হাতে খুন হচ্ছেন মা, পিতার হাতে পুত্র খুন, ছেলের হাতে বাবা খুন, দুগ্ধপোষ্য সন্তানকে ফেলে পালিয়ে যাচ্ছে মা ইত্যাদি ইত্যাদি।

২.
বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যেহেতু এগোচ্ছে অভিশপ্ত এক পন্থায়, স্বভাবতই আমাদের দেশেও আঘাত হেনেছে ধর্মসন্ত্রাস নামক এক কালসাপ। সাপের ছোবলে আজ ক্ষতবিক্ষত সারা বিশ্ব। এ খবর আপনার কাছে নতুন নয়। যদি চোখ রেখে থাকেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, তাহলে আমাদের মতো আপনিও হয়তো আশঙ্কা করছেন বৃহৎ কোন ধ্বংসযজ্ঞের।
সে যা-ই হোক, এখন আমরা একটু নজর দেবো আমাদের দেশে। ২০১৩ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি মুক্তমনা প্রকৌশলী রাজীব হায়দারকে খুনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ধর্মের নামে মানুষ খুনের রাজনীতি। এর পর একের পর এক মুক্তমনা সংগঠক-কর্মীদেরকে নৃশংসভাবে খুন করে হাত পাকিয়েছে এদেশে বাস করা ধর্মসন্ত্রাসী বা জঙ্গিরা। অবশেষে এই বছর ১লা জুলাই তারা হামলা করেছে গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয়, খুন করেছে ২ পুলিশ কর্মকর্তা ও ২০ বিদেশি অতিথিকে; ঈদের দিন (৭ই জুলাই) আবার কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহে পবিত্র ঈদের নামায চলাকালীন সময়ে বোমা হামলা করেছে, তবে দুই পুলিশ সদস্য ছাড়া আর কোন হতাহত হয়নি। এসব ঘটনায় স্বভাবতই নড়েচড়ে বসে সরকার। এতোদিন ধরে যথারীতি জঙ্গি-উপস্থিতি অস্বীকার করলেও, গুলশান-শোলাকিয়া কাণ্ডের পর সরকার-প্রশাসন স্বীকার করতে বাধ্য হয়। অবশ্য যথারীতি তারা এখানেও ঘরোয়া রাজনীতির দুর্গন্ধ পেয়ে চলেছেন সবসময়।

৩.
এক্ষণে আমরা একটু পিছন ফিরে দেখতে চাই। মনে করতে চাই গত ২০০১ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত সময়কালে সংঘটিত কিছু জঙ্গি কার্যক্রম। দেখা যাক, কতোটুকু মনে আছে আমাদের।
লোকটা পরিচিত 'বাংলা ভাই' নামে। আসল নাম সিদ্দিকুল ইসলাম। 'জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ' নামক একটি উগ্র ধর্মসন্ত্রাসী সংগঠনের প্রধান নির্বাহী সে; মূল উদ্যোক্তা এবং আধ্যাত্মিক নেতা শায়খ আবদুর রহমান নামক আরেক আফগানিস্তান ফেরৎ 'জিহাদী'। ২০০২ সালে প্রথম গণমাধ্যমে আসে বাংলা ভাই'র নাম। সেই সূত্রে জানা যায়, রাজশাহী অঞ্চলকে কেন্দ্র করে একটা বামবিরোধী সশস্ত্র 'মুজাহিদ' বাহিনী গঠন করে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে জেএমজেবি। বামপন্থী বা মৌলবাদবিরোধী ছেলেদের ধরে ধরে গাছের সাথে উল্টো করে ঝুলিয়ে পেটানো, মধ্যযুগীয় বিভিন্ন বিধান পালন করতে বাধ্য করা, চাঁদাবাজি, চুক্তিতে খুন ইত্যাদি নানাবিধ অভিযোগ এই জঙ্গিদের বিরুদ্ধে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, মিডিয়ায় প্রকাশিত সব খবরকে 'ভিত্তিহীন বানোয়াট কল্পনাপ্রসূত' বলে বাতিল ঘোষণা করে তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রশাসন।

সরকার ও প্রশাসনের প্রবল সন্দেহ-জাগানিয়া এই উদাসীনতা-নিষ্ক্রিয়তা মূলত বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের শক্ত ভিত তৈরিতে সহায়তা করে।
কিছুদিন চুপ করে থেকেই ২০০৪ সালে আবার মিডিয়ায় প্রবলভাবে নিজের উপস্থিতি জানান দিতে শুরু করে 'বাংলা ভাই'। সর্বহারা নামধারী বিলুপ্তপ্রায় চরম-বামপন্থী সংগঠনের সদস্য হিসেবে অত্যাচার করে খুন করে প্রায় ১০ জনকে। এছাড়া আগের মতো যথারীতি ফতোয়াবাজি আর চাঁদাবাজি তো চলছেই। আর বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে তাদের এই মহা-অপরাধের পৃষ্ঠপোষণ শুরু করে স্থানীয় বিএনপি-জামায়াত দলীয় জনপ্রতিনিধি এবং পুলিশ-প্রশাসন।

কথায় বলে-- কচু গাছ কাটতে কাটতে ডাকাত হয়। তো, এই বাংলা ভাইও 'কচু গাছ' হিসেবে মানুষ কাটতে কাটতে আস্তে আস্তে ত্রাসে পরিণত হয়। দেশব্যাপী উগ্রবাদ ও মৌলবাদের বিষ-বীজ ছড়িয়ে দেয়ার ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে শুরু হয় গণরিক্রুটিং। দলে দলে মাদ্রাসার ছাত্র, অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত মজুর শ্রেণির লোক থেকে শুরু করে কর্পোরেট চাকরিজীবি, ব্যবসায়ী, পেশাজীবিরাও যোগ দেয় এই জঙ্গি বাহিনীতে। পত্রিকা এবং গোয়েন্দা তথ্য মতে, ২০০২ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত অন্তত ৮০০০ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা-বয়সের লোকজন জেএমজেবি'র সদস্য হিসেবে দীক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিয়েছে।

এই বিপুল সংখ্যক জঙ্গীর কিছু অংশ মাঠে নামে। ২০০৫ সালের ১৭ই আগস্ট বেলা সাড়ে ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে একযোগে দেশের ৬৩টি জেলায় ৩০০টি জায়গায় ৫ শতাধিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় তারা। এই ঘটনায় নিহত হয় ৩ জন, আহত শতাধিক। প্রতিটি জায়গায় পাওয়া যায় জেএমজেবি'র নাম সম্বলিত বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রবিরোধী উস্কানিমূলক লিফলেট। কি থেকে কি হচ্ছে নিয়ে যখন জল্পনা-কল্পনায় ব্যস্ত সরকার-প্রশাসন-জনগণ, ঠিক তখনই আবার হামলা চালায় জঙ্গি সংগঠনটি। ১৪ই নভেম্বর ঝালকাঠি জেলা জজ আদালতের চত্বরে বোমা ছুঁড়ে হত্যা করে জ্যেষ্ঠ সহকারী বিচারক জগন্নাথ পাণ্ডে এবং সোহেল আহমেদকে। আর ২৯শে নভেম্বর গাজীপুর ও চট্টগ্রামের আদালত চত্বরে একযোগে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালায় জেএমজেবি, যাতে নিহত হন ৮ জন, আহত শতাধিক, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন উকিল ও পুলিশ সদস্য।
এই তিন ঘটনায় অবশেষে বোধোদয় হয় সরকারের। সাথে সাথে বাংলা ভাই ও তার সহযোগীদের ধরতে অভিযান শুরু হয়। অবশেষে ২০০৬ সালের ৬ই মার্চ র‍্যাব-৯ এবং গোয়েন্দা পুলিশের যৌথ অভিযানে প্রথমে ময়মনসিংহ শহর থেকে গ্রেপ্তার হয় বাংলা ভাই'র স্ত্রী ফাহিমা এবং ছোট ছেলে সানি। পরে তাদের তথ্য অনুসরণ করে একই দিনে অভিযান চালানো হয় বাংলা ভাই'র মুক্তাগাছার আস্তানায়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে প্রথমে গুলি চালায় সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই এবং তার দেহরক্ষী মাসুদ। গোলাগুলির এক পর্যায়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে বোমা ছুঁড়তে গিয়ে বিস্ফোরণে নিজেরাই আহত হয় তারা। আহত অবস্থায় আটক করা হয় বাংলা ভাইকে।
তারপর জেএমজেবি'র আধ্যাত্মিক নেতা শায়খ আবদুর রহমান, সামরিক প্রধান সহ বেশ কিছু সদস্যকে আটক করে পুলিশ।

বিচারের পর ২০০৭ সালের ৩০শে মার্চ ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই এবং শায়খ আবদুর রহমান ওরফে আকা'র।

দৃশ্যতঃ, আমাদের বাংলাদেশে মৌলবাদী জঙ্গি কার্যক্রম শেষ হয়ে যায় ২০০৭ থেকে; বিষয়টায় নিজেদের পিঠ চাপড়াতে শুরু করে সরকার ও প্রশাসন।
কিন্তু কিছু প্রশ্ন তো থেকেই যায়। যেমন--

# বিভিন্ন জায়গা থেকে রিক্রুট হওয়া ৮ সহস্রাধিক জঙ্গি কোথায় গেলো? তারা কী ভয় পেয়ে থেমে গেছে? কিন্তু আত্মঘাতী হওয়ার মতো ভয়ঙ্কর বিধ্বংসী চিন্তায় অভ্যস্ত লোকগুলো এতো অল্পতেই ভয় পাবে কেন?

# সিদ্দিকুল কিংবা আবদুর রহমান তো মাঠপর্যায়ের নেতা ছিলো, কিন্তু তাদের অর্থদাতা এবং মদদদাতারা কারা? তারা কী তাদের এই বিপুল পরিমাণ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্যের পিছনে ঢালা অর্থ বিফলে যেতে দেবে?

# সিদ্দিকুল ইসলাম এবং আবদুর রহমানকে ফাঁসি দিয়েই কেন বন্ধ করে দেয়া হলো এ্যান্টি-টেরোরিস্ট সেল? আসলে কাকে আড়াল করা হলো?
আমরা শুধু হাতড়ে মরেছি এর উত্তর আর সুকুমারের ভাষায় বলে গিয়েছি-- ''মাথায় কতো প্রশ্ন আসে, দিচ্ছে না কেউ জবাব তার''।

৪.
আবার ফিরে আসি বর্তমানের বাংলাদেশে।
ক'দিন আগেই আপনি জেনেছেন, ঢাকার আজিমপুর থেকে আটক করা হয়েছে তিন নারী জঙ্গিকে। তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে জানা গেছে, বিপুল সংখ্যক নারী সদস্য জড়িয়ে পড়েছে সর্বনাশা এই খেলায়। সবচেয়ে ভয়ের কথা, এদের একটা বড় সংখ্যক আবার আত্মঘাতী দলের সদস্য! তাদের মাথায় এমনভাবে 'জিহাদ' নামধারী সন্ত্রাসের বীজ বুনে দেয়া হয়েছে, "দল ও ইসলামের স্বার্থে" নিজের ১০ মাসের সন্তানকে গোলাগুলির মধ্যে ফেলেই পালাতে চেষ্টা করেছিলো জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) -এর নারী বাহিনীর প্রধান ফেরদৌসী আফরিন ওরফে শারমিন। একই জায়গা থেকে আটক করা অপর দুই নারী জঙ্গি আবেদাতুল ফাতেমা এবং শায়লা আফরিনও নিজেদেরকে আত্মঘাতী দলের সদস্য বলে স্বীকার করেছে।
এসব তথ্য আমাদেরকে ভাবতে বাধ্য করছে, নব্বইয়ের দশকে যারা স্লোগান তুলেছিলো "আমরা হবো তালেবান, বাংলা হবে আফগান", তাদের পরিকল্পনা বেশ দৃঢ় পদক্ষেপেই এগিয়ে চলেছে। বিশেষ করে সামরিক বাহিনীতে একাধিক উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার সরাসরি জঙ্গি কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে প্রসঙ্গটা বেশ সুদৃঢ় হচ্ছে নিঃসন্দেহে। তাহলে কী আমরাও পরিণত হবো আফগানিস্তান, পাকিস্তান, সিরিয়ার মতো ব্যর্থ ও সন্ত্রাসী রাষ্ট্রে?

তবে অতি ভয়ঙ্কর এই শঙ্কার মধ্যেও আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বারবার সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তাঁর সুদৃঢ় অবস্থান ঘোষণা করে আমাদেরকে সাহস দিচ্ছেন, ভরসা দিচ্ছেন। তাই আমরাও আশাবাদী-- আমার মাটি আমার মা, পাকিস্তান হবে না। যে দেশের মাটিতে মিশে আছে হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক চেতনার দীপ্ততা, সেখানে মৌলবাদের আগাছা বেশিক্ষণ টিকতে পারবে না বলেই আমরা বিশ্বাস করি। যে দেশে জন্ম নেয় লালন ফকির, হাসন রাজা, আরজ আলী মাতুব্বর প্রমুখ মানবতাবাদী মহাত্মা, সেখানে আর যা-ই হোক, কোন মধ্যযুগীয় বর্বরতার জায়গা হবে না, হতে দেয়া যায় না।
তাই ধর্মসন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম চলবেই, আমাদের দেশকে ব্যর্থ কিংবা সন্ত্রাসী বানাতে দেবো না কিছুতেই। আর এই প্রতিজ্ঞা আমার-আপনার, এই দেশের অস্তিত্বে বিশ্বাসী, মাটির চেতনায় আস্থাশীল সকলের।

লেখক: লেখক ও সংবাদকর্মী।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি অনলাইন এবং বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন