শিরোনাম :

ভাষা ও ভালবাসা


মঙ্গলবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১২:২৮ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

ফুলে ফুলে সজ্জিত ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’

সালমা সেতারা

অভিযোগ ছিলো এক রাতজাগা পাখির, ভালো লাগে ভাবনার সৃষ্টি স্বপন। হৃদয়ের মৃত্যু ঘটাবে নির্ঘাত, ভাষা আর ভালবাসা, নির্জন রাত।

হাঁ, আমরা আমাদের ভাষাকে ভালবাসি। এ ভাষার সৃষ্টি স্বর সুরের নিবিড়টানে আর সব ভুলে গেলেও ভুলিনা কখনও দুটি সত্বা। তার একটি হলো “মা” অন্যটি প্রিয়তমা। এই দুটি ভালবাসাই পৃথিবীতে আমাকে শ্রেষ্ঠ ধনি করে দেয়। আর তখনই সম্ভব হয় ভালবাসা বিলিয়ে দেবার সার্বজনীনতা। এ ভালবাসা স্বর্গীয়।

শ্রষ্টা তাঁর সৃষ্টিকে ভালবাসেন করুণা ও দানের মাধ্যমে। তিনিই সৃষ্টি করেছেন বিভিন্ন দেশের জল হাওয়া মাটির ঋতুচরিত্রের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ভূমি সূত মানুষের ভাষা মেজাজ মনন চেতনা ও তৎপ্রসূত কৃষ্টি।

মহান আল্লাহ তাঁর নিজের প্রেমকে সমস্ত সৃষ্টির মাঝে বিলিয়েছেন। আর তাই প্রত্যেকের ভুমি ও ভাষার আবেদনে তৈরি হয় ব্যক্তি প্রেম এবং ব্যক্তি প্রেম ছড়িয়ে যায় মানবিক প্রেমে। মানবিক প্রেম এক সময় রূপ নেয় আধ্যাত্মিক প্রেমে। মানুষ যখন নিজের ভাষায় নিজের বেদনা চাওয়া পাওয়া বিনিময় করতে পারে তখনই তা আবেদনময়, স্পর্শকাতর প্রতিবেদনে রূপ নেয় তাইতো পড়শীর সাথে যেমন গড়া সম্ভব সমব্যথি সখ্যতা তেমনি প্রিয়তমার সাথে প্রেম, মা ও মাতৃভুমির সাথে অপত্য, মানুষে মানুষে প্রীতিবন্ধন। বহির্দেশীয় ভাষাকে আয়ত্ব করে এই ভালবাসা পেরিয়ে যায় ভূগোল সীমা। যেমন করে সিয়েরালিয়নে সরকারি ভাষা রূপে প্রতিষ্ঠিত হলো বাংলা ভাষা। জাতিসংঘ মিশনে আমাদের সেনা বাহিনীরা নিয়োজিত বিভিন্ন দেশে। সে পর্যায়ে ২০০৪ সালের কঙ্গো মিশনের একটা ঘটনা বলছি।

“কঙ্গো”, এটি একটি আফ্রিকান দেশ। সেখান থেকে ফিরে এসে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীদল এনটিভিতে এক সাক্ষাৎকারের সাথে কঙ্গোর কিছু চিত্র দেখায়। যেমন তাদের কাজকর্ম আবেগ অনুভূতি বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষা প্রীতি। দুজন কঙ্গো যুবককে দেখানো হলো, তারা সুন্দর বাংলা বলছে। একজন বলছে আমাদের অতি পরিচিত সেই প্রবাদ- কাজ আছে ভাত আছে। কাজ নেই ভাত নেই। আর একজনকে বলা হলো, তুমি বাংলা বলতে পারো? সে তখন খুব মিষ্টি হেঁসে শুধু পারি একথাই বললো না! বরং সে রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লার সেই বিখ্যাত গান- “ভাল আছি ভাল থেকো আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো”। তারপর সে একটু দুষ্টুমি করে দিও তোমার মালাখানি কঙ্গোর এই মানুষকে। গানের চরণ দু'খানি গাওয়া শেষে সে বললো বাংলাদেশ ভাল কঙ্গো ভাল না জঙ্গল অভাব। বাংলাদেশ ভালবাসি। আশ্চর্য ও বটে সত্যও বটে এমন ঘটনা, এভাবেই মানুষ জীবনের মৌলিক সাধনায় উপনীত হয়ে শ্রষ্টার খোজে বুকের গোপন কন্দরে।

মানব মানবীর স্বীকৃত যুগলের কোল জুড়ে যখন প্রেমের ফসল স্বরূপ সন্তান আসে তখন দাম্পত্য প্রেম সদৃঢ় হয়। সন্তান যখন মায়ের মুখের দিকে চেয়ে মায়েরি ভাষার আধোবোল বাধো বাধো উচ্চারণে প্রথম মা, বাবা বলে ডেকে ওঠে, তখন দম্পতির হৃদয়ে অপূর্ব এক স্বর্গীয় ঝর্ণা অপত্য স্নেহের নিঃস্বরণে ছুটে চলে এক অনাবিল আনন্দ পানে পিতামাতা তখন আকুল হয়ে সন্তানের মুখচুম্বন করেন। আর তখনই সৃষ্টি কর্তা তার কুদরতের প্রতি ভালবাসা দেখে খুশি হন।

ফেরেশতাদের বলেন, ঐ দম্পতিকে ১০টি পূণ্য দান কর। যেহেতু আমার কুদরতের প্রতি মুগ্ধ মিস্ময়ে চুম্বন করেছে। তাহলে আল্লাহ্ পাকের এই মহিমা থেকে আমরা নিশ্চই বুঝতে পারি ভাষা তাঁরই দান এবং তিনি তার সৃষ্টিকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসেন।

দর্শনিক লালন তার গানে বলেছেন আপন সুরাতে আদম গড়েছেন দয়াময়। নইলে কি আর ফেরেশতারে সেজদা দিতে হয়!

ভালবাসা দেবার বা নেবার সর্বোত্তম উপায় হলো মাতৃভাষা। তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ দেয়া যায় যেমন মীর্জা গালিব ও হাফিজ এর প্রেমের গজল এর বাংলা অনুবাদ কাব্যে। এই প্রবাদ প্রতীম দুই পারস্য কবি প্রিয়াকে ঘিরে যা রচনা করেছিলেন সে গজলগুলোকে আমরা যখন সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের যাদুকরি ছন্দের বাংলায় অনুবাদিত পাই তখন আমরা আমাদের আবেগ দিয়ে বুঝতে পারি। যেমন হাফিজের কবিতার দুখানি ছত্র- অমা যামিনীর গহীন আঁধারে চুপিচুপি এল প্রিয়া, দ্বিগুন আঁধার খর্জুর বীথি তাহারি আড়ালদিয়া, আঙুরের মত অলকগুচ্ছে গোলাপের মালাপরি মৃদু ওষীরের মদির গন্ধে নিশীথ আকাশ ভরি। আর এক কবিতায় গালিব তাঁর প্রিয়াকে বলেছিলেন, নিজের ভাষার একখানি কাব্য হাতে পেলে এতটাই অন্তরে ধনি মনে করেন নিজেকে যে সুলতানকেও তার পদতলের গোলাম মনে হয়।

পারস্য ভাষী কবিদের কাব্যসুধা অবশ্যই দুর্বোধ্য থেকে যেত আমাদের কাছে যদি না বাংলার কবি বাংলা ভাষায় তার কাব্যরূপ না দিত। আমরা বুঝতে পারি প্রত্যেকেরই মা, মাতৃভাষা ও প্রিয়ার আবেদন একই রকম। অকৃত্রিম ও অভিন্ন। ভাষা ও ভালবাসা দুটি দুটির প্রতি উন্মুখ হয়ে সৃষ্টি হয় কালজয়ী কবিতা।

আমাদের পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের ভাষায় - ‘চলতে পথে ময়না কাঁটায়, উত্তরীয় জড়িয়ে যাবে, এঁটেল মাটির হোঁচট লেগে আঁচল হতে ফুল ছড়াবে’। এ দুখানি ছত্রে কি অপূর্ব ভাষার মায়া। বনপথে একা পল্লী যুবতির হোঁচট খেয়ে আঁচলের ফুল ছড়াবার আগে, প্রেম ছড়িয়ে যাবে বাংলাভাষীদের হৃদয়ে। শুধু আমার নয় বাংলাভাষী সব লোকেরি হয়তো এটুকু বিশ্বাস করতে হবে ভালবাসা মিলন বিরহ মান অভিমান ঠিক যতখানি মধুময় হয়ে ওঠে? ত্যাগটুকুও যেন মহিমান্বিত।

আজ আমাদের বাংলাভাষা শুধু সারা বিশ্বেই সীমিত থাকেনি মহাবিশ্বে চলে গেছে অর্থাত স্পেস স্টেশনেও বাংলায় মঙ্গল লেখা হয়েছে। ১৯৫২ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারি, অর্থাৎ আজকের এই দিনে যারা বর্ণমালাকে বুকের রক্তে চিররঙিন করে দিয়ে গেল সেই শহীদদের প্রতি সালাম ও রূহের মাগফেরাত কামনা করি সর্বান্ত করেন।

তৃষ্ণা অনিবার হোক আমাদের ভাষার প্রতি যে তৃষ্ণা মেটাবে আমাদের কপোতাক্ষের জলে। তৃষ্ণা মেটাবে বাংলা ভাষার দুখানি পংক্তি। মিষ্টি সম্বোধন “মা” দাওনাগো মা একটু গুড় মুড়ি। ওরে খোকা আয় ভাত যে ঠাণ্ডা হলো। কিংবা ভালবাসি তোমায় আমি, আমার জন্ম ভুমি। আর যেন চিরদিন শুনি প্রিয়তম কন্ঠ, ওগো শুনছো – আড় চোখে চেয়ে সলাজ কটাক্ষ হেনে চিরদিন যেন দহি, ভাষা ও ভালবাসার মিষ্টি দহনে।

এই মহান ভাষা দিবসে ও ভালবাসা দিবসের অঙ্গীকার হোক।, ভাষাকে ভালবেসে ও ভাষার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে চর্চিত হোক সুস্থ মানবিক জীবন।

এসএস

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন