শিরোনাম :

আরব যুদ্ধে সুন্নি নেতা ইসরায়েল!


মঙ্গলবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৭, ০৪:৪২ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

আরব যুদ্ধে সুন্নি নেতা ইসরায়েল!

ফারুক ওয়াসিফ: মাথা ঘোরানো সব খবর। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সৌদি আরবে গিয়ে ‘নিখোঁজ’ হয়ে রয়েছেন। ভ্লাদিমির পুতিনের মতো একক শাসক হওয়ার খায়েশে সৌদি যুবরাজ ভাই-বেরাদরদের বন্দী করে রেখেছেন; জব্দ করেছেন তাঁদের বিলিয়ন ডলারের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। ইসরায়েল হতে চাইছে সুন্নি আরব দেশগুলোর নেতা। সাইড শোতে আসিয়ান দেশগুলোর সভায় ট্রাম্পের ‘আদেশে’ গান গাইছেন ফিলিপাইনের বন্দুকবাজ প্রেসিডেন্ট দুতার্তে। তলে তলে এগিয়ে আসছে আরেকটি যুদ্ধ—লেবাননে।

সৌদি আরবের নতুন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (সংক্ষেপে এমবিএস) এক সপ্তাহ আগে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরিকে জরুরি তলব করলেন। হারিরি সৌদি অনুগত বিধায় নির্ধারিত সব বৈঠক বাতিল করে মাত্র দুজন দেহরক্ষী নিয়ে উড়ে গেলেন সৌদি রাজধানীতে। রিয়াদ বিমানবন্দরে নামামাত্র তাঁর ফোন নিয়ে নেওয়া হয়। লেবাননের প্রেসিডেন্ট মাইকেল আউন বললেন, প্রধানমন্ত্রী হারিরি ‘অপহৃত’ হয়েছেন। ৪ নভেম্বর সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সাদ হারিরি বললেন, তিনি লেবাননের প্রধানমন্ত্রীর পদ ত্যাগ করছেন!

সৌদি আরব ও ইসরায়েল ইরানবিরোধী বকা-বাদ্য সপ্তমগ্রামে তুললেও হারিরি বিষয়ে তারা চুপ!

কিন্তু গুমর হলো ইসরায়েলের চ্যানেল ১০ টেলিভিশনে। বিশ্বের সব ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতকে পাঠানো ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ গোপনীয় তারবার্তা ফাঁস হলে জানা গেল, সংকটের দিনে ইসরায়েলই সৌদি বাদশাহির পরম বন্ধু। তারবার্তায় ইসরায়েলি কূটনীতিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়, হারিরির পদত্যাগের ঘটনাটাকে তারা যেন ইরান ও হিজবুল্লাহকে চাপে রাখার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে এবং বিশ্বকে বোঝায়, ইরান কত খারাপ। তারা যেন লেবানিজ সরকার থেকে হিজবুল্লাহকে বহিষ্কারের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে চাপ দেয়।

এটুকু স্বাভাবিক। ইসরায়েল ও ইরান পরস্পরকে শত্রু ভাবার ব্যাপারে একমত। তাই ইসরায়েল ইরানকে কিংবা ইরান ইসরায়েলকে মিসাইল মারতে চাইতেই পারে। আমজনতার জন্য আসল চমক পরের কথাগুলোয়। সেখানে বলা হয়েছে, সৌদি আরবকে ইয়েমেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সাহায্য করতে হবে।

মধ্যপ্রাচ্যের কর্তৃত্ব নিয়ে যুদ্ধ চলেছে সিরিয়ায়, সৌদি আগ্রাসন চলছে ইয়েমেনে। আইএস ও আল-কায়েদার প্রতি সৌদি-ইসরায়েলি মদদও গোপন নেই আর। ইয়েমেনের হুতি, সিরিয়ার আসাদ এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ হলো মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাববলয় বা রাজনৈতিক-সামরিক বর্ম। তিনটি ফ্রন্টেই রাশিয়া ও তুরস্কের সমর্থনে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে ইরান। ইয়েমেন ও সিরিয়াকে কবজায় ব্যর্থ হয়ে সৌদি-মার্কিন-ইসরায়েল জোট মওকা খুঁজছে লেবাননে। এর মধ্যেই সৌদি আরব ঘোষণা করেছে যে, লেবানন নাকি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এই যুক্তিতে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমীরাত, কুয়েত, বাহরাইন বৈরুত থেকে তাদের নাগরিকদের সরিয়ে নিয়েছে। যুদ্ধই যদি এ হয়, তাহলে লেবানিজ প্রধানমন্ত্রী কি সেই যুদ্ধের বন্দি?

ইসরায়েলে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল শ্যাপিরো ইসরায়েলের শীর্ষ দৈনিক হারেটজে লিখেছেন, ‘সৌদিরা যুদ্ধের ময়দান সিরিয়া থেকে লেবাননে সরিয়ে আনতে চাইছে।’ এই কাজে সৌদি আরবের ইসরায়েলকে লাগবেই। মধ্যপ্রাচ্যের সেরা সামরিক গোয়েন্দা তথ্য ও সমরাস্ত্র ইসরায়েলেরই আছে। ইরান উভয়েরই চক্ষুশূল। এ অবস্থায় শিয়া-সুন্নি-খ্রিষ্টান ভাগে বিভক্ত লেবাননই একমাত্র নরম জায়গা। অতীতে চারবার তারা লেবাননে আগ্রাসন চালিয়েছে এবং প্রতিবারই প্রতিরোধের মুখে হাত গুটিয়ে ফেরত আসতে হয়েছে।

ধৈর্যের জন্য ইরানিরা খ্যাত, আর ইসরায়েলিদের গুণ হলো কূটবুদ্ধি নিয়ে আগ্রাসী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে লেগে থাকা। সাদ হারিরিকে পদত্যাগ করিয়ে লেবাননের কোয়ালিশন সরকারে ভাঙন এনে অস্থিরতা সৃষ্টির চিন্তা তাদের। কোনো সন্দেহ নেই, খ্রিষ্টান ও শিয়া সংঘাত তৈরি করে সেই সুযোগে হিজবুল্লাহকে নির্মূল করাই সৌদি-ইসরায়েলি জোটের লক্ষ্য।

ইতিমধ্যে সৌদি আরবের নেতৃত্বে সামরিক জোট গঠিত হয়েছে। ইরান-সিরিয়া-লেবানন বাদে মুসলিমপ্রধান ৩৯টি দেশের এই ‘সন্ত্রাসবিরোধী জোট’কে বলা হচ্ছে মুসলিম ন্যাটো। বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সানন্দে এই জোটের অংশীদার। মুসলিম ন্যাটোর নেতা সৌদি আরব, আর সৌদি আরবের বন্ধু ইসরায়েল—অতএব দুয়ে দুয়ে চার। কৌশলে সৌদি আরবকে সামনে রেখে ইসরায়েল হতে চাইছে সুন্নি দেশগুলোর নেতা।

আল-জাজিরায় প্রকাশিত ব্রিটিশ সাংবাদিক জোনাথন কুকের প্রতিবেদন ইসরায়েলি সাংবাদিক জেফ হাপারের বরাতে জানাচ্ছে, ‘ইসরায়েলের অভিলাষ আরও বিরাট। যতই অদ্ভুত শোনাক, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সম্প্রতি বলেছেন, ইরানকে মোকাবিলায় তিনি “আধুনিক সুন্নি রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে” জোট গঠনে “কঠিন” চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ইসরায়েলের ওই কূটনৈতিক মিশনের উদ্দেশ্য নিয়ে তাই আর সন্দেহ থাকে না।’ অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে হলেও আরব রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতার খেলায় ধুরন্ধর ইসরায়েলই হয়ে উঠছে সুন্নি দুনিয়ার নেতা।

জেফ হাপার কার্যকারণটা স্পষ্ট করেই বলেছেন: ‘সৌদি আরব ঠেকে শিখেছে যে তারা ইয়েমেনের শিয়া হুতিদেরও হারাতে পারে না। ইসরায়েলের সামরিক শক্তি, ইউরোপে তাদের গ্রহণযোগ্যতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে তাদের প্রভাব সৌদি আরবের খুব দরকার।’

সবাই চাইছে তাদের হয়ে ইরানকে অন্যরা মেরে দিক। ইসরায়েল চাইছে আমেরিকা ইরানে বোমা ফেলুক। আমেরিকা চাইছে সৌদি আরবকে দিয়ে ইরানকে দমাতে। আর সৌদিরা চাইছে ইসরায়েল ইরান অথবা ইরানের ছায়াসঙ্গী হিজবুল্লাহকে শায়েস্তা করুক। এর প্রস্তুতি হিসেবে গত সেপ্টেম্বর মাসে লেবানন সীমান্তে ইসরায়েল গত বিশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক মহড়া চালিয়েছে। উদ্দেশ্য, চতুর্থবারের মতো লেবানন আগ্রাসন। ২০০৬ সালে ইসরায়েল যেভাবে ব্যর্থ হয়েছে, এবারেও তেমন হওয়ার সম্ভাবনা। সিরীয় যুদ্ধের সাফল্যে হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা আরও পোড় খাওয়া আরও দৃঢ়চেতা এবং আরও চাঙা। আর সম্ভবত তারাও জানে, এই যুদ্ধই হবে আখেরি যুদ্ধ। হয় হিজবুল্লাহ বিনাশ হবে, নয়তো ইসরায়েল বড় ধাক্কা খাবে।

সম্ভবত এই যুদ্ধই সৌদি রাজতন্ত্রের পতনের ঘণ্টা বাজাবে। ১৯৫৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পরিণতিতে মিসরের সেনাবাহিনী সে দেশের অথর্ব রাজাকে উৎখাত করে জাতীয়তাবাদী সরকার প্রতিষ্ঠা করে। ইয়েমেন ও সিরিয়ার পরাজয়ের পর ইরানের কাছে আরেকটি মার খাওয়ার ধাক্কা সৌদি রাজপরিবার সামলাতে পারবে না। তা ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে এই আঁতাত অনেক শেখ, রাজপুত্র ও জেনারেলও ভালো চোখে দেখছেন না। তারই প্রমাণ, জাতীয় রক্ষী বাহিনীর প্রধানসহ বেশ কয়েকজন রাজপুত্রকে আটকে রাখার ঘটনার মধ্যেই আছে।

ইরানকে মোকাবিলার এই সৌদি-ইসরায়েলি মিশনের শিকার শুধু ফিলিস্তিনের ভাগ্যহত মানুষেরাই নয়, বিধ্বস্ত সিরিয়া, গণহত্যা ও দুর্ভিক্ষে পীড়িত ইয়েমেনসহ কাতার, ইরাকের কোটি কোটি মানুষ এই ভূরাজনৈতিক খেলার নিরীহ শিকার। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান অভিশাপ একা ইসরায়েল নয়, মধ্যপ্রাচ্যের জনগণের শত্রু এর রাজতান্ত্রিক, ভোগমত্ত, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বশংবদ স্বৈরশাহিগুলো। তাদের চাই আরও তেল, আরও রক্ত, আরও সোনা আর ডলার; আর ইসরায়েলের চাই আরও আরব ভূমি।

মধ্যপ্রাচ্য আবার এসে দাঁড়িয়েছে শূন্য সময়ের শূন্য ডিগ্রিতে—ইরাক-সিরিয়া-ইয়েমেনের পর আরেকটি ধ্বংসের কিনারে। আমরা দর্শক, হাতে টিভির রিমোট কন্ট্রোল; থাকছে শুধু টেলিভিশনে মানুষের মৃত্যু দেখবার স্বাধীনতা। প্রথম আলো

ফারুক ওয়াসিফ: লেখক ও সাংবাদিক।
faruk.wasif@prothom-alo.info

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন