শিরোনাম :

কী বার্তা দিয়ে গেলেন সুষমা স্বরাজ


বৃহস্পতিবার, ২৬ অক্টোবর ২০১৭, ০৩:৩১ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

কী বার্তা দিয়ে গেলেন সুষমা স্বরাজ

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী: বাংলাদেশ-ভারত চতুর্থ ‘জয়েন্ট কনসালটেটিভ কমিশন’–এর বৈঠকে যোগদানের জন্য ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ গত ২২ অক্টোবর রবিবার ঢাকায় এসেছিলেন। নিয়ম অনুসারে জেসিসির বৈঠকে পানিবন্টন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সীমান্ত সমস্যাসহ সার্বিক দ্বিপাক্ষিক ইস্যুতে আলোচনা হয়। বহু পূর্বেই এ বৈঠক হওয়ার কথা ছিল কিন্তু সুষমা স্বরাজের অসুস্থতার কারণে বৈঠক পিছিয়েছিল।

ভারতের সঙ্গে রোহিঙ্গা সহ বেশ কিছু বিষয় নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের মনোমালিন্য চলছিলো সম্ভবতো তা নিরসনও সুষমা স্বরাজের এ ঝটিকা সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য। যে কারণে তিনি বার বার বলেছেন, রাখাইনের বাস্তুত্যাগীরা রাখাইনে ফিরে যাক ভারত তা কামনা করে এবং ভারত মনে করে যে বাস্তুত্যাগীরা ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত অবস্থা স্বাভাবিক হবে না।

ভারত বিষয়টা নিয়ে সক্রিয় থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। সুষমা স্বরাজ রোহিঙ্গা শব্দটা উচ্চারণ করেননি বলে কেউ কেউ আপত্তি তুলেছেন। কিন্তু একটা বিষয় অনুধাবন করতে হবে যে মিয়ানমার এবং বাংলাদেশ উভয়েই ভারতের প্রতিবেশী। সুতরাং ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে কথা বলা অপরাধ নয়।

ভারতের রাজনীতিবিদেরা সব সময় সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলতে চায় কিন্তু অনেক সময় আমলাদের কারণে করতে পারেন না। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-সহ বড় বড় নেতারা এটা স্বীকার করেছেন। ভারতীয় আমলারা খুবই রক্ষণশীল এবং আত্মভরী। উদারতা নামক কোনও শব্দই তাদের অভিধানে নেই। কয়দিন আগে ঢাকায় নিযুক্ত প্রাক্তন হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনা প্রসঙ্গে কী কথাটাই না বললেন! ‘কথায় কথায় তোমরা চীনের দিকে দৌড়ে যাও। এখন চীনকে বলো না কিছু রোহিঙ্গা নিয়ে যেতে।’ কূটনৈতিক শিষ্টাচার বর্জিত কথা। আবার কথাটাতে তুচ্ছ তাচ্ছিল্যে ভরা।

ভারতীয় অফিসাররা বুঝেন না যে ভারতের ডানে-বামে কেউই তাদের বন্ধু নয়। একমাত্র বাংলাদেশই তাদের বন্ধু। তারা মনে করে আমরা তাদের বন্ধু হতে বাধ্য। কোনও কোনও সময় বন্ধু বলতেও তাদের গায়ে লাগে। অনুরূপ মনোভাবের মধ্যে সম্পর্ক ঠিক রাখা দায় হয়ে পড়ে। ২০১০ সালে ভারত বাংলাদেশকে ১০০ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছিলো। সেই ঋণের টাকা ডিসভার্সমেন্ট হয়েছে মাত্র ৪০ কোটি ডলার।

২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরের সময় ২০০ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছিলেন তার এক কানা পয়সাও এখনও ডিসভার্সমেন্ট হয়নি। আবার এ অক্টোবর মাসেই অর্থমন্ত্রী জেটলি এসে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার চুক্তি করে গেলেন। যে প্রজেক্টে অর্থায়নের চুক্তি হয় তার মালামাল ভারত দেবে, ঠিকাদার ভারত নিয়োগ করবে, কনসালটেন্সিও ভারতের, তাদের টাকা তারাই দেয় তারাই নেয় এরপরও প্রোজেক্টের কাজ হতে কত দীর্ঘ সময় লাগে।

যেসব চুক্তি হয় চুক্তিগুলো শর্তের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকে। শর্তের গিট ছুটাতেই সময় যায় মাসের পর মাস আর বৈঠকের পর বৈঠক। এ সব ভারতীয় আমলাদের লীলা। আমরা দুর্বল পক্ষ। ঋণ গ্রহিতা। আমাদের কথা শুনে কে? ভারতীয় আইসিএসদের সুনাম আছে। জওহরলাল নেহরু বলেছিলেন, তারাই নাকি তাদের সুনামের স্রষ্টা।

২০১৬ সালে বাংলাদেশে চীনের প্রেসিডেন্টও এসেছিলেন। তিনি ২৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণ চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন বাংলাদেশের সঙ্গে। তার মাঝে একটা প্রজেক্ট ছিল পায়রা বন্দরের কাছে ১২৩০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন। ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ২৯% শতাংশ কাজ শেষ হচ্ছে। অথচ নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একই সময়ে স্বাক্ষরিত চুক্তির টাকার কোনও দেখা-সাক্ষাৎ নেই।

ভারত ঋণ চুক্তি সম্পাদনের সময় যে মুন্সিয়ানা করে সেই মুন্সিয়ানা চীনের কাছে নেই। আর চীনের সব কাজই দ্রুত। এসব কিছু পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী জানেন। জেনেও না জানার ভান করে কথা বলেন। বাংলাদেশ তাদের প্রদত্ত ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করে বন্ধুত্বের খাতিরে। ঋণ নিয়ে দুর্ভোগ পোহানোর চেয়ে না নেওয়াই তো ভালো।

সুষমা স্বরাজ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দীর্ঘ সময়ব্যাপী আলাপ আলোচনা করেছেন। এটা ছিল জেসিসির বৈঠক। সুতরাং সব বিষয়েই আলাপ হওয়ার কথা সম্ভবত তাই হয়েছে। কিন্তু তিস্তার পানি চুক্তি প্রসঙ্গে কী আলোচনা হলো কোনও পক্ষই তা সুস্পষ্ট করে কিছু বলেননি। অথচ উভয় সরকারের মেয়াদ শেষ পর্যায়ে এসে উপস্থিত হচ্ছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কথা দিয়েছিলেন তার সরকারের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার আগেই তিস্তা চুক্তি সম্পাদন করা হবে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ সংসদের নির্বাচন আর তার ২/৩ মাস পরে ভারতের লোকসভা নির্বাচন। অথচ তিস্তার পানি চুক্তির মূল বাধা পশ্চিম বঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সম্পর্ক দিন দিন খারাপই হচ্ছে।

বিজেপির সভাপতি অমিত শাহা কয়দিন আগে বলেছেন এবার বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের মাটি হতে দিদিকে তুলে মূলে উচ্ছেদ করবেন। মমতা মাথা গরম মহিলা এবং সামনে লোকসভা নির্বাচন সুতরাং কোনোভাবেই মনে হচ্ছে না যে তিস্তার পানি বন্টন নিয়ে কোনও চুক্তি সম্পাদন করা নরেন্দ্র মোদির পক্ষে সম্ভব হবে। অর্থাৎ বাংলাদেশের যে কপাল সে মাথাই রয়ে যাবে।

সুষমা স্বরাজ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সুষমা স্বরাজের দীর্ঘ সময়ের বন্ধুত্ব। দেখেছি প্রধানমন্ত্রী সীমানা ও ছিটমহল হস্তান্তর চুক্তির সময় গভীর রাতেও সুষমা স্বরাজের সঙ্গে ফোনে কথা বলতেন। সুষমা স্বরাজ গভীর আন্তরিকতার সঙ্গে পরিশ্রম করে সীমানা ও ছিটমহল হস্তান্তর বিল লোকসভায় উত্থাপন করেছিলেন। বিল উত্থাপনের উদ্বোধনী বক্তৃতায় লোকসভা রাজ্যসভার যৌথ অধিবেশনে সুষমা স্বরাজ বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ উত্থাপন করে অশ্রু বিসর্জনও করেছিলেন।

সুষমা স্বরাজ উমা ভারতীদের মতো আরএসএস-এর ক্যাডার নন। জনতা পার্টি গঠনের পর তাতে তার যোগদান। নরেন্দ্র মোদির হস্তক্ষেপে অনেক সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী অকার্যকর হয়ে পড়েন। সুষমা ঠাণ্ডা মাথার মানুষ বলে এখনও টিকে আছে। সুষমা স্বরাজ বিজেপির ওল্ড সিন্ডিকেটের নেতা। নরেন্দ্র মোদি ওল্ড সিন্ডিকেটের নেতাদের বয়সের অজুহাত তুলে মন্ত্রী করেননি। সুষমাই মন্ত্রিসভায় ওল্ড সিন্ডিকেটকে রিপ্রেজেন্ট করেন। নিশ্চয়ই রাজনীতির প্রজ্ঞা সম্পন্ন সুষমার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর গঠনমূলক আলোচনাই হয়েছে।

চীন বাংলাদেশের উন্নয়নের বিরাট সহযোগী আর ভারত বন্ধু রাষ্ট্র, রোহিঙ্গার বিষয়টা বাংলাদেশকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। আরাকান উপকূলে বন্দর গড়তে গিয়ে চীন এ যাবৎ ১২৯০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। এ বন্দরের ৭০% শতাংশের মালিক চীন। উন্নয়নের সহযোগী হিসেবে চীন যদি আরাকানে তার স্বার্থের প্রতি সদয় হতে বাংলাদেশকে আহ্বান জানায় বাংলাদেশতো সে আহ্বান উপেক্ষা করতে পারে না।

ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো এবং আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ওপর যে চাপ প্রদান করেছেন এখন চীন মিয়ানমারকে এ অঞ্চলের শান্তি অব্যাহত রাখার প্রয়োজনে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের কথা বলতে পারে। বাংলাদেশের মাটিতে ১০/১২ লক্ষ রোহিঙ্গার অবস্থান, এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী শেষ পর্যন্ত যদি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের আধার হয়ে ওঠে তবে বাংলাদেশ, মিয়ানমার আর ভারতের শান্তি খুবই গুরুত্বরভাবে বিনষ্ট হবে। আরাকানে চীনের বিনিয়োগও ঝুঁকির মুখে পড়বে।

সুষমা স্বরাজের সঙ্গে বাংলাদেশের আরেক ডমিনেন্ট পার্টি বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ারও বৈঠক হয়েছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করে থাকেন ২০০১ সালে অষ্টম সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনা ক্লিনটনের প্রস্তাব উপেক্ষা করে ভারতের কাছে গ্যাস বিক্রি না করায় ভারত-আমেরিকা যৌথভাবে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করেছিলো। অনেক বিশ্লেষক অনুরূপ ইলেকশান ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কথা কল্পনা করেছেন। অনেকে বলছেন যে লন্ডনে বেগম জিয়ার সঙ্গে বিজেপির নেতাদের সঙ্গে কথাবার্তা পাকা হয়েছে। চীনকে নিয়ে ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনার কিছু ভুল-বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়েছে তার সত্যতা পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর কথায়ও তা বুঝা যায়। চীন থেকে বাংলাদেশ ২৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েছে, আর তো কিছু নয়; বিনিময়ে তো বাংলাদেশ পাকিস্তান শ্রীলংকা বা মিয়ানমারের মতো নৌঘাটি দিয়ে ভারতকে ঘিরে ফেলার কোনও সুবিধা প্রদান করেনি। চীন ভারতেও তো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।

বাংলাদেশ গরিব দেশ। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের মাঝে ১৬ কোটি লোকের বসবাস। বাংলাদেশের প্রচুর উন্নয়নের প্রয়োজন। তাতে ভারত উল্লেখযোগ্য কোনও অবদান রাখতে পারছে না আবার প্রতিবেশী চীন ঋণ দিয়ে সাহায্য করলে ভারত তাতে নাক সিটকালেতো হবে না। গত দশ বছরে ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনার সরকারের ৭৫০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি হয়েছে। অথচ ডিসভারসমেন্ট হয়েছে মাত্র ৪০ কোটি ডলার। আর ভারত ঋণ দানের সংস্কৃতিতে এখনও অভ্যস্ত হয়নি। যে কারণে ঋণ গ্রহিতাকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

যাক, ভারত যদি বাংলাদেশের নির্বাচনে কোনও ইঞ্জিনিয়ারিং করতে চায় ভালো। সুবিধা আদায়ের আশায় তাতো তারা করবেই। তবে ভারতের কূটনীতি যাদের হাতে তারা কাঁচা মানুষ নন। ভারতের একটা দৈনিক পত্রিকা লিখেছে ‘সাপ-খোলস পাল্টায় চরিত্র পাল্টায় না। চরম ভারত বিদ্বেষী বাংলাদেশের বিএনপি এখন ক্ষমতায় যাওয়ার লোভে খোলস পাল্টে ভারত প্রেমী সাজতে পারে। কিন্তু তার চরিত্র পাল্টাবে না।’ এর বেশি লিখার সময় এখনও আসেনি।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন