শিরোনাম :

কেন যুদ্ধাপরাধীর পরিবারের রাজনৈতিক অধিকার নিষিদ্ধ করা উচিৎ?


বৃহস্পতিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৬, ১১:২২ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

কেন যুদ্ধাপরাধীর পরিবারের রাজনৈতিক অধিকার নিষিদ্ধ করা উচিৎ?

শাওন মাহমুদ ।।  যুদ্ধাপরাধীর বিচার চাই। দাবি একটা। দুর্গম ঘন আঁধারে ঢাকা পাহাড়সম কঠিন দাবি। যার প্রতিটা স্তরে স্তরে ভার হয়ে বসে আছে চরম নিষ্ঠুরতা। একেকটি স্তর উন্মোচিত হতেই বর্বরতার শাখা প্রশাখা বিস্তারের দেখা মেলে। বহুদিনের পুরনো মরচে ধরা বিনুনী পাঁকানো মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ কুটিল জটের শিকড়গুলো উপড়ে ফেলার সময় এখন।

যুদ্ধাপরাধীর বিচার, রায় এবং কার্যকারিতা। এক অপ্রত্যাশিত পাওয়া। কোনো এক দৈব মন্ত্র বলে প্রত্যাশিত দাবিটি বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ হয়ে নেমে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকা সরকার সেই মন্ত্রের দূত যেনো। অলৌকিক সেই মন্ত্রকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথিকৃৎ তারা।

যুদ্ধাপরাধী, মানবতাবিরোধী, রাজাকার। যে নামেই একাত্তরের কলংকময় শত্রুদের ডাকা হোক না কেন, এদের অপরাধের ওজন এক। গত পঁয়তাল্লিশ বছরে এদের শিকড় ঘন হয়েছে গভীরে।

অনেকে তারকা খচিত রাজাকারদের ফাঁসী কার্যকরের পর স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়েছে। শত্রুর মাথা ভেঙে ফেলার পর আর শক্তি কোথায় ভেবে সহজ জীবন যাপন করছে। আমার কখনও তা মনে হয় না। এ পর্যন্ত যেসব যুদ্ধাপরাধীর বিচার এবং রায় কার্যকর হয়েছে তারা রেখে যাচ্ছে তাদের বংশধর।

অগণিত ভক্তকুল। প্রাচুর্যের পাহাড়। তাদের অর্থের বিনিয়োগে পাওয়া যায় স্কুল, মাদ্রাসা, পত্রিকা, টিভি চ্যানেল, রেডিও স্টেশন, ইউনিভার্সিটি, হাসপাতাল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, কোচিং সেন্টার, এতিমখানাসহ বহু কিছু। এমন কি দেশী বিদেশী নামকরা লবিস্ট, ব্লগার, সাংবাদিক এবং আইনজীবীদের অহরহ দেখা যায় তাদের পক্ষে কাজ করতে। লড়াই করতে। বিশাল অর্থের বিনিময়ে।

ক্ষমতা, অর্থ, বিত্তে প্রচণ্ড প্রভাবশালী এই যুদ্ধাপরাধীদের বিপক্ষে আমাদের লড়াই কখনও থেমে যাওয়ার নয়। এদের অর্থে ক্রয়কৃত শক্তি সদা ব্যস্ত দেশকে অস্থির, অরাজকতাময় আর নিরাপত্তাহীনতায় রাখবার জন্য। বিচারকাজ চলাকালীন সময়ে এবং রায় কার্যকরের পর এরা হত্যা করেছে ব্লগার, অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট, লেখক, প্রকাশক, গণমাধ্যম কর্মী, সাংবাদিক, অভিনেতা, বিদেশী নাগরিক, মাঠকর্মীসহ সাধারণ মানুষকে। হত্যার হুমকি থেকে বাদ যায়নি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা অভিনয় শিল্পীও। দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে অনেক ব্লগার এবং অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টকে। পেট্রোল বোমা আর অবরোধে স্তব্ধ করেছে অর্থনীতি। নিথর করেছে দেশ। ট্রাইব্যুনালকে স্থবির করার জন্য ষড়যন্ত্রমূলক বিভিন্ন ঘটনার অবতারণা করেছে ওরা। হলি আর্টিজান হামলায় সংগঠিত করেছে আমাদের ইতিহাসের বীভৎসময় হত্যাকাণ্ডের।

তিনদিন আগে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ একটি বিবৃতি দেয়। “বাংলাদেশ: বিধি বহির্ভুত ও গোপন গ্রেফতার বন্ধ করুন”। যুদ্ধাপরাধে দণ্ডপ্রাপ্তদের তিন সন্তান- সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী, মীর কাশেমের ছেলে মীর আহমেদ বিন কাশেম এবং গোলাম আযমের ছেলে আমান আযমীকে অগাস্টের প্রথম সপ্তাহ এবং শেষদিকে কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়া ধরে নিয়ে গিয়ে গুম করা হয়েছে বলে সরকারের বিরুদ্ধে দোষারোপ করছে তারা। একইদিন বিবিসি অনলাইনও তাদের নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে।

কতটা অর্থের দম্ভ থাকলে তারা এমন অন্যায় বার্তা পৃথিবীর কাছে ছড়াতে পারে তা আমার জানা নেই। যদি ভেবে থাকেন এরকম বার্তাগুলো হাওয়ায় ভেসে বেড়াবে, ভুল হবে সেই ভাবনা। যুদ্ধাপরাধী মুজাহিদ শেষ চিঠিতে স্ত্রীকে নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিল, ‘তোমরা বিচলিত হইও না। এই জালিম মহিলার কাছে কোনো দয়া বা ক্ষমা আমি বা আমার দলের কেউ প্রত্যাশা করিনি। তার বিচার আল্লাহ করবে। আমাদের রোকন হিসেবে তোমার বৈঠক অব্যাহত রাখিবে। খাদিজা, নজীব ও সাইমুরকে স্নেহ দিও। তারা যেন তার আব্বার দেখানো পথে চলে।’ এর মানে স্পষ্ট। মানবতাবিরোধীদের দেখানো পথেই তাদের সন্তান আর উত্তরাধিকাররা চলবে।

প্রতিটা যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসী কার্যকর হবার পর আমরা তাদের সমূলে উৎপাটন করার তাগিদে যুক্তিবহ আরো কিছু দাবির প্রস্তাবনা করে আসছি। এর মধ্যে তাদের সহায় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার দাবিটি মাননীয় আইনমন্ত্রী আমলে নিয়েছেন। তারপরও আরেকটি কঠিন দাবি বাকি রয়ে যায়। তা হচ্ছে যুদ্ধাপরাধী প্রমাণিত হবার সাথে সাথে এদের পরিবারের রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করবার দাবি। তাদের আব্বার দেখানো চলবার পথ বন্ধ করার দাবি।

আমি বিশ্বাস করি এই দাবিটিও একসময় নজরে আসবে এবং বাস্তবায়িত হবে। রাজাকার পরিবারের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ এবং রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করা আগামীতে সরকার এবং ট্রাইব্যুনালের প্রতি অন্যায় আস্ফালন করবার ক্ষমতা হ্রাস করবে। বিদেশী লবিস্ট বা গণমাধ্যমকে হাতের মুঠোয় নেওয়া আর দেশকে অস্থিতিশীল করার মূল শিকড় উপড়ে ফেলতে এই দাবিগুলি বাস্তবায়নের অনুরোধ জানাই।

আগামীর কাছে আমরা কথা দিয়েছি। তাদের জন্য রাজাকারমুক্ত দেশ রেখে যাবো আমরা। যুদ্ধাপরাধীর বিচারের মাধ্যমে সেই আস্থা নিয়ে পথ চলতে চাই। আগামীর জন্য লাল সবুজের বাংলাদেশের সব কালোকে মুছে ফেলে রেখে যেতে চাই।

-----

শাওন মাহমুদ : অমর সুরকার শহীদ আলতাফ মাহমুদের মেয়ে। সাংবাদিক আন্দোলনকর্মী ও অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি অনলাইন এবং বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন