শিরোনাম :

কাশ্মীর ইস্যুতেই পাক-ভারতের যত দ্বন্দ্ব


বৃহস্পতিবার, ৬ অক্টোবর ২০১৬, ০১:৩৮ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

কাশ্মীর ইস্যুতেই পাক-ভারতের যত দ্বন্দ্ব

রনি রেজা ।। একসময়ে ভূ-স্বর্গ নামে পরিচিত কাশ্মীর এখন উত্তপ্ত আগ্নেয়গিরি, যার প্রখর তাপে জ্বলছে দক্ষিণ এশিয়ার দুই শক্তিধর রাষ্ট্র পাকিস্তান ও ভারত। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার পর থেকে রাষ্ট্র দুটির মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগেই আছে। আর এর মূলে রয়েছে এই কাশ্মীর। মজার বিষয় হচ্ছে, দুই দেশই মনে করে কাশ্মীর তাদের অংশ।

কাশ্মীর ইস্যুতে সর্বশেষ যুদ্ধটি হয় ১৯৯৯ সালে। সেসময় পাকিস্তান লাইন অব কন্ট্রোল পেরিয়ে ভারতের কার্গিল এলাকা দখল করে নিয়েছিল। অবশ্য পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী'র সাথে আলোচনা করে সেনা প্রত্যাহার করে নেয় পাকিস্তান।

১৯৪৭ সালে দেশ দুটি বিভক্ত হবার সময়ই কাশ্মীর সমস্যার সমাধান চেয়েছিলেন ব্রিটিশ শাসক। তখন কাশ্মীরের রাজা হরি সিংহকে না পাওয়ায় অসমাপ্ত থেকে যায় কাশ্মীর ইস্যুর সমাধান। আর শুরু হয় দুই সহদর রাষ্ট্রের দ্বন্দ্বের অধ্যায়। যা চলছে চলমান।

বর্তমানে কাশ্মীর এলাকা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিভক্ত হয়ে আছে এবং এর একটি ক্ষুদ্র এলাকা চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পাকিস্তান ও ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। কাশ্মীরের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে রয়েছে চীনের সীমানা। ভারত মনে করে, চীন সরকার পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে ইসলামাবাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করার জন্য দেশটিকে সহায়তা করছে এবং চীন ও পাকিস্তান আজাদ কাশ্মীর এলাকায় যৌথ নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। ফলে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও উভয় দেশের কৌশলগত অবস্থানের কারণে কাশ্মীর সংকটের সমস্যার সমাধান আরো জটিল হয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও এই বিরোধপূর্ণ কাশ্মীর অঞ্চল-- যার প্রায় দুই তৃতীয়াংশ রয়েছে ভারতের নিয়ন্ত্রণে। এক তৃতীয়াংশকে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণ করে আজাদ কাশ্মীর নামে। এই অঞ্চলটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং এর অধিকাংশ মানুষই ভারতের সঙ্গে থাকতে চায় না বলে পাকিস্তান বলে আসছে। ভারত নিয়ন্ত্রিত অংশের মানুষের মতামত তথা গণভোটের মাধ্যমে এর ভাগ্য নির্ধারণ করতে চায় পাকিস্তান। অন্যদিকে ভারত মনে করে তাদের নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর হলো ভারতেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং ভারত এটাও দাবি করছে যে পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রিত অংশও ভারতকে দেয়া হোক।

সম্প্রতি কাশ্মীরের সেনাঘাঁটিতে সন্ত্রাসী হামলার পর ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে এ অগ্নিকুন্ডলী। এপর্যন্ত পাক-ভারত দ্বন্দ্বের সংক্ষিপ্ত চিত্র উপস্থাপন করা হলো।

১৯৪৭

পৃথক হবার পর ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে এটিই ছিল প্রথম যুদ্ধ। এটিকে প্রথম কাশ্মীর যুদ্ধও বলা হয়। ১৯৪৭ সালের ২১ অক্টোবর শুরু হয়ে এ যুদ্ধ চলে ১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। প্রায় ১৪ মাস চলা এ যুদ্ধের সমাপ্তিতে যুদ্ধবিরতি গণভোটের আয়োজন করে জাতিসংঘ। এ যুদ্ধে লাইন অব কন্ট্রোল পার হয়ে কাশ্মীর ও জম্মুর প্রায় এক তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণে নেয় পাকিস্তান। এর ফলে জম্মু ও কাশ্মীর (প্রায় ১০১.৩৮৭ বর্গ কিলোমিটার) ও পাকিস্তান অঞ্চলে যা পরবর্তীতে আজাদ কাশ্মীর নামে পরিচিতি পায়; (১৩,৩৯৭ বর্গ কিলোমিটার) এবং উত্তরাঞ্চল (৭২,৪৯৬ বর্গ কিলোমিটার) হয়ে ওঠে ভারত রাষ্ট্র।

১৯৬৫

ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মীর ইস্যুতে দ্বিতীয়বারের মতো যুদ্ধ হয় ১৯৬৫ সালে। ওই বছর আগষ্টের শেষের দিকে শ্রীনগর সিমান্তে প্রবল বিক্রমে আক্রমণ করে পাকিস্তান। হতচকিত ভারত কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাকিস্তানী সেনাবাহিনী যুদ্ববাজ উপজাতিগুলোর সহায়তায় শ্রীনগরের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। মেজর জেনারেল আখতার হোসেন মালিকের অধিনায়কত্বে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আখনুর ও জারিয়ান দখল করে নেয়। পরের লক্ষ্য স্থির করে জন্মু। পরে ৬ই সেপ্টেম্বর খেমকারান সেক্টর দিয়ে ভারত করাচি আক্রমন করে বসে। আয়ুবের তখন ত্রাহি অবস্থা, আয়ুব কখনও ভাবতে পারেনি ভারত শ্রীনগর যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক সীমান্তে টেনে নেবে। পাকিস্তানি সমস্ত ইউনিট তখন হয় শ্রীনগর নাহয় শ্রীনগর অভিমূখে। ওই রাতেই আয়ুব খান ম্যাগের কমান্ড নিজ হাতে তুলে নেন, শ্রীনগর অভিমূখী সেনা ইউনিট ঘুরিয়ে খেমকারান সেক্টরে এসে ভারতীয় আক্রমণ প্রতিহত করার নির্দেশ দেন। দু’দেশের দ্বন্দ্ব যখন চরমে তখন আন্তর্জাতিক মহলের হস্তক্ষেপে তাশখন্দ চুক্তির মাধ্যমে এ যুদ্ধ বন্ধ করা হয়।

১৯৭১

১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ ছিল ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘটিত একটি সামরিক যুদ্ধ। ওই বছর ৩রা ডিসেম্বর ১১টি ভারতীয় এয়ারবেসে পাকিস্তান আচমকা হানা দিলে অপারেশন চেঙ্গিস খাঁ নামে এই যুদ্ধ শুরু হয়। ৩ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র তেরো দিনের এই যুদ্ধ ইতিহাসের স্বল্পদৈর্ঘ্যের যুদ্ধগুলোর মধ্যে একটি।

১৯৯৯

১৯৯৯ সালের মে-জুলাই মাসে কাশ্মীরের কার্গিল জেলায় ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘটিত একটি সশস্ত্র সংঘর্ষ। পাকিস্তানি ফৌজ ও কাশ্মীরি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে ডি-ফ্যাক্টো সীমান্তরেখা হিসেবে পরিচিত নিয়ন্ত্রণ রেখা বা লাইন অব কন্ট্রোল পেরিয়ে ভারতে ঢুকে পড়লে এই যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। মে থেকে জুলাই পর্যন্ত স্বল্প সময়ের এ যুদ্ধে পাকিস্তান লাইন অব কন্ট্রোল পেরিয়ে ভারতের কার্গিল এলাকা দখল করে নিয়েছিল। অবশ্য পরবর্তীতে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী'র সাথে আলোচনা করে সেনা প্রত্যাহার করে নেয় পাকিস্তান।

২০০৩ সালে দুই দেশের মধ্যে অস্ত্রবিরতি চুক্তি হয়। কিন্তু এরপরও প্রায়শ উভয় দেশ পরস্পরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করে আসছে। সীমান্তে নিয়মিত চলছে গোলাগুলি।

গত মাসের শেষ থেকে আবার অস্থির হয়ে ওঠে কাশ্মীর। প্রথমে ভারতের মাটিতে জঙ্গী হামলার চালায় পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আই.এস.আই মদদপুষ্ট সন্ত্রাসী সংগঠন লস্কর-ই-ত্যৈয়বা। জবাবে পাকিস্তান অধীকৃত কাশ্মীরে সামরিক হামলা চালায় ভারত। ফলে শুরু হয় সীমান্ত-যুদ্ধ। ভারতের সমর্থনে এগিয়ে আসে জাতিসংঘ এবং যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান সহ বেশ কয়েকটি দেশ। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত পিছু হটে পাকিস্তান।

তবে এই পিছু হটা কতোদিনের জন্য, তা ভাবনার বিষয়। কে জানে, তলে তলে হয়তো আরেকটি যুদ্ধের দিকেই এগোচ্ছে বিপরীত মেরুতে চলা রাষ্ট্র দুটি।

---

লেখক : সংবাদকর্মী

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি অনলাইন এবং বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

/রুদ্র

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন