শিরোনাম :

কাঠগড়ায় নারীর সৌন্দর্য!


শনিবার, ৭ অক্টোবর ২০১৭, ০৩:৩৪ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

কাঠগড়ায় নারীর সৌন্দর্য!

রেজানুর রহমান: লাভটা কিন্তু এভ্রিলেরই হয়েছে। আর লাভবান হয়েছে অন্তর শোবিজ। প্রশ্ন উঠতেই পারে– এরা কারা রে ভাই? প্রকাশ্যে এই প্রশ্নটি না করাই ভালো। কারণ গত কয়েকদিনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সহ দেশের প্রচার মাধ্যমে এই দুটি নাম এতবার উচ্চারিত হয়েছে যে বাসা-বাড়ির কাজের বুয়ারা পর্যন্ত নাম দুটি জেনে ফেলেছে। তবুও নাম দুটি সম্পর্কে আপনাদের একটু ধারণা দেই। অন্তর শোবিজ নামটি অবশ্য সবার কাছেই পরিচিত। কাজেই এই নামের ব্যাখ্যায় যাবো না। এভ্রিল প্রসঙ্গেই একটু বলি। না, না এটি কোনও বিদেশীর নাম নয়। এটি আমাদের দেশের একজন নারীর নাম। এটি অবশ্য তার বাবা- মায়ের দেওয়া নাম নয়। বাবা-মা তার নাম রেখেছিলেন আমেনা। কিন্তু আমেনা নিজে তার নাম বদলে ফেলে। আমেনা থেকে হয়ে যায় এভ্রিল। মেয়েটির অনেক কষ্টের জীবন। সবেমাত্র এসএসসি পাস করেছে। হঠাৎ বাবা-মা জোর করে (এভ্রিলের দাবি) একজন কাপড় ব্যবসায়ী তরুণের সঙ্গে তার বিয়ে দেয়। এভ্রিলের ভাষায় এটি ছিল বাল্য বিবাহ। কারণ তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। অবশ্য বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী এভ্রিলের বয়স তখন ১৮ বছরের ওপরে ছিল। যাইহোক এভ্রিল এই বিয়ে মেনে নিতে পারেননি। তার ডিভোর্স হয়ে যায়। তারপরের কাহিনী ‘এলাম আর জয় করলাম’ এর মতো... প্যান্টশার্ট পড়ে রাস্তায় প্রচণ্ড গতিতে বাইক চালাচ্ছে সে। বন্ধুরা তাকে ‘মাফিয়া গার্ল’ বলে ডাকে। এতে তার কোনও আপত্তি নাই। বরং এতে তিনি বেশ আনন্দ পান। স্বাভাবিক ভাবে দেখলে এভ্রিলের এই যে উত্তরণ সেটা তো প্রশংসার দাবিদার। গ্রামের একটি সাধারণ মেয়ে সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে একা লড়াই করে নিজেকে একটা অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। তাকে তো আমাদের দাঁড়িয়ে স্যালুট করা উচিৎ। এভ্রিল যদি একটি ছেলে হতো তাহলে হয়তো আমরা অনেকে আরও বেশি করে তার জীবন সংগ্রামের প্রশংসা করতাম। অথচ একটি ছেলের চেয়ে একটি মেয়ের জীবন সংগ্রাম অনেক বেশি কষ্টের। সে জন্য এভ্রিল বিশেষ ভাবে প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। এটা তিনি পেয়েও গিয়েছিলেন। সুন্দরী প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়ে তিনি বিস্ময়ের সৃষ্টি করলেন। তাকে ঘিরে ‘বাহ্বা বাহ্বা’ রব উঠলো। আকাশে উড়তে শুরু করলো হাজারো রঙ বেরঙের বেলুন। হঠাৎ কী যে হলো বেলুনগুলো নিজেরাই ফাটতে শুরু করলো। বেলুন ফাটে আর আকাশ থেকে নিচে পড়ে যায়। ঘটনা কী? আনন্দের মাঝে হঠাৎ এতো বিষাদের সুর কেন? নাকি কেউ কারও সঙ্গে প্রতারণা করছে। হ্যাঁ, প্রতারণা শব্দটি ওঠে এলো সামনে। যিনি সুন্দরী তিনি প্রতারক। কেন প্রতারক? কারণ তিনি সত্য গোপন করেছেন। সত্যটা কী? সত্যটা হলো সুন্দরীর বিয়ে হয়েছিল। সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সময় তিনি এই সত্য গোপন রেখেছিলেন।

অথচ সুন্দরী প্রতিযোগিতা অর্থাৎ মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতার নিয়মাবলীতে উল্লেখ আছে– কখনও বিয়ে হয়েছে, সন্তান জন্ম দিয়েছে বা গর্ভপাত করানো হয়েছে এমন কোনও মেয়ে মিস ওয়ার্ল্ড অথবা মিস ইউনিভার্স প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবে না।

ব্যস, ল্যাঠা তো চুকে গেলো। ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর আয়োজক প্রতিষ্ঠান অন্তর শোবিজ সাংবাদিক সম্মেলন করে মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ হিসেবে পাওয়া এভ্রিলের মুকুট কেড়ে নিলেন। নতুন মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশের এর নাম ঘোষণা করা হলো। আয়োজক প্রতিষ্ঠান একবারও ভুল স্বীকার করলো না। যেনো ঘটনা কিছুই না। সামান্য মিসটেক হয়েছে। আবুলের জায়গায় কাবুলের নাম ঘোষণা হয়েছিল। ওটা আসলে আবুল হবে। এটা বড় কোনও মিসটেক না। কাজেই এ নিয়ে হাউকাউ করার কোনও মানে হয় না। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে হাউহাউ তো বোধকরি লেগেই গেলো। পুরুষ আর নারীর মধ্যে হাউকাউ। মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় এভ্রিলের নাম ঘোষণা এবং পরবর্তিতে এভ্রিলের বিবাহ সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকের লেখা পড়ে সত্যি সত্যি অবাক হয়েছি। কারও কারও মতে, পুরুষ জাতির মতো বাজে প্রাণী পৃথিবীতে আর একটিও নাই। ঘটনা ঘটালো এভ্রিল আর অন্তর শোবিজ। সেখানে অহেতুক পুরুষ বিদ্বেষী মন্তব্য কেন করা হচ্ছে বুঝলাম না। আমার একজন প্রিয় নারী চিত্র পরিচালক (অবশ্য তিনি নিজেকে নারী হিসেবে পরিচয় দিতে নারাজ) প্রথমে তিনি ফেসবুকে লিখলেন– ‘একটি মেয়ে বিবাহ করিয়া যতক্ষণ স্বামী সংসার ধর্ম নিয়ে থাকেন ততক্ষণ সে বিবাহিত। আর যদি সে সেখান থেকে অব্যাহতি নেয় তবে সে আবার অবিবাহিত। এটাই সত্য। মানলে মানো না মানলে ভাগো। ভালো লাগা না লাগার ওপর কারও হাত নাই। বিবাহ কোনও আমৃত্যু শর্ত নয়। সংসার করা ছাড়াও জীবনে মূল্যবান কাজ আছে। যার যখন সময় হবে তখন করবে। বিবাহ জন্ম-মৃত্যু তো আল্লাহ’র হাতেই। কেন এখন মনে পড়ছে না। নাকি মিস বাংলাদেশ দেখলেই সুড়সুড়ি হয়ে যায়...

দ্বিতীয়বার তিনিই ফেসবুকে লিখলেন, ‘এইসব বিয়ে সংসার আমাকে টানে না। আমি নারী নই। আমি নিজেকে মানুষ হিসেবে পরিচয় দিতেই গর্ব বোধ করি।’

প্রিয় চিত্র পরিচালকের কথার সাথে আমিও একমত। নিজেদেরকে মানুষ ভাবলেই তো নারী পুরুষের মাঝে কোনও ভেদাভেদ থাকে না। যদি তাই হয় তাহলে মিস ওয়ার্ল্ড, বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতার কি কোনও প্রয়োজন আছে? এভ্রিলের জীবন সংগ্রামের প্রশংসা করেছেন সবাই। আমিও তার জীবন সংগ্রাম দেখে মুগ্ধ হয়েছি। কিন্তু তিনি প্রতারণার আশ্রয় নিতে গেলেন কেন? তিনি বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ করার জন্য আজীবন কাজ করে যাবেন। কিন্তু আমার কাছে বিষয়টি মোটেই পরিষ্কার নয়। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করার জন্য সত্য গোপন করে সুন্দরী প্রতিযোগিতার মতো নারীর দেহ প্রদর্শনকারী উদ্যোগের সঙ্গে কেন তিনি যুক্ত হলেন? এই ধরনের প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠত্ব পরিমাপের ভাবনাটা মূলত এমন– “৩৬-২৪-৩৬ এটিই তোমার পরিচয়।” এর বাইরে চুল পরিমাণ গেলেই তুমি সুন্দরী নও। তোমার সুন্দর একটা মন থাকতে পারে। তাতে কোনও কাজ হবে না। বুকের মাপ ৩৬ ইঞ্চি হলেই তোমাকে সৌন্দর্যকে আয়নায় তুলে ধরা হবে। তোমার কোমর ২৪ ইঞ্চি হওয়া চাই। পশ্চাতের বেড় ৩৬ ইঞ্চির বেশি হলেই নারী তুমি অযোগ্য!

এই যে নারীর সৌন্দর্য মাপার প্রক্রিয়া এটাতো নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপনেরই একটি অংশ। এভ্রিল কেন এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হলেন? তথ্য লুকানোর প্রতারণাই বা কেন করলেন? অবশ্য এভ্রিলের চেয়ে আমার কাছে আয়োজক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে ভিন্ন ধারার প্রতারণা মনে হয়েছে। বলা হচ্ছে সারাদেশে আবেদন করা ২৫ হাজার প্রতিযোগী থেকে ধাপে ধাপে বাছাই করা ১০ জন প্রতিযোগীকে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই করেছে। প্রশ্ন উঠতেই পারে বিচার প্রক্রিয়াটা আসলে কেমন ছিল? প্রতিযোগিতার মূল পর্বের বিচারক শম্পা রেজাকে একটি টেলিভিশনের টক শোতে এব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলেছেন– ‘আসলে সে ভাবে কোনও গাইড লাইন ছিল না। আমি আমার কথা বলতে পারি... নিজের মতো করে প্রশ্ন করেছি। শম্পা রেজার কথা যদি সত্য হয় তাহলে তো প্রতিযোগিতার বিচারকার্য নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশ্ব আসরে যাকে পাঠানো হবে তার মেধা যাচাইয়ের সঠিক কোনও নির্দেশনা থাকবে না এটা কি করে হয়?

ওই অনুষ্ঠানে শম্পা রেজা আবারও জোর দিয়েই বলেছেন, এভ্রিলের মুকুট কেড়ে নেওয়ার পর নতুন করে যাকে সেরা ঘোষণা করা হয়েছে সেই জেসিয়া মূলত সবার বিচারে সেরা ছিলেন। যদি সেটাই হয় তাহলে চূড়ান্ত পর্বে আয়োজক প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার স্বপন চৌধুরী কেন উপস্থাপককে পাশ কাটিয়ে এভ্রিলের নাম ঘোষণা করেছিলেন? তার বরাত দিয়ে প্রচারমাধ্যমে এমন কথাও প্রকাশ হয়েছে যে– টাকা দিয়ে বিচারক নিয়োগ করেছি। কাজেই আমি যা বলবো তাই হবে। স্বপন চৌধুরী যদি সত্যি সত্যি এ ধরনের কথা বলে থাকেন তাহলেতো তাকে জবাবদিহির আওতায় আনা দারকার। অনেকে মনে করেন এভ্রিল সত্য গোপন করে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু আয়োজক প্রতিষ্ঠান কি এক্ষেত্রে দায় এড়াতে পারে? জানা গেছে, অন্তর শোবিজ আগামী ৫ বছর এভাবেই সুন্দরী প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে পারবে। আগামীতেও কি প্রতিষ্ঠানটি এভাবেই অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সুন্দরী খুঁজে বের করবে? প্রতারণা কি চলতেই থাকবে? এই যে কাঠগড়ায় নারীর সৌন্দর্যকে দাঁড় করানো হলো এজন্য দায়ী কে? উত্তরটা কার কাছে চাইব? বাংলা ট্রিবিউন

লেখক: সাংবাদিক, নাট্যকার, কথাসাহিত্যিক

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন