শিরোনাম :

মহাসড়কে মৃত্যু ও মানুষের নিরাপত্তা


মঙ্গলবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০২:৪০ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

মহাসড়কে মৃত্যু ও মানুষের নিরাপত্তা

মাসুদা ভাট্টি: বিষয়টি ব্যক্তিগত হলেও এদেশের প্রতিটি মানুষ যারা সড়ক/মহাসড়ক ব্যবহার করে থাকেন তাদের প্রত্যেকের এ বিষয়ে বাস্তব ও ভয়াবহ অভিজ্ঞতা রয়েছে বলে আজকের লেখায় এটি তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আমি শুধু ঘটনাটিই বলবো, বাকিটুকু পাঠকের চিন্তা-ভাবনার ওপরই ছেড়ে দিতে চাই।

ঘটনা গত সপ্তাহের। পদ্মা পার হওয়া তখন এক বিশাল যন্ত্রণার ব্যাপার, বেশিরভাগ মানুষ প্রায় দেড়/দু’দিন ধরে পদ্মাপারে পার হওয়ার অপেক্ষায় আছেন। সরকার ফেরির সংখ্যা বাড়ালেও যাত্রীভিড় বা ভোগান্তি তাতে কোনোভাবেই কমানো সম্ভব হচ্ছে না। রাজবাড়ির মোড় থেকে দৌলতদিয়া ঘাট পর্যন্ত যে বিশাল যানজট, মানুষের দীর্ঘ সারি তাতে মনে হতে পারে এক জীবন অপেক্ষা করেও পদ্মা পাড়ি দেওয়া সম্ভব হবে না। কিন্তু মানুষের অসাধ্য কিছুই নেই। বাস/ট্রাক লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও ব্যক্তিগত ও ছোট গাড়িগুলো মহাসড়ক থেকে নেমে পড়েছে গ্রামের ছোট রাস্তায়। সেখানে হাজার হাজার বললে কম বলা হবে, অন্তত সিকি লাখ নতুন ধরনের যানবাহন যা মূলত ব্যাটারি চালিত বা ছোট ইঞ্জিনে চলে, একই সঙ্গে দশ থেকে কুড়ি জন যাত্রী বহনে সক্ষম, সেগুলো দাঁড়ানো লাইন দিয়ে। তারা মহাসড়কে দাঁড়িয়ে থাকা বাসের যাত্রীদের ঘাটে পৌঁছে দিয়ে আবার নতুন যাত্রী নেওয়ার জন্য মহাসড়কে পৌঁছুতে চাইছে। কিন্তু পারছে না কারণ সেই রাস্তায় উল্টো দিক থেকে ঢুকে পড়েছে ব্যক্তিগত গাড়ি, যার মধ্যে মাইক্রোবাস, ফোর হুইলার জিপ, কারসহ কী নেই। দু’একটি ছোট আকারের বাসও ঢুকেছে, কিন্তু তারা আটকে যাচ্ছে শুরুতেই। কোনও মতে ঘাটে পৌঁছুতেও তিন/চার ঘণ্টা লেগে যায়। তারপরও এদেশের মানুষের অসাধ্য কিছু নেই। অসীম ধৈর্য্য নিয়ে সকলে বসে আছে, যাদের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটছে তারা তার পার্শ্ববর্তী কারও সঙ্গে ধুন্ধুমার লাগিয়ে দিচ্ছে, প্রকৃতির তেজ তাদের মুখ দিয়ে গল গল করে বেরুচ্ছে।

কোনও মতে যদি ফেরিঘাটে পৌঁছানো যায় তো ভালো কিন্তু ফেরিতে ওঠার যে ঝুঁকি এদেশের মানুষ নেয় তা দেখে বিস্ময় মানতে হয় যে, কেন এখানে দিনে একাধিক দুর্ঘটনা ঘটে না, কিন্তু আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি চরম অব্যবস্থায়। অব্যবস্থাকে আমরা ব্যবস্থা বানিয়ে নিতে পারি অনায়াসে, সেটাই আমাদের সাফল্য। পদ্মার এপারে পাটুরিয়া ঘাটে ফেরি ভিড়তে পারছে না। আমার প্রিয় সুহৃদ দম্পতি ঈদের পরে ঘুরতে বেরিয়েছিলেন রাস্তা ফাঁকা পাবেন বলে। মানিকগঞ্জ যেহেতু এসেছেন সেহেতু আমার অবস্থান জেনে তারাও ঘাটের উদ্দেশ্যে এলেন। কিন্তু ঘাটের কাছাকাছি নবগ্রাম ফায়ার স্টেশনের সামনে এসে তাদের মনে হলো একেবারে ঘাট পর্যন্ত না গিয়ে সেখানেই অপেক্ষা করবেন। যেই তিনি গাড়িটা ঘোরাতে গেলেন অমনি ঘাটের দিক থেকে আসা গোল্ডেন লাইনের একটি গাড়ি তাদের পাজেরো জিপকে পেছন থেকে আঘাত করে। বাসটি এতোই দ্রুততার সঙ্গে আসছিলো যে, মুহূর্তে সেটি দৃষ্টিসীমা থেকে উধাও হয়ে যায়। অতোবড় জিপটি তার শরীরে পুরো আঘাতটি ধারণ করে কয়েকটি চক্কর দিয়ে রাস্তার পাশে গিয়ে থামে, উপস্থিত বুদ্ধিতেই হোক আর ‘ভাগ্যের জোরে’-ই হোক চালক ও তার পাশে বসা স্ত্রী বড় কোনও আঘাত পাননি। কিন্তু তাদের জীবনের ভয়ঙ্করতম অভিজ্ঞতা হিসেবে এই ঘটনা চিরদিন তাদের দুঃস্বপ্নের কারণ হবে, তাতে কোনোই সন্দেহ নেই।

এই দম্পতিকে এই অবস্থায় দেখে প্রথমেই অদৃশ্য কোনও শক্তির কাছে কৃতজ্ঞতা জানাতে হয় যে, বড় কোনও ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটেনি। উপস্থিত সকলেই হাসিমুখে সেকথা এই আহত দম্পতির সামনে বার বার উচ্চারণে কোনও দ্বিধাই করছে না, কবে এই একই জায়গায় কারা কতো ভয়ঙ্কর ভাবে মারা গেছে সে ক্ষতিয়ান আমরা নিমিষেই জেনে নেই উপস্থিত ভিড়ের মুখ থেকে। যেন এরা বেঁচে গিয়ে তাদের পরবর্তী গল্পের জন্য সমস্যা করে দিয়েছেন। প্রথমেই মানিকগঞ্জ পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন করে জানানো হয় বিষয়টি। স্বাভাবিক ভাবে পুলিশের পক্ষ থেকে জিজ্ঞেস করা হয় যে, গাড়ির নাম্বার রেখেছেন? কিন্তু একথাও স্বাভাবিকই যে, ওরকম সত্তর/আশি কিংবা তারও বেশি বেগে ধেয়ে আসা যে বাস একটি গাড়িকে দুমড়ে-মুচড়ে পার হয়ে যায় আহত চালক বা যাত্রী কারো পক্ষেই সে বাসের নাম্বার টুকে রাখা সম্ভব হয় না। একথা শুনেই পুলিশ বলে, তাহলে ধরবো কী করে বলেন? গোল্ডেন লাইনের তো অনেক গাড়ি, কোন গাড়ি মেরেছে কী করে বুঝবো?

কথা ঠিক, গোল্ডেন লাইনের অনেকগুলো গাড়ি পনেরো/কুড়ি মিনিট অন্তর পাটুরিয়া-ঢাকা চলাচল করে, তাদের কেউ বরিশাল থেকে কেউ বা ফরিদপুর থেকে ছেড়ে আসে। বলা হলো, এই যে, পনেরো মিনিট আগে যে গাড়িটি পাটুরিয়া ঘাট থেকে ছেড়ে এসেছে সেটি দেখুন। এখনও হয়তো মানিকগঞ্জ অতিক্রম করতে পারেনি। পারার কথাও নয়। কিন্তু মানিকগঞ্জ পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হলো এতোক্ষণে গোল্ডেন লাইনের সেই গাড়িটি অতি অবশ্যই মানিকগঞ্জ পার হয়ে গেছে। আপনারা দয়া করে ধামরাই পুলিশকে অবহিত করুন। তারা দয়া করে ধামরাই পুলিশের একটি নাম্বার অবশ্য দিলেন। ততোক্ষণে ফোন করার কাজটি শুরু করেছি আমি নিজে। ধামরাই পুলিশের সঙ্গে কথা হলো, তারা বললেন, আমরা রাস্তায় জানিয়ে দিচ্ছি, গোল্ডেন লাইনের গাড়ি থামিয়ে জিজ্ঞেস করা হবে। যে বাসটি পাজেরো জিপটিকে ধাক্কা দিয়ে পালিয়েছে তার সামনের দিকটাও সে সাক্ষ্য বহন করার কথা যদি না সেটি পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন ইস্পাত দিয়ে তৈরি হয়ে থাকে। ফলে সে বাসকে সনাক্ত করতে কারো অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। ইতোমধ্যে সময় পেরুচ্ছে অন্ধকার চারদিকে, তারই মধ্যে একদল মানুষ এসে জড়ো হয়ে নানা পরামর্শ দিতে শুরু করেছেন। তাদেরকে কিছু বলাও যায় না আবার সেসব পরামর্শ গ্রহণ করতেও যে কোনও সুস্থ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। ধামরাই থানা জানালো কোনও গোল্ডেন লাইন বাস তারা থামাতে পারেনি যার সামনে এরকম দাগ রয়েছে। তার মানে হলো বাসটি হয়তো ধামরাই অতিক্রম করে সাভার/আশুলিয়া থানায় প্রবেশ করে থাকবে। ধামরাই থানা থেকেই আশুলিয়া/সাভার থানার নাম্বার দিয়ে মহা উপকার করলেন কর্তব্যরত ব্যক্তিরা। সেখানে ফোন দেওয়া হলো, আবারও সেই একই কথা শোনানো হলো সাভার/আশুলিয়া থানার যিনি ফোন ধরলেন তাকে। তিনি প্রথমেই বললেন, আজকে আমরা খুব ব্যস্ত কারণ কালকে প্রধানমন্ত্রী আসবেন আশুলিয়ায় একটি হাসপাতাল উদ্বোধনে। এরপরে যে কোনও সাধারণ মানুষের মতোই আমারও মনে হলো, তাহলে আর এই থানাকে বলে কী হবে? কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এই অজুহাত দেখিয়ে আশুলিয়া থানা আরো কী কী করে থাকতে পারে সেটি ভেবে নিজের সাংবাদিক পরিচয়টি দিলাম, পরিচিত পুলিশের বড়কর্তাদের নামও বললাম, তাতেও কোনও কাজ হলো বলে মনে হয় না। কারণ তারা গোল্ডেন লাইনের কোনও গাড়ি থামিয়ে বিষয়টি নিয়ে কিভাবে প্রশ্ন করবেন সেটিই উল্টো আমাকে জিজ্ঞেস করলেন। এরই মধ্যে একজন ওসি’র সঙ্গে নিজের সাংবাদিক পরিচয় নিয়ে কথা বলতে হলো, তিনি আমার জন্ম-বেড়েওঠা ইত্যাদি জায়গার ঠিকানাসহ নানাবিধ কথা বলতে থাকলেন কিন্তু একবারও আলোচ্য সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কোনও কথা বলেন না। ধৈর্য্যচ্যুতি হলো। বললাম, ভাই আপনি কি এই ব্যাপারে কিছু করতে পারবেন? না করলে বলেন, আপনার সঙ্গে এই আলাপে আমার কোনোই আগ্রহ নেই। কাজ হলো না, বললেন, আমরা কী করতে পারি বলেন? গাড়ির নাম্বারতো রাখেন নাই আপনারা।

ততোক্ষণে বেশ রাত হয়ে গেছে। ভীড় কমেছে কিন্তু তাও কেউ না কেউ আছে পাশে। এক লোক এসে গাড়ি কিভাবে ঢাকা নেওয়া হবে তার একটা পরামর্শ দিচ্ছেন, তিনি গাড়ি টেনে নেওয়ার ব্যবস্থা বাবদ কতো টাকা নেবেন তা বললেন। ধামরাই থানার কর্তব্যরত ব্যক্তির সঙ্গে বার বার কথা বলায় তাদের ফোনেই ফোন করে (যদিও কার ফোনে যে কখন ফোন করেছি বলতে পারবো না) বললাম, একটা রেকার পাঠানো যাবে কিনা? প্রয়োজনে খরচ দেবো। তিনি বললেন বিষয়টি তিনি দেখবেন, কিন্তু দীর্ঘক্ষণ পরেও তার কোনও খবর পাইনি। স্থানীয় শিবালয় থানায় ফোন করার কথা বলে তার সঙ্গে কথাও বলেছিলেন সাভার থানার ওসি। তিনি বললেন, গাড়িটি যদি তার থানায় নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয় তাহলে তিনি রাতের মতো সেটিকে সেখানে রেখে দিতে পারবেন। তিনি দয়া করে টহল পুলিশও পাঠালেন। টহল পুলিশ এসে গাড়ি দেখে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জ্ঞানের কথা বলে, তারপর কাকে যেনো ফোন করে, কথা বলে, কিন্তু গাড়ির ব্যাপারে, দুর্ঘটনার ব্যাপারে তারা কিছুই বলে না, মনে হয় তারাও এতোক্ষণ যে দর্শক এখানে ভিড় করে দাঁড়িয়েছিলেন, তারাও তাই। ফলে কারো ওপর আর ভরসা করার সুযোগ থাকলো না। একটি সড়ক দুর্ঘটনায় পড়ে অন্তত তিন থানার পাঁচ/ছয়জন কর্তব্যরত ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেও এ বিষয়ে কোনও সহযোগিতা পাওয়া গেলো না– এই দুঃখ ও পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে দুর্ঘটায় আহত ব্যক্তিই তার স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে সেই ভাঙা গাড়িটিকেই চালিয়ে যখন ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন তখন এই দেশ, এদেশের আইন, এদেশের জীবন ও যাপন কোনোকিছুর জন্যই কি সুখকর কোনও কথা মনে আসে? গাড়িটি সেখানে রেখে এলে পরদিন তার কোনোই যন্ত্রাংশই আর খুঁজে পাওয়া যাবে না একথা টহল পুলিশই আমাদের বলেছিল। আমরা নিকটস্থ ফায়ার সার্ভিসের কম্পাউন্ডেও গাড়িটি রেখে আসার কথা ভেবেছিলাম কিন্তু তারা রাজি হননি। গাড়িটি চলবে কিনা জানতাম না, কিন্তু আমার গাড়ির চালক কয়েকবার চেষ্টা করে গাড়িটি সচল করলেন। তবে টহল পুলিশ আমাদের হাইওয়ে থানায় মামলা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন কিন্তু এই তিন থানা থেকে প্রাপ্ত ‘সাহায্যের’ অভিজ্ঞতায় নতুন কোনও থানাসংক্রান্ত ঝামেলায় জড়ানোর মতো সাহস বা উৎসাহ আমাদের ছিল না। আমরা মহাসড়কে মৃত্যুর অভিজ্ঞতা নিয়ে এখনও বেঁচে আছি, এর পরের বার হয়তো এ সুযোগ পাবো না, এরকম কোনও লেখা লিখার জন্য। তাই আরেকবার মৃত্যুর আগে এদেশের মহাসড়ক থেকে অর্জিত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাটুকু পাঠকের জন্য নিবেদন করছি।

ঘটনাটি ঘটেছে ৯ সেপ্টেম্বর, শনিবার, আনুমানিক সন্ধ্যা ছয়টার দিকে, পাটুরিয়া ঘাট থেকে মাত্রই মাইল খানেক দূরত্বে নবগ্রাম ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সামনে। এতোদিন এই ঘটনা নিয়ে লিখিনি কেন? সেই ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা ও তার পূর্বাপর বিচারহীনতায় যে এখনও ধাতস্থ হতে পারিনি তার প্রমাণ এই লেখা। সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আমাদের অর্থনীতি

masuda.bhatti@gmail.com

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন