শিরোনাম :

রোহিঙ্গাদের জন্য ভালোবাসা!


বুধবার, ৩০ আগস্ট ২০১৭, ০৬:৪২ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

রোহিঙ্গাদের জন্য ভালোবাসা!

রেজানুর রহমান: প্রথমে মনে হলো যা দেখছি ভুল দেখছি। এসব হয়তো কম্পিউটারের কারসাজি। কম্পিউটারের কারিশমায় একজনের মাথা অন্যজনের শরীরে জোড়া দেওয়া যায়। আরও কত কিছু যে করা যায়...। এ ব্যাপারে আমাদের গ্রামের মানুষও বেশ সচেতন। গ্রামের কথা বললাম এই জন্য যে একটা সময় ছিল যখন গ্রামের মানুষকে ভাবা হতো অশিক্ষিত, ব্যাকডেটেড। আধুনিক দুনিয়ার হালচাল সম্পর্কে তাদের কোনও ধারণাই নাই। বর্তমান সময়ে সেই ধারণা পাল্টেছে। এখন আর গ্রাম আর শহরের মধ্যে তেমন কোনও পার্থক্য নাই। কোথাও কোথাও রাত দুপুরেও গ্রামের বাজার অথবা মহাসড়কের রাস্তার ধারের চায়ের দোকান, ফলমূল, কোমল পানীয় এমনকি ভাতের হোটেলও খোলা থাকে। টেলিভিশনে অনুষ্ঠান দেখতে দেখতে মানুষজন আড্ডা দেয়।

সেরকমই একটা জায়গা কুড়িগ্রামের অদূরে উলিপুর উপজেলা থেকে ফোন করেছেন আমার এক শিক্ষক। তিনি প্রায়ই আমাকে ফোন করেন। তার ফোন আসা মানেই আমাকে বুঝে নিতে হয় সামাজিক অসঙ্গতি অথবা গত কয়েকদিনে ঘটে যাওয়া জাতীয় পর্যায়ের কোনও ঘটনার ব্যাপারে তিনি আমার ওপিনিয়ন জানতে চাইবেন। সাধারণত তিনি আমাকে কোনও কিছু বলার কোনও সুযোগ দেন না। তিনিই বলতেই থাকেন। আমি নিশ্চুপ ভঙ্গিতে শুনে যাই। হ্যাঁ হু করি। বুঝতে পারি অস্থিরতা প্রশমনের জন্য তিনি আমাকে ফোন করেন।

আজ তিনি ফোন করেই বকাঝকার ভঙ্গিতে কথা বলতে শুরু করলেন, এসব কী হচ্ছে বলোতো? মানবাধিকার বলে কি কিছুই থাকবে না। মানুষ মানুষকে পশুর মতো জবাই করবে। বিশ্ব বিবেক কী বলে? মুসলমানরা কি সারা পৃথিবীতে এইভাবেই নিগৃহীত হবে। কোথায় তোমাদের সৌদি আরব? কোথাও মধ্যপ্রাচ্য? কোথায় আমেরিকা?

তিনি বলেই চলেছেন। কয়েকবার থামাতে চাইলাম। কিন্তু তিনি থামলেন না। বলেই চলেছেন। এবার একটু জোর দিয়েই বললাম, আপনি কি একটু থামবেন? আসল ঘটনাটা কী আমাকে একটু বুঝিয়ে বলবেন?

এবার তিনি অবাক হলেন। আমার ওপর যারপর নাই ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, তুমি কী বলছো এইসব। আমার কথা বুঝতে পারো নাই? মিয়ানমারে এইসব কী হইতেছে? মানুষ মানুষকে পশুর মতো, পাখির মতো জবাই করতেছে। ফেসবুক দেখো না তুমি? ফেসবুক, ইউটিউবে তো শুধুই রক্তের স্রোত দেখতেছি। শিশুদেরকে পর্যন্ত টুকরো টুকরো করে কেটে হাত, পা, মাথা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে রেখেছে। না না আমি আর বলতে পারতেছি না। আমার বমি আসতেছে...

কাজের চাপে গত কয়েকদিন ফেসবুকে তেমন একটা অ্যাকটিভ ছিলাম না। অবশ্য আমি সেভাবে ফেসবুক চর্চা করিও না। প্রিয় শিক্ষকের কথায় যতটুকু বুঝলাম তিনি মিয়ানমারের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে বেশ ক্ষুব্ধ।

আমাদের পত্রপত্রিকায় প্রতিদিন বেশ গুরুত্ব সহকারে মিয়ানমারের সংকট নিয়ে খবর প্রকাশ হচ্ছে। মিয়ানমারে আবার রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নিপীড়ন শুরু হয়েছে। তাই তারা প্রাণভয়ে তাদের সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকতে চাইছে। একজন দুইজন নয় সংখ্যায় তারা হাজার হাজার। যদি এমন হতো এই প্রথম বাংলাদেশে কিছু মানুষ জীবন রক্ষার তাগিদে আশ্রয় প্রার্থনা করছে তাহলে না হয় একটি কথা ছিল। কিন্তু এর আগেও একই সংকটের কারণে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশে ঢুকেছে। তাদের ব্যাপারটা ফয়সালা না হওয়ার আগেই আবার নতুন করে রোহিঙ্গা মুসলমানরা বাংলাদেশে আশ্রয় চাইছে। এতো দেখি মরার ওপর খাড়ার ঘা। আমাদের এই ছোট্ট দেশে এতো মানুষকে জায়গা দেব কিভাবে?

প্রিয় শিক্ষকের আবেগ ছুঁয়েছে আমাকে। ফেসবুকে ঢুকলাম। নিজের চোখকে তো বিশ্বাস করতে পারছি না। যা দেখছি তা কি ঠিক দেখছি? গ্রামীণ জনপদে বাড়িঘর দাউ দাউ করে জ্বলছে। প্রাণ ভয়ে পালাচ্ছে নিরীহ মানুষ। তাদের ওপর গুলিবর্ষণ করছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বুকে গুলিবিদ্ধ হওয়ায় মাটির ওপর লুটিয়ে পড়লো কয়েকজন লুঙ্গিপরা মানুষ। আরেকটি ভিডিওতে দেখলাম রাস্তার ধারে বেশ দূরত্বে আকাবাঁকা করে কবর খোড়া হয়েছে। কবরের মাঝখানে বসে আছে নিরীহ কিছু মানুষ। তাদেরকে দেখার জন্য উৎসবের ভঙ্গিমায় উঁকিঝুকি দিচ্ছে অসংখ্য মানুষ। যিনি এই ভিডিওটি পোস্ট করেছেন তিনি লিখেছেন রোহিঙ্গাদেরকে এভাবেই জীবন্ত কবর দেওয়া হবে।

আরেকটি ভিডিওতে দেখলাম একটি লোককে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। মাটির ওপর তার দেহ পড়ে আছে। মনে হচ্ছে তিনি বেঁচে নেই। তাকে দেখার জন্য দাঁড়িয়ে আছে শত শত মানুষ। একসময় গরুকে টেনে নেওয়ার মতো করে মৃত ব্যক্তিটিকে টেনে নিয়ে যেতে থাকলো একজন লোক। শত শত লোক তার আশেপাশে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। তারা তালি দিচ্ছে।

আরেকটি ভিডিও দেখে প্রথম ধারণা করেছিলাম নদী থেকে হয়তো ভয়ঙ্কর কোনও প্রাণী ডাঙ্গায় উঠতে চাইছে। তাই লাঠিসোটা নিয়ে তেড়ে এসেছে মানুষ। পরক্ষণেই ভুল ভাঙলো। নদী থেকে দু'জন অসহায় মানুষ ডাঙ্গায় উঠতে চাইছে। তাদেরকে ডাঙ্গায় উঠতে দিতে চাইছে না সংখ্যায় ১০/১২ জন মানুষ। অসহায় মানুষ দুটি যখনই পানি থেকে ভেসে ওঠার চেষ্টা করছে তখনই তাদের মাথায় লাঠির আঘাত করছে তীরে থাকা নির্দয় নিষ্ঠুর মানুষেরা। একসময় দেখলাম অসহায় দুটি মানুষের মৃত দেহ পানিতে ভেসে উঠলো। নদীর পানির কিছু অংশ লাল হয়ে উঠেছে। তাই দেখে তীরের লোকজন উল্লাস করছে।

আরেকটি ভিডিওতে দেখলাম মানুষের লাশ টুকরো টুকরো করে কেটে রাখা একটি ঘরের মেঝেতে। দুজন মানুষ তদারকির ভঙ্গিতে ঘরে হাঁটাচলা করছে। তাদের চেহারায় কোনও আতঙ্ক অথবা অপরাধের চিহ্ন নাই। বরং বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কাটা মাথা সরিয়ে পায়ের কাছে রাখছে। অথবা কাটা বুক সরিয়ে মাথার কাছে রাখছে।

আমি এখনও বিশ্বাস করতে চাই না এই দৃশ্যগুলোর প্রতিটিই বাস্তবতা থেকেই ধারণ করা। যদি এগুলো বাস্তবতা থেকেই ধারণা করা হয়ে থাকে তাহলে প্রশ্নটা তো এসেই যায় মানুষ, মানুষের প্রতি এতটা নির্দয় নিষ্ঠুর হচ্ছে কিভাবে? যারা এই নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করছে তারা কি আসলেই মানুষ?

মিয়ানমারে জাতিগত বিভেদ বহু বছরের। তাই বলে মানুষ মানুষকে এভাবে নির্দয়, নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করবে? মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচি শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। অথচ তার দেশে তিনিই ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় মানুষ মানুষকে এভাবে নির্দয়, নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করবে তা মোটেই মেনে নেওয়া যায় না।

যখন এই লেখাটি লিখছি তখনই হাতে এলো আজকের কয়েকটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা। একটি দৈনিকের প্রথম পাতায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ শিরোনাম ছেপেছে ‘নাফ নদে সুচির নোবেলের মৃত্যু’। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে- নেট দুনিয়ায় নানা ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই ঘুরে বেড়ানো নতুন কিছু নয়। কারোই রেহাই মেলেনি। গর্ভবতী মা, মাতৃগর্ভের শিশু। গুলি খাও না হয় আগুনে পুড়ে মরো। ধর্ষণ যেনো মামুলি ব্যাপার। বাঁচতে চাইলে পালাও। অবশ্য পালাতে গেলেও গুলির মুখে পড়তে হচ্ছে... এ যেনো আরেক ১৯৭১। নির্দয়, নিষ্ঠুর সময়...

১৯৭১ সালে আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম চলাকালে আমি ছিলাম ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। বর্বর পাক বাহিনীর নির্দয়, নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ডের অনেক করুন স্মৃতি এখনও ভুলতে পারি না। তার মধ্যে একটি হলো প্রাণ ভয়ে অসহায় নারী পুরুষের গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া।

মিয়ানমারের অসহায় মানুষের সারিবদ্ধ মিছিল দেখে বারবারই মনে হচ্ছে- আরে এ-তো আরেক ৭১-এর প্রতিচ্ছবি। একইভাবে বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া, অসহায় নারীকে ধর্ষণ, নিরীহ মানুষকে নির্বিচারে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করা সবইতো হুবহু মিলে যায়। কিন্তু বিশ্ব বিবেক জাগ্রত হচ্ছে না কেন? যাদেরকে আমরা বিশ্বের মোড়ল হিসেবে বিবেচনা করি তারা কেন নিশ্চুপ? বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের নেতারা কেন কিছুই বলছেন না?

জাতিসংঘ থেকে বাংলাদেশের প্রতি রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খোলার চাপ দেওয়া হয়েছে। দেশের আরেকটি একটি জাতীয় দৈনিকের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে এ যেন ২০১২ সালেরই পুনরাবৃত্তি। এবারও মিয়ানমারের ওপর চাপ না বাড়িয়ে রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দেওয়ার চাপ দেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশকে। তবে ঢাকায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, রোহিঙ্গা সমস্যার বিরূপ প্রভাব ইতিমধ্যে দেশে বড় মাত্রায় পড়েছে। তাই বাংলাদেশ নতুন করে আর রোহিঙ্গা শরণার্থী গ্রহণ করবে না।

কথায় কথায় অনেকে ১৯৭১ সালের কথা তোলেন। তাদের বক্তব্য হলো ১৯৭১ সালে আমরাও তো পাশের দেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিলাম। কাজেই মিয়ানমার থেকে আসা শরণার্থীদেরকে আমাদের উচিত জায়গা দেওয়া। তাদের কথা শুনে সত্যি সত্যি অবাক হই। বাংলাদেশে দীর্ঘবছর ধরে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করছে। সেখানে আবারও হাজার হাজার শরণার্থী যুক্ত হলে পরিস্থিতি সামাল দেবে কে? আমাদের এই ছোট্ট দেশে এমনিতেই অনেক সমস্যা। সেখানে রোহিঙ্গা সমস্যাকে আমরা আর কত দিন টেনে নিয়ে বেড়াবো?

আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে ঠিকই কিন্তু কোনও কোনও ক্ষেত্রে তা যেন একপেশে হয়ে যাচ্ছে। আলজাজিরার একটি রিপোর্টে দেখলাম মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের খবর যতটা না গুরুত্ব পেয়েছে তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বাংলাদেশের বর্ডার থেকে রোহিঙ্গাদেরকে ফেরত দেয়ার খবর।

পাশাপাশি দুইটি বাড়ির একটি বাড়িতে সহিংসতার ঘটনা ঘটলে প্রাণ বাঁচাতে এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে কিছু মানুষ আসবে এটাই স্বাভাবিক। তাই বলে ওই বাড়িতে একটার পর একটা ঘটনা ঘটতেই থাকবে আর নতুন করে কিছু সদস্য অন্য বাড়িটিতে আশ্রয় নিতেই থাকবে সেটা কি মেনে নেওয়া সম্ভব? কাজেই বাংলাদেশ কেন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফেরৎ দিচ্ছে সেটা গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিয়ে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারকেই চাপ দেওয়া প্রয়োজন। এটাই সময়ের দাবি। সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

লেখক: সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন