শিরোনাম :

‘পরামর্শ’ কেন...


বৃহস্পতিবার, ১৭ আগস্ট ২০১৭, ০৫:৪০ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

‘পরামর্শ’ কেন...

গোলাম মোর্তোজা: গোলাম মোর্তোজা‘আগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবনগুলো কাঁচা ছিল, শিক্ষকরা পাকা ছিলেন। এখন ভবনগুলো পাকা, শিক্ষকরা কাঁচা’। শিক্ষা ব্যবস্থার করুণ চিত্র এভাবেই তুলে ধরেছেন অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।

তার এই বক্তব্য নানাভাবে ঘুরেফিরে বারবার আসে।

গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের আলোচনার শুরুর আগে নির্বাচন কমিশন ভবন নিয়ে কথা হচ্ছিল। নতুন ভবন, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। কমিশনারদের বিশাল বড় রুম। এসবের প্রেক্ষিতে ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত বলছিলেন, ‘আগে নির্বাচন কমিশনের কার্যালয় এত ভালো ছিল না, কিছু নির্বাচন ভালো করেছিল। এখন অফিস অনেক ভালো হয়েছে, কিন্তু নির্বাচন...।’
বাক্যটি শেষ করেননি।

কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা কারোরই না বোঝার কথা নয়। বাক্যটি শেষ করার প্রসঙ্গ অর্থাৎ একটি সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কিভাবে করা যায়- নির্বাচন কমিশনের সংলাপের আয়োজন মূলত সেই লক্ষ্যে। যদিও এটা আসলে সংলাপ ছিল না, মূলত সাংবাদিকদের থেকে পরামর্শ নিয়েছেন নির্বাচন কমিশন। তার প্রেক্ষিতে কিছু কথা।

১. একটি সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার আইনগত ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের আছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার নূরুল হুদা শুভেচ্ছা বক্তব্যে তা বলেছেনও। সবাই যে পরামর্শ দিয়েছেন, নির্বাচনটি হতে হবে অংশগ্রহণমূলক। সব রাজনৈতিক দল যাতে সেই নির্বাচনে অংশ নেয়, তেমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। আরও সরাসরি বলা হয়েছে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-বিএনপির অংশগ্রহণ থাকতে হবে। তা না হলে নির্বাচন সুষ্ঠু বা গ্রহণযোগ্য হবে না।

বাংলাদেশের নির্বাচনি সংস্কৃতিতে ‘সংবিধান রক্ষা’র অজুহাত বিএনপির সেই ২২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন থেকে সামনে আনা শুরু হয়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি তার প্রয়োগ দেখা গেছে। জনঅর্থে পরিচালিত নির্বাচন কমিশন, জনঅর্থে অনুষ্ঠিত নির্বাচন, সংবিধান রক্ষা, দেশ রক্ষা বা অন্য কোনও অজুহাতে ভোটারবিহীন বা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতার নির্বাচন আয়োজন করা নির্বাচন কমিশনের কাজ হতে পারে না।

নির্বাচনে সব দল অংশ নেবে, ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দেবেন এবং সেই অনুযায়ী ফলাফল নির্ধারিত হবে। নির্বাচন কমিশন তা তখনই করতে পারবে, যখন তারা তাদের ক্ষমতা অনুযায়ী দৃঢ়তা - সাহস দেখাতে পারবে। ভয় না পেয়ে যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারবে।

২. সরাসরি সেনা মোতায়েনের পক্ষে-বিপক্ষে পরামর্শ এসেছে। তবে উপস্থিত অধিকাংশ সাংবাদিক বলেছেন, সুষ্ঠু নির্বাচন করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। তারা প্রয়োজন মনে করলে সেনা মোতায়েন করবেন, না প্রয়োজন মনে করলে করবেন না। তবে নির্বাচনটি সুষ্ঠু হতে হবে।
তাদের মনে করাটা হতে হবে দৃশ্যমান। কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনা যদি ঘটতে দেখা যায়, আর নির্বাচন কমিশন যদি বলে ‘সেনা’ দরকার নেই- তা গ্রহণযোগ্য হবে না। সেনা মোতায়েন করলেই যে নির্বাচন সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য হবে বিষয়টি তেমন নয়। নির্বাচনকালীন সরকার নির্বাচন সুষ্ঠু করার ক্ষেত্রে কতটা আন্তরিকতার সঙ্গে নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে।

৩. প্রশাসন নির্বাচন কমিশনের অধীনে আসার পরের সময়টা খুব অল্প। এই অল্প সময়ে নির্বাচন কমিশনের পুরোপুরি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে প্রশাসনের ওপর। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ প্রশাসন কথা না শুনলে কঠোর ব্যবস্থা দৃশ্যমান করতে হবে

৪. প্রবাসীদের ভোটার করার আন্তরিক উদ্যোগ নেওয়া অতি জরুরি। আর বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন ঘটেছে। সন্ত্রাসী, ইয়াবা চোরাচালানীদেরও রাজনৈতিক দলগুলো মনোনয়ন দেয়। এ কারণে দেশের মানুষের একটা বড় অংশ রাজনীতির প্রতি ক্ষুব্ধ। ভালোরা রাজনীতিতে আসেন না। মানুষের ক্ষুব্ধতা প্রকাশের সুযোগ দেওয়ার জন্যে ‘না’ ভোটের ব্যবস্থা রাখতে হবে। দু’একজন ছাড়া প্রায় সবাই ‘না’ ভোটের বিধান করার পক্ষে পরামর্শ দিয়েছেন।

৫. আরও অনেক পরামর্শ এসেছে। নির্বাচন কমিশন পরামর্শগুলো থেকে ২০টি প্রস্তাব সামনে এনেছে। এক লাইনের এই প্রস্তাবগুলো দিয়ে প্রকৃত পরামর্শ বা আলোচনা প্রকাশিত হয়নি। যেমন নির্বাচন কমিশন ৩ নম্বর প্রস্তাবে বলেছে ‘সেনা মোতায়েনের পক্ষে বলেছেন কেউ কেউ, অধিকাংশই বলেছেন সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন নেই’। মোটেই আলোচনাটি এত সবলভাবে হয়নি। যা আলোচনা হয়েছে তার কিছুটা লিখেছি।

৪ নম্বরে উল্লেখ করা হয়েছে ‘না ভোটের পক্ষে বিপক্ষে মত, কেউ ভালো বলেছেন কেউ বিপক্ষে বলেছেন’। এক্ষেত্রেও প্রকৃত আলোচনা বা পরামর্শের প্রতিফলন ঘটেনি।

ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার কাজটি মোটেই ভালোভাবে হয়নি। প্রায় কোনও বাড়িতে নির্বাচন কমিশনের কর্মীরা যাননি। একথা বলেছেন উপস্থিত প্রায় সকল সাংবাদিক। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের ২০টি প্রস্তাবের একটিতেও তা স্থান পায়নি।

আলোচনা বা পরামর্শ নির্বাচন কমিশন যখন প্রকাশ করবে, তা পূর্ণাঙ্গ হওয়া বাঞ্ছনীয়। হতে পারে ২০টি পরামর্শ তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। তাই হয়তো সংক্ষেপ করা হয়েছে। নির্বাচন কশিমন অনেক আগে পরামর্শ নেওয়া শুরু করেছে। তাদের হাতে পর্যাপ্ত সময় আছে। তাদের উচিত সংলাপ বা পরামর্শের পুরোটা প্রকাশ করা। কোনও পরামর্শই যেহেতু ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভিত্তিতে হয়নি, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে হয়েছে, ফলে পুরোটা প্রকাশ করা দরকার। তাহলে বিভ্রান্তি দূর হবে।

৬. এই পরামর্শগুলো নিয়ে নির্বাচন কশিমন একটি সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের উদ্যোগ নেবেন কিনা? তার চেয়ে বড় কথা, যে পরামর্শগুলো এসেছে তার মধ্যে একটি পরামর্শও আসেনি, যা নির্বাচন কমিশন জানে না। তারপরও কেন এই পরামর্শ নেওয়া? হতে পারে তারা যা করতে চান, তারপক্ষে অবস্থান আরও দৃঢ় করার জন্যে। এভাবে ভাবতে পারলে ভালো হতো। অতীতে অভিজ্ঞতা এভাবে ভাবনায় বেশ বড়ভাবে বাঁধ সাধে। অতীতে দেখা গেছে, পরামর্শ নিয়ে সে অনুযায়ী কাজ করেনি নির্বাচন কমিশন। কাজ না করলেও, বলেছে সবার পরামর্শ নিয়ে করছি। ফলে পুরোটা প্রকাশ করলে মানুষের পক্ষে মিলিয়ে দেখা সহজ হবে যে, কী পরামর্শ এসেছিল আর নির্বাচন কমিশন কী করছে।

৭. বর্তমান বিধান অনুযায়ী নির্বাচনকালীন সরকার নির্বাচন কমিশনকে আন্তরিকভাবে সহায়তা করবে, সেই আশা করার সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। সরকার চাইবে নির্বাচন কমিশনকে তার আওতার মধ্যে নিয়ে আসতে। নির্বাচন কমিশন যদি তা না চায়, বিরোধ তৈরি হবে সরকারের সঙ্গে। নির্বাচন কমিশন ক্ষমতা অনুযায়ী সাহসিকতার সঙ্গে তার যোগ্যতা-দক্ষতায় প্রমাণ দিতে পারা না পারার ওপর নির্ভর করবে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া না হওয়া। নির্বাচন কমিশনের অনেক কাজ, কঠিন পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় পাস করা খুব কঠিন। কমিশনারদের বিশাল সুযোগ-সুবিধা, আরাম-আয়েশের বিষয়গুলো অক্ষুন্ন না থাকার মতো পরিবেশ তৈরি করা হতে পারে। বিপদ আসতে পারে আরও নানা দিক থেকে। তা মোকাবিলার জন্যে ত্যাগের মানসিকতা, চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং সাহস অপরিহার্য। পারবেন কী পারবেন না, অনুমান হয়তো করতে পারি। এখনই বলতে পারি না। বলা ঠিক হবে না।

নির্বাচন কমিশন যদি সফল হতে চায়। আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ তাদের করতে হবে। যা সাংবাদিকদের পরামর্শে আসেনি, আসা উচিত ছিল। সেটা হলো, নির্বাচনের আগে বর্তমান সংসদ ভেঙে দেওয়ার দাবি তুলতে হবে। কেউ এমপি থেকে নির্বাচন করলে, কোনও অবস্থাতেই স্বাভাবিক পরিবেশ তৈরি হবে না। স্বাভাবিক পরিবেশ তৈরি না হলে, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। ফলে এত তর্ক-বিতর্ক, আলোচনা-পরমার্শ পুরোটাই বৃথা হবে। সুযোগ-সুবিধা ভোগ করলেও ব্যর্থতার দায় নিয়ে, নিন্দিত মানুষ হিসেবে নির্বাচন কমিশনারদের বিদায় নিতে হবে।

ব্যর্থতার এ পথে হাঁটা সহজ, সফলতার পথে হাঁটা অত্যন্ত কঠিন।

লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন