শিরোনাম :

ভিন্নমতকে বিকশিত হতে দিন


বৃহস্পতিবার, ৬ জুলাই ২০১৭, ০৪:৩০ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

ভিন্নমতকে বিকশিত হতে দিন

প্রভাষ আমিন: বাংলাদেশের বর্তমান পশ্চাতমুখী যাত্রা, সাম্প্রদায়িকতার প্রসার, অন্ধকার শক্তির বিস্তারের জন্য আমি দু’জন ব্যক্তিকে সবচেয়ে বেশি দায়ী করি। তাদের একজন হলেন ‘আমার দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, অপরজন ফরহাদ মজহার। দায়টা যদি একজনকে দিতে বলেন, তাহলে সেটা অবশ্যই পাবেন ফরহাদ মজহার। কারণ চিন্তার দূষণটাই যে কোনও জাতির জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর। বুদ্ধিবৃত্তিক অপরাধের প্রভাব অনেক ব্যাপক।

ফরহাদ মজহার অনেকদিন ধরেই তার কলুষিত চিন্তা, দুষিত ভাবনা দিয়ে জাতিকে পিছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে আসছেন। ফরহাদ মজহার তার ভাবনা কখনও মাহমুদুর রহমানকে দিয়ে প্রচার করান, কখনও হেফাজতে ইসলামকে দিয়ে প্রয়োগ করান, কখনও মৌলবাদী শক্তিকে লেলিয়ে দেন মুক্তমনা ব্লগারদের বিরুদ্ধে।

ফরহাদ মজহারের পুরো জীবনটাই বিভ্রান্তির। একদা সর্বহারা বামপন্থী ফরহাদ মজহার এখন হেফাজতে ইসলামের তাত্ত্বিক নেতা। ফরহাদ মজহারের কথিত অপহরণের পর ফেসবুকে তার সম্পর্কে নানান কথা লেখা হয়েছে। তার লেখার নানা রেফারেন্স দিয়ে অনেকে প্রমাণের চেষ্টা করেছেন, একসময় তিনি নাস্তিক ছিলেন; আর এখন তিনি ‘নাস্তিক ব্লগার’দের হত্যার উস্কানি দেন। এমনকি ফরিদা আখতারের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে কিনা, তা নিয়েও অনেকের প্রশ্ন।

নিজে সারাজীবন ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা করে এসে, কখনও লালন, কখনও কালির সাধনা করে আসা একজন ব্যক্তি যখন এখন হেফাজতে ইসলামের পক্ষে অবস্থান নেন। ফরহাদ মজহারের ব্যক্তিগত বিশ্বাস-অবিশ্বাস, বিভ্রান্তি, ব্যক্তিজীবন নিয়ে আমার কোনও আগ্রহ থাকতো না; যদি তিনি তার সেই বিভ্রান্তি জাতির মাঝে ছড়িয়ে দিতে না চাইতেন। মানুষের বিশ্বাসের বদল হতেই পারে। সারাজীবন ঘোরতর নাস্তিক কোনও ব্যক্তি মরার আগে আস্তিক বনে যেতে পারেন। কিন্তু আমার আপত্তি তখনই, যখন ফরহাদ মজহারের মতো কেউ কেউ তার সেই বিভ্রান্তি, অসুস্থ মানসিকতা অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চান, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে উসকানি দেন, হত্যার পক্ষে সাফাই গান, যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে দাড়ান; তখন।

ফরহাদ মাজহারকে আমি এখন যতটা অপছন্দ করি, চারবছর আগে ততটা করতাম না। বরং তার বেশকিছু কবিতা ভালো লাগতো, এখনও লাগে। নব্বইয়ের দশকে তার বেশকিছু গানও ভালো লেগেছিল। কিন্তু ২০১৩ সালের পর ফরহাদ মজহার যখন তার সমস্ত চিন্তা যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে, মৌলবাদীদের পক্ষে, গণজাগরণ মঞ্চকে ব্যয় করার কাজে ব্যয় করা শুরু করলেন। যখন তিনি সাধারণ বোমাবাজদের সঙ্গে তুলনা করে মুক্তিযোদ্ধাদেরও সন্ত্রাসী বললেন, যখন তিনি বাংলাদেশের হাজার সমস্যা ফেলে ভারতে মুসলিম নিধনের প্রসঙ্গ তুলে সাম্প্রদায়িক সুরসুরি দেওয়ার চেষ্টা করলেন; তখন বুঝলাম পচা বামের চেয়ে খারাপ ও বিপদজনক আর কিছু নেই।

বাংলাদেশের সবচেয়ে মহৎ আন্দোলনের একটি গণজাগরণ মঞ্চকে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে হেয় করার মূল কাজটি করেছেন ফরহাদ মজহার। শুরুতে গণজাগরণ মঞ্চ নিয়ে বিপাকে পড়েছিল বিএনপি। এমন একটি আন্দোলন, এর পক্ষেও যাওয়া যায় না, বিপক্ষেও যায় না। আন্দোলন সরকারের বিরুদ্ধে, কিন্তু আওয়ামী লীগই গণজাগরণ মঞ্চের পাশে দাঁড়ালো, বিএনপি আবারও বিএনপি মিস করলো ট্রেন। বিএনপিকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করলেন ফরহাদ মজহার।

প্রথমে মাহমুদুর রহমানের আমার দেশ, পরে আল্লামা শফীর হেফাজতকে দিয়ে গণজাগরণ মঞ্চকে ‘নাস্তিকদের মঞ্চ’ বানিয়ে দিলেন। শুধু তখনই বিএনপি গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারলো।

এতকিছুর পরও ফরহাদ মজহারের নিখোঁজ হওয়ার খবরে ভয়ের একটা শীতল স্রোত আমাকে গ্রাস করলো।

ফরহাদ মজহার সরকারেরও তীব্র সমালোচক। আমার মতো অনেকের সাথেই তার মত মেলে না। কিন্তু তাই বলে তুলে নিয়ে যাওয়া? ভিন্নমত তো অপরাধ নয়। আপনি মতের জবাবে ভিন্নমত, যুক্তির জবাবে পাল্টা যুক্তি, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে গালির জবাবে গালি দিতে পারেন। কিন্তু মুখোশের আড়ালে থেকে তুলে নিয়ে গেলে তো খেলা শেষ। কারো ভিন্নমত অপরাধের পর্যায়ে গেলে বা সাম্প্রদায়িক উসকানির পর্যায়ে গেলে সরকার তাকে আইনের আওতায় আনতে পারে। ফরজাদ মজহারের কোনও কোনও বক্তব্যে তেমন উপাদান থাকতেও পারে। সেটা বিবেচনা করবে সরকার। কিন্তু তুলে নিয়ে ভয় দেখানো সবসময়ই ভয়ঙ্কর। আমরা আইনের শাসন চাই, প্রতিহিংসার নয়। আমি সবসময় সবধরনের বিচার বহির্ভূত কর্মকাণ্ডের বিপক্ষে। আমি কোনও ক্রসফায়ারের পক্ষে নই। আমি যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই, ক্রসফায়ার নয়। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী এবং যুদ্ধাপরাধীরা আইনের সর্বোচ্চ প্রটেকশন পেয়েছে। যা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় চমৎকার উদাহরণ হয়ে থাকবে। কিন্তু এই সরকারের আমলেই যখন ভিন্নমতের মানুষেরা গুম হয়ে যায়, ছিঁচকে সন্ত্রাসীরা ক্রসফায়ারে মরে যায়; আমরা মেলাতে পারি না।

বলছিলাম ভয়ের কথা। ফরহাদ মজহারের নিখোঁজ হওয়ার খবরে আমি দারুণ ভয় পেয়েছি। তারচেয়েও বেশি ভয় পেয়েছি, তার নিখোঁজের খবরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকের উল্লাস দেখে। ১৮ ঘণ্টা পর ফরহাদ মজহারকে যশোর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু এই ১৮ ঘণ্টায় ফেসবুকে ফরহাদ মজহারের অতীতের নানা অপকর্ম, তার সংসার জীবন, তার লেখালেখি, টক শো, এমনকি তার পরণের লুঙ্গি নিয়েও অনেক সমালোচনা হয়েছে। অতীত টেনে অনেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, ফরহাদ মজহারের হারিয়ে যাওয়াটা জাতির জন্য কতটা দরকার। অনেকে তাকে খুঁজে পাওয়ার আগেই একে ‘নাটক’ বা ‘আত্মঅপহরণ’ বলে মজা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এইসব প্রতিক্রিয়া দেখে আমি টের পেয়েছি ভেতরে ভেতরে আমরা কতটা নিষ্ঠুর, অমানবিক, অসহিষ্ণু। অনেকে বলছেন, ফরহাদ মজহারও তো ব্লগারদের হত্যাকারীদের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। সেটা করে ফরহাদ মজহার যদি খারাপ হয়ে থাকেন, তার নিখোঁজে উল্লসিত হয়ে আপনিও তো নিজেকে খারাপ, অমানবিক, নিষ্ঠুর প্রমাণ করলেন। তুমি অধম, তাই বলিয়া আমি উত্তম হইবো না কেন?

অনেকে বলছেন, ফরহাদ মজহার যা বলছেন, তা নিছক ভিন্নমত নয়; অপরাধ, উসকানি। তা যদি হয়ও, সেটা তো রাষ্ট্র ঠিক করবে, আপনি বা আমি নই। আমার কাছে ফরহাদ মজহারের মত পছন্দ নয়, কিন্তু দেশে অনেক লোক আছে, যারা তার মত পছন্দ করেন।

ফরহাদ মজহারের হারিয়ে যাওয়া আর ফিরে আসার মধ্যে অনেক নাটক আছে, অসংখ্য প্রশ্ন আছে। বাসা থেকে বেরুনো নিয়ে দুটি কথা আছে। ফরহাদ মজহার নিজে আদালতে বলেছেন, তিনি ওষুধ কিনতে বেরিয়েছিলেন। কোনও কোনও পত্রিকায় এসেছে, তিনি কারও ফোন পেয়ে তিনি বেরিয়েছেন। ফোন পেয়ে বেরিয়েছিলেন কিনা তা তার কললিস্ট দেখলেই বোঝা যাবে। আর অত ভোরে তিনি কী এমন জরুরি ওষুধ কিনতে বেরিয়েছিলেন, সেটাও কাউকে কাউজে কৌতুহলী করেছে। তবে ফোন পেয়ে হোক আর ওষুধ কিনতেই হোক, অত ভোরে বাসার কাউকে কিছু না বলে বেরুনোটা একটু অস্বাভাবিক। আরও অনেক প্রশ্ন আছে। তিনি কেন নিয়মিত ফোন না নিয়ে বেরুলেন?

কথিত অপহরণকারীরা কেন তার ফোন খোলা রেখে তাদের অবস্থান জানান দিল? ছাড়া পাওয়ার পরও তিনি বাসায় যোগাযোগ করেননি কেন? এমন অসংখ্য প্রশ্নের জবাব পাওয়াটা জরুরি। আশা করি ফরহাদ মজহার এবং সরকার মিলে পুরো বিষয়টি পরিষ্কার করবেন। যে বা যারাই এটা করে থাকুক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

অনেকের দাবি অনুযায়ী যদি ফরহাদ মজহার নিজেই এটা করে থাকেন, ব্যবস্থা নেওয়া হোক তার বিরুদ্ধেও। আদালতে ফরহাদ মজহার একটা সত্যি কথা বলেছেন, যারা সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে চায়, তারাই এটা করেছে। আমিও এটাই বিশ্বাস করি। ফরহাদ মজহারের মতো লোককে নিয়ে এই নাটকে সরকারের কোনও লাভ হয়নি, পুরোটাই ক্ষতি। লাভ হয়েছে শুধু ফরহাদ মজহারেরই। মুফতে অনেকের সহানুভূতি পেয়েছেন তিনি। তাই সরকারের উচিত যারা এই ঘটনা ঘটিয়ে সরকারকে বিপাকে ফেলতে চাইছে, তাদের খুঁজে বের করা হোক।

আর সব মতের মানুষের কাছে প্রত্যাশা, আমরা যেন ভিন্নমতকে ভিন্নমত হিসেবেই দেখি। ফরহাদ মজহারের মতের সঙ্গে আমার মেলে না। কিন্তু তার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় আমি সবসময় সচেষ্ট থাকবো। তার কাছ থেকে যৌক্তিক অবস্থান আশা করবো, তার সুমতি চাইবো; কিন্তু অমঙ্গল চাইবো না।

ফরহাদ মজহারের দুর্গতিতে আমরা যারা উল্লসিত, মনে রাখা দরকার এমন দিন আমাদেরও আসতে পারে। তখন হয়তো আমাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কাউকে পাবো না। কোনও অন্ধকার শক্তিকেই কখনো প্রশ্রয় দিতে নেই। সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন