শিরোনাম :

‘শুভ জন্মদিন দাদাভাই’


সোমবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৭, ০৫:৩৮ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

‘শুভ জন্মদিন দাদাভাই’

বড়ভাই হুমায়ূন আহমেদই সম্ভবত আমাদের সব আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া ছাত্র। বলা বাহুল্য সে খুবই মেধাবী ছিল। সেই সময়ে বোর্ডে স্ট্যান্ড করা স্টার মার্ক পাওয়া ছাত্র। যখনকার কথা বলছি তখন কিন্তু এখনকার মত মেধাবী ছাত্ররা ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য ছুটতো না তখন মেধাবীরা বেসিক সাবজেক্টেই পড়াশুনা করতে আগ্রহী ছিল।

যেমন বড় ভাই যাকে আমরা ভাইবোনরা সবাই দাদাভাই ডাকতাম। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নে ভর্তি হয়েছিল। সেরকম মেজোভাই মুহম্মদ জাফর ইকবাল (সেও খুব মেধাবী ছিল)পদার্থ বিজ্ঞানে। যদিও আমার মায়ের সারা জীবনে ইচ্ছে ছিল পরিবারের কেউ একজন ডাক্তার হোক। ডাক্তাররা সাদা এ্যাপ্রন পড়ে ঘুরে বেড়ায় (বিশেষ করে মেয়ে ডাক্তাররা) এটা আমার মায়ের খুবই প্রিয় একটি দৃশ্য।

অনেক পরে বড় ভাইয়ের বড় মেয়ে নোভা আহমেদ ডাক্তারীতে চান্স পেল, মা খুশী হয়ে উঠলেন। এবার বোধহয় পরিবারে একজন ডাক্তার হতে যাচ্ছে। কিন্তু না শেষ পর্যন্ত সে কম্পিউটার সায়েন্সে চলে গেল, ডাক্তারী তার ভালো লাগে না। পরে সেই বিষয়েই যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি করেছে সে। এখন নর্থ সাউথের টিচার। তার আগে অবশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার ছিল।


যাহোক আমাদের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া বড় ভাইয়ের কাছে আমরা বিশেষ করে আমি যেহেতু ছোট ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ে নানারকম গল্প শুনতাম। আর সে তখন থেকেই ছিল গল্প বলার যাদুকর। একটা গল্প বেশ মনে আছে...


সে তখন মহসিন হলে থাকতো। তাদের ফ্লোরের একটা রুম সব সময় বন্ধ থাকত। মাঝে মাঝে গভীর রাতে মেয়ের গলায় খিল খিল চাপা হাসির শব্দ শোনা যেত। সবাই বেশ ভয় পেত। তারপর এ ঘটনা চারিদিকে চাউর হয়ে গেল।


একদিন হলের প্রভোস্ট লোকজন নিয়ে এসে সেই ভৌতিক দরোজায় নক করলেন। ভিতর থেকে মাস্টার্সে পড়ুয়া এক ছাত্রকে পাওয়া গেল। সে একাই থাকে সে রুমে। কিন্তু প্রভোস্টের কি সন্দেহ হল। বললেন ‘তোমার আলমারিটা খোল’। খোলা হল সেই আলমারি (যেটা দেয়ালের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে) দেখা গেল আলমারীর ভিতর এক রুপসী মেয়ে গুটি সুটি হয়ে বসে আছে। ব্যাপার হচ্ছে সেই মাস্টার্সের ছাত্র বিয়ে করে তার স্ত্রীকে নিয়ে হলে থাকত। যাহোক পরে তাদের দুজনকেই হল থেকে বহিস্কার করা হয়।

আরেকটা ঘটনা এটাও তার কাছ থেকে শোনা। তাদের সময় কিংবা তাদের অনেক আগের ঘটনা হতে পারে এটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক শিক্ষক জয়েন করলেন কোন এক ডিপার্টমেন্টে। কিন্তু তিনি ক্লাশ নেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন আর যান। কিন্তু কখনই কোনো ক্লাশ নেন না। সবাই আশ্চর্য! পরে তার বিরুদ্ধে কেস হয়ে গেল। তাতেও তার যেন কোনো বিকার নেই।
পরে কোর্টে যখন তাকে ডাকা হল তখন তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে বললেন। ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার হিসেবে জয়েন করলে যে ক্লাশ নিতে হবে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি মালায় কোথাও লেখা নেই।’ বলা বাহুল্য তিনি কেসে জিতে গেলেন। আসলেই নীতি মালায় সেটা লেখা ছিল না। পরে তা যুক্ত করা হয়।

এরকম অনেক ঘটনাই তার কাছে শুনতাম। এই গল্পগুলো হত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটি ছাটায় যখন সে ঢাকা থেকে বাড়ি আসত তখন। আমরা থাকতাম মফস্বলে। কখনো কুমিল্লা বা বগুড়ায় । তবে ১৯৭১ সালে সে নিজেই ভয়ঙ্কর এক গল্প হয়ে উঠল যেন।
সেই সময় পাকিস্তানী আর্মির হাতে বাবার মৃত্যুর পর আমাদের পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। তখন কোনো একটা সময় কিছুদিন সে মহসিন হলে ছিল। সেই সময়েই এক রাতে হল রেইড দেয়। হলে ছাত্ররা কেউ খুব একটা নেই। যে কয়জন ছিল সবাইকে গ্রেফতার করা হল। নিয়ে আসা হল মহসিন হলের সামনের মাঠটায়। একটা সবুজ আর্মি জিপ দাঁড়িয়ে তার চারপাশে গোল করে দাঁড় করানো হল হল থেকে গ্রেফতার করে আনা আট দশজন ছাত্রকে।


তার মধ্যে একজন হুমায়ূন আহমেদ। আর্মিরা উর্দুতে বলল ‘ঐ জীপটাকে কেন্দ্র করে তোমরা হাঁটতে থাক’। তারা তাই করল। বড় ভাই খেয়াল করল সে যখন জীপটার বাম দিকের দরোজাটার কাছে আসে তখন ভিতর থেকে একজন বলে ‘দিস ম্যান’ এরকম কয়েকবার বলার পর তাকে সেই চলমান মানব বৃত্ত থেকে আলাদা করা হল।


এভাবে তাকে নিয়ে তিনজনকে আলাদা করা হল। এবং পরে কাছাকাছি একটা আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হল তাদের। তারপর ভয়াবহ নির্যাতন!

থাক, তার জন্মদিনে এই গল্প বলতে চাই না। সে নিজেও কখনো এই গল্প আমাদের বলতে চাইত না। আমরাই মাঝে মাধ্যে জিজ্ঞেস করে করে জানতে চাইতাম। আসলে সেই সময় ১৯৭১ সালে ... চারিদিকে নিজেদের পরিবারের ভিতরই এত ভয়াবহ সব মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল যে।

তার এই নির্যাতনের ঘটনাটা চাপা পড়ে গিয়েছিল। সে অবশ্য একবার ছোট্ট করে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় লিখেছিল ঘটনাটা। তাও খুব সংক্ষেপে। সে নিজেই বলত এই স্মৃতি আমি ভুলে থাকতে চাই।

তবে তার কোনো স্মৃতিই আমরা ভুলে থাকতে পারছি না। পিছনে তাকালেই দেখি সে আছে। ফেলে আসা দিনগুলো তাকে নিয়ে এত বেশী স্মৃতিময় ... তাই কি ভোলা যায়? না সম্ভব? ‘শুভ জন্মদিন দাদাভাই।’


আহসান হাবীব: হুমায়ূন আহমেদ এর অনুজ, লেখক, সম্পাদক: উন্মাদ।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন