শিরোনাম :

ট্রাম্পের ফাঁদে সালমানের পা


বুধবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৭, ০৮:১৯ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

ট্রাম্পের ফাঁদে সালমানের পা

শুভ কিবরিয়াঅনেক ঘটনা ঘটছে সৌদি আরবে। ‘নয়া আরব’ তৈরির ঘোষণা দিয়ে সৌদি যুবরাজ অ্যাকশনে আছেন। এই অ্যাকশন আচানক তবে অপ্রত্যাশিত নয়। যুবরাজ মুহম্মদ বিন সালমান তার ক্ষমতার পাটাতন শক্ত করতে এক চালে অনেক পক্ষকে ঘায়েল করতে চাইছেন। সৌদি আরবের উপরমহলে শুধু ধরপাকড়, গ্রেফতারই চলছে না চলছে গোপনে ও প্রকাশ্যে অনেক খেলা। ইতোমধ্যে সৌদি আরবে ১১ জন রাজকুমার ও চার প্রাক্তন মন্ত্রী গ্রেফতারের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন অভিযানের জেরে পদ হারিয়েছেন বর্তমান তিন মন্ত্রী। গ্রেফতার হওয়া রাজকুমারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে আলওয়ালিদ বিন তালালকে নিয়ে। পশ্চিম এশিয়ায় কয়েকশ কোটি ডলারের মালিক হিসেবে তালাল গোটা বিশ্বে ধনীদের তালিকায় অনেকটাই উপরে। টুইটার, অ্যাপল, রুপার্ট মার্ডকের নিউজ কর্প-এর মতো আরও বেশ কয়েকটি নামকরা সংস্থায় শেয়ার রয়েছে তার।

দুর্নীতির দায়ে পদ হারিয়েছেন অর্থনীতি ও পরিকল্পনা সংক্রান্ত মন্ত্রী আদেল বিন মহম্মদ ফকি, জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ও রাজকুমার মিতেব বিন আবদুল্লা বিন আব্দুল আজিজ এবং নৌবাহিনীর কমান্ডার অ্যাডমিরাল আবদুল্লা বিন সুলতান বিন মহম্মদ আল-সুলতান। এক সময় সৌদি সিংহাসনের দৌড়ে রাজকুমার মিতেবের নামও শোনা গিয়েছিল। সৌদি সংবাদমাধ্যমের দাবি, ধৃত ব্যক্তিরা জনস্বার্থের কাজ করতে গিয়ে মুনাফা লুটেছেন, কেউ কেউ সরকারি অর্থ নয়ছয় করেছেন। তাই প্রশাসনের সব স্তর থেকে দুর্নীতি মুছতে এ পদক্ষেপ। পদচ্যুত মন্ত্রীদের জায়গায় নতুন মুখও এনেছেন রাজা। ধরপাকড় ছাড়াও দুর্নীতি দমন কমিটির প্রধান যুবরাজ মুহম্মদ বিন সালমান কারও কারও সম্পত্তি ফ্রিজ, কারও ক্ষেত্রে বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। বলা হচ্ছে কয়েক সপ্তাহে রিয়াদের রির্টজ-কার্লটন হোটেল ভিআইপি বন্দিশালায় পরিণত হয়েছে। প্রায় আট শত বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্পদ ফ্রিজ করা হয়েছে।

সৌদি যুবরাজ অবশ্য বলছেন ভিন্ন কথা। তার ভাষ্য হচ্ছে নতুন আরব গড়তে সংস্কার কর্মসূচি চালু করেছেন তিনি। তারই প্রথম ধাপ হিসাবে এই দুর্নীতি বিরোধী অভিযান।

এর বাইরে সৌদি যুবরাজ চালাকি করেছেন ইরানের বিরুদ্ধেও। মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবের রাজনৈতিক প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করেছে ইরান। সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মুহম্মদ বিন সালমান তাই ভাবিত সৌদি আরবের ভবিষ্যৎ নিয়ে। তার ধারণা সৌদি রাজতন্ত্র গত ৩০ বছর ধরে কট্টর শাসন চালিয়েও সেদেশে ইরানি ইসলামি বিপ্লবের প্রভাব ঠেকাতে কার্যকর কোনও পন্থা বের করতে পারেনি। সালমান চান ‘মডারেট ইসলাম’ তাড়িত নতুন সৌদি আরব। কট্টর রক্ষণপন্থা থেকে সৌদি আরবকে নিয়ে যেতে চান তিনি একটি মুক্ত সমাজে। তার ধারণা ইরানি বিপ্লবের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে সৌদি আরব নিজের চারপাশে রক্ষণশীলতার বর্মই পরেছে কেবল। ফলে সৌদি আরবে মুক্ত সমাজ যেমন তৈরি হয়নি, সুশাসন আসেনি, দুর্নীতি কমেনি, বিদেশি বিনিয়োগও বাড়েনি। রক্ষণশীলতার বর্ম পরে কেবল ইরানভীতিই বেড়েছে সৌদি সমাজজুড়ে।

দুই.

ত্রিশ বছর আগে ১৯৭৯ সালের ইরানি ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে গত তিন যুগ ধরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে দুধরনের ঘটনা ঘটেছে। কেউ এই বিপ্লবকে অনুসরণ করতে চেয়েছে। কেউ ওই পথ এড়িয়ে চলতে চেয়েছে। এর কোনোটাই সাফল্য পায়নি। যুবরাজ সালমান তাই নতুন পথে হাঁটতে চান। সেই নতুন পথের নাম ‘মধ্যপন্থা’ বা ‘মডারেট ইসলাম’। কেননা সৌদি আরবে মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশের বয়স ৩০ বছরের নিচে। চরমপন্থা হটিয়ে এরা মুক্তপথেই চলতে চায়। সালমান এদের নেতা হতে চান। সোশ্যাল ট্যাবু ভাঙতে চান। সংস্কার চান সমাজজুড়ে। ইতোমধ্যে সৌদি আরবে নারীরা গাড়ি চালানোর অধিকার পেয়েছে। নারী অধিকার দেওয়ার পথে হাঁটতে চাইছেন সালমান। শুধু সামাজিক সংস্কারই নয়, অর্থনৈতিক সংস্কারও চান তিনি। নতুন ইকোনমিক জোন তৈরি করে এদের ‘লিবারেল হাব’ গড়ে তুলতে চান। অর্থনৈতিক পুনর্বাসন চান। জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের নানান সামাজিক চুক্তির পথ উন্মুক্ত করতে চান সালমান। আগামী ১০ বছরে সৌদি আরবে ৫০ লাখ কর্মক্ষম মানুষ কর্মবাজারে প্রবেশ করবে। তাদের জন্য চাই সুনিশ্চিত কর্মসংস্থান। তেলের বাজার পড়তির দিকে। অর্থনীতির নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার তাই জরুরি।

তিন.

তাহলে সৌদি কৌশল কী হচ্ছে? সৌদি যুবরাজ প্রথমেই দেশের ভেতর তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার উদ্যোগ নিলেন। সাথে সাথে ইরানের বিরুদ্ধে জোরদার ব্যবস্থা নেওয়ার কৌশল চালু করলেন। এইক্ষেত্রে তার ভরসা একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, অন্যদিকে ইসরায়েলি মিত্রতা। সেকারণেই সৌদি যুবরাজ মার্চ ২০১৭-তে মার্কিন মুল্লুকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। গোপনে ইসরায়েল সফরও করেছেন বলে জোর প্রচারণা আছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাই সালমানের প্রধানতম মিত্র এখন।

সালমানের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের সমর্থনে টুইট পর্যন্ত করেছেন ট্রাম্প। লিখেছেন– ‘রাজা সালমান এবং যুবরাজ মুহম্মদ বিন সালমানের প্রতি আমার অসম্ভব বিশ্বাস। ওরা জানেন, ওরা ঠিক কী করছেন। ওরা আজ যাদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নিয়েছেন, তারা এতদিন নিজের দেশ থেকে প্রচুর সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন।’

এদিকে ইয়েমেন থেকে রিয়াদে একটি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ঘটনা নিয়ে সৌদি আরব এবং ইরানের মধ্যে বাকবিতণ্ডা বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। ক্ষমতাধর সৌদি যুবরাজ বলেছেন, ইরান ইয়েমেনি হুতি বিদ্রোহীদের এই ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে কার্যত সৌদি আরবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। শিয়া হুতি বিদ্রোহীরা ইরানের সমর্থন পাচ্ছে। অন্যদিকে সৌদি আরবসহ আরও কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ ইয়েমেনি সরকারের সমর্থনে বিদ্রোহীদের ওপর দুই বছর ধরে বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। সৌদি যুবরাজ ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের যে অভিযোগ করেছেন, তেহরানের সরকার তাকে মিথ্যে বলে উড়িয়ে দিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ বলেছেন, সৌদি আরব একটি আঞ্চলিক মোড়লের ভূমিকা পালন করছে এবং এটা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জন্য হুমকি।

এর মধ্যে সৌদি আরবে গিয়ে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। সাদ হারিরির অভিযোগ দেশে হিযবুল্লাহর হাতে তার প্রাণনাশের সম্ভাবনা রয়েছে। উল্লেখ্য, লেবাননে হিযবুল্লাহর পেছনে আছে ইরান। সাদ হারিরি আদৌ নিজে পদত্যাগ করলেন, না সৌদি আরব তাকে গৃহবন্দি করে এই খবর রটাচ্ছে তা নিয়েও চলছে কানাঘুষা। লেবাননের ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সম্ভাব্য ক্ষেত্র নিয়ে সৌদি আরব-ইরান ছায়াযুদ্ধে নেমে পড়েছে।

সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া, ইয়েমেন, লেবাননে ক্রমশ ইরানি প্রভাব বাড়ছে। ইরানের এই বাড়ন্ত শক্তি সৌদি আরবকেও ভাবিয়ে তুলেছে।

ইরান-সৌদি আরবের এই দ্বন্দ্বের পেছনে দুই পক্ষে দাঁড়িয়ে আছে বৃহৎ শক্তিবর্গ। সৌদি যুবরাজের পেছনে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানবিরোধীরা এক-কাতারে সমর্থন করছে সৌদি আরবকে। অন্যদিকে সিরিয়ায় ইসলামি স্টেটকে পরাভূত করা আসাদ বাহিনীর মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে ইরান। রাশিয়া ও চীনের প্রত্যক্ষ সমর্থনে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বাড়িয়ে তোলা ইরান এখন সঙ্গে পাচ্ছে তার একসময়ের শত্রু তুরস্ককে। শিয়া-সুন্নির ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব তো আছেই, নতুন করে শুরু হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের লড়াই।

চার.

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দুনিয়া চষে বেড়াচ্ছেন তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে। সেক্ষেত্রে তার সাফল্য এখনও আসেনি। তাই তার শাসনকালকে উজ্জীবিত রাখতে একটি যুদ্ধ এখন খুব জরুরি। আপাতত উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ সম্ভাবনা মুখে বজায় থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে যে কোনও মূল্যে ইরানকে ঘায়েল করতে চান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করতে চান ট্রাম্প। তার টার্গেট তিনটি। এক. ইরানকে ঠেকানো। দুই. আমেরিকার সমরাস্ত্র বাণিজ্য মধ্যপ্রাচ্যে জোরদার করা। তিন. ইসরায়েলকে সম্ভাব্য শত্রুর হাত থেকে সুরক্ষা দেওয়া।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাই নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যে ফাঁদ পেতেছেন। সৌদি আরব ও তার সমর্থকদের ইরানের পেছনে লেলিয়ে দিতে চান। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার পুরনো কৌশল। তাতে দুই পক্ষে উত্তেজনা বাড়লে মার্কিন সমরাস্ত্র বাণিজ্য বাড়বে। যত অস্ত্র বিক্রি হবে তত তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে জোয়ার উঠবে। যুবরাজ সালমান সম্ভবত সেই ফাঁদে পা দিয়েছেন। ইসরায়েলি প্ররোচনা আর মার্কিন উৎসাহে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে নেমে পড়লে নিজ দেশ সৌদিতে যেমন তার শক্তি সংহত হবে তেমনি ইরানকেও একটা বেকায়দায় ফেলা যাবে এই ভাবনা এখন যুবরাজ সালমানের। ট্রাম্প এবং ইহুদি লবি এই কাজে এখন অতিতৎপর। যুবরাজ সালমান যদি ট্রাম্পের পাতা ফাঁদে পা দেন তবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে দেখা দেবে নতুন বিপদ। সেই বিপদের উত্তাপ আমাদেরও ভোগাতে পারে বিলক্ষণ।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন