শিরোনাম :
   মিয়ানমারে বিলাসবহুল হোটেলে ব্যাপক আগুন, নিহত ১    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রক্টর ড. এ কে এম গোলাম রব্বানী    রাবির ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে মেস মালিকদের চরম স্বেচ্ছাচারিতা    বর্ষিয়ান সাংবাদিক বাটুলের হীরক জন্ম জয়ন্তি    ঢাবি’র ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা আগামীকাল    দেশব্যাপী ভ্রাম্যমান লাইব্রেরি কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে গণগ্রন্থাগার     বস্তিবাসীদের জন্য ১০ হাজার ফ্ল্যাট নির্মাণ করবে সরকার    বেড়িবাঁধ পূনঃনির্মাণ কাজ উদ্বোধন:  দুঃখ ঘুচবে শাহ্পরীর দ্বীপের অর্ধলাখ মানুষের    ফেসবুকে আপত্তিকর মন্তব্য:  রেহাই পেলেন দুই আ. লীগ নেতা    নদীগর্ভে বিলীনের পথে নবনির্মিত সাইক্লোন সেল্টার

পৃথিবীকে শিশুর বসবাসযোগ্য করে যাবে কে?


রবিবার, ৮ অক্টোবর ২০১৭, ০৬:৫৯ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

পৃথিবীকে শিশুর বসবাসযোগ্য করে যাবে কে?

সালেক উদ্দিন: হ্যাঁ আমি মিয়ানমারের রাখাইন থেকে বিতাড়িত শিশুদের কথা বলছি। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের গণমাধ্যমে এখন রোহিঙ্গা নিধনের খবর গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হচ্ছে। প্রকাশ হচ্ছে ‘রোহিঙ্গারা আমাদের কেউ নয়’ জাতির উদ্দেশে দেওয়া সেদেশের সেনাপ্রধানের বক্তব্য। সেই সূত্রধরে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সেনাবাহিনী ও উগ্রবৌদ্ধদের সম্মিলিত নির্যাতনের এবং রোহিঙ্গা নর-নারীদের গণহত্যা, গণধর্ষণের খবর। শত শত গ্রাম পুড়িয়ে রোহিঙ্গা আবাস নিশ্চিহ্ন করার চিত্র, আরও রয়েছে রোহিঙ্গাদের জাতিগত নিধনের নীল নকশার খবর।

রোহিঙ্গা নির্যাতনের প্রতিদিনের এতশত খবরের মধ্যে রোহিঙ্গা শিশুদের নিয়ে কিছুকথা বলার চেষ্টা করছি এই লেখায়। পত্রিকায় প্রকাশিত ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী মিয়ানমারের সেনাদের বর্বরতায় এখনও প্রতিদিনই রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে ঢুকছে। এ যাত্রায় বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ৬ লাখের কোঠায়। তার মধ্যে শিশুদের সংখ্যা ৩ লাখ। বাবা-মা হারা শিশুর সংখ্যা ২ হাজার। ২ থেকে ১২ বছর বয়সী এই সব শিশুর বেশিরভাগ মা-বাবাই মিয়ানমারের সেনা নির্যাতনে প্রাণ হারিয়েছেন। অনেকে আবার দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে গিয়ে বাবা মাকে হারিয়ে ফেলেছে।
এই সব শিশুদের জীবন কাহিনি প্রতিদিনই পত্র-পত্রিকায় আসছে। নিজ দেশে পরবাসী হলেও সেখানে তাদের বাবা-মা আত্মীয় স্বজন ছিল। তারাও আর দশজন শিশুর মতো হাসতো খেলতো বেড়াতো। এ বছর ২৫ আগস্টের পর সেদেশের সেনাবাহিনীর জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে মা-বাবা ভাই বোন সর্বস্ব হারিয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে এরা।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর আক্রমণের সময় তাদের কেউ-কেউ জীবন বাঁচাতে ঝোপে ঝাড়ে আড়ালে লুকিয়ে দেখেছে তাদের মা-বাবা ভাই-বোনদের হত্যাকাণ্ড আর ধর্ষণের দৃশ্য। দেখেছে গুলির পরেও না মরলে কিভাবে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারা হয় সেই দৃশ্য। মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করতে কিভাবে মানুষের দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয় সেইসব মর্মান্তিক দৃশ্য এবং সবশেষে তাদের সহায় সম্বল ঘরবাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার দৃশ্য।

এইসব শিশুরা পরিচিত-অপরিচিত লাখ-লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে জেলে নৌকায় বঙ্গোপসাগরের প্রান্ত দিয়ে নাফ নদী পার হয়ে বাংলাদেশে আসলে তাদের স্থান হয় টেকনাফ ও উখিয়ার আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে। এদের মধ্যে আট দশ বছরের এমন অনেক পিতা-মাতাহীন শিশু রয়েছে যাদের কাঁধে আবার রয়েছে তাদেরই কনিষ্ঠ ভাই-বোন, আর চোখের সামনে ভাসছে বাপ-ভাইয়ের নির্মম হত্যার দৃশ্য, মা ও বোনের ধর্ষণের দৃশ্য এবং হত্যার মতো কষ্টকর দৃশ্য। আবার কিছু শিশু আছে তারা এখনও জানেই না যে তাদের ভাই-বোন-মা-বাবা বেঁচে আছে কিনা! হয়তো তারা জীবনের একটা সময় পর্যন্ত আপনজনদের খুঁজে বেড়াবে!

সেপ্টেম্বর ১ তারিখে একটি পত্রিকার প্রথম পাতায় ছবিতে দেখলাম টেকনাফের সাগর তীরে দুই ব্যক্তির মাথায় করে দুটি শিশুর লাশ নিয়ে ফিরছেন। রোহিঙ্গাদের নৌকা ডুবিতে এরকম বহু শিশুর লাশ ভেসে আসছে প্রতিদিনই। একজন সাংবাদিক লিখেছেন, এ-তো রোহিঙ্গা শিশুর লাশ নয়, বিশ্ব বিবেকের লাশ! কথটি বেশ মনে ধরেছে আমার।

স্বামী হারা অন্তঃসত্ত্বা রোহিঙ্গা বধূ সানোয়ারার কথা এলো আর একদিনের পত্রিকায়। সানোয়ারার মতো স্বামী হারা অন্তঃসত্ত্বা রোহিঙ্গা কত বধূ গর্ভে সন্তান নিয়ে দুর্গম পাহাড়ি পথ পার হয়ে নৌকায় নাফ নদী দিয়ে বাংলাদেশের আশ্রয় শিবিরে এসে উঠেছে। পথিমধ্যে সন্তান প্রসব করে অনেকেই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেছে, এখনও মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করছে অনেকেই। পথিমধ্যে সন্তান প্রসব করেও বেঁচে গেছে সানোয়ারা। নজাতককে নিয়ে বাঁচার পথ খুঁজছে। সন্তানের নাম রেখেছে শেখ মুজিবুর রহমান।


আর একটি খবরে দেখলাম রাখাইন রাজ্যের ‍দংখালী গ্রামের আবদুর রহিমের কাহিনি। সেনাবাহিনীর গুলিতে মারা গেছেন মা জমিলা খাতুন ও ভাই হামিদ হোসেন। ২২ বছরের স্ত্রী জাহেদা খাতুন ও চার মাসের ছেলে কায়েশকে নিয়ে তিনি মিয়ানমার হায়েনাদের হাত থেকে বাঁচার জন্য অন্যদের সঙ্গে উঠেছিলেন জেলে নৌকায়। শাহপরীর দ্বীপ পশ্চিম পাড়ার সাগর সৈকতে ডুবে যায় নৌকাটি। সাঁতরে তিনি বেঁচে ছিলেন ঠিকই। বাঁচেনি তার স্ত্রী ও ছয় মাসের সন্তান। সাগরে ভেসে আসা সৈকতের বালুচরে পড়ে থাকা লাশের মধ্যে স্ত্রী জাহেদা খাতুন ও চার মাসের ছেলে কায়েশের লাশের সামনে আবদুর রহিমের চিৎকারে সেদিন আকাশ বাতাস কেঁপে উঠেছিল! সে আওয়াজ অং সান সু চি পর্যন্ত পৌঁছিয়েছিল কিনা জানি না! নাফ নদীতে এসব এখন প্রতিদিনের ঘটনা।

শরণার্থী কেন্দ্রগুলোতে নতুন আসা তিনলক্ষ শিশুর মধ্যে বাবা-মা হারা যে দুই সহস্রাধিক শিশু ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তাদের বেশিরভাগই একাধারে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, আবার বিভিন্ন অপুষ্টিজনিত রোগে ভুগছে। জ্বর, সর্দি, কাশি, অ্যালার্জি, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কলেরাসহ নানা রোগে আক্রান্ত অনেকেই। এই শিশুরা জীবন ঝুঁকিতে আছে বলে জানিয়েছে ইউনিসেফ। সহস্র পিতা-মাতাহীন অনাথ রোহিঙ্গা শিশুর জীবন দেখে কবি সুকান্তের ছাড়পত্র কবিতার কথা বড় মনে পড়ে যায়।

বাংলার ক্ষণজন্মা এই কবির সেই একই বাসনা নিয়ে মার্কিন বিজ্ঞানী ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকার বার্ক ২০১৫ সালে বিশ্বে সকল শিশুদের বৈষম্যহীন উন্নত জীবন নিশ্চিতের জন্য তার উপার্জনের ৯৯ ভাগই দান করেন। অর্থের বিবেচনায় যার পরিমাণ ৪৫ বিলিয়ন ডলার। শুধু তাই নয় আগামী দিনের শিশুদের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করার লক্ষে তিনি আত্মনিয়োগ করেন। গড়ে তোলেন ‘চ্যান জাকারবার্গ ইনিশিয়েটিভ’। অথচ এদের কেউই মানবতার কল্যাণের জন্যে নোবেল পুরস্কার পাননি। যিনি পেয়েছেন সেই মানবাধিকার সংগ্রামের মানস কন্যা শান্তির দূত হিসেবে খ্যাত অং সান সু চি’র হাতেই আজ মানবাধিকার হত্যা হয়েছে। শত শত বছর ধরে রাখাইনে বসবাস করা রোহিঙ্গাদের জাতিগত অধিকার যার ফিরিয়ে দেওয়ার কথা ছিল তিনিই মেতে উঠেছেন তাদের জাতিগত নিধনের এক বিভৎস খেলায়।

বিশ্বের বিবেক জাগ্রত হোক। রোহিঙ্গা শিশুরা নিজ দেশে তাদের জাতীয় পরিচয় ফিরে পাক। পৃথিবীর আর সব শিশুর মতো তাদেরও বসবাসযোগ্য জীবন নিশ্চিত হোক। বাংলা ট্রিবিউন

লেখক: কথাসাহিত্যিক

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন