শিরোনাম :

দুর্ভোগের দখিন দুয়ার


শনিবার, ৮ জুলাই ২০১৭, ০৪:৫১ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

দুর্ভোগের দখিন দুয়ার

তুষার আবদুল্লাহ: দুর্ভোগের দখিন দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। সেবকেরা আমাদের এই দুয়ারে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আমরা ভাসছি জলে। থমকে আছি জটে। শয্যা নিয়েছি মশকের দংশনে। ঘণ্টাখানেকের বৃষ্টিতেই রাজধানীর রাজপথ-গলিপথে হাঁটুজল কোথাও কোথাও কোমরে গিয়ে ঠেকছে। ২৪ ঘণ্টা পরেও অনেক এলাকা থেকে পানি সরছে না। অতিবৃষ্টিতে দুই সিটি করপোরেশনের খুব কম সড়কই আছে, যেখানে খানা-খন্দ তৈরি হয়নি। যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে উঠেছে কোনও কোনও রাস্তা। আবর্জনায় ভরাট হয়ে নর্দমার জল ঢুকে পড়ছে বাসাবাড়িতে। আবর্জনা অপসারণ করা হচ্ছে না অনেক এলাকা থেকে। কোনও কোনও এলাকায় ব্যস্ত সড়কে আবর্জনা এনে জড়ো করাতে বৃষ্টিতে সেগুলো ছড়িয়ে পড়ছে। সঙ্গে আছে যানজট।

ঢাকা শহরকে নিয়ে পুলিশ বিভাগের নীরিক্ষা শেষ হয়নি। একেক দিন একেক ভাবে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে তারা। যানবাহন চলাচলের জন্য তৈরি সড়ক বা পথ বন্ধ রেখে যানজট নিয়ন্ত্রণের সূত্র আবিষ্কার করছে ট্রাফিক বিভাগ। সঙ্গে আছে ভিআইপির দৌরাত্ম। সবমিলিয়ে যানজট ও অবৈধ পার্কিংয়ে অচল শহর ঢাকা। বাড়তি হিসেবে আছে নানা উন্নয়ন কাজের জন্য ক্ষত-বিক্ষত সড়ক। আর পীড়ন?

চিকনগুনিয়া মহামারীর মতোই ছড়িয়ে পড়েছে শহরময়। এমন কোনও পরিবার খুঁজে পাওয়া মুশকিল, যে পরিবার চিকনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়নি।

রাজধানী থেকে চট্টগ্রামের দিকে তাকালে আঁতকে উঠতে হয়। একটি বন্দর নগরী কিভাবে ভাসমান শহর হয়ে গেলো? সেই ভাসমান শহরে নর্দমার পানির তোড়ে হারিয়ে গেলেন একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা। একটানা কয়েকঘণ্টা বৃষ্টি হলেই পুরো নগরবাসী পানি বন্দি। খাল-নর্দমা ভরাট হয়ে বৃষ্টির পানি নেমে যেতে পারছে না। পাহাড়ের বালু ও মাটিতে ভরাট হয়ে থাকা নর্দমা পরিষ্কার করা হয় না বলে পানি সরে যাওয়ার পথগুলো প্রায় বন্ধ।

শহরের মাস্টারপ্ল্যানকে তোয়াক্কা করেনি নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং সিটি করপোরেশন। নগরের কোন কাজ কে করবে তা নিয়ে দ্বন্দ্ব চিরবিরাজমান। এই দ্বন্দ্বেই জল আটকে থাকে। আটকে থাকে যানবাহনও। সমন্বয় নেই বন্দরনগরীর উন্নয়ন ও পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত কুড়িটির বেশি সেবা সংস্থার মধ্যে। সমন্বয়হীনতা সিলেট, খুলনা, গাজীপুর, রংপুর, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জসহ কোনও সিটি করপোরেশনেই নেই।

রাজধানী ঢাকায় কাজ করছে যে পঞ্চাশটিরও বেশি সংস্থা তারাও বিক্ষিপ্ত ভাবে কাজ করছে। যখন একক সিটি করপোরেশন ছিল তখনও কারো সঙ্গে কারো যোগাযোগ বা মান্যগণ্য ছিল না, এখন দুই সিটি করপোরেশনে বিভক্ত হওয়ার পর সেই বিশৃঙ্খলা এখন আরও প্রকট হয়েছে। দেশের সকল নগরে সবাই উন্নয়নের একক নৈপুণ্য দেখাতে চায়। এই প্রবণতা যেমন সংস্থার রয়েছে, তেমনি ব্যক্তিরও। একক নৈপুণ্যে কোনএ সমাধান বা জয় আসে না। নগর সেবা দলবদ্ধ প্রয়াসের বিষয়। কিন্তু নগরপিতারাও মনে করেন তারা একক ভাবে নগরবাসীকে ‘ইউটোপিয়া’তে নিয়ে যাবেন। তাদের এই ভাবনায় যে ভেজাল আছে তার প্রমাণ একেকটি শহর কেমন দিনকে দিন দুর্ভোগের ভাগাড় হয়ে উঠছে।

রাজধানী, বন্দরনগরী, মহানগরের এই রূপ জেলা, উপজেলা, ইউনিয়নে সংক্রামিত হয়েছে। সেখানেও উন্নয়ন এবং উন্নয়নকাজের তদারকির মধ্যে কোনও সমন্বয় নেই। ফলে বাঁধ তৈরি হচ্ছে অপরিকল্পিত ভাবে। কোন এলঅকা, কোন নদীর জন্য কত উচ্চতার বাঁধ হবে, তা বিবেচনায় থাকছে না। বাঁধ মেরামত ও রক্ষাতেও রয়েছে সমন্বয়হীনতা। ফলে বৃষ্টি হওয়া মাত্র বা নদীতে পানি বাড়লেই বাঁধ ভেঙে জোয়ারের পানি ফসলী জমি এবং বসত এলাকায় ঢুকে পড়ছে। হাওড়ের বাঁধ কেমন হবে, কিভাবে রক্ষা হবে তা নিয়েও পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। ঘাটতি আছে জেলা, উপজেলার রাস্তা মেরামত কাজেও।

পার্বত্য এলাকার পাহাড় কাটা বন্ধ করা, পাহাড়কে রক্ষার জন্যও কোন সমন্বিত উদ্যোগ নেই। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র অবধি উন্নয়ন কাজে বাজেট বরাদ্দে ঘাটতি কমে আসলেও, কমে আসেনি কাজ নিপুন ভাবে করার সক্ষমতা এবং তদারকির দায়িত্বশীলতা। এই ঘাটতি এবং দায়িত্বহীনতাই এখন রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সংকট। এই সংকট থেকে না বের হতে পারলে উন্নয়নের মহাসড়কে চলাচল সুখকর হবে না। বরং মহাসড়কে উঠতে না পেরে দুর্ভোগের দখিন দুয়ারেই দাঁড়িয়ে থাকবো। সূত্র: বাংলাট্রিউন

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন