শিরোনাম :

শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের সমীপে...


সোমবার, ৬ নভেম্বর ২০১৭, ০৩:৫৪ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের সমীপে...

ইকরাম কবীর: দেশ স্বাধীন হওয়ার দু’দিন আগে আমাদের যেই শিক্ষকদের রাজাকার ও পাকিস্তানি সৈন্যরা তাদের বাড়ি থেকে নিয়ে গিয়ে অত্যাচার করে মেরে ফেলেছিল, আজ তারা কবরে শুয়ে নিশ্চয়ই কাতরাচ্ছেন। তাদের পরের প্রজন্মের শিক্ষকদের কাণ্ড-কারখানা দেখে মনে হচ্ছে তারা মৃত ব্যক্তিদেরও জাগিয়ে তুলতে সক্ষম। একাত্তর সালে আমাদের শিক্ষকদের পাকিস্তানিরা হত্যা করেছিল কারণ তারাই ছিলেন দেশের সবচেয়ে উন্নত মেধার অধিকারী। তাদের শেষ করতে পারলেই এদেশ আর কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।

মনে হচ্ছে রাজাকার-পাকিস্তানিরা সার্থক হয়েছে। দেশের সর্বোন্নত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকেরা মারামারি করছেন, তা দেখে নিশ্চয়ই রাজাকার-পাকিস্তানিরা হাততালি দিচ্ছে।
হাতাহাতিতে ব্যস্ত শিক্ষকগণ– আপনারা তাদেরই মনের ইচ্ছা পূরণ করছেন এবং আপনাদের দিকে হতবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছে গোটা বাংলাদেশ।

পত্রিকার প্রতিবেদনে একজন শিক্ষকের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, যে ‘স্বার্থে’ আঘাত লাগায় এমন হাতাহাতির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।

‘স্বার্থ’? কাদের স্বার্থ? আপনাদের? শিক্ষকদের? না শিক্ষার্থীদের? কিসের স্বার্থ? শিক্ষার স্বার্থ? নাকি ‘অশিক্ষার’ স্বার্থ। প্রতিবেদনে যেমন করে ধারা-বিবরণী দেওয়া হয়েছে তা যদি কোনও টেলিভিশন রেকর্ড করে রাখতে পারতো, সেটিই হতো বিশ্বের সবচেয়ে বড় রিয়েলিটি শো!

আপনারা দলীয় রাজনীতি করেন তা আমরা অনেক বছর ধরে দেখে আসছি। ক্যাম্পাসে পাঠদানের চেয়ে আপনাদের কাছে রাজনীতি করে ফায়দা আদায় করা যে আরও গুরুত্বপূর্ণ তাও আমরা বুঝি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এমন করে নিজেদের মধ্যে হাতাহাতি করে রক্ত ঝরাবেন তা আমরা আশা করি না। আপনারা আসলে কিসের ফায়দা চান তা আমাদের কাছে ঠিক বোধগম্য নয়। টাকা-পয়সা? আপনারাতো শিক্ষক; আপনাদের হাতে রাজনৈতিক দলগুলো কোন তরিকায় অর্থ দেবে। ক্ষমতা? হাজার-হাজার শিক্ষার্থীদের ওপর কর্তৃত্ব বজায় রাখবেন? জানতে চেয়েছেন আপনাদের শিক্ষার্থীরা আপনাদের কর্তৃত্ব কতটা চায়? তারা কি চায় আপনারা রাজনীতি করুন? এসব বোধহয় একেবারেই ভাবেন না, তাই না? কষ্ট, কষ্ট!

আপনাদের কর্মকাণ্ড আপনাদের কর্মস্থলের ওপর কী প্রভাব ফেলছে বা এখন ফেলবে তা একবার ভেবেছেন? ওখানে কি শিক্ষাদানের কাজ করছেন? নাকি রাজনীতি করতে গেছেন? তাহলে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে ফেলুন না! আপনারা সবাইতো হয় প্রথম বিভাগে প্রথম, না হয় দ্বিতীয়। আপনাদের অন্য কোথাও চাকরির অভাব হবে না।

তবে আপনারাই বোধহয় প্রথম নন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পতন শুরু হয়েছে আপনাদেরও আরও আগে। তখন– আশির দশকের মধ্যভাগে– আমরা কেবল আমাদের শিক্ষাযাত্রা শুরু করেছি। আমি নিজে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে কিছুটা গর্ববোধ করতে চাই। আমার মতো আরও অনেকেই আছেন। কিন্তু হাজারো চেষ্টা করেও গর্ব করতে পারি না। আমাদের পিতা-মাতা আপনাদের ওখানে অর্থাভাবে পড়তে পাঠাননি; পাঠিয়েছিলেন শিখতে।

সেখানে গিয়ে দেখলাম একজন বেহায়া রকমের স্বৈরশাসক দেশের ক্ষমতা দখল করে, ছাত্রাঙ্গন কলুষিত করে এক অভিনব ধ্বংসের খেলায় মত্ত। এই শাসকের কারণে আমাদের আট বছর লেগেছিল পাস করে বেরুতে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলাম ১৮ বছর বয়সে, শেষ করার কথা ছিল ২২ বছর বয়সে, কিন্তু বেরুলাম আরও চার বছর পর– ২৬ বছরে। জীবন থেকে হারিয়ে গেলো চার-চারটি বছর। ওই বছরগুলোতে আসলে কিছু শিখেছি বলে দাবি করতে পারবো না।

শুধু ওই শাসক নন, আপনাদের মধ্যেও অনেকেই তার দখল-কর্মে ইন্ধন জুগিয়েছিলেন। হয়তো তার হাতে হাত মেলাননি, তবে ক্যাম্পাসের ছাত্র রাজনীতিকে তিলে-তিলে ধ্বংস হতে দেখেও চুপ করে বসেছিলেন। কিছুই করেননি। তখনই আপনারা দলীয় রাজনীতিতে নাম লিখিয়েছিলেন।

আমরা আমাদের নিজেদের ধৈর্যের প্রশংসা করি। জীবন থেকে কোনও কারণ ছাড়াই বছরগুলো চলে যাচ্ছে, আপনারা তা দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখছেন, ক্যাম্পাসে অবাধে অস্ত্র ঢুকতে দিয়েছেন, জাতীয় রাজনীতিতে সচল হচ্ছেন – কিন্তু আমাদের পড়াশোনা নিয়ে কিছু করছেন না। আমাদের বাবা-মাদেরও ধন্যবাদ দিতে হয়। তারা সামান্য আয় দিয়ে আমাদের পড়তে পাঠিয়ে আরও চার বছর আমাদের জন্য খরচ টানতে হয়েছে।

চার বছরে পড়াশোনা আট বছরে শেষ করে কী শিখেছি তা হয়তো আপনারা জানেন না, তবে আমরা জানি। আপনারাতো মনে করেন আমাদেরকে খুব ভালো শিখিয়েছেন! কোনও সমীক্ষা করে দেখেছেন কেমন শিখিয়েছেন। আপনাদের অনেকেইতো অনেক বড়-বড় প্রজেক্টে কাজ করতে গিয়ে অনেক সমীক্ষা-কর্ম করেন। একবার আপনাদের নিজেদের শিক্ষার্থীদের ওপর সমীক্ষা চালিয়ে দেখুন না!

এখন আর সেশন জট নেই, তবে আপনাদের তৎপরতা ঠিকই রয়ে গেছে। ক্যাম্পাসে কেন রাজনীতি করা দরকার এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে গেলেই আপনারা স্বাধীনতার সময় ক্যাম্পাস রাজনীতির দোহাই দেন।

সত্য কথা। তখনকার ক্যাম্পাস রাজনীতি আমাদের দেশ স্বাধীন করতে সাহায্য করেছিল। আমরা অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে তা স্মরণ করি। তারপর কিন্তু ৪৭ বছর চলে গেছে, মনে আছে তো? ওই স্বৈরশাসককেও টেনে নামিয়েছিল এই ক্যাম্পাস রাজনীতিই। তারপরও আড়াই দশক পেরিয়ে গেছে। সেই রাজনীতিই কি আপনারা এখনও চালিয়ে যেতে চান?

মনে আছে কিছুদিন আগে আমাদের রাষ্ট্রপতি আপনাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এক কনভোকেশনে গিয়ে কী বলেছিলেন? তিনি বলেছিলেন, ‘আমি এখন সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর যে বিশ্ববিদ্যালয় এক সময় আমায় প্রত্যাখ্যান করেছিল’। তিনি তাঁর ছাত্রজীবনের কথা সবাইকে জানিয়েছিলেন।

তিনি মজা করে অনেক কথা বলেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নিয়েও কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তাঁরা যখন ষাটের দশকে ছাত্র ছিলেন তখন রাজনীতি ছিল দেশের মানুষকে সেবা করার জন্য, মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য; তাদের নিজেদের কোনও স্বার্থ ছিল না।

আপনারা অনেকেই হয়তো তার কথা পছন্দ করেননি। আপনারা আসল অর্থ ধরতেই পারেননি।

তিনি আপনাদের সবাইকে অন্ধকার থেকে জেগে ওঠার আহ্বান জানিয়েছিলেন, নিজেদের আত্মার পানে তাকাতে বলেছিলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয় এতগুলো বছর ধরে কী অর্জন করলো সেদিকে তাকাতে বলেছিলেন।

পড়াশোনা নিয়ে আমার নিজের অনেক আশা ছিল। পূরণ হয়নি। যা আশা করেছিলাম আমাদের শিক্ষকদের কাছ থেকেই করেছিলাম। আমাদের সময় ইংরেজি বিভাগে অনেক নামকরা শিক্ষক ছিলেন যাদের আমরা অসম্ভব সম্মান দিতাম।

ভেবেছিলাম তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক হবে গুরু-শিষ্যের মতো; সপ্তাহে-সপ্তাহে সেমিনার করবেন, তাদের পেছন-পেছন লাইন দিয়ে ব্রিটিশ কাউন্সিলে যাবো, লেখা প্রতিযোগিতা আয়োজন করবেন, আমরা একসঙ্গে নাটক মঞ্চায়ন করবো– আশা পূরণ হয়নি।

আজ আপনারা যারা হাতাহাতি করলেন সবাই নিশ্চয়ই প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান পেয়েছিলেন! আপনারা ক’জন লেখেন? ক’জন ছাত্র-ছাত্রীকে লিখতে উৎসাহ দেন? অল্প কয়েকজন ছাড়া আর তেমন কাউকেই তো লিখতে দেখি না।

গেলো বছর আপনাদের বিশ্ববিদ্যালয় ৮১টি দেশের ৯১৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৭০১তম স্থান পেয়েছে। এশিয়ার মধ্যে হয়েছে ১০৯তম। বুঝতে পারছেন আপনাদের প্রথম-বিভাগে-প্রথম ফলাফল কোনও কাজে আসছে না?

আমরা যখন বড় হচ্ছিলাম শুনতাম আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় নাকি ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’। বিশ্বাসও করেছিলাম। সে কারণেই সেখানে পড়াশোনা করতে চেয়েছিলাম। তবে পড়তে গিয়ে ভুল ভেঙেছিল। কেন যে ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ বলা হতো তা আজ পর্যন্ত বুঝতে পারিনি। এখনও পারি না।

ওই স্বৈরশাসকের সময় ছাত্ররা নিজেদের মধ্যে মারামারি-গোলাগুলিতে ব্যস্ত ছিল; এখন আপনারা হাতাহাতির রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত। তো এই বিশ্ববিদ্যালয়টির কী হবে? শিক্ষার্থীরা কী করবে। আপনারা মারামারি করলেন আর আপনাদের শিক্ষার্থীরা দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে তা দেখল! কোথায় রইল আপনাদের সম্মান?

আমাদের সমাজে মারামারি, হাতাহাতি করার সময় পায় কারা? যাদের কোনও কাজ নেই, তারা! আপনাদের কি কোনও কাজ নেই?

বেশিদূর যেতে হবে না। আশেপাশের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে আপনাদের একটু তুলনা করুন। ক’জনকে হাতাহাতি করতে শুনেছেন? এই যে কাজটি করলেন, একবার ভেবেছেন আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান কোথায় দাঁড়ালো?

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম আপনাদের প্রতি সহায় হয়েছে। আপনাদের মারামারির খবর তারা খুব বড় করে ছাপেনি। যারা মারামারি করেছেন তাদের উচিত প্রথমে সাংবাদিকদের ধন্যবাদ দেওয়া এবং তারপর কয়েকদিনের ছুটি নেওয়া। ছুটিতে বসে বসে চিন্তা করা যে কাজটি করেছেন তা নিয়ে।

অতএব, ক’দিন ছুটি নিন এবং ভাবুন।

লেখক: গল্পকার ও কলামিস্ট

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন