শিরোনাম :

রোহিঙ্গা সমস্যা, ইসলামপন্থার রাজনীতি এবং বাংলাদেশের কূটনৈতিক ব্যর্থতা


সোমবার, ৩০ অক্টোবর ২০১৭, ০৪:৪৯ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

রোহিঙ্গা সমস্যা, ইসলামপন্থার রাজনীতি এবং বাংলাদেশের কূটনৈতিক ব্যর্থতা

সাঈদ ইফতেখার আহমেদ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর মনে করা হয়েছিল যে, রাষ্ট্র কর্তৃক কোনো জাতি বা ধর্মাবলম্বীদের নিধনের ঘটনা হয়তো আর ঘটবে না। হিটলারের নাৎসি জার্মানি সে সময় নিজ দেশসহ ইউরোপের যে সমস্ত অঞ্চল অধিকার করেছিল সেসব অঞ্চলে ইহুদি জনগোষ্ঠীকে নির্মূলের লক্ষ্যে ব্যাপক গণহত্যা চালিয়েছিল। এর মূল লক্ষ্য ছিল, প্রাথমিকভাবে জার্মানি এবং ক্রমান্বয়ে সমগ্র ইউরোপ থেকে ইহুদি জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ নির্মূল করে দেওয়া।

বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর লোক হওয়া সত্বেও ইহুদিরা যেহেতু নিজেদের এক জাতি বলে মনে করে, তাই এ গণহত্যা অনেকে জাতিগত নিধন (Ethnic cleansing) বলেও অভিহিত করে থাকেন। শুধুমাত্র ধর্মের উপর ভিত্তি করে এক জাতি ভাবার এ ধারণা অনেকটাই মুসলমানদের ‘উম্মাহ’এর ধারণার মতো। অর্থাৎ, জাতি বা রাষ্ট্রনির্বিশেষে মুসলিমদের একটা বড় অংশই নিজেদেরকে এক জাতি বা উম্মাহ হিসেবে ভাবতে বা কল্পনা করতে পছন্দ করেন।

আজকে পাশ্চাত্যে ইহুদিরা সফল জনগোষ্ঠী হওয়াতে অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান এবং কর্পোরেট মিডিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত। এর ফলে ইহুদি গণহত্যার বিষয়টি বিশ্ববাসী যেভাবে জানেন, হিটলারের আরেক টার্গেট, রোমা বা জিপসি জনগোষ্ঠীকে ইউরোপ থেকে নির্মূল করার লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত গণহত্যার বিষয়ে ততটা অবগত নন কেউ।

আজকে মিয়ানমারে অং সান সুচি এবং সেনাবাহিনী যেমন মনে করে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গারা যেহেতু বাইরে থেকে বা বাংলাদেশ থেকে এসেছেন, তাই তাদের দেশ থেকে বিতাড়ণ বা নির্মুল করতে হবে– তেমনি হিটলারও মনে করতেন, রোমা বা জিপসি জনগোষ্ঠী ভারত থেকে এসে ইউরোপে বসাবাস শুরু করেছে বলে তাদের হত্যা করতে হবে বা ইউরোপ্ থেকে বের করে দিতে হবে।

রাখাইন বা আরাকান রাজ্যে রোহিঙ্গারা কয়েক শতাব্দী যাবত বসবাস করলেও দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সেখানকার জনগণের মাঝে এ ধারণা গড়ে তুলতে সমর্থ হয়েছে যে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাইরে থেকে এসে বসবাসকারী; তাই তাদেরকে বলপূর্বক বহিস্কার বৈধ এবং এর মধ্যে অনৈতিক কিছু নেই।

যখন কোনো একটি দেশ দীর্ঘ সময় সেনা-শাসনাধীন থাকে সেদেশে সেনাশাসকদের চিন্তার বাইরে অন্য মত বা চিন্তার বিকাশের তেমন সুযোগ থাকে না

যখন কোনো একটি দেশ দীর্ঘ সময় সেনা-শাসনাধীন থাকে সেদেশে সেনাশাসকদের চিন্তার বাইরে অন্য মত বা চিন্তার বিকাশের তেমন সুযোগ থাকে না। সেনাবাহিনী ক্ষমতায় এসেই স্বাধীন চিন্তা যে সমস্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিকাশ লাভ করে অর্থাৎ ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়ার উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে একটি অনুগত সিভিল সমাজ এবং কিছু অনুগত রাজনৈতিক দল তৈরির চেষ্টা করে, যাদের মূল কাজ হল সেনা-শাসনের পক্ষে এবং তাদের অনুসৃত নীতি ও কার্যকলাপের প্রতি জনসমর্থন গড়ে তোলা।

১৯৬২ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সরাসরি ক্ষমতাসীন মিয়ানমারের সেনাবাহিনী অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে একটি অনুগত জনগোষ্ঠী এবং সিভিল সমাজ গড়ে তুলতে সমর্থ হয়েছে। ফলে বিভিন্ন সময়ে সামরিক শাসনবিরোধী বিক্ষোভ হলেও, সেটি বাংলাদেশের মতো এতটা জোরালো হতে পারেনি যা সামরিক শাসনের অবসান ঘটাতে পারত। এ ব্যর্থতায় রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়েছে এবং সেনবাহিনী সামরিক আমলাতন্ত্রের অনুগত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তাতে দেশে প্রত্যক্ষ সেনাশাসন না থাকলেও রাষ্ট্র এবং সরকারের সব অঙ্গের উপরে সেনা-কর্তৃত্ব অব্যাহত রয়ে গেছে।

সেনা-কর্তৃত্বের ফলে অং সান সু চি এবং তাঁর দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির পক্ষে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গিয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা আছে কিনা সে প্রশ্ন উঠেছে। আবার স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারলেও সু চি এবং তাঁর দল রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর নীতির বাইরে গিয়ে ভিন্ন কোনো নীতি গ্রহণ করতেন কিনা সেটাও প্রশ্নসাপেক্ষ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটো মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র এবং প্রতিরক্ষা– যারা রোহিঙ্গা-নিধনে সরাসরি ভূমিকা পালন করছে– তথাকথিত গণতান্ত্রিক শাসন ফিরে এলেও সেনাবাহিনী তাদের নিজেদের হাতে রেখে দিয়েছে।

১৯৬২ সাল থেকেই সেনাবাহিনী বিভিন্ন জাতিসত্তায় বিভক্ত মিয়ানমার সমাজকে তুলনামূলকভাবে একটি সমসত্ব জাতি হিসেবে গড়ে তুলবার উদ্যোগ নেয় অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী হতে ভিন্ন রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করবার উদ্যোগ নেবার মাধ্যমে। এ প্রক্রিয়ার শুরুটা হয় প্রথমে নির্যাতন এবং পরবর্তীতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করবার মাধ্যমে। মূলত এটি গণহত্যা হলেও নাৎসি জার্মানি বা ১৯৭১ সালে পাকিস্তান কর্তৃক বাঙালি গণহত্যার মতো একবারে অধিক সংখ্যক হত্যা নয়। বরং সরকার ধীরে ধীরে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাশূন্য করবার পথ নেয়– অমর্ত্য সেন যেটাকে বলেছেন, ‘মন্থর গণহত্যা’।

মিয়ানমারের ৮৮ শতাংশ জনগোষ্ঠী থেরাভেদা বৌদ্ধমত অনুসরণ করেন। বাকি জনগোষ্ঠীর ৬.২ শতাংশ খ্রিস্টান এবং ৪.৩ শতাংশ মুসলমান। মুসলমান জনগোষ্ঠীর বড় অংশ রোহিঙ্গারা। রোহিঙ্গাদের বাইরে অন্যান্য যে এথনিক গোষ্ঠী মিয়ানমারে রয়েছে তাদের মধ্যে ইসলাম ধর্মের অনুসারীর সংখ্যা নগণ্য। আবার রোহিঙ্গাদের মধ্যেও রয়েছে অল্পসংখ্যক হিন্দু এবং হাতেগোনা কিছু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী।

ধীরে ধীরে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাশূন্য করবার পথ নেয়– অমর্ত্য সেন যেটাকে বলেছেন, ‘মন্থর গণহত্যা’।

নাৎসি জার্মানির অনুকরণে মিয়ানমার সরকারের ‘জাতিগত বিশুদ্ধতা’ প্রকল্পের বলি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মাঝে যে খুব কমসংখ্যক অমুসলিম রয়েছেন তাঁরাও নির্যাতনের শিকার হয়ে শরণার্থী হয়ে বাংলাদেশে এসেছেন। অন্যদিকে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বাইরে শুধু মুসলমান হবার জন্য মিয়ানমারে কেউ নিপীড়নের শিকার হননি।কিন্তু জাতিগোষ্ঠীনির্বিশেষে খ্রিস্টান ধর্মালম্বীদেরকে সেখানে নানা সময়ে হেনস্থা এবং নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। অপরদিকে, শুধু রোহিঙ্গারাই নয় শান ও কারেন জাতিগোষ্ঠীও সেখানে জাতিগত নিপীড়নের শিকার হচ্ছে।

রোহিঙ্গা সমস্যা হল মূলত জাতিগত নিধনের সমস্যা। কিন্তু যেহেতু বেশিরভাগ রোহিঙ্গা ইসলাম ধর্মানুসারী এবং মিয়ানমারের অধিকাংশ জনগণ বৌদ্ধ ধর্ম অনুসরণ করেন বলে, পাশ্চাত্যের ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়া একে জাতিগত সমস্যার চেয়ে মুসলমানদের উপরে বৌদ্ধদের ধর্মীয় নীপিড়নের সমস্যা হিসেবে দেখাতে আগ্রহী। তাই পাশ্চাত্যের মিডিয়া রোহিঙ্গা শব্দের পাশাপাশি মুসলমান শব্দ জুড়ে দিয়ে অথবা কোনো কোনো সময় শুধু মুসলমান শব্দ ব্যবহার করে মিয়ানমারের বর্তমান সমস্যা তাদের মিডিয়াতে তুলে ধরছে।

এভাবে সংবাদ পরিবেশন করবার মূল কারণ হচ্ছে এই যে, এতে পাশ্চাত্যের সরকারগুলো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে নিয়ে ভবিষ্যতে চীন, রাশিয়াঘেঁষা মিয়ানমারের বিরুদ্ধে এবং এর পাশাপাশি উপযোগী ক্ষেত্র তৈরি হলে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও পাশ্চাত্য কর্তৃক বহুলব্যবহৃত ইসলাম কার্ড ব্যবহার করতে পারবে– এর সঙ্গে জঙ্গীবাদের ইস্যুটি জুড়ে দিয়ে।

৯/১১ পরবর্তী বিশ্বে ইসলাম বা মুসলমান শব্দগুলোর সঙ্গে প্রয়োজন পড়লে পাশ্চাত্য বা অন্য রাষ্ট্রের পক্ষে উগ্রবাদ বা জঙ্গিবাদের তকমা খুব দ্রুত জুড়ে দেওয়া সম্ভব। যা কোনো জাতিসত্তার ধারণার সঙ্গে অতিদ্রুত সম্ভব নয়। ফলে গত কয়েক দশক ধরে পাম্চাত্যের প্রবণতা হল, মুসলিমপ্রধান দেশ, অঞ্চল বা জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে কোনো ঘটনা ঘটলে বিশ্ববাসীকে বারবার তার ধর্মীয় পরিচয় স্মরণ করিয়ে দেওয়া।

যুগোস্লাভিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় সার্বিয়া কর্তৃক বসনিয়াতে যখন গণহত্যা চালান হচ্ছিল তখনও পাশ্চাত্যের মিডিয়া বারবার বলছিল, বসনিয়ার মুসলমানদের হত্যা করা হচ্ছে। কিন্ত তারা কখনও বলেনি যে, সার্বিয়ার খ্রিস্টান কর্তৃক বসনিয়ার মুসলমানদের হত্যা করা হচ্ছে। অর্থাৎ, নেতিবাচক কোনো বিষয়ে পাশ্চাত্য যেমন তার খ্রিস্টান পরিচয় লুকিয়ে রাখতে আগ্রহী, তেমনি ইতিবাচক বিষয়টি ধর্মীয় পরিচয়ে চিহ্নিত না করে বৈশ্বিক পরিচয়ে পরিচিত করাতেই আগ্রহী।

বাংলাদেশের মিডিয়া যেহেতু পাশ্চাত্যের মিডিয়া দ্বারা বহুলপ্রভাবিত, তাই এখানকার সব মিডিয়াতে রোহিঙ্গা পরিচয়ের পাশাপাশি তাদের ধর্মীয় পরিচয়টি একই সঙ্গে পাশ্চাত্যের অনুকরণে বলা হচ্ছে। অপরদিকে, ইসলামপন্থার রাজনীতি যারা করেন তাদের কাছেও রোহিঙ্গাদের জাতিগত পরিচয়ের চেয়ে ধর্মীয় পরিচয়টি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এটি তাদেরকে বিষয়টির রাজনীতিকরণের মাধ্যমে রাজনীতির মাঠে টিকে থাকতে সাহায্য করবে।

শুধু বাংলাদেশেই নয়, মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষত ইরাক, সিরিয়াসহ অন্যান্য জায়গায় আইসিস ক্রমশ কোণঠাসা অবস্থানে চলে যাওয়া এবং এর পাশাপাশি মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রভাব হারানোর ফলে বিশ্বব্যাপী ইসলামপন্থী দলগুলোর ভবিষৎ আছে কিনা এ প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে। বিষয়টা অনেকটা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে তার টিকে থাকবার প্রশ্নে যে চ্যালেঞ্জ উপস্থিত হয়েছিল সে রকম।

এছাড়া শুরু থেকেই ইসলামপন্থার রাজনীতি বিশ্বব্যাপী পাশ্চাত্যের স্বার্থসিদ্ধির গুটি হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে। ৯/১১ পরবর্তীতে এ সম্পর্কে অনেকাংশে চির ধরলেও পাশ্চাত্যের সঙ্গে ইসলামপন্থী দলগুলোর সম্পর্ক ইংরেজিতে যাকে বলে Love hate relationship সেটা রয়ে গেছে। অর্থাৎ পাশ্চাত্য এবং ইসলামপন্থী দলগুলো একে অন্যের বিরুদ্ধে লড়াই করবার কথা বললেও, প্রয়োজনে একে অন্যকে সাহায্য করে যাচ্ছে। বহু ইসলামপন্থী নেতা এবং কর্মী লন্ডনসহ পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন শহরে বসবাস করেন এবং ধর্মীয় লেবাসে নানা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যম পরিচালনা করেন।

এদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, পাশ্চাত্যের মুসলমানদের মধ্যে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ এবং মুসলমানপ্রধান দেশগুলোর ইসলামপন্থার রাজনীতির সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করা। এটি খুব অদ্ভুত ব্যাপার যে, বারবার সন্ত্রাসবাদের শিকার হলেও পাশ্চাত্য ইসলামপন্থী দল এবং সংগঠনগুলোর কার্যকলাপসমূহ সহানুভূতির চোখে দেখে। অপরদিকে, ক্রমাগত আমেরিকা এবং পাশ্চাত্যবিরোধী কথা বলে গেলেও এ সমস্ত দলের নেতা, কর্মীরা তাদের আশ্রয়স্থল হিসেবে পশ্চিমা দেশগুলোকেই নিরাপদ মনে করে।

বস্তুত এ সম্পর্কের জের ধরেই আমরা দেখি, জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসির আদেশ রদ করবার জন্য তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করতে অথবা জামায়াতকে মডারেট গণতান্ত্রিক দল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্বীকৃতি দিতে। এটা খুবই স্বাভাবিক যে, ইসলামপন্থী দলগুলো পাশ্চ্যত্যের দেখানো পথেই রোহিঙ্গা সমস্যাটি জাতিগত নিধনের চেয়ে মুসলিম নিধনের সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করবে এবং এটি পুঁজি করে ইসলামপন্থার রাজনীতির বিকাশই ঘটাতে চাইবে।

ফলশ্রুতিতে আমরা দেখছি হেফাজতসহ ইসলামপন্থার রাজনীতিতে যারা বিশ্বাস করেন তারা সবাই রাজনীতির মাঠ থেকে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমসমূহে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হিসেবে জিহাদের মাধ্যমে স্বাধীন আরাকান দেশ প্রতিষ্ঠার অবাস্তব ধারণার কথা বলে যাচ্ছেন। এ জিহাদে তারা বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে অংশগ্রহণের পাশাপাশি সরকারকেও সাহায্য করবার আহবান জানাচ্ছেন। তাদের অনেকেই বিভিন্ন ফোরামে বর্তমান বিশ্ব-বাস্তবতা এবং মিয়ানমারের তুলনায় বাংলাদেশের সামরিক সামর্থ্য ইত্যাদি বিবেচনায় না নিয়ে শুধু আবেগ পুঁজি করে বুঝে বা না-বুঝে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে ভারত যে ভূমিকা পালন করেছিল বাংলাদেশকেও আজকে সে ভূমিকা পালন করবার আহবান জানাচ্ছেন। তবে তা ভারতের মতো ধর্মনিরপেক্ষ চেতনায় না হয়ে জিহাদি চেতনায় উদ্ভুদ্ধ হয়ে।

অপরদিকে, দীর্ঘদিন ধরে নিপীরিত রোহিঙ্গারাও এ জিহাদের মাধ্যমেই তাদের ওপর নিপীড়নের অবসানের উপায় খুঁজছেন। আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা আরসা তাদের মুক্তিসংগ্রামের জন্য এমন একটি প্রত্যয় অর্থাৎ জিহাদ বেছে নিয়েছে যার মাধ্যমে পাশ্চাত্য তো বটেই এমনকি জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সক্রিয় বাংলাদেশ সরকারের সহানুভূতি বা সমর্থন পাওয়া অনেকটাই অসম্ভব। তাছাড়া মিয়ানমার সরকারের কার্যকলাপের নিরঙ্কুশ সমর্থন দানকারী কমিউনিস্ট গণচীন, সিরিয়াতে ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াইরত রাশিয়া এবং হিন্দু মৌলবাদী বিজেপিশাসিত ভারত– এদের কাছ থেকেও জিহাদি কার্যক্রমের পক্ষে সমর্থন আশা করা বাতুলতা মাত্র।

রোহিঙ্গারা অন্য কোনো আদর্শ যেমন ১৯৭১ সালের বাঙালিদের মতো ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ বা কুর্দিদের মতো বাম মতাদর্শ সামনে রেখে তাদের মুক্তিসংগ্রাম সংগঠিত করতে পারেনি। মিয়ানমারের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী থেকে তুলনামূলকভাবে অনগ্রসর রোহিঙ্গাদের কাছে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ এ সমস্ত শব্দ বিজাতীয়। অন্য মতাদর্শগত রাজনীতির তাদের মধ্যে স্থান করে নিতে পারেনি। তাদের কাছে পরিচিত ইসলাম ধর্মজাত জিহাদ ইত্যাদি শব্দাবলী ব্যবহার করে শুধু ইসলামপন্থার রাজনীতিরই বিকাশ ঘটান সম্ভব হয়েছে।

এই রাজনীতির আলোকে বেশিরভাগ রোহিঙ্গা তাদের সমস্যা বুঝবার চেষ্টা করবার কারণে জাতিগত নিধনের চেয়ে তাদের অনেকের কাছেই এটা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী কর্তৃক ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের উপর ধর্মগত নিপীড়ন বলে প্রতিভাত। এদিকে, বাংলাদেশের সামরিক শাসকরা যেমন স্বার্থসিদ্ধির জন্য ইসলাম কার্ড ব্যবহার করেছেন, মিয়ানমার সরকারও ঠিক তেমনিভাবে রোহিঙ্গাদের দেশ থেকে তাড়াবার জন্য বৌদ্ধ কার্ড ব্যবহার করে ভিক্ষুদের দিয়ে বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী চেতনা গড়ে তুলছেন। সু চি সরকারের লক্ষ্য হল, বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের বিপরীতে রোহিঙ্গারা যাতে ইসলামপন্থার রাজনীতি দাঁড় করায়, যাতে বিশ্ববাসীর সামনে রোহিঙ্গা সমস্যাটি জঙ্গিবাদের সমস্যার সঙ্গে এক করে এ বিতাড়ণ এবং নিধনের বৈধতা দেওয়া যায়।

যারা রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়নকে শুধু মুসলিম নিধন হিসেবেই প্রচার করছেন, তারা মূলত সু চি সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নেই সহায়তা করছেন। এতে মিয়ানমার বিশ্ববাসীর সামনে রোহিঙ্গা সমস্যা জঙ্গিবাদের সমস্যা হিসাবে তুলে ধরার প্রয়াস পাবে এবং এ লক্ষ্যেই সু চি সরকার এগুচ্ছে। তাছাড়া পাশ্চাত্যের অনেক নীতিনির্ধারক এবং চিন্তাবিদ মনে করেন, মুসলিমপ্রধান দেশগুলিতে হস্তক্ষেপের নীতি বজায় রাখতে হলে যে কোনো ভাবে ইসলামপন্থার রাজনীতি বাঁচিয়ে রাখতে হবে। বিশ্বব্যাপী ইসলামপন্থার রাজনীতির পতনোন্মুখ সময়ে রোহিঙ্গা সমস্যাটি ধর্মগত ইস্যু হিসেবে প্রচার করে বাঙালি এবং রোহিঙ্গা ইসলামপন্থীরা মূলত পাশ্চ্যত্যের রাজনৈতিক এজেন্ডার পক্ষেই কাজ করে যাচ্ছেন।

রোহিঙ্গা ইসলামপন্থীরা তাদের জিহাদি কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই ২৫ আগস্ট একযোগে তিরিশটি থানা এবং একটি সেনা ক্যাম্প আক্রমণ করে। ২৫ আগস্টের ঘটনা অজুহাত ধরেই মিয়ানমার সরকার ব্যাপকভাবে সাধারণ রোহিঙ্গাদের বিতাড়ণের অভিযান শুরু করেছে যা এখনও চলছে। এ অভিযানের জের ধরে জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী গড়ে এখন প্রতিদিন চৌদ্দ হাজারের মতো রোহিঙ্গা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে ঢুকছে। ২৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ছয় লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, যাদের পঞ্চাশ হাজারের বেশি গর্ভবতী নারী। এর আগে, ১৯৭৮ সাল থেকে ২৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত আনুমানিক পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল। বর্তমানের ছয় লাখ মিলে এ সংখ্যা এখন এগার লাখে এবং সংখ্যাটা ক্রমাগত বাড়তির দিকে।

এ থেকে একটা বিষয় পরিস্কার যে, মিয়ানমার আগের ধীরে ধীরে বিতাড়নের নীতি থেকে সরে এসে একবারে এবং চিরতরে সব রোহিঙ্গাকে দেশ থেকে বের করে দিতে চাচ্ছে।

২৫ আগস্টের পর থেকে রোহিঙ্গা জনস্রোত যখন বাংলাদেশে আশা শুরু করে তখন বাম এবং ইসলামপন্থীরা ভেবেছিলেন আওয়ামী লীগ সরকার হয়তো রোহিঙ্গাদের দেশে প্রবেশ করতে দেবে না। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে যেহেতু বাম এবং ইসলামপন্থীরা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক অনেক ইস্যু একইভাবে দেখেন; সেই একই দেখার রেশ ধরে দুতরফ থেকে জোরেশরে বলা হতে লাগল যে, ভারত যদি ১৯৭১ সালে এক কোটি বাঙালিকে আশ্রয় দিতে পারে তাহলে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশে কেন রোহিঙ্গারা আশ্রয় পাবে না। কিন্তু চতুররতার সাথে তারা যে বিষয়টি উল্লখ করা থেকে বিরত থাকে তা হল, বাংলাদেশে ১৯৭৮ সাল থেকেই রোহিঙ্গাদের প্রবেশ অব্যাহত রয়েছে।

অপরদিকে, আওয়ামী লীগ জনমতের চাপই হোক বা ইসলামপন্থীরা যাতে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে রাজনীতি করতে না পারে সে কারণ বা অন্য যে কোনো কারণেই– সীমান্ত খুলে দেবার নীতি নেয়। কিন্তু কেউ এটি অনুধাবন করতে পারেননি যে, মিয়ানমার সরকার এবার সব রোহিঙ্গাকেই একেবারে দেশ থেকে বিতাড়ণ করবার উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে রোহিঙ্গাদেরকে সাহায্য করবার ব্যাপারে প্রাথমিকভাবে যে উৎসাহ দেখা গিয়েছিল সেটাতে ভাটা পড়তে শুরু করেছে। জনমানসে আস্তে আস্তে এ ধারণা প্রোথিত হচ্ছে যে, তাদেরকে হয়তো আর ফেরত পাঠান যাবে না। তারা এদেশে থেকে গেলে এর কী কী নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের উপর পড়বে এ নিয়ে জনগণের একটা উল্লেখযোগ্য অংশের মাঝে উৎকণ্ঠা বাড়তে শুরু করেছে। এর পাশাপাশি মিয়ানমার সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোতে রোহিঙ্গাদের সাথে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর এক ধরণের রেশারেশির পরিস্থিতিও তৈরি হচ্ছে।

এদিকে, বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলেও তাদেরকে শরণার্থীর মর্যাদা দিতে অস্বীকার করছে। একটি দেশের শরণার্থীদের অধিকার বিদেশি স্থায়ী বসবাসকারীদের অধিকারের সমান। যেমন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একজন গ্রিন কার্ডধারীর যে নাগরিক অধিকার রয়েছে, যে কোনো রাষ্ট্রে একজন শরণার্থীরও সে অধিকার রয়েছে। শরণার্থীর অধিকার রয়েছে আশ্রিত দেশের যে কোনো জায়গায় স্বাধীনভাবে চলাচল, বাড়ি ভাড়া বা ক্রয়ের, চাকরি বা ব্যাবসা করার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করবার এবং রাজনীতিসহ যে কোনো বিষয়ে মত প্রকাশ করবার।

রোহিঙ্গাদের শরণার্থীর মর্যাদা না দিয়ে বাংলাদেশও মিয়ানমারের মতো জাতিগত বিশুদ্ধতা বজায় রাখার নীতি মাথায় রেখেই তাদের আশ্রয় দিচ্ছে। হিটলারের জার্মানিতে ইহুদিদের বিয়ে করা নিষিদ্ধ ছিল। ইসরাইলের কোনো নাগরিকের কোনো ফিলিস্তিনিকে বিয়ে করা নিষেধ। তেমনি, মিয়ানমারের কোনো নাগরিকের পক্ষেও কোনো রোহিঙ্গাকে বিয়ে করা বেআইনি। মিয়ানমারকে অনুসরণ করে বাংলাদেশ সরকারও ১৯১৪ সালে ‘কোনো রোহিঙ্গাকে বিয়ে করা যাবে না’ মর্মে আইন প্রণয়ন করেছে। এছাড়া রোহিঙ্গারা যাতে দেশের কোথাও ভ্রমণ বা বাড়ি ভাড়া করতে না পারে সে বিষয়েও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের অনেকেই এ বিষয়ে মিয়ানমারের নাগরিকদের মতো সরকারকে নানাভাবে সহযোগিতা করছেন, যাতে রোহিঙ্গারা কোনো ভাবেই বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে যেতে না পারে। রোহিঙ্গাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি হল, মিয়ানমারে যেমন রাখাইন রাজ্যে মূল জনগোষ্ঠী বিচ্ছিন্ন হয়ে তাদের আলাদাভাবে বসবাস করতে হয়েছিল, বাংলাদেশেও তেমনি তাদেরকে ক্যাম্পে বা দুর্গম দ্বীপে নাগরিক এবং মানবিক সুযোগ-সুবিধা বিচ্ছিন্ন এক ধরনের বন্দি জীবন যাপন করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকারের সামনে কূটনৈতিক তৎপরতা ছাড়া রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের আর কোনো পথ খোলা নেই। আবার শুধু কূটনৈতিক প্রচেষ্টার উপর নির্ভর করেই যে সব সমস্যার সমাধান করা যায় না এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি প্রামাণ্য সত্য। কিন্তু এ তৎপরতা চালানার ক্ষেত্রেও আমলা-কূটনীতিকনির্ভর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। বেশিরভাগ আমলা-কূটনীতিকই আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা রাষ্ট্রবিজ্ঞান ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে ফরেন সার্ভিসে আসেননি। লোকপ্রশাসন একাডেমিতে কয়েক মাসের প্রাপ্ত প্রশিক্ষণই তাদের জটিল আন্তর্জাতিক রাজনীতি বুঝার একমাত্র উৎস। ফলে তাদের অনেকেই বিশ্বরাজনীতির পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট বুঝে উঠতে পারছেন না।

ফলে তাদের মনোজগত এখনও আটকে আছে সোভিয়েত পতন-উত্তর এককেন্দ্রিক বিশ্বের দিকে। মিয়ানমারের উপর খুব সীমিত প্রভাব থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতার লক্ষ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন। বাস্তবতা হচ্ছে, বর্তমানে শীতল যুদ্ধোত্তর এক মেরু বিশ্বের জায়গায় রাশিয়া-চীনকেন্দ্রিক দ্বি-মেরু বিশ্বের উদ্ভব হচ্ছে। রাশিয়া-চীনের লক্ষ্য মিয়ানমারকে যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রভাবের বাইরে রেখে নিজেদের বলয়ভুক্ত করে রাখা। ভারতও আজকে রাশিয়া, চীনের সঙ্গে ব্রিকস, সাংহাই কোপারেশন অরগানাইজেশন ইত্যাদি অর্থনৈতিক এবং সামরিক জোটের সদস্য। তাই তারা চাচ্ছে না চীন, রাশিয়ার বাইরে মিয়ানমারের ব্যাপারে ভিন্ন অবস্থান নিতে।

মিয়ানমারের উপর যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রভাব খুব সীমিত, তাই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে রাশিয়া-চীনের সঙ্গে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো ছাড়া বাংলাদেশের সামনে বিকল্প নেই। কেননা শুধু এ দুটি দেশেরই মিয়ানমারের নীতি প্রভাবিত করবার ক্ষমতা রয়েছে।

কূটনৈতিক তৎপরতার সঙ্গে বাংলাদেশকে আজকে এ বাস্তবতাও অনুধাবন করতে হবে যে, আটকে-পড়া বিহারীদের মতো রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সম্ভব না-ও হতে পারে। এ ক্ষেত্রে এ বিশাল জনগোষ্ঠীকে কীভাবে বাঙ্গালদেশের মূলধারার সঙ্গে একীভূত করা যাবে তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবারও সময় এসেছে। কেননা মিয়ানমারের মতো এ বিপুল জনগোষ্ঠীকে বিছিন্ন করে অনেকটা বন্দিদশার মতো করে রাখলে তাদের মাঝে উগ্রবাদ, অপরাধ মনোবৃত্তি এসবের জন্ম দেবে। যা আখেরে বাংলাদেশের জন্য আরও বড় বিপদ ডেকে আনবে।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন