শিরোনাম :

‘হারাধনের দশটি ছেলে’


বৃহস্পতিবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৭, ০৩:০২ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

‘হারাধনের দশটি ছেলে’

সৈয়দা আখতার জাহান: আমাদের ছোটবেলায় জনপ্রিয় বা বহুলশ্রুত কবিতাগুলোর একটা ছিল যোগীন্দ্রনাথ সরকারের লেখা ‘হারাধনের দশটি ছেলে’। সেই দশ ছেলের মধ্যে প্রথমজন হারিয়ে গেলেও আমরা গর্ব করে পড়তাম রইলো বাকি নয়। দ্বিতীয়জন কাঠ কাটতে গিয়ে দুভাগ হলে, মনে করিয়ে দিতাম রইলো বাকি আট। তৃতীয়জন পেট ফেটে, চতুর্থজন জলাশয়ে ডুবে, পঞ্চমজন গাছ থেকে পা পিছলে পড়ে, এভাবে একে একে নয় সন্তান মারা গেলে গলার স্বর দমিয়ে স্বান্তনা নিয়ে পড়তাম রইলো বাকি এক। অতঃপর, হারাধনের একটি ছেলে/কাঁদে ভেউ ভেউ, মনের দুঃখে বনে গেল/ রইল না আর কেউ। তারপর? কবিতাটা আবার শুরু থেকে পড়তাম।

কবিতার ছেলেরা হারিয়ে গেলে কবিতার ক্ষতিবৃদ্ধি না হলেও বাস্তবের সন্তানরা হারিয়ে গেলে তার ক্ষতিবৃদ্ধি হয় বৈকি। বলছিলাম গণমাধ্যমের বহুল আলোচিত নাম মোবাশ্বার হাসান (সিজার) এর কথা। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড সোশিয়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সিজারকে গত ৭ নভেম্বর থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সিজার কিছুটা অমসৃণ সময় পার করছিলেন। সপ্তাহ খানিক আগে দুই অজ্ঞাত যুবক ছাত্র পরিচয়ে তার বাসায় ঢোকার চেষ্টা করলে বাসার নিচে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো হয়। আইডিবি ভবনে মিটিং শেষে উবার ডেকে নেন সিজার। ৬টা ৪১ মিনিটে সেলফোন থেকে লাস্ট কলটি করা হয়। এরপর ৬টা ৪৫ থেকে মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। এবছরের অক্টোবরে গণমাধ্যমের আরেকটি বহুল আলোচিত নাম উৎপল দাস। ২৯ শে পা দেওয়া উৎপল গত ১০ অক্টোবর নিজ কার্যালয় থেকে বের হওয়ার পর থেকে আর কেউ তাকে দেখেনি। সেদিন দুপুর ১টা পর্যন্ত অফিস করেন। দুপুর ১টা ৪৭ মিনিটের পর থেকে বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে উৎপলের ব্যবহৃত সেলফোনটি।

না, সিজার এবং উৎপল তাদের বাসাতে ফেরেননি, তারা অফিসেও ফেরেননি। স্থায়ী ঠিকানা, বাবা-মা, পরিবার কোথাও ফেরেনি। এই ফিরে না আসায় যেটা প্রথম মনে আসবে, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে কিনা? না। তাদের কোনও বিরোধ কিংবা শত্রুতার কথা কেউ বলতে পারছেন না। তাহলে সিজার এবং উৎপল কোথায়? শুধু সিজার কিংবা উৎপল নয়, প্রায়শই রাষ্ট্রের কোনও না কোনও সন্তান নিখোঁজ হচ্ছেন। গণমাধ্যম মারফত জানলাম গত আগস্ট মাস থেকে এ পর্যন্ত রহস্যজনক ভাবে নিখোঁজ হয়েছেন নয়জন। নিখোঁজ ব্যক্তিরা হলে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সৈয়দ সাদাত, কল্যাণ পার্টি মহাসচিব আমিনুর রহমান, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও বেলারুশের অনারারি কনসাল অনিরুদ্ধ রায় এবং কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইশরাক আহমেদ, আরাফাত রহমান নামের এক যুবক, বাংলাদেশ জনতা পার্টির মিঠুন চৌধুরী ও সহকর্মী আশিক ঘোষ।

আরও একটু পেছনে তাকালে নিখোঁজের তালিকায় আছেন ইলিয়াস আলী, মাহবুব হাসান, সাজেদুল ইসলাম, চৌধুরী আলম, হুমায়ন কবীর পারভেজ, মাজহারুল ইসলাম, হিরু, আদনান চৌধুরীসহ আরো অনির্দিষ্ট সংখ্যার মানুষ। তারা কোথায় আছেন? যদি মারা গিয়েও থাকেন সেই উত্তর জানাটা তাদের পরিবারের জন্য খুব বেশি জরুরি। কেননা অপেক্ষার আরেক নাম অনিঃশেষ যন্ত্রণা। যাদের নাম বললাম এদের নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ গণমাধ্যমে এসেছে বলে জানাতে পেরেছি, আর যাদের কথা আসে না তারা হারিয়ে যান সংখ্যার অন্তরালে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদন বলছে, ২০১৪ সাল থেকে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত নিখোঁজ বা অপহরণের শিকার হয়েছেন ২৮৪ জন। তাঁদের মধ্যে মৃতদেহ উদ্ধার হয় ৪৪ জন ব্যক্তির। নিখোঁজের পর গ্রেফতার দেখানো হয় ৩৬ জনকে এবং পরিবারের কাছে বিভিন্নভাবে ফিরে আসেন ২৭ জন। তবে এখনও ১৭৭ জনের কী অবস্থা তা জানা যাচ্ছে না। তাঁদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা পরিবার বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ বলতে পারছেন না। নিখোঁজদের তালিকা বলে দেয় যে গত পাঁচ ছয় বছরে সংখ্যার বিচারে তা বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি মেক্সিকোর গুয়েরেরো রাজ্যের ৪৩ জন শিক্ষার্থী নিখোঁজ হলে, তাদের সন্ধান করতে গিয়ে বেশ কয়েকটি গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায় ওই রাজ্যে। দেশটিতে গুম হওয়ার ঘটনা ছিল নৈমিত্তিক।

উৎপলের মা বিমলা দাসের কিংবা সিজারের বাবা মোতাহার হোসেনের তো আর দশটা ছেলে না, তাই তারা কাঁদেন, সংবাদ সম্মেলন করেন, রাষ্ট্রের কাছে সন্তান ফিরে পাওয়ার সহযোগিতা চান। ‘সহযোগিতা’ একটা মানবিক রাষ্ট্রের কাছে তার নাগরিকরা চাইবেন সেটাই স্বাভাবিক। তবে সেই স্বাভাবিককে স্বাভাবিক রাখতে রাষ্ট্র কি কোনও পদক্ষেপ নিচ্ছেন?

যদিও নিখোঁজদের খুঁজে দিতে সময় চেয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তবে সেখানে ভবিষ্যতে আর কেউ নিখোঁজ হবেন না এমন আশার বাণী নেই। সময়ের দীর্ঘসূত্রিতা শুধু হতাশা নয় আশংকারও জন্ম দিচ্ছে। যারা ফিরে আসেন না তাদের পরিণতি আমাদের জানা হয় না। জনবহুল এবং ঘটনাবহুল এই দেশে সেটা আমরা মনেও রাখি না। নতুন ইস্যু, নতুন সমস্যা, নতুন চমক, আর নতুন নতুন গ্যাজেটের ভীড়ে হারিয়ে ফেলি কিংবা চাপা পড়ে যায়। নিখোঁজরা যদি ফিরে না আসে! তাতেই বা কী! আমাদের দিন এবং রাত যাপনে তো এমন প্রভাব পড়বে না। আমরা তো আর নিখোঁজ হয়নি এখনও। আতংকের গরম নিঃশ্বাসটা কি আমাদের কাঁধেও পড়ছে না?

ভানুর একটা কৌতুক আছে এরকম, ভানু একবার পুলিশের কাছে গেলেন একটা নালিশ নিয়ে, গত রাতে তার বাড়ি চুরি হয়েছে, পুলিশ জিজ্ঞাসা করলেন, চোর কে সেটা কি আপনি দেখেছেন? ভানু বললেন হ্যাঁ দেখেছি। চোর ব্যাটা তো আমার সামনেই চুরি করলো। ঘরে একটা চোর আসলো। ভানু টের পেয়েও নিঃশব্দে পড়ে রইলেন, ভাবলেন দেখি না কী করে। চোর ঘরে সিদ কাটলো, মূল্যবান জিনিস নিলো; ভানু ভাবছে দেখি না কী করে। চোর কাজ সমাধা করে যাওয়ার আগে ভানুর খাটের মশারি তুললেন, যেখানে ঘুমন্ত স্ত্রীসহ ভানু ঘাপটি মেরে পড়ে ছিলেন; চোর ভানুর বৌয়ের গলার সোনার হার খুলে নিলো। দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে খুলে বাইরে বেরিয়ে গেলো। ভানু তখনও ভাবছেন, দেখি না কী করে। পুলিশ বললেন, আপনার নিজের ঘরে চুরি হওয়া আপনি যদি জেগে থেকে ‘দেখি না কী করে’ ভেবে চুপটি করে বসে বসে দেখতে পারেন, তবে পুলিশকেও দেখতে হবে, দেখি না কী হয়!

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা এবং গণমাধ্যম অধ্যায়ন বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ।

 

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন