শিরোনাম :

হুমায়ূনী প্রেম হুমায়ূনী মন: কেঁদেও পাবে না তাকে


বৃহস্পতিবার, ২০ জুলাই ২০১৭, ০৩:১১ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

হুমায়ূনী প্রেম হুমায়ূনী মন: কেঁদেও পাবে না তাকে

ফারুক ওয়াসিফ: হ‌ুমায়ূনী জগৎ অনেক দূরের মনে হয়। জরীর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। নিচতলায় তারই আলোবাদ্য। চিলেকোঠায় জ্বরের ঘোরে আনিসের হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। বেনারসি সাজে জরী সোনালী হয়ে আনিসকে শেষবার দেখতে আসছে। অভাবে নিশিকন্যা হয়ে যাওয়া তিথি মেয়েটা ঢাকার রাস্তার রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার সাধ, তার যা নেই সেই প্রেম—যাকে তিথি টেনে বৃষ্টির ছাদে নিয়ে ভিজবে একসঙ্গে। মুনার সামনে চিরকাল থতমত হয়ে থাকা মাস্তান বাকের ভাই, মেসের ঘরে নিঃসঙ্গ জ্যোতিষ নিশিকান্ত...না, কোথাও আর কেউ নেই। এই মৃদু মানুষেরা তাদের জগৎসহ কবে উবে গেছে!

হ‌ুমায়ূনের মৃদু মানুষদের সরিয়ে এসেছে প্রবল মানুষদের দুর্ধর্ষ সময়। তাঁর প্রয়াণের পরপরই প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে লিখেছিলাম: ‘আমরা যারা শহর-নিমশহরে মানুষ হয়েছি, আমাদের শৈশব-কৈশোরটা কোনোভাবেই “পথের পাঁচালী”র অপু-দুর্গার মতো হওয়ার নয়। “অপরাজিত”র তরুণ অপুর কলকাতাবাসের অভিজ্ঞতাও আমাদের নয়। আমাদের উদাস দুপুর, আমাদের অকারণ মন খারাপের কথা কেউ তো বলেনি। আমাদের অসচ্ছল সংসারের এই সব দিনরাত্রিতে কত ছোট ছোট অনুভূতির ফুল ফোটে আর ঝরে, কে তা খেয়াল করে? এসব মৃদু মানুষের মৃদু জীবনের নন্দিত নরকের কথা বলবেন কোন ঈশ্বর? কে আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনের মায়াকে আমাদেরই একজন হয়ে, আমাদেরই মতো করে, আমাদেরই ভাষায় প্রকাশ করবেন? নগর-উপনগর আর মফস্বলে আমরা সামান্য হয়ে ছিলাম। হ‌ুমায়ূন আহমেদ আমাদের তুলে নিয়ে তাঁর জগৎ সাজালেন, মনের আয়নায় বড় করে দেখালেন।’ (মৃদু মানুষের দ্রষ্টা)

সেই মায়ার আয়নাখানা হ‌ুমায়ূনের সঙ্গে সঙ্গেই হারিয়ে গেছে। মৃদু মানুষেরা এই দুনিয়ায় অচল মুদ্রার মতো, আগ্রহ জাগায় কিন্তু বাজারে বিকায় না। হ‌ুমায়ূনী জগৎ অনেক দূরের মনে হয়। হ‌ুমায়ূনের শহর, হ‌ুমায়ূনের প্রেমিক-প্রেমিকা, হ‌ুমায়ূনের মানুষের মন; ‘কোথায় পাব তারে’?

২.
সেটা ছিল আমাদের ভরাট সম্পর্কের যুগ। সেটা ছিল আমাদের সারল্যেরও সময়। সেই জগতে জীবনটা রাংতার মতো একদিকে চকচকে আরেকদিকে ফাঁকা হয়ে ছিল না। হ‌ুমায়ূনের খোকা, আনিস, পরী, রূপা, নীলা, রুনু, রাবেয়া ও মন্টুদের সঙ্গ পেয়ে আমরা বড় হয়ে উঠি। তাঁর উপন্যাসের পরিবার যেন আমাদেরই প্রতিবেশী। পাড়ার মাস্তানটি তাঁর কাহিনিতে ভালোবাসার রাজপুত্তুর হয়ে ওঠে। হ‌ুমায়ূনের মায়ার ছোঁয়ায় সবই কত মানবিক, কত আপন আর চেনা। এভাবে হ‌ুমায়ূন আমাদের গত তিন-চার দশকের মফস্বলি-ঢাকাই মধ্যবিত্তের জীবনী লিখতে থাকেন। শুধু মধ্যবিত্ত বললে এদের মনটা বোঝা যায় না, তাই নাম দিয়েছি মৃদু মানুষ। এদের তীব্র জীবনসংগ্রাম, গভীর ভালোবাসা আর ট্র্যাজিক পরিণতি সত্ত্বেও মৃদু বলার কারণ তাদের প্রান্তিকতা।

স্যাঁতসেঁতে দিশাহীন পরিবেশে এসব মৃদু মানুষেরা জীবন অতিবাহিত করছে। তারা ইতিহাস গড়বে না, বিদ্রোহ করবে না, এমনকি গভীর কোনো চিন্তাও নেই তাদের। তারা কেবল একটু ভালো করে জীবনের আস্বাদন চায়। দিন শেষে তারা অতি সাধারণ। অসাধারণ কিছুই ঘটে না তাদের জীবনে। মামুলি খুটখাটে ভরা তাদের কর্মকাণ্ড। সব আহ্লাদ সব সুখ-সাধ বিসর্জনে গেলেও পরের দিনটি শুরু করার অধ্যবসায়ে কোনো কমতি নেই তাদের। হ‌ুমায়ূনের মধ্য ও নিম্নবিত্ত মানুষেরা জীবনের গোড়া বাঁধতে বাঁধতেই আয়ু শেষ করে দেয়।

তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে এখনো আমরা আমাদের অতীতকেই ফিরে দেখি।

বিশ্বায়ন, মুক্তবাজার, নগরায়ণ, ডিজিটালাইজেশনের টনিকে আমরা বদলে গেছি। যাবতীয় সলিড সম্পর্ক তরল হয়ে যাচ্ছে। এ সময়ের প্রেম বাসনার স্রোতে তরলের মতো—দাঁড়ায় না, টেকসই আদল পায় না। আমরা সম্পর্কের জালে ভাসি বটে কিন্তু বন্ধন গড়ি না। স্থায়ী সম্পর্ক কেমন ভারি লাগে, ভয় পাই দায় নিতে। অস্তিত্বের অসহ্য নির্ভার নিয়ে আমরা উড়ে যেতে থাকি সম্পর্কহীনতার শূন্য স্পেসে। হ‌ুমায়ূনী আবেগে দূরে কোথাও যাওয়ার উপায় আর নেই, সব আমরা গিয়ে ফেলেছি, জেনে ফেলেছি। মোহমুগ্ধতা হারানো দৃষ্টি লুকাতে চোখের মণির ওপর পরতে শিখেছি নানা রঙের লেন্স।

কেনাকাটার হাত খোলা, মেলামেশায় শরীরখোলা, যোগাযোগে অজড়িত থাকার এই নতুন পরিবেশে হ‌ুমায়ূনের আনিস, শফিক, পরী, নীলারা এক পাশে সরে যায় তাদের নিদাগ হৃদয় আর তীব্র অভিমানসহ। এ রকম সময়ে কোথায় খুঁজে পাব হ‌ুমায়ূনী ভাবালুতা, রোমান্টিকতা? কোথায় পাব হ‌ুমায়ূনী শহর, যার পথে হাঁটা যায়, বৃষ্টিতে ভেজা যায়, মেঘের দুপুরে যে শহর নির্জন হতে জানে! হ‌ুমায়ূন যত দিন ছিলেন, তত দিন অন্তত তাঁর কল্পনামারফত ওই সব অনুভূতিময় জগতের সঙ্গে আমাদের দেখা হতো। হ‌ুমায়ূনের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে তারাও কি লোপ পেয়ে গেল?

প্রতিষ্ঠার চলন্ত সিঁড়িতে উঠেও অন্যদের থেকে এগিয়ে থাকতে দৌড়াতে হয় এখনকার তরুণ-তরুণীদের। হ‌ুমায়ূনী তারুণ্যের এমন উদগ্র ক্যারিয়ার-সচেতনতা ছিল না। পরিবারের একটি ভাই বা বোন বেকার থেকে যাওয়া সম্ভব ছিল। মৃদু গঞ্জনা সত্ত্বেও তার দায়িত্ব নিত অন্য ভাই বা বোন। এবং কোনো জরি বা অপালা সেই বেকার, উদাস যুবকদের প্রেমেও পড়ে যেত। আর ছিল সময়। অবসর ছিল ভাবার, উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরির এবং সম্পর্ক গড়ার। জীবনের গতি আর সময়ের গতি এত অস্থির ছিল না তখন।

বাংলাদেশ আজ নিদারুণ এক জায়গায় এসেছে। মৃদু তরুণেরা মুখ লুকিয়েছে হ‌ুমায়ূনের সাহিত্যে, আর সারা দেশের দেয়ালে দেয়ালে নির্লজ্জভাবে সাঁটা আছে প্রবল তরুণদের পোস্টার। সন্ত্রাসী-ধর্ষক-দখলদার যুবনেতারাও তরুণ, হুমায়ূনের নায়ক-নায়িকারাও তরুণ। পৃথিবীর আর কোথাও সমাজবিরোধীরা রাজনীতির মাধ্যমে এত খোলাখুলিভাবে আত্মপ্রকাশ করেনি। আর কোথাও দুর্বৃত্ত তরুণদের পোস্টার ঢেকে দেয়নি সময়ের তারুণ্যের মুখ। দুর্বৃত্ত অর্থনীতি ও রাজনীতি আর করপোরেট কালচার ইন্ডাস্ট্রি যে তারুণ্য তৈরি করেছে, তারাই সরের মতো ভেসে উঠেছে ওপরে। তাদের নির্লজ্জ হাসি হ‌ুমায়ূনের তরুণদের পরিহাস করে বলে, ‘কী বোকা, কী ফালতু, কী তুচ্ছ ছিল তোমাদের জীবন!’

আজকের মাস্তানদের তুলনায় হ‌ুমায়ূনের বাকের ভাইকে মনে হবে দেবতা। হ‌ুমায়ূনের রংবাজ-মাস্তানদেরও আমরা মিস করি, তাদের জন্যও আমাদের মন পোড়াতে পারে। মানুষ পদবাচ্যই তারা ছিল, চাপাতি বদরুল কিংবা ইয়াবা ভাই হওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।

এদিকে আশার শহর জাদুর শহর পরিণত হয়েছে ভয় আর ভোগান্তির শহরে। এ শহর কারও নয়, শুধু টাকার আর ক্ষমতার। নিসর্গহীন, সমাজহীন এ শহরের সড়ক ও শপিং মলে আমরা সবাই সবার কাছে আগন্তুক—স্ট্রেঞ্জার। এখানে সবাই সবার অচেনা—অপর। এখানে আর হ‌ুমায়ূনী গল্প জমবে কি?

শেষ দিকে হ‌ুমায়ূনও সম্ভবত এই নতুন বাস্তবতার থই পাচ্ছিলেন না। তাই আরও পেছনে তাকাতে শুরু করেন, আরও আগের গল্প বুনতে থাকেন, ইতিহাস খুঁড়ে জীবন হাতড়াতে থাকেন এই মাতাল হাওয়ায়। চক্র পূর্ণ হয়, মৃদু মানুষের দ্রষ্টা আরও একা হতে শুরু করেন। স্মৃতির ছবিতে সন-তারিখ দাগানো থাকে না, তেমনি হ‌ুমায়ূনের চরিত্ররাও সময়হীন এক মায়াপুরীর বাসিন্দা। হ‌ুমায়ূনও যাত্রা করেছেন সময় থেকে সময়হীনতার দিকে। জীবননান্দ দাশ যেমন রূপসী বাংলায় হারানো বাংলাদেশকে ধরে রেখেছেন, হুমায়ূন তেমনি জীইয়ে রেখেছেন সেইসব ভাবপ্রবণ যুবক-যুবতী আর খেয়ালী মানুষদের। সেই লুপ্ত জগতে চিরকালের মতো একটা গান বাজতে থাকে:
‘Where have all the soldiers gone?
Gone to graveyards, everyone.
Oh, when will they ever learn?
Oh, when will they ever learn?’

৩.
দুপুর বেলা সব শুনশান হয়ে গেলে পাশের বাড়িতে ছোটনফু’র ঘরে যেতাম। বড় ঘরের শান দেওয়া শ্যাওলা-কালো মেঝে মোছা হয়ে গেছে। ছোটনফুকে মাঝে রেখে দেওয়ালের দিকে মাথা দিয়ে সার বেঁধে আমি, ময়না, টুটু, সুমন, নোটন- সবাই। বিবিধ বয়সী হলেও কেউ ১২-১৫ এর বেশি না। সেরকম দুক্কুরবেলায় শীতল মেঝেটায় পিঠ পেতে আমরা গল্প শুনতাম। হুমায়ূনের প্রথম কোনো গল্প এভাবেই আসে আমার কাছে। সম্ভবত, ‘তোমাদের জন্য ভালবাসাটা’ই প্রথম কিংবা ‘দেবী’ও হতে পারে। সালটা সম্ভবত ৮৫-৮৬।

দলিত হওয়া প্রথম কুঁড়ি যারা আর হবে না, তাদের হুমায়ূন, বয়সের মায়ার মতো। থাকে কিন্তু মুঠার মধ্যে ধরা যায় না। সেই হুমায়ুন মায়ালোক ছেড়েছেন, মায়া কাটিয়েই আবার তাঁকে পড়া দরকার। যে মানুষ দানবীয় শক্তি নিয়ে একটি যুগের মধ্যবিত্তীয় সাহিত্যরুচি গড়ে দিয়েছেন, তাঁকে পাতলা আবেগের ঝালরে রাখা-ফেলা করা উচিত নয়। যাঁর গল্প পড়লে অভিভূত হতে হয়, সেই হাসান আজিজুল হক লিখেছেন তিনি আবার হুমায়ূন পড়া শুরু করবেন। আমারও আবার সেরকম দুপুর ফিরে পাওয়া চাই, সেরকম শীতল মেঝে, আর হুমায়ূনেরই বই থেকে উঠে আসা ছোটন ফুপুর সঙ্গ চাই। সে কি আর সম্ভবে না। প্রথম চৈতন্যের অষ্ফূট সুখ-দুঃখ, অধরা বিষণ্নতা যদি আবারো ফেরানো যেত তাহলে হয়তো হুমায়ূনও ফিরতেন তাঁর মায়াবাস্তবের জগৎসহ।

কিন্তু ‘যো দিন গ্যায়া সো গ্যায়া’। কেঁদেও পাবে না তাকে! প্রথম আলো

ফারুক ওয়াসিফ: লেখক ও সাংবাদিক।
faruk.wasif@prothom-alo.info

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন