শিরোনাম :

বাংলাদেশ নির্মাণে বঙ্গবন্ধু


সোমবার, ২১ আগস্ট ২০১৭, ০৩:২৬ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

বাংলাদেশ নির্মাণে বঙ্গবন্ধু

আনিস আলমগীর : ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যু দিবস। তাই আজ এ মহান নেতাকে নিয়েই লেখার সুযোগটা আরও প্রাসঙ্গিক হলো। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু কোনও স্বাভাবিক মৃত্যু ছিল না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে তিনি নিহত হয়েছিলেন। ভাগ্যের ফেরে তার দু’ কন্যা বিদেশে ছিলেন তাই তারা বেঁচে গিয়েছিলেন।

জার্মানিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী তার বাসভবনে সেই দুর্দিনে শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, ড. ওয়াজেদ ও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন। জাসদের কিছু নেতা-কর্মী এ নিয়ে দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ করেছিলো এবং রাষ্ট্রদূতের বাসভবন আক্রমণ করেছিলো। মহাত্মা গান্ধী বলতেন মানবীয় গুণাবলী ছাড়া রাজনীতি বিপদজনক। জাসদের রাজনীতিও ছিল তাই।

অবশ্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাদেরকে বেশিদিন জার্মানিতে থাকতে দেননি। সবাইকে এনে দিল্লিতে রেখেছিলেন। সে সময় তাদের জীবনের নিরাপত্তা প্রদান জরুরি ছিল সম্ভবতো শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী তা উপলব্ধি করেছিলেন। এছাড়া একটা ঐতিহাসিক পরিবারকে নিশ্চিহ্ন হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য আরেকটা ঐতিহাসিক পরিবারের প্রচেষ্টা থাকাই তো স্বাভাবিক। ইন্দিরা গান্ধী ভূট্টোর ফাঁসির আগে জিয়াউল হকের কাছেও মিনতি করেছিলেন দণ্ড মওকুফ করার জন্য। কিন্তু ষড়যন্ত্র তো কখনও মানবতার পথ বেয়ে এগোয় না। পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জনাব লিয়াকত আলী খানকেও রাওয়াল পিণ্ডির জনসভায় গুলি করে হত্যা করেছিলো। এ হত্যাকাণ্ড ছিল মিলিটারি চক্রের ষড়যন্ত্র।

মিলিটারি চক্রের ষড়যন্ত্র থেকে পাকিস্তান এখনও বের হতে পারেনি। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশে সে চক্রের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিলো। বিদেশি এবং স্বদেশি চক্রের ষড়যন্ত্রে মিলিটারিরাই বঙ্গবন্ধুকে ১৫ আগস্ট হত্যা কলেছিলো। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ পনেরো বছর বাংলাদেশেও সামরিক বাহিনীর এ লীলা অব্যাহত ছিল। পাকিস্তানে মাঝে মাঝে হীনস্বার্থে মিলিটারিরা এবং ষড়যন্ত্রকারীরা সুপ্রিম কোর্টকেও ব্যবহার করেছিল। পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ইফতেখার চৌধুরী, আসিফ আলী জারদারীর সরকারের বিরুদ্ধে এক নিষ্ঠুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। বিরোধী দল নেওয়াজ মুসলিম লীগ আর সরকারি দল পাকিস্তান পিপলস পার্টি ঐক্যবদ্ধ না থাকলে জারদারীর সরকার টিকে থাকাই মুশকিল ছিল। কিন্তু তারা ঐক্যবদ্ধ ছিল বলেই জারদারীর সরকার মেয়াদপূর্ণ করতে পেরেছিলো।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ছিলেন যে কোনও মৌলিক পদার্থের চেয়েও মৌলিক। সুপরিকল্পিত এবং সুশৃঙ্খল। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু এবং মওলানা ভাসানীর দলত্যাগ শেখ মুজিবকে বন্ধন মুক্ত করে দিয়েছিলো। তিনি ১৯৬৬ সালের আওয়ামী লীগের ইডেন কাউন্সিলের পর উলকার মতো দেশ সফর করে সংগঠনকে মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ১৯৭০ সালের মাঝে তিনি আওয়ামী লীগকে যে কোনও চূড়ান্ত সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করে ফেলেছিলেন। ১৯৬৬ সালের কাউন্সিলে আওয়ামী লীগের যে কমিটি গঠন করা হয়েছিলো তাও ছিল যুবা বয়সের নেতাদেরকে নিয়ে এবং ত্যাগ স্বীকারে যাদের কোনও দ্বিধা ছিল না।

বঙ্গবন্ধু ছাত্র নিয়ে কাজ করতে আনন্দবোধ করতেন তাই তিনি কলকাতা থেকে ঢাকা এসেই প্রথম ছাত্রলীগ গঠনের কাজে মনযোগী হয়েছিলেন। ১৯৭০ সালে ছাত্রলীগ মহাকাশ মহীরূহের আকার ধারণ করেছিলো। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি অংশগ্রহণ করলেন আর সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জিতে শাসনতান্ত্রিক বৈধতাও আদায় করে নিলেন। নির্বাচনের পরে যখন ষড়যন্ত্র আরম্ভ হয়েছিলো তখন মওলানা ভাসানী, আতাউর রহমান খান, অলি আহাদ জনসভা করে বঙ্গবন্ধুকে আহ্বান জানালেন রেসকোর্স ময়দান খোলা আকাশের নিচে পার্লামেন্টের অধিবেশন ডেকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাও করলেন না। তিনি পাকিস্তানিরা কী করে না করে শুধু তাই দেখলেন। পাকিস্তানিরা যখন চূড়ান্ত আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হলেন তখনই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন।

২৫ মার্চের দিবাগত রাত্রেই পাকিস্তানিদের সঙ্গে বাঙালির স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা হয়। বঙ্গবন্ধুকে ধানমণ্ডির ৩২ নং বাড়ি থেকে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী গ্রেফতার করে পাকিস্তান নিয়ে যায়। আর আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ নিরাপদে ভারতে চলে যায়। শুধু যশোরের মশিউর রহমানকে পাকবাহিনী গ্রেফতার করে যশোর শহরে পায়ে দঁড়ি দিয়ে জিপের সঙ্গে বেঁধে রাস্তায় টেনে টেনে নির্মমভাবে হত্যা করেছিলো। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেনি।

বঙ্গবন্ধুর এ গ্রেফতার নিয়ে তার বিরুদ্ধবাদীরা মনের মাধুরী মিশিয়ে বহুকথা বলেছেন। অলি আহাদ তার বইয়ে লিখেছেন ‘আত্মসমর্পণ’ করলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের মূখ্য নেতা জানে না তিনি ভারতে গেলে সাধারণ মানুষের মাঝে প্রতিক্রিয়া কী হবে! অনুরূপ পরিস্থিতিতে তিনি ভারতে যান কিভাবে! তিনি ভারতে যাওয়ার চেয়ে নিজের ক্রুশ নিজে বহন করে পাকিস্তানের বধ্যভূমিতে যাওয়ার সিদ্ধান্তই তো ছিল উত্তম। সেদিন মানুষের আস্থা কোনোভাবে বিনষ্ট হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়াই ছিল মুশকিল।

বঙ্গবন্ধু আস্থাশীল ছিল তার সহকর্মীদের প্রতি এবং আস্থাশীল ছিল জনগণের প্রতি। তার সহকর্মীরা আর তার জনগণ তার মর্যাদা রেখেছে, পঙ্গপালের মতো অকাতরে জীবন দিয়ে। তিনিও স্বাধীনতা সংগ্রামকে সংশয়ের ঊর্ধ্বে রেখেছেন, পাকিস্তানের বধ্যভূমিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে। এজন্যই বলছিলাম বঙ্গবন্ধুর সব কাজ ছিল সুচিন্তিত আর সুশৃঙ্খল।

কয়দিন আগে আমাদের সুপ্রিম কোর্ট ১৬তম সংশোধনী বাতিল করে ৭৯৯ পৃষ্ঠার এক রায় দিয়েছেন। তাতে এক জায়গায় বলা হয়েছে, ‘কোনও জাতি- কোনও দেশ একজনের দ্বারা তৈরি হয়নি। যদি আমরা সত্যিকার অর্থে আমাদের জাতির পিতার সোনার বাংলার স্বপ্ন পূরণ করতে চাই, আমাদের অবশ্যই ‘আমিত্বের’ আত্মঘাতী আকাঙ্খা এবং আসক্তি থেকে মুক্ত থাকতে হবে- এক ব্যক্তি বা একজন সব কিছু করেছেন এমন।’

অনেকে এর ব্যাখ্যা করেছেন ‘কোনও জাতি - কোনও দেশ একজনের দ্বারা তৈরি হয়নি’ বলে রায়ে মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতা বঙ্গবন্ধুর একক কৃতিত্বে হয়নি বুঝাতে চেয়েছেন। এটা ধৃষ্টতা। কিন্তু যখন অনেকে মনে করছেন- তাইতো, ওনার একক কৃতিত্ব কোথায়- আদালত ঠিকই বলেছে। সেই পরিস্থিতে আদালতের এই পর্যবেক্ষণকে ধৃষ্টতা বলা অন্যায়ও নয়। সুশীল মনা লোকরা অবশ্য এতে কোনও দোষ খুঁজে পাচ্ছেন না। ডাবল মিনিং কথা বলে আদালত যে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আবার একটা তর্কের খোরাক দিয়েছে, যার কারণে আদালতের মৌলিক কিছু বিষয় নিয়ে আওয়ামী লীগের কোনও কোনও নেতা ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্য রাখছেন সেটাও অস্বীকার করা যাচ্ছে না। এমনকি রায় লিখে দিয়েছেন একজন পত্রিকা সম্পাদক- আদালতের মৌলিক কাঠামোর বিরুদ্ধে হুমকিস্বরুপ কথাও উচ্চারিত হচ্ছে।

কোনও এক পাগলের সাঁকো থেকে পড়ে জুমার গোসলের মতো হঠাৎ মাননীয় বিচারপতিরা ইতিহাস চর্চায় ব্রতী হলেন কেন জানি না। বিচারপতিরা মানবেন কিনা জানিনা বিদ্বেষতাড়িত কোনও উপলব্ধি কখনও কোনও ইতিহাসের অংশ হয় না। ইতিহাসবিদেরা গবেষণা করে স্থির করেছেন যে মহাত্মা গান্ধী না হলেও ভারত স্বাধীন হতো। কিন্তু জিন্নাহ আর শেখ মুজিব না হলে পাকিস্তান আর বাংলাদেশ হতো না। সুতরাং ইতিহাসকে অনুসরণ করে জিন্নাহ আর শেখ মুজিব পাকিস্তান আর বাংলাদেশের একক স্রষ্টা বলতে লজ্জা কিসের তা বোধগম্য হলো না। স্বাধীনতার পর ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ডগলাস হোম ঢাকা এসেছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন ‘একটা জাতি তার বন্দী নেতার নির্দেশ পালন করে দীর্ঘ সময়ব্যাপী যুদ্ধ করে একটা জাতিকে স্বাধীন করা বিশ্ব ইতিহাসের বিরল ঘটনা'। কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো বলতেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি'।

বিচারপতিরা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এ অবহেলা করতে গেলেন কেন বুঝে আসে না। অবশ্য ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি ফেরালে দেখা যায় ইহুদি বিচারকেরা হুকুম দিয়েছিলো যীশুকে ক্রুশবৃদ্ধ করে হত্যা করতে অথচ তিনি ছিলেন মহামানব, নিষ্পাপ শিশুর মতো লোক। তিনি খ্রিস্টানধর্ম প্রচার করেছিলেন। এ ছিল তার অপরাধ। গ্রিসের আদালত হুকুম দিয়েছিলো সক্রেটিসকে বিষপানে হত্যা করতে। তিনি এথেন্সে দর্শনের প্রচার করতেন আর দলে দলে যুবকেরা তার সভায় যোগদান করতো দর্শনের সংলাপ শোনার জন্য।

ইতালির বিচারপরিতরা গ্যালিলিওর ফাঁসির আদেশ দিয়েছিলো। কারণ তিনি বলেছিলেন পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে। ফ্রান্সের আদালত জোয়ান অব আর্ককে জ্যান্ত পুঁড়িয়ে হত্যা করার আদেশ দিয়েছিলো। তার অপরাধ ছিল কুমারী জোয়ান রাজার থেকে সৈন্য নিয়ে বীরবিক্রমে যুদ্ধ করে ফ্রান্স থেকে ব্রিটেনের সৈন্য তাড়িয়ে ফ্রান্সকে ব্রিটেনের দখলদারিত্ব থেকে মুক্তি করেছিল আর জোয়ান দাবি করতে ঈশ্বর তার সঙ্গে কথা বলে। ষোড়শ সংশোধনীর রায় সহ আদালতের অনেক রায় নিয়ে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এ দুনিয়া আদালতের অনাচারও কম দেখেনি।

১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর প্রয়াণ দিবস। আল্লাহ’র কাছে তার আত্মার শান্তি কামনা করছি। 

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক

anisalamgir@gmail.com  সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন