শিরোনাম :

ভয়ঙ্কর ‘কৈশোর’


রবিবার, ২৬ নভেম্বর ২০১৭, ১২:২৮ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

ভয়ঙ্কর ‘কৈশোর’

তুষার আবদুল্লাহ: মনটা অস্থির হয়ে আছে। আমার একার নয়, অনেককেই হয়তো গ্রাস করছে এই অস্থিরতা। নাগরিক জীবনে অস্বস্তি বোধ করার নানা কারণ থাকে। নিত্য নতুন উপকরণ যোগ হয়। নাগরিকেরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। নাগরিক বলতে এখন আর শুধু বড় শহরে বসবাসকারীদের ভাবলে চলবে না। নগরের ধুলা এখন গ্রামেও উড়ছে। তারাও নাগরিক নষ্টামির যন্ত্রণায় কাতর-অস্থির। নাগরিক জীবনের জটিলতা তাদের সহজ জীবনে আতঙ্ক হয়ে এসেছে।

রকমারি সেই আতঙ্ক! আপাতত যে আতঙ্কটি নিয়ে অস্থিরতা, সেটি হচ্ছে ‘কৈশোর’। এই বয়সসীমা অতিক্রম করছে যারা, তাদের নিয়ে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের অস্থিরতা বাড়ছেই। এই বয়সসীমায় আছে যারা, তারা বেপরোয়া হয়ে উঠছে—কী শহর, কী গ্রামে। বেপরোয়া এই গতি তাদের ভয়ঙ্কর অপরাধের অতলে নিয়ে যাচ্ছে। পাশের কিশোরটি, ঘরের কিশোর সন্তানটিই যে ভয়ঙ্কর অপরাধী হয়ে উঠছে, আমরা একসময় সেটি বুঝে উঠতে না পারলেও, এখন তাদের  দ্বারা আক্রান্ত হয়ে বসে আছি। শুধু যে শিক্ষাবঞ্চিত কৈশোর অপরাধের নষ্ট চক্রে জড়িয়ে পড়েছে, তা নয়। স্কুলপড়ুয়া কিশোররা, শিক্ষিত পরিবার বলে পরিচিত পরিবারের সন্তানরাও এই অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। তাদের মধ্যে কৈশোরের কোমলতা, উচ্ছ্লতা নেই। আছে ঔদ্ধত্য।

আমাদের কিশোরদের কৈশোরের উচ্ছ্লতা হারিয়ে যাওয়া ও কোমলতা উড়ে যাওয়ার জন্য দায়ী পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র। রাষ্ট্র তাকে সঠিক শিক্ষা ও বিকাশের পরিবেশ তৈরি করে দিতে পারেনি। সমাজ তাকে অবহেলা করেছে। বিকাশের পথেও তৈরি করে দিয়েছে একের পর এক বাঁধ। সমাজ ও রাষ্ট্র কিশোর বয়সীদের নিজেদের মতো করে ব্যবহারও করেছে। পরিবার শুরু থেকেই তাকে পারিবারিক বন্ধনে বাঁধতে পারেনি, তাকে সঠিক শিক্ষা দিতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল, পরিবার তার মানসিক বিকাশকে জটিল করেছে, তাকে ভোগের প্রতি, প্রতিযোগিতার প্রতি প্রলুব্ধ করেছে। সবমিলিয়ে আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র কৈশোর বান্ধব হয়ে ওঠেনি।

ফল হিসেবে আমরা দেখছি কিশোর-কিশোরীরা মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে। মাদক ব্যবসায় ব্যবহৃত হচ্ছে তারা। কিশোররা পেশাদার অপরাধী এমনকী পেশাদার খুনি হিসেবে ভাড়া খাটছে। ধর্ষণ, যৌন-হয়রানি, অপহরণ, ডাকাতি ও সাইবার অপরাধে কোনও কোনও ক্ষেত্রে কিশোর বয়সীরাই নেতৃত্বে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একপ্রকার প্রকাশ্য গ্রুপ খুলে তারা এলাকাভিত্তিক দখল-সাম্রাজ্য পরিচালনা করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই তাদের বিকৃত যৌনতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ার আলামত স্পষ্ট।

কিশোরদের মধ্যে বিষণ্নতা, হতাশা চেপে বসার অনেক কারণের মধ্যে প্রধান হয়ে উঠেছে তাদের শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্রের নিরীক্ষা। রাষ্ট্র মোটেও বিবেচনায় রাখছে না যে, তার তৈরি পাঠ্যসূচি শিক্ষার্থীকে পাঠে আকৃষ্ট করছে কিনা, তাকে পরীক্ষা ও কোচিং-নির্ভরতার দিকে কতটা ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস, অনিশ্চিত পাঠ্যসূচির জালে আটকে পড়ছে কৈশোর। শিক্ষা এখন তার কাছে একবিন্দুও আনন্দের নয়। তার কাছে শিক্ষা এখন এক আতঙ্কিত প্রতিযোগিতার নাম। শৈশব ও  কৈশোরের পাঠ্যক্রম বিষয়ে সুরাহা না হলে আমাদের কিশোর-কিশোরের মানসিক বৈকল্যের আরোগ্য সম্ভব নয়।

এখন আবার আওয়াজ উঠেছে—স্কুলে স্কুলে ছাত্রলীগের কমিটি গঠিত হবে। আমাদের এক প্রজন্ম আগে শুনেছি এমনটা ছিল। আমরা স্কুলে পেয়েছি ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র শিবির ও খেলাফত মজলিসের তৎপরতা। সেই সময়ে সমাজের অস্থিরতা এই পর্যায়ে আসেনি। কিশোররা অপরাধের জালে এভাবে আটকে পড়েনি। ছাত্র সংগঠনগুলো আদর্শচ্যুত হয়নি তখনও। এখন তো ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে  দলের আদর্শের সম্পর্ক নেই। সংগঠনগুলো কতিপয় নেতার লেজুড়বৃত্তি করছে। সেখানে সাংস্কৃতিক চর্চা নেই। স্কুলে স্কুলে যে কোনও ছাত্র সংগঠনের শাখা খোলা মানে কিশোরদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করে দেওয়া। তারা লেখাপড়ার চেয়ে স্কুল কমিটিতে প্রভাব বিস্তারে মনোযোগী হবে। স্কুল শিক্ষকদের ওপরও চড়াও হবে। স্কুলেও যে অস্ত্রের ঝনঝনানি পৌঁছে যাবে, তা নিশ্চিত। স্কুল কমিটির ছাত্ররা ব্যবহৃত হবে দখল বাণিজ্যেও।

অর্থাৎ আমাদের সন্তানদের কৈশোরকে আরও ভয়ঙ্কর করে তোলার আরেকটি বীজ আমরা বপন করতে যাচ্ছি। বীজ থেকে অঙ্কুর ছাড়া ফলনের জন্য ক্ষতিকর কীটনাশক তো তৈরিই আছে  তাই না?

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন