শিরোনাম :

খাদিজার জন্য প্রার্থনা


শনিবার, ২২ অক্টোবর ২০১৬, ০২:১৮ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

খাদিজার জন্য প্রার্থনা

এ মাসের অক্টোবরের ৩ তারিখ সোমবার বিকেলে আমি খবর পেয়েছি এমসি কলেজে একটি মেয়েকে নির্মমভাবে কুপিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। সন্ধ্যাবেলা জানতে পেরেছি খবরটি ভুল। মেয়েটি মারা যায়নি তবে বেঁচে থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই, সাথে সাথে আরো একটি খবর জানতে পেরেছি, খাদিজাকে নির্মমভাবে কুপিয়েছে যে ছেলেটি সে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং ছাত্রলীগের নেতা।

ঠিক কী কারণ জানা নেই আমার ভেতরে তীব্র একটি অপরাধের জন্ম হল, মনে হল আমরা নিশ্চয় আমাদের ছাত্রদের ঠিক করে মানুষ করতে পারি নি। তা না হলে কিভাবে আমাদের একজন ছাত্র এরকম নৃশংস একটি ঘটনা ঘটাতে পারে? (তবে অতীতে গণপিটুনি খাওয়ার পর আমি তার প্রতি সমবেদনাসূচক বক্তব্য রেখেছিলাম সেই প্রচারণাটি মোটেও সত্যি নয়।)

খাদিজা যে বাসায় থাকে তার পাশেই আমার একজন সহকর্মী থাকে সে এসে আমাকে ঘটনাটির কথা বলতে বলতে অশ্রুসজল হয়ে উঠতে লাগলো। পরদিন মাঝে মাঝেই খবর পেয়েছি খাদিজা মারা গেছে, শেষ পর্যন্ত জেনেছি তখনো বেঁচে আছে এবং তাকে স্কয়ার হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে ৭২ ঘণ্টা পার না হলে খাদিজা বেঁচে যাবে কিনা সেটা বলা যাবে না। সারা দেশের কোটি কোটি মানুষের সাথে সাথে আমিও নিঃশ্বাস বন্ধ করে ৭২ ঘণ্টা পার হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে থাকি, তার জীবনের জন্য প্রার্থনা করতে থাকি। ৭২ ঘণ্টা পার হওয়ার পর আমরা খুব সাবধানে প্রথমবার একটুখানি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি। এরপর থেকে তার সম্পর্কে একটু খানি ভালো সংবাদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি।

যখন এটি লিখছি তখন পনেরো দিন পার হয়ে গেছে। খাদিজার শরীরে একটি দিক এখনো অবশ কিন্তু যতদূর জানি তার প্রাণের ঝুঁকিটুকু আর নেই। এখন আমারা সবাই আবার নতুন আশা নিয়ে অপেক্ষা করে আছি কখন তার জ্ঞান ফিরে আসবে, কখন আপনজনকে চিনতে পারবে, কখন সে আবার তার সত্যিকারের জীবন শুরু করবে। মানুষের শুভ কামনা বলে যদি কিছু থেকে থাকে তাহলে কাউকে খাদিজার মত করে সেটি পেতে আমি বহুদিন দেখিনি।

খাদিজার এই নিষ্ঠুর ঘটনার সাথে সাথে দুটি বিষয় হঠাৎ করে আমাদের সবার চোখের সামনে চলে এসেছে। প্রথম ঘটনাটি হচ্ছে এই ভয়ংকর ঘটনাটির প্রত্যক্ষদর্শীদের এক ধরণের নির্লিপ্ততা। এই রকম নির্লিপ্ততা শুধু যে আমাদের দেশে ঘটেছে তা নয় সারা পৃথিবীতেই ঘটছে। দিল্লির রাস্তায় গাড়ী অ্যাক্সিডেন্টে আহত হওয়া একজন মহিলা রাস্তার পাশে পড়ে আছে, তাকে কেউ সাহায্য না করে পাশ দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে। এরকম ঘটনার কথা কিছুদিন আগেই খবরের কাগজে দেখতে পেয়েছি।

সবচেয়ে ভয়ঙ্কর স্মৃতিটার কথা আমরা কখনো ভুলব না। সেটি হচ্ছে বই মেলার বাইরে যখন অভিজিৎ এবং তার স্ত্রীকে জঙ্গিরা নির্মম ভাবে আক্রমণ করছে শত শত মানুষ দেখছে, কেউ সাহায্যের জন্য এগিয়ে যায়নি (অনেকেই ছবি তুলেছে), শুধু তাই নয় খুব কাছেই পুলিশ নির্লিপ্ত দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। (তাদের অজুহাতটাও যথেষ্ট চমকপ্রদ ছিল- তারা ভেবেছিল ছাত্রলীগের দুই গ্রুপে মারামারি)।

প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে এগুতে না চাওয়ার ব্যাপারটি আমরা একটুখানি বুঝি কিন্তু যেখানে অসংখ্য মানুষ সেখানে সম্মিলিত ভাবে সাহায্যার জন্য ছুটে না গিয়ে শুধু ছবি তুলে দায়িত্ব শেষ করে ফেলার বিষয়টি দেখে কেন জানি নিজেদের খুব অপরাধী মনে হয়ে। সুদানে দুর্ভিক্ষের সময় একটি ক্ষুধার্ত শিশু হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে আর তার পিছনে পিছনে একটি শকুন পায়ে পায়ে অগ্রসর হচ্ছে, কখন শিশুটি মারা যাবে এবং শকুনটি তার মৃতদেহটি খাবে সেই আশায়, এই ছবিটি তুলে কেভিন কার্টার নামে একজন ফটো সাংবাদিক পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছিলেন। কিন্তু শিশুটি উদ্ধার না করে প্রথমে ছবি তোলার জন্য তাকে যে ভাবে সমালোচিত হতে হয়েছিল তিনি সম্ভবত তার অপরাধবোধ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছিলেন।

আমার মনে হয়ে আমাদের এই নির্লিপ্ততা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। পথে ঘাটে কাউকে আক্রান্ত হতে দেখলে আমাদের তাকে ছুটে গিয়ে সাহায্য করতে হবে। আমরা বাঙালীরা কখনো এরকম ছিলাম বলে মনে পড়ে না। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই দেশের মানুষেরা প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে যেভাবে একজন আরেকজনকে সাহায্য করেছিল তার কোনো তুলনা নেই। সেই একই দেশের একই মানুষ কেমন করে এখন হঠাৎ এরকম হৃদয়হীন হয়ে গেল আমি বুঝতে পারি না। (আমি অনেকের কাছে এই ব্যাপারে তাদের মতামত জানতে চেয়েছি, সত্য মিথ্যা জানি না, অনেকেই বলেছেন এরকম সময় কেউ এগিয়ে যায় না পুলিশের হয়রানির ভয়ে। ঘটনা শেষ হবার পর নাকি পুলিশের সাথে দীর্ঘ একটা ঝামেলা শুরু হয়ে যায়। যদি এটি সত্যি হয় তাহলে পুলিশের কর্তৃপক্ষের উচিত সবাইকে এ ব্যাপারে নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্যে উৎসাহ দেওয়া।)

খাদিজার ঘটনাটি ঘটে যাবার পর দ্বিতীয় যে বিষয়টি উঠে এসেছে সেটি হচ্ছে চাপাতি হাতে আক্রমণকারী বদরুল আলমের পরিচয়। যতবার সংবাদ মাধ্যমে তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে ততবার তাকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে। সংবাদ মাধ্যম একবারও দাবি করেনি শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র মানেই চাপাতি হাতে নৃশংস আক্রমণকারী ছাত্রলীগের নেতা। কিন্তু তারপরও আমরা যারা শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তারা এক ধরনের অস্বস্তি অনুভব করেছি। আমাদের থেকে শতগুণ বেশি অস্বস্তি অনুভব করেছে দেশের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তারা ঘটনা ঘটে যাবার পর প্রাণপণ চেষ্টা করেছে বোঝানোর জন্য যে বদরুল আলম ছাত্রলীগের কেউ নয়।

সবচেয়ে বিচিত্র ছিল একজন নেতা বা কর্মীর ব্যাখ্যা, সেখানে সে লিখেছে বদরুল আলমের কোপানোর ভঙ্গিটি দেখেই বোঝা যায় সে ছাত্রলীগের কর্মী না। কারণ ছাত্রলীগ এভাবে কোপাতে পারে না। এভাবে কোপায় শুধু শিবির- কাজেই বদরুল আলম নিশ্চয়ই একজন শিবির কর্মী! এ ধরনের বিচিত্র ব্যাখ্যা আমি আমার জীবনে খুব বেশি শুনিনি। সবচেয়ে বড় কথা বদরুল আলমের এই নৃশংসতার গ্লানি তার পরিবারকে যেরকম স্পর্শ করেছে, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যায়কেও সেভাবে স্পর্শ করেছে ঠিক সেরকম ছাত্রলীগকেও স্পর্শ করেছে। তার পরিবার একবারও বলার চেষ্টা করেনি সে আমাদের সন্তান নয়, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ও দাবি করেনি সে আমাদের ছাত্র নয় কিন্তু ছাত্রলীগ প্রাণপণ চেষ্টা করেছে বোঝানোর জন্যে যে সে তাদের কর্মী নয়। তার একটি কারণ কী হতে পারে যে একজন মানুষকে দানবে পরিণত করার ব্যাপারে তাদের একটুখানি হলেও দায় রয়েছে?

মাত্র কয়েকদিন আগে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের একজন নেতা তার দলবল নিয়ে শুধু যে একটা রেস্টুরেন্টে ভাঙচুর করেছে তা নয় সেই রেস্টুরেন্টের মালিক কর্মচারীকে পিটিয়ে গুরুতরভাবে আহত করেছে। ক্যাম্পাসে আজকাল অহরহ ছিনতাই হচ্ছে। বাইরের ছিঁচকে সন্ত্রাসীরা ক্যাম্পাসে এসে ছিনতাই করবে তাদের সেরকম সাহস নেই- তাই আসলে কারা ছিনতাই করছে সেটি না জানলেও সবাই ধরে নিয়েছে এটা সঠিক বখরা না পাওয়া ছাত্রলীগের ক্ষুব্ধ কর্মীদের কাণ্ড। ক্যাম্পাসে চাঁদাবাজি যে একেবারে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ পেয়েছে সেটা আর কেউ না জানলেও আমরা খুব ভাল করে জানি। আমাদের ইনস্টিটিউটে একটা ক্যান্টিন চালোনোর জন্যে সিলেট শহরের কাউকেও আমরা রাজি করাতে পারি না- ছাত্রলীগের চাঁদাবাজির আতঙ্কে তারা এদিকে পা বাড়াতে রাজি নয়।

একজন শিক্ষিকাকে ইভটিজিং করা ছাত্র নেতাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করার পরও সে বহাল তবিয়তে ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়ায়। আর এই দেশের সব মানুষই নিজের চোখে দেখেছে বিশ্ববিদ্যায় প্রশাসন কেমন করে ছাত্রলীগের কর্মীদের ব্যবহার করে শিক্ষকদের গায়ে হাত তুলেছিল। ঘটনাটির কথা শুনে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন ছাত্রলীগ থেকে আগাছা উপড়ে ফেলতে। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ কিছু আগাছা উপড়ে ফেলেছিল, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও কিছু ছাত্রলীগ কর্মীদের সাজা দিয়েছিল- কিন্তু তারা সবাই শুধু যে বহাল তবিয়তে আছে তা নয় ছাত্রলীগের সেই কমিটির কোনো একজন সহ-সাধারণ সম্পাদক হচ্ছে এই বদরুল আলম।

কাজেই কেউ যদি মনে করতে থাকে ছাত্রলীগের একজন কর্মী বিশ্ববিদ্যালয়ের একেবারে সরাসরি প্রশ্রয় পেয়ে শত অন্যায় করেও কোনো শাস্তি না পাওয়ার ‘ইনডেমনিটি’ পেয়ে ধীরে ধীরে একজন বদরুল আলম হয়ে ওঠার দুঃসাহস পায় তাহলে কী তাকে কোনো দোষ দেয়া যাবে?

খবরের কাগজে দেখছি চীন বাংলাদেশকে প্রায় পঁচিশ বিলিয়ন ডলারের সাহায্য দিয়েছে। বিশ্বব্যাংক দারিদ্র বিমোচনে বাংলাদেশের ভূমিকা দেখে মুগ্ধ হয়েছে, নিজে এসে দুই বিলিয়ন ডলার দিয়ে গেছে। ক্ষুধার সূচকে বাংলাদেশ ভারতের মত দেশকে পিছিয়ে ফেলে সামনে এসেছে এবং যে বিষয়টি নিয়ে আমি সব সময়ই গর্ব করি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে শুধু শাস্তি দেয়া নয় শাস্তি কার্যকর পর্যন্ত করা হয়েছে। দেশকে নিয়ে এ ধরনের অনেকগুলো বিশাল বিশাল অর্জনের তালিকা করা সম্ভব। কিন্তু সরকার কী জানে, এই ধরনের বিশাল বিশাল অর্জনকে বদরুল আলমের মত একজন সন্ত্রাসী ছাত্রলীগের কর্মী মুহূর্তের মাঝে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে?

আমার ধারণা রামপালে জোর করে বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করতে গিয়ে সরকার এই দেশের মানুষকে যতোটা ক্ষুব্ধ করেছে- বদরুল আলম একা দেশের মানুষকে তার থেকে বেশি ক্ষুব্ধ করেছে। যদি তাই হয় তাহলে কেন আমরা এই দেশের মাটিতে এভাবে দানবের জন্ম হতে দিচ্ছি? কেন তাদের দুধ কলা দিয়ে পুষে যাচ্ছি?

খাদিজাকে দিয়ে শুরু করেছিলাম তাকে দিয়েই শেষ করি। সে এখন আর লাইফ সাপোর্ট সিস্টেমে নেই নিজের শরীরকে দিয়েই জীবন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। তাকে যখন আঘাত করা হয়েছে তখন নিজের হাত দিয়ে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছে বলে হাতে মারাত্মক আঘাত পেয়েছে, সেই হাতে সফল অস্ত্রোপচার হয়েছে। ডাক্তাররা বলেছেন আরো দুই এক সপ্তাহ গেলে তারা আরো নিশ্চিতভাবে খাদিজার সুস্থ হয়ে যাবার কথা বলতে পারবেন।

আমরা সারাদেশের মানুষ তার সুস্থ হয়ে ওঠার খবরটির জন্যে আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে আছি।

-----

মুহম্মদ জাফর ইকবাল : কথাসাহিত্যিক; অধ্যাপক, শাবিপ্রবি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি অনলাইন এবং বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

/dr

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন